ইসলামী ব্যাংকের সংকট: ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, রাজনৈতিক প্রভাব নাকি আস্থার যুদ্ধ?

চিররঞ্জন সরকার
১৫ জুন ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ১২:০০

বাংলাদেশে আর কোনও ব্যাংক নিয়ে এত আলোচনা হয়েছে বলে মনে হয় না। সেই দিক থেকে ইসলামী ব্যাংকের ঘটনা ব্যতিক্রম। কারণ এই ব্যাংক কেবল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি লাখো মানুষের সঞ্চয়, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মূলধন এবং অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সে কারণে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার প্রশ্ন নয়; বরং দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও জনগণের আস্থার প্রশ্ন হিসেবেও সামনে এসেছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসক নিয়োগ, বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকদের ভিড়, নগদ অর্থ উত্তোলনে সীমাবদ্ধতার অভিযোগ এবং ডিজিটাল লেনদেনে বিঘ্ন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক আমানতকারী তাদের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ব্যাংকটি কি প্রকৃত অর্থেই তারল্য সংকটে ভুগছে, নাকি এটি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ?

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ইতোমধ্যে আমানতকারীদের আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত নীতিগত ও আর্থিক উপকরণ রয়েছে এবং গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এই আশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সম্পদ ভবন, জমি বা নগদ অর্থ নয়; সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষের বিশ্বাস। একটি ব্যাংকের ওপর মানুষ আস্থা হারাতে শুরু করলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।

ব্যাংকিংয়ের একটি মৌলিক সত্য হলো, কোনও ব্যাংকই ভল্টে সব আমানতের শতভাগ অর্থ নগদ হিসেবে সংরক্ষণ করে না। আমানতের বড় অংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়। পৃথিবীর সব ব্যাংকই এই নীতিতে পরিচালিত হয়। ফলে যদি হঠাৎ বিপুল সংখ্যক গ্রাহক একযোগে টাকা তুলতে শুরু করেন, তাহলে শক্তিশালী ব্যাংকও সাময়িক চাপে পড়তে পারে। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘ব্যাংক রান’। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে আতঙ্কই ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছে।

তবে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু আতঙ্কের ফল বললে বাস্তবতার একটি বড় অংশ আড়াল করা হবে। কারণ এই ব্যাংককে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই ঋণ বিতরণ, করপোরেট সুশাসন এবং পরিচালন কাঠামো নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে গত এক দশকে ব্যাংকটির বিপুল পরিমাণ ঋণ কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে চলে যাওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে এস আলম গ্রুপের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘কনসেন্ট্রেশন রিস্ক’ বা ঝুঁকির কেন্দ্রীভবন। অর্থাৎ, একটি ব্যাংকের ঋণের বড় অংশ যদি কয়েকজন ঋণগ্রহীতার হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে সেই ঋণগ্রহীতারা সমস্যায় পড়লে পুরো ব্যাংক ঝুঁকিতে পড়ে। সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে একটি খাত বা একটি গোষ্ঠীর ব্যর্থতা পুরো প্রতিষ্ঠানকে বিপর্যস্ত না করতে পারে। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই নীতিটি কতটা অনুসরণ করা হয়েছিল, সেটিই আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ঋণ অনুমোদনের সময় যথাযথ যাচাই-বাছাই কতটা হয়েছিল? ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা, জামানতের প্রকৃত মূল্য, ব্যবসার সম্ভাবনা এবং অর্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্য যাচাই করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নানা মানদণ্ড রয়েছে। যদি এসব মানদণ্ড উপেক্ষা করা হয়ে থাকে, তবে সেটি নিছক ভুল নয়; বরং গুরুতর ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা।

কিন্তু এখানেই আরেকটি বিতর্ক সামনে আসে। অনেকের মতে, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকট কেবল দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার রাজনীতি। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যাংকিং খাত কখনও পুরোপুরি রাজনীতির বাইরে ছিল না। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ব্যাংক থেকে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন—এমন অভিযোগ নতুন নয়।

ইসলামী ব্যাংককে ঘিরেও অভিযোগ রয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিবেচনা এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রভাব ফেলেছে। আবার অন্য পক্ষের দাবি, ব্যাংকটিকে ঘিরে বর্তমানে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার একটি অংশ রাজনৈতিকভাবে উসকে দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসকে কেন্দ্র করে একটি সংঘাত তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রমের ওপর।

