হাতিরঝিল নিয়ে মিস প্ল্যান হয়েছে: মেয়র আতিক

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ১১:১৫, জুলাই ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৫, জুলাই ২৭, ২০২০

মেয়র আতিকুল ইসলামরাজধানীর হাতিরঝিল নিয়ে মিস প্ল্যান হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ২০ থেকে ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতকে মাথায় রেখে এর প্ল্যান করা হয়েছে। বাংলাদেশ তো বৃষ্টিপ্রবণ দেশ। ছয় ঋতুকে মাথায় রেখেই প্ল্যানটি করা উচিত ছিল। ৫০ থেকে ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে ঢাকার অবস্থা কী হবে সেটাও ভাবার দরকার ছিল। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে যাদি পরিকল্পনাটি করা হতো, তাহলে আজ ঢাকার এমন দশা হতো না।

সম্প্রতি গুলশান-২ নম্বরে অবস্থিত নগর ভবনের মেয়র দফতরে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মেয়র এসব কথা বলেন। একইসঙ্গে তিনি ট্যাক্স না বাড়িয়ে, ট্যাক্স দাতার সংখ্যা বৃদ্ধি করে সংস্থার আয় বাড়ানো এবং যানজট নিরসনসহ নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

বাংলা ট্রিবিউন: হাতিরঝিল প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল রাজধানীর যানজট নিরসন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা ও বন্যা প্রতিরোধ, ময়লা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। কিন্তু এখন জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পটির কোনও ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। উল্টো প্রকল্পের কারণে সামান্য বৃষ্টি হলেই আশপাশের বড় অংশজুড়ে জলজট দেখা দেয়। এ নিয়ে সিটি করপোরেশন কী ভাবছে?

মেয়র আতিকুল ইসলাম

আতিকুল ইসলাম: হাতিরঝিল নিয়ে মিস প্ল্যান হয়েছে। বর্তমানে ডিএনসিসি এলাকায় মগবাজার প্রধান সড়ক, জাহান বক্স লেন, শাহ সাহেব বাড়ি লেন, নয়াটোলা ও মধুবাগ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। হাতিরঝিল করার সময় যদি এই এলাকাগুলো নিয়ে পরিকল্পনা করা হতো, তাহলে এই সমস্যাটা হতো না। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীসহ হাতিরঝিল এলাকা পরিদর্শন করেছি। আজ টিসিবি ভবনের সামনে পানি জমে। অথচ তার পাশেই হাতিরঝিল। পানি নিষ্কাশনের সেই লাইন সেখান থেকে যাবে পূর্ব দিকে। সেখান থেকে লাইন ঘুরে এসে আবার পশ্চিম দিকে আসবে। সেখানে ধনমন্ডি থেকে পানি আসার যে কালভার্ট সেখানে গিয়ে পড়বে। তারপর সেটা হাতিরঝিলে যাবে। পানি তো এত সময় ওয়েট করবে না। বৃষ্টি এলে যত দ্রুত সম্ভব সেটা নিষ্কাশন করতে হবে। এসব বিষয় নিয়ে এখন আমাদের প্ল্যান করতে হচ্ছে।

মেয়র আরও বলেন, এখন হাতিরঝিল প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে—২০ থেকে ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতকে মাথায় রেখে এর প্ল্যান করা হয়েছে। বাংলাদেশ তো বৃষ্টি প্রবণ দেশ। ৬ ঋতুকে মাথায় রেখেই প্ল্যানটি করা উচিত ছিল। ৫০ থেকে ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে ঢাকার অবস্থা কী হবে সেটাও ভাবার দরকার ছিল। এখন হাতিরঝিলে আরও বেশি পাম্প বসিয়ে পানি আউট করতে হবে। যত তাড়াতাড়ি হোক শর্ট ওয়েতে পানি নিষ্কাশন করতে হবে।

