X
সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২
৩১ শ্রাবণ ১৪২৯

রাশিয়ার তেল আমরা নেবো কি নেবো না

সঞ্চিতা সীতু
০২ জুন ২০২২, ১৪:০০আপডেট : ০২ জুন ২০২২, ১৪:০০

বাংলাদেশের কাছে রাশিয়ার তেল বিক্রির প্রস্তাবের পর নানামুখী আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে, রাশিয়া যে ধরনের অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) রফতানি করে তা দেশে পরিশোধন সম্ভব নয়। ফলে রাশিয়া থেকে সহসা তেল আমদানি সম্ভবও হচ্ছে না। সেইসঙ্গে আছে কিছু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষার ইস্যুও।

ভারত ও চীন যেখানে রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়টিতে কোনও রাখঢাক রাখছে না সেখানে বাংলাদেশের সমস্যা কোথায়? এমন প্রশ্ন অনেকের।

বিশেষজ্ঞ ও জ্বালানিখাতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেলো বিষয়টা খানিকটা স্পর্শকাতর। অন্যদিকে, এখন তেলের দাম হুট করে বেড়ে যাওয়ার শঙ্কাও নেই বলে মনে করছেন তারা। বরং আগামী বছর খানিকটা কমতেও পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেল প্রতি বুধবার (১ জুন) ১১৬ ডলারে জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ বলছে আগামী বছর এই দাম গড়ে ১০০ ডলারই থাকবে।

বিপিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভারত বা চীন রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রে যা করতে পারবে আমরা তা করতে পারি না। কারণ ও দুটো দেশ অনেক বড়। তাদের তেল মজুতের অনেক ক্ষমতা আছে। আমাদের মজুতের ক্ষমতা সীমিত। এর আগে করোনার সময় যখন জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ কমেছিল তখন আমরা অতিরিক্ত তেল কিনতে পারিনি।

 

তেল রাখার জায়গা নেই

তিনি আরও বলেন, কিছু বেসরকারি কোম্পানির কাছ থেকে অয়েল ট্যাঙ্কার ভাড়া নিতে চেয়েছিলাম আমরা। কিন্তু তারা যে দাম চেয়েছিল তা দিয়ে মজুত করা কষ্টসাধ্য ছিল। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবেও অয়েল ট্যাঙ্কার ভাড়া পাওয়া যায়। কিন্তু যখনই এমন কোনও ঘটনা ঘটে তখন বেসরকারি অনেক উদ্যোক্তা ট্যাঙ্কার ভাড়া করে ফেলে।

‘বিপিসি যেহেতু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তাই তার কাজের ক্ষেত্রে অবশ্যই কিছু সীমাবদ্ধতা আছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা লাভ হবে ধরে নিয়েই এ ধরনের বিনিয়োগে গেলাম। কিন্তু যদি লোকশান হয়, দায় নেবে কে?’

বাংলাদেশ সব মিলিয়ে ১৩ লাখ আট হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি মজুত করতে পারবে। তবে ক্রুড অয়েল মজুতের ক্ষমতা আছে ২ লাখ ২৫ হাজার টন। ডিজেল মজুত করা যাবে ছয় লাখ টন এবং ফার্নেস অয়েল দেড় লাখ টন।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আলাদা স্টোরেজ রয়েছে। যাতে তারা এক মাসের তেল মজুত রাখতে পারে।

দেশে মোট যে জ্বালানি তেল লাগে তার চার ভাগের একভাগ দেশে পরিশোধন করা হয়। বাকিটা পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি হয়।

দেশের ইস্টার্ন রিফাইনারি একমাত্র তেল পরিশোধনাগার। স্বাধীনতার আগে ফ্রান্সের কারিগরি সহায়তায় এটি নির্মাণ করা হয়। এই রিফাইনারিতে সাধারণত হালকা ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হয়। ভারি ক্রুড পরিশোধন করা যায় না।

বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে ক্রুড আমদানি করে সেই দেশগুলো হালকা ক্রুডই রফতানি করে।

দূরত্বের কারণে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে ক্রুড আমদানি করে না। তাই এ ধরনের পরিশোধনাগার বানানোর চিন্তাও বাংলাদেশের মাথায় আসা উচিত নয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

তারা আরও জানান, একটি তেল পরিশোধনাগার চাইলেই নির্মাণ করা যায় না। ২০১০ সাল থেকেই ইস্টার্ন রিফাইনারির ক্ষমতা আরও ৩০ লাখ টন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। তবে এই প্রকল্পে দাতারা বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

বলা হচ্ছে সারা বিশ্বই ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসছে। এখন নতুন করে তেল পরিশোধনাগার নির্মাণে আগ্রহ নেই অনেকের।

