শ্যামপুরের কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে মামলা নিতে সাহস পায়নি থানা!

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ১৮:৩১, আগস্ট ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২২, আগস্ট ১৪, ২০২০

117806673_306814677420766_5153237497058045390_nঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজি মো. মাসুদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে এক তরুণকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজের প্রমাণ আর ভুক্তভোগীর অভিযোগের পরও শ্যামপুর থানা এ বিষয়ে মামলা নেয়নি। বরং ইচ্ছাপূর্বক কালক্ষেপণ হওয়ায় কাউন্সিলর অন্য পক্ষের সঙ্গে মীমাংসা করে নিয়েছেন।

জানা গেছে, ঈদুল আজহার আগের দিন (৩১ জুলাই) পোস্তগোলা শ্মশানঘাট পশুর হাটের হাসিল কাউন্টারের মঞ্চে দলবল নিয়ে এসে গুলি চালান কাউন্সিলর মাসুদ। হাটের স্বেচ্ছাসেবী জাহিদ হাসান শুভকে লক্ষ্য রেখে তিনি নিজেই গুলি করেন। এরপর তার অনুসারীদের হামলায় গুরুতর আহত হন একসময়ের এই ছাত্রলীগকর্মী। সিসি ক্যামেরায় এসব চিত্র ধরা পড়েছে। পরে শুভ শ্যামপুর থানায় একটি অভিযোগ দিলেও সেটি এজাহার হিসেবে নেয়নি পুলিশ।

ঘটনার দশ দিন পর কাউন্সিলর মাসুদ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভুক্তভোগীর স্বজনদের মীমাংসায় আসতে বাধ্য করেছেন। পুলিশ বলছে, ফৌজদারি অপরাধ হলেও সামাজিক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে আপস হতে পারে। কিন্তু আইনজীবীদের মন্তব্য, এমন অপরাধের বেলায় কখনও আপস বা মীমাংসা করার সুযোগ নেই।

সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, কাউন্সিলর মাসুদ হাসিল কাউন্টারে গুলি করছেন। এরপর তার ছেলে, ভাতিজা ও অনুসারীরা মঞ্চে উঠে শুভকে বেধড়ক পেটাচ্ছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করেছেন শুভ। তিনি জানান—হামলায় কাউন্সিলরের ছেলে হিমু, ভাতিজা রায়হান ও তমাল, দেহরক্ষী সারোয়ার, ফরহাদ, আকাশ ও সাব্বিরসহ কোয়েল, ফরহাদ, সোহান ও নিলয় অংশ নেয়।

হাটের ইজাদার মাঈনউদ্দীন চিশতীর কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি মূলত ঘটনাটি শুনছি। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম না। যারা সেখানে ছিল, তারা বলতে পারবেন। আমি অসুস্থ।’

হাজি মাসুদ হাসিল কাউন্টারে গুলি করছেন প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় সেই রাতের ঘটনা

৩০ জুলাই দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে কাউন্সিলরের ছেলে হিমু, ভাতিজা তমাল ও রায়হানসহ কয়েকজন তিনটি মোটরসাইকেল নিয়ে হাটের সামনে আসে। তাদের হেঁটে ভেতরে যাওয়ার অনুরোধ জানান স্বেচ্ছাসেবীরা। কারণ হাটের ভেতরে যানবাহন নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু কাউন্সিলরের ছেলে মোটরসাইকেল নিয়ে জোরপূর্বক ভেতরে ঢুকতে নিজের পরিচয় দিয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের ধমকায়। কোনও বিশৃঙ্খলা হলে হাটের ইজারাদারকে জানানোর জন্য স্বেচ্ছাসেবীদের কাছে ওয়াকিটকি ছিল। ঘটনাটি ওয়াকিটকির মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবীরা জানান। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন জাহিদ হাসান শুভ। তিনি এসে হিমু ও রায়হানকে হেঁটে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান অথবা পেছন দিয়ে ঘুরে যেতে বলেন। এরপর শুভকে তমাল বলেন, ‘তুই চিনোস আমাকে, আমি হাজি মাসুদের ভাতিজা। আমার হোন্ডা এদিক দিয়েই যাবে।’ শুভ জবাবে বলেন, ‘আমিও পোস্তগোলা লোহা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ আজহারের ভাগ্নে। এখানে নাম বিক্রি করে লাভ নাই। হাটের নিয়ম মানতে হবে।’

এরপর শুভকে শাসিয়ে চলে যায় রায়হান, তমাল ও কাউন্সিলরের ছেলে হিমু। ১৫-২০ মিনিট পর তারা অনেককে নিয়ে আবারও আসে। তখন ফটকে শুভসহ তিনজন স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন। তাদের গালিগালাজ করেছে কাউন্সিলরের ছেলে, ভাতিজা ও তাদের অনুসারীরা। প্রধান ফটকে প্রিন্স নামের এক স্বেচ্ছাসেবককে ফরহাদ ও কাউন্সিলরের দেহরক্ষী সারোয়ার চড় দিয়েছে। সেখানে শুভও ছিলেন। শুভকে স্বেচ্ছাসেবীরা ভেতরে পাঠিয়ে দেন। হাটের ইজারাদার মাঈনউদ্দিন চিশতীর ছোটভাই রফিক এসে হিমু ও তার লোকবলের সঙ্গে কথা বলে হাটে ঝামেলা না বাঁধানোর অনুরোধ জানান। ঈদের পর বিষয়টি নিয়ে তারা বসবেন বলে আশ্বাস দেন। তবে কাউন্সিলরের অনুসারীরা কারও কথা শোনেনি।