প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলছেন মেয়র আতিকুল ইসলাম

হাতিরঝিল কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে মেয়র বলেন, হাতিরঝিল কর্তৃপক্ষের চিন্তা করতে করতেই অনেক বছর চলে যাবে। তারা এখনও চিন্তা করছে। তারা যতক্ষণে চিন্তা করছে, ততক্ষণে আমি প্রকল্প সাবমিট করে দিয়েছি। মন্ত্রণালয় যদি অনুমোদন দিয়ে দেয় আমি এখনই কাজ শুরু করবো। আগামী বর্ষায় কেউ যেন ভোগান্তিতে না পড়ে। এই কাজগুলো করতে হবে। তার সঙ্গে সঙ্গে খাল ও সারফেস ড্রেনের সঙ্গে কানেকটিভিটি করে দিতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: হাতিরঝিলের আদলে বেগুনবাড়ি (আফতাব নগর-বনশ্রী) খালটি করার পরিকল্পনা ছিল। সেটি বাস্তবায়ন কতদূর?

আতিকুল ইসলাম: আফতাব নগর-বনশ্রী (বেগুনবাড়ি) খাল নিয়ে আমরা একটা প্রকল্প নিচ্ছি। এই খালটি হবে সুন্দর ও নান্দনিক। খালের দুই পাড় বাঁধাই করে দেবো। হাঁটার ওয়াকওয়ে থাকবে, যাতে আশপাশের মানুষ হাতিরঝিলের মতো ঘুরতে পারে। আমরা এই খালটিকে সুন্দর করে তৈরি করে বালু নদী পর্যন্ত নিয়ে যাবো। পার্লামেন্ট ভবনের পাশে যেভাবে রয়েছে, সেই আদলে করবো। আমি অলরেডি বলে দিয়েছি এই খাল নিয়ে একটা পরিকল্পনা করার জন্য। আমাদেরও দোষ আছে, আমরা খালের মধ্যে ময়লা ফেলি। এসব নিয়ে একটা মাস্টার প্ল্যান করেছি।

বাংলা ট্রিবিউন: বৃষ্টি হলেই পুরো নগরী পানিতে তলিয়ে যায়। এই জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্বে রয়েছে ৬টি সরকারি সংস্থা। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করবেন। রাজধানীর এই জলাবদ্ধতা নিরসনে আপনার বিশেষ কোনও পরিকল্পনা আছে কিনা?

কথা বলছেন মেয়র আতিকুল ইসলাম

আতিকুল ইসলাম: আমরা দেখেছি, যে সমস্যাগুলো হচ্ছে—সেটা হয়েই আসছে। কিন্তু কেন হচ্ছে সেটার গভীরে আমাদের যেতে হবে। আমি যখন প্রথমবার দায়িত্ব নিই, তখন কালশী খালে কোমর পানি ছিল। আমি সেখানে গিয়েছি, দেখেছি। আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সঙ্গে আলাপ করেছি। এর পেছনে কারণটা কী তাও খুঁজেছি। আমি দেখলাম—সাত দিন বা সাত মাসের জন্য কাজ করে লাভ নেই। একটা একটা স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে। এজন্য তিন ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছি। শর্ট টাইম, মিডটাইম ও লং টাইম।