এই বিতর্কের মধ্যে আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে, তা হলো আমানতকারীদের আতঙ্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে গুজব আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একটি ফেসবুক পোস্ট, একটি ইউটিউব ভিডিও বা একটি অডিও ক্লিপ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ব্যাংকিং খাতের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এই ধরনের গুজব ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ মানুষ যখন মনে করে, তার টাকা ঝুঁকির মধ্যে আছে, তখন যুক্তির চেয়ে আবেগ বেশি কাজ করে।

কিন্তু সব উদ্বেগকে গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়াও সমান বিপজ্জনক। প্রকৃত আমানতকারীদের উদ্বেগ বাস্তব। তারা জানতে চান, তাদের টাকা নিরাপদ কিনা। তারা জানতে চান, ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা কী। তারা জানতে চান, কেন এটিএমে টাকা পাওয়া যাচ্ছে না, কেন লেনদেনে সমস্যা হচ্ছে, কেন প্রশাসক নিয়োগের প্রয়োজন হলো। এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, পরিচালনা পর্ষদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের।

এখানেই বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব শুধু সংকট দেখা দিলে হস্তক্ষেপ করা নয়; সংকট যাতে তৈরি না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা। যদি বছরের পর বছর ধরে কোনও ব্যাংকে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ হয়ে থাকে, যদি করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি থেকে থাকে, যদি সম্পদের অস্বাভাবিক কেন্দ্রীভবন ঘটে থাকে, তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল, সেই প্রশ্নও ওঠা স্বাভাবিক।

বিশ্বের ব্যাংকিং ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলোর একটি এসেছে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট থেকে। তখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বলে বিবেচিত বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধসে পড়েছিল। কারণ তারা ঝুঁকিকে অবমূল্যায়ন করেছিল, তদারকি দুর্বল ছিল এবং স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল। লেহম্যান ব্রাদার্সের পতন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের পতন ছিল না; সেটি ছিল আস্থার পতন।

বাংলাদেশের জন্যও একই শিক্ষা প্রযোজ্য। কোনও ব্যাংকের শাখা সংখ্যা, বিজ্ঞাপন বা ব্র্যান্ড মূল্য তাকে নিরাপদ করে না। নিরাপদ করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা। ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকট সেই মৌলিক সত্যটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

তাই ইসলামী ব্যাংকের সংকটকে একক কোনও কারণে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এটি একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, দুর্বল তদারকি, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণনীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আস্থার সংকটের সমন্বিত ফল। শুধু একটি কারণকে দায়ী করলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না।

এখন প্রয়োজন আবেগ নয়, তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান। গত কয়েক বছরে বিতরণ করা বড় ঋণগুলোর স্বাধীন ফরেনসিক অডিট হওয়া উচিত। কে কত ঋণ নিয়েছে, কী জামানত দিয়েছে, ঋণের অর্থ কোথায় ব্যবহার হয়েছে, কত টাকা ফেরত এসেছে এবং কত টাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালন কাঠামোকে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারত্বের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ ব্যাংকিং খাতে বিশ্বাস হারানো সহজ, কিন্তু সেই বিশ্বাস পুনর্গঠন করতে অনেক বছর লেগে যায়। ইসলামী ব্যাংকের সংকট শেষ পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সফল হতে হলে রাজনৈতিক অবস্থান নয়, প্রয়োজন সত্য উদ্ঘাটন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সুশাসনের প্রতি অঙ্গীকার। অন্যথায় আজ ইসলামী ব্যাংক, কাল অন্য কোনও ব্যাংক—সংকটের এই চক্র চলতেই থাকবে। আর তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সেই সাধারণ মানুষকেই, যাদের ঘামঝরা সঞ্চয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

/ইউএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
চার দিন ধরে পড়ে আছি, বাচ্চাগুলার মুখের দি‌কে তাকায় সরাই নেন
চার দিন ধরে পড়ে আছি, বাচ্চাগুলার মুখের দি‌কে তাকায় সরাই নেন
শেষ মুহূর্তে পানামার হৃদয় ভাঙলো ঘানা
শেষ মুহূর্তে পানামার হৃদয় ভাঙলো ঘানা
ফ্ল্যাট বাসায় দুই সন্তানের মায়ের গলা কাটা লাশ
ফ্ল্যাট বাসায় দুই সন্তানের মায়ের গলা কাটা লাশ
সেই খালেদা রাব্বানীকে দেখতে গেলেন প্রধানমন্ত্রী, কথা শুনে আবেগাপ্লুত
সেই খালেদা রাব্বানীকে দেখতে গেলেন প্রধানমন্ত্রী, কথা শুনে আবেগাপ্লুত
সর্বশেষসর্বাধিক