এরপর রাত ২টা ১০ মিনিটে কাউন্সিলর মাসুদ, তার ছেলে, ভাতিজা, দেহরক্ষী ও ৪০-৪৫ জন অনুসারী নিয়ে অস্ত্রসহ হাটের হাসিল কাউন্টারে আসেন। প্রথমেই তিনি বলেন ‘ধর’। এরপর শুভকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এ সময় কাউন্টার মঞ্চে আরও ছিলেন সালাম ও সোহেল। প্রিন্সসহ আরও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী মঞ্চের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। কাউন্সিলর গুলি করার পর সবাই মাথাগুজে মঞ্চে শুয়ে পড়েন। মঞ্চ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কয়েকজন মঞ্চে উঠে শুভকে কিল, ঘুষি ও ইট দিয়ে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে। সোহান ও ফরহাদ কাউন্টারের পেছনে নিয়ে প্রিন্সকে মারধর করে। তিনি পরে দৌড়ে ১ নম্বর গেটের দিকে চলে যান।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পশুর হাট থেকে বেরোনোর সময় কাউন্সিলর ওপরে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে চলে যান। তখন তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলতে থাকেন, ‘সামনে যে আসবে তাকেই গুলি করা হবে।’

হামলায় অংশ নেয়া আরো সাব্বির সুমন ফরহাদ ও ভাতিজা রায়হানহামলার শিকার শুভর বয়ান

জাহিদ হাসান শুভ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাউন্সিলর এসেই আমাকে গুলি করে। আমি শুয়ে পড়ি। এরপর কাউন্সিলরের ভাতিজা রায়হান মঞ্চে উঠে আমার মুখে ঘুষি মারতে থাকে। কোয়েল ও সুমন আমাকে পায়ে ইট দিয়ে আঘাত করেছে। মঞ্চের নিচে রড দিয়ে আমাকে পেটানো হয়। এরপর টেনে বের করে। কাউন্সিলরের পা জড়িয়ে ধরে মাফ চাই। তিনি তারপরও আমাকে লাথি দিতে থাকেন। আমার মুখ পা দিয়ে মাটিতে চেপে ধরেন। আশেপাশের লোকজনকে তার লোকবল গালিগালাজ করতে থাকে। একজনের সহযোগিতায় কোনোরকম পালিয়ে একটি মোটরসাইকেল নিয়ে হাট থেকে চলে যাই।’

সেদিন শুভ প্রথমে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল হাসপাতালে যান। মাথায় ও ‍বুকে আঘাত পাওয়ার কারণে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। সেখানে তার ছোট মামা পোস্তগোলা লোহা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ আজহারসহ স্বজনরা আসেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য শুভকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিন দিন ভর্তি রাখা হয়। এরপর তিনি গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে চলে যান।

হামলার শিকার জাহিদ হাসান শুভশুভ বলেন, ‘ঘটনার পর শ্যামপুর থানায় আমি লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা নিলো না। ১০ আগস্ট আমার ছোট মামা শেখ আজহার আমাকে মীমাংসার জন্য ঢাকায় যেতে বলেন। ওইদিন রাতে শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষে মীমাংসা হয়। সেখানে হাজি মাসুদ এবং আমার মামাসহ আরও অনেকে ছিলেন। আমি আপসনামায় স্বাক্ষর দেই, হাজি মাসুদও স্বাক্ষর করেন। আপসের বিষয়ে বিস্তারিত জানি না। আমার মামা বলেছেন, তাই আমি গিয়েছিলাম। তবে থানায় চূড়ান্ত মীমাংসার আগে আওয়ামী লীগের একজন নেতার বাসায় প্রাথমিক বৈঠক হয়েছিল জানতে পেরেছি।’

জাহিদ হাসান শুভ পরিবারে দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে সবার ছোট। বেকার থাকায় শ্যামপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিলের কাছে অনুরোধ করে পশুর হাটে কাজ নিয়েছিলেন। ঘটনার পর তিনি ভয়ে ঢাকা ছেড়ে মুন্সীগঞ্জ চলে গেছেন। একসময় শ্যামপুরে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর তিনি বিদেশ চলে যান। বিদেশ থেকে ফিরে বিয়ে করেন। দুই মাস আগে তিনি বাবা হয়েছেন।