খালের দায়িত্ব ওয়াসার উল্লেখ করে মেয়র বলেন, এই খাল পরিষ্কার করা কিন্তু আমাদের কাজ না। এটা হচ্ছে সম্পূর্ণ ওয়াসার কাজ। এর পরও মানুষের দুর্ভোগ কমাতে আমরা পুরো খালটি পরিষ্কার করে দিয়েছি। সেই খাল থেকে ৩৩টি জাজিম, ৮০ ট্রাক ডাবের খোসা, টেলিভিশন-ফ্রিজ সবই উদ্ধার করা হয়েছে। খালের উত্তর দিকে একটা কালভার্ট ছিল। এর দক্ষিণ দিকে ছিল বাউনিয়া ও বাইশটেকি খাল। আমরা দেখলাম দক্ষিণ দিকে যাওয়ার কোনও উপায় নেই। খালটি দখল হয়ে হাজার হাজার বাড়ি হয়ে গেছে। আমি যদি বসে থাকি সেই বাড়ি ভাঙবো, তারপর করবো, তাহলে অনেক সময় লেগে যাবে। তখন আমি খালের উত্তর পাশ দিয়ে অন্য লাইন করে পুরোটা বালু নদীর সঙ্গে সংযোগ করে দিয়েছি। এভাবে পরিকল্পনা করে ওই এলাকার সমস্যা সমাধান করেছি। কালশী খালে কিন্তু এখন পানি জমবে না। সেখানে কিন্তু আমার ৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এই খালটা ঠিক করার কথা ছিল ওয়াসার। কাজটি করার কারণে আমাকে কিন্তু অডিট ধরবে। কারণ সেই খালটি তো আমার না। তারপরেও করতে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, একইভাবে কাওলার সিভিল অ্যাভিয়েশন খাল ২৭ দিনের মধ্যেই উদ্ধার করেছি। সেখানে কিন্তু এখন পানি জমে না। সেই খালটি সিভিল অ্যাভিয়েশনের। আমরা জায়গাটি সেনাবাহিনীকে দিয়ে উদ্ধার করি। অথচ এই খালটির মালিকও আমরা না। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হিসেবে সেই দায়িত্ব আমাকেই পালন করতে হচ্ছে। তাই সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়টা খুবই জরুরি। যখনই সমন্বয় করতে পারছি না, তখনই এ সংক্রান্ত আইনগুলো ঘাঁটা শুরু করছি। আইনে কিন্তু বলে দিয়েছে এর দায়িত্ব পালন করবে সিটি করপোরেশন। কিন্তু অন্যান্য সংস্থা সেটা দিচ্ছে না। ওয়াসা যদি ব্যর্থ না হতো তাহলে আজকের এই পরিস্থিতি হতো না। আজ আমাদের গালি শুনতে হচ্ছে, আমরা তো গালি শোনার জন্য আসিনি; বরং জনগণ বলার আগেই তাদের সেবা দিতে হবে।

কথা বলছেন মেয়র আতিকুল ইসলাম

জলাবদ্ধতা নিয়ে নিজের উদ্যোগুলোর কথা উল্লেখ করে মেয়র বলেন, আজ উত্তরা-৪ ও ৬ নম্বর সেক্টরে জলাবদ্ধতা নেই। আমরা পুরোপুরি ড্রেন বসিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছি। কাওলা সিভিল অ্যাভিয়েশন খাল, এয়ারপোর্ট, কালশী, খিলক্ষেতের জলাবদ্ধতা দূর করেছি। এখন কাওরানবাজার-বিজয় সরণি, এরোপ্লেন চত্বর হয়ে পরিকল্পনা কমিশন—এই এলাকায় পানি জমছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে মেট্রোরেল। আমি কিন্তু তাদের গলা চেপে ধরেছি। বলে দিয়েছি জলাবদ্ধতার সমাধান না করলে আমি মেট্রোরেল করতে দেবো না। পরে মেট্রোরেল থেকে আমাদের ২০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। আমরা এখন এই এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ শুরু করে দিচ্ছি। কারণ এখন টেন্ডার দিলে সময় লাগবে, তাই কাজটি সেনাবাহিনীকে দিয়ে করাচ্ছি। তারা তিন মাসের মধ্যেই কাজটি করে দেবে। আর মগবাজার শাহ সাহেব বাড়ি এলাকায় আর পানি জমবে না। এটিও আমরা সেনাবাহিনীকে দিয়ে দিচ্ছি। এছাড়া আমরা বনশ্রী, নিকেতন, আগারগাঁও ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দূর করেছি।

‘ট্যাক্স নয়, বাড়াবো দাতার সংখ্যা’

বাংলা ট্রিবিউন: হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে পুরাতন ও নতুন বাড়ি মালিকদের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। পুরাতন বাড়ি মালিকরা ৩০ বছর আগের রেশিও অনুযায়ী ট্যাক্স পরিশোধ করে থাকেন। আর নতুন বাড়ির মালিকরা বর্তমান রেশিও অনুযায়ী ট্যাক্স পরিশোধ করে থাকেন। এক্ষেত্রে রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে হোল্ডিং ট্যাক্স পুনর্মূল্যায়নের জন্য আপনি কোনও উদ্যোগ নেবেন কি?