শুভ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাকে হয়তো আমার সন্তানের জন্য আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন। তা না হলে গুলিতে ও হামলায় আমার বেঁচে থাকার কথা না। ঘটনার পর কাউন্সিলর আমার বাবার কাছে আসছিল। তারা জোর গলায় বলে, আমাকে মারধর করেনি। আমার পরিবারও সেই কথা বিশ্বাস করেছে। আমাকে কেউ বিশ্বাস করছিল না। কিন্তু তারা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখার পর বিশ্বাস করেছে। আমি ভয়ে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে এসেছি।’

কাউন্সিলর মাসুদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন

হাজি মো.  মাসুদ একসময় ভিডিও গেমসের ব্যবসা করতেন। শ্যামপুর ও পোস্তা এলাকায় পেশিশক্তির মাধ্যমে দুইবার কাউন্সিলর হয়েছেন। বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে আদালতে। ঢাকার পঞ্চম অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে (মামলা নং ১১৭৭-২০০৫), ঢাকা মহানগর তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে (মামলা নং ১৩৮/২০০১) এবং একটি মামলা মেট্রো তৃতীয় অতিরিক্ত জজ আদালতে বিচারাধীন।

কাউন্সিলর মাসুদ বাংলা ট্রিবিউনের কাছে সেদিন রাতের বর্ণনা দিলেন এভাবে, ‘আমার ছেলে তার চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে গরু কেনার জন্য হাটে গিয়েছিল। গেটে তাদের আটকে দেয় শুভ। সবাইকে যেতে দিলেও মোটরসাইকেল নিয়ে তাদের ঢুকতে দেয়নি। এরপর সেখানে ঝামেলা হয়। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে দেখলাম শুভ হাসিল কাউন্টারের মঞ্চে আছে। সেখানে আমাদের ছেলেপেলে তাকে কিল-ঘুষি মেরেছে। ওদের অনেক লোকজন ছিল। তারা অনেকে কোমরে হাত দিচ্ছিল। তখন আমার অস্ত্র দেখিয়েছি, তবে ফুটাই নাই। এরপর দুই পক্ষের লোকজন শান্ত হলে আমরা চলে আসি। এ ঘটনায় আমি থানায় অভিযোগ দিয়েছি, ওরাও দিয়েছে। এরপর বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেছে।’

সিসি ক্যামেরার ফুটেজে পুরো ঘটনা দেখা যায় জানানোর পর কাউন্সিলর আত্মপক্ষ সমর্থন করেন, ‘একটা ফুটেজে সবকিছু প্রমাণ হয় না।’

পুলিশ কী বলছে

পশুর হাটে কাউন্সিলরের গুলি চালানো ও তার নেতৃত্বে হামলার ঘটনা স্বীকার করেছে শ্যামপুর থানা। তবে এ নিয়ে কোনও আইনি প্রক্রিয়ায় যায়নি পুলিশ। ভুক্তভোগী অভিযোগ দিলেও কেন মামলা নেওয়া হলো না? বাংলা ট্রিবিউনের এমন প্রশ্নের উত্তরে শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পেয়েছিলাম। তবে গত ১০ আগস্ট দুই পক্ষ বসে মীমাংসা করেছে। তাদের মধ্যে আপস হয়েছে।’

 এ ধরনের ফৌজদারি অপরাধ আপস করা যায় কিনা জানতে চাইলে ওসির উত্তর, ‘যায়। সামাজিক সম্প্রীতির জন্য এ বিষয়ে আপস-মীমাংসা করা হয়েছে, মামলা হয়নি।’

 কাউন্সিলর যে অস্ত্র দিয়ে গুলি করেছেন তা বৈধ কিনা প্রশ্ন করলে ওসি নিশ্চিত করেন, ‘সেটি তার লাইসেন্স করা অস্ত্র। এটা দিয়েই তিনি সেদিন রাতে গুলি চালিয়েছিলেন।’

লাইসেন্স করা অস্ত্র এভাবে ব্যবহার করা যায় কিনা জানতে চাইলে ওসি আর কোনও মন্তব্য করেননি। এছাড়া ঘটনার দশ দিন পর আপস-মীমাংসা হলো, তার আগে কেন ভুক্তভোগীর অভিযোগ থানা মামলা হিসেবে নেয়নি প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

 আইনজীবীর মন্তব্য

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান মনে করেন, শুভকে হত্যাচেষ্টার মতো অপরাধের বেলায় কখনও আপস-মীমাংসা করা যায় না। তিনি মনে করেন, কাউন্সিলর মাসুদ যে অপরাধ করেছেন তাতে তার অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা উচিত। তার মন্তব্য, ‘মানুষকে জীবনরক্ষার জন্য অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়। কারও জীবন কেড়ে নেওয়ার জন্য সরকার কাউকে অস্ত্রের লাইসেন্স দেয় না।’

আইনজীবী ইশরাত হাসানের মন্তব্য, ভুক্তভোগী শুভ চাইলে এখনও আদালতে মামলা করতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘শুভকে হত্যার উদ্দেশে গুলি ও মারধর করা হয়েছে। তাই এটি একটি হত্যাচেষ্টা মামলা হবে।’

 

 

/জেএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