আতিকুল ইসলাম: এবার আমাদের বোর্ড মিটিংয়ে কাউন্সিলরা এটা উঠিয়েছেন। হোল্ডিং ট্যাক্সের ক্ষেত্রে শুধু এটা নয়, আরও অনেক ধরনের বৈষম্য হচ্ছে। অলরেডি আমাদের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তাকে বলেছি, কীভাবে এটাকে সমতায় আনতে পারি। বর্তমানে যে বাড়ি করেছে, তার হোল্ডিং ট্যাক্স এক ধরনের, আর আগে যে বাড়ি করেছে, তার ট্যাক্স আরেক ধরনের। আবার পাশাপাশি দুই জন দুই ফ্ল্যাটে থাকেন, কিন্তু দুই জন দুই ধরনের হোল্ডিং ট্যাক্স দেন। আবার দেখা গেছে, আগে একটা ভবনের দুই থেকে তিন তলা পর্যন্ত হয়েছে। আমাদের লিস্টে কিন্তু দুই বা তিন তলা পর্যন্ত আছে। বর্তমানে ওই বাড়ি ১০ তলা পর্যন্ত হয়ে গেছে। বাকি ৭ বা ৮ তলা কিন্তু আমাদের ট্যাক্সে ধরা নেই। এমনটাও হয়ে আসছে। আমরা হোল্ডিং ট্যাক্স এখনও মেনুয়্যাল পদ্ধতিতে আদায় করছি। যত তাড়াতাড়ি পারি এটাকে অনলাইনের মাধ্যমে আনবো। আমরা বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক ট্যাক্স নির্ধারণ করে দেবো। তখন নির্ধারিত পদ্ধতির বাইরে কারও যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। তখন ট্যাক্স দিতে আর আমাদের অফিসে আসতে হবে না।

মেয়র বলেন, আমি ট্যাক্স বাড়াবো না, ট্যাক্স দাতার সংখ্যা বাড়াবো। এখন আমি দুই লাখ ৫০ হাজার বাড়ির ট্যাক্স পাই। এর সঙ্গে যদি আরও এক লাখ যোগ করতে পারি তাহলে আমার আয় বেড়ে যাবে। নিজের পায়ে নিজে দাঁড়ানোর জন্য এটাই যথেষ্ট।

বাংলা ট্রিবিউন: রাজধানীকে রিকশার নগরী বলা হচ্ছে। যানজটের জন্য এটাও অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করা হয়। গত বছর রিকশাকে প্রধান সড়ক থেকে ভেতরের সড়কে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বিষয়টি বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে?

আতিকুল ইসলাম: রিকশা নিয়ে আরও অনেক রিসার্চ করতে হবে। রিসার্চ ছাড়া হবে না। দেখা যাচ্ছে—একটা বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়ার জন্য চার জন চারটা গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছে। ওই কার পুল করে আমরা একই গাড়িতে সব শিশুকে স্কুলে নিয়ে যাবো। বাচ্চাদের ব্যাগের মধ্যে ডিভাইস দিয়ে দেবো। বাচ্চারা স্কুলে ঢুকলে অটোমেটিক্যালি তার অভিভাবক বা মা জেনে যাবেন তার শিশু স্কুলে প্রবেশ করেছে। আমরা এমন পরিকল্পনা নিয়েছি। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের কাজ চলছে। একটা ওয়ার্ডের তিন থেকে চারটি স্কুলকে আমরা প্রথমে এভাবে পরীক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণ করবো। এটা যদি সফল হয়, তাহলে আমরা পরবর্তীতে সব স্কুলে এটা চালু করবো।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

দেখুন ভিডিও...

/আইএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