এছাড়া, কাঁচামাল যেহেতু আমাদানি নির্ভর, সঙ্গত কারণে বিনিয়োগ জটিলতাও কাটছে না।

কর্মকর্তারা বলছেন একটি পরিশোধনাগারের স্থায়ীত্ব ৮০-১০০ বছর হতে পারে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব যেখানে নতুন জ্বালানির অনুসন্ধান করছে এবং ক্ষেত্র বিশেষে সফলও হচ্ছে তাই এ ধরনের উদ্যোগে এখন আর বড় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নেই।

 

লাভজনক, তবে

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারির কোনও কিছু পরিবর্তন করে এই অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা যাবে না। এজন্য আলাদা রিফাইনারি করতে হবে। আলাদা বিনিয়োগ লাগবে। এই বিনিয়োগ বিপুল পরিমাণ। তবে এটা পেলে আমাদের লাভ হতে পারে।

তিনি বলেন, বাণিজ্যিকভাবে এটা অলাভজনক হবে না। তবে, যে দেশে যে জ্বালানির চাহিদা বেশি সেটার পরিশোধন ক্ষমতা বেশি রেখেই রিফাইনারি করতে হয়। আমাদের ডিজেলের চাহিদা বেশি। পেট্রোলের কম। তাই ডিজেল বেশি পরিশোধন করার মতো কারিগরি দক্ষতার পরিশোধনাগার দরকার।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের বিষয়ে তিনি বলেন, যুদ্ধ না থামা পর্যন্ত দামের বিষয়ে বলা মুশকিল। তবে খুব বেশি দাম বাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। ছয় মাসের মধ্যে বড়জোর ১২০ ডলার বা আরও কমলে ৮০ ডলারে নামতে পারে।

তিনি বলেন, দাতা সংস্থাগুলো এখন পরিবেশবান্ধব কিছু না হলে টাকা দিতে চায় না। এক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে নিজস্ব অর্থায়ন বা বাণিজ্যিক লোন নিয়ে এটা করা যেতে পারে।

ভারত বা চীন যে ক্রুড মজুত করছে তার কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, এরা তো খুব বেশি মজুত করতে পারবে না। চাইলেই হাজার হাজার টন মজুত করা সম্ভব নয়। ভারতের যে ক্রুড আমদানি করতো তার মাত্র ৫ থেকে ৬ ভাগ আসতো রাশিয়া থেকে, বাকিটা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে। ফলে ভারতের রিফাইনারিগুলোও রাশিয়ার ক্রুডের জন্য প্রয়োজ্য নয়।

 

বিষয়টি স্পর্শকাতরও

এদিকে দেশের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবেও স্পর্শকাতর বলছেন অনেকে। উপমহাদেশে ভারতের অবস্থান সুদৃঢ়। অন্যদিকে চীনের কর্তৃত্ব অনেকটাজুড়ে। কাজেই বিশ্বের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত বা চীন যা করতে পারবে চাইলেই বাংলাদেশের পক্ষে তা করে দেখানো সম্ভব নয়। সেটা করতে যাওয়াটাও বোকামি হবে বলে মনে করেন অনেকে।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম বলেন, রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা আমাদের জন্য বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে কি হবে না তার চেয়ে জরুরি হচ্ছে আদশর্গত দিক থেকে কোনোভাবেই বাংলাদেশের উচিত হবে না এই তেল নেওয়া। অথর্নীতি বিচারে, একদিকে এই তেল নিয়ে আমাদের যে লাভ হতে পারে তারচেয়ে ক্ষতির আশঙ্কা বেশি।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, তেল নেওয়ার কারণে ইউরোপের দেশগুলো বা যুক্তরাষ্ট্র যদি আমাদের গার্মেন্ট শিল্পে নিষেধাজ্ঞা জারি করে তা আমরা সামাল দিতে পারবো না। আমাদের অথর্নীতি দাঁড়িয়ে আছে গার্মেন্টসের ওপর। তাই ক্রেতাদের খেপিয়ে তেল কেনা মোটেই লাভজনক হবে না।

/এফএ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
২৫ বছরে উন্নত দেশ হবে ভারত, স্বাধীনতা দিবসে মোদি
২৫ বছরে উন্নত দেশ হবে ভারত, স্বাধীনতা দিবসে মোদি
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী: কাদের
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী: কাদের
গাজীপুরে লাইনচ্যুত বগি উদ্ধার, ১২ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু
গাজীপুরে লাইনচ্যুত বগি উদ্ধার, ১২ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু
টিভিতে আজ
টিভিতে আজ
এ বিভাগের সর্বশেষ
বাংলাদেশে ৩ লাখ টন গম রফতানি করবে রাশিয়া
বাংলাদেশে ৩ লাখ টন গম রফতানি করবে রাশিয়া
আট মাস পর দাম বাড়লেও লোকসান রয়েই গেছে
আট মাস পর দাম বাড়লেও লোকসান রয়েই গেছে
জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া কিছু করার ছিল না: প্রতিমন্ত্রী
জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া কিছু করার ছিল না: প্রতিমন্ত্রী
সিটিতে বাসের ভাড়া বাড়তে পারে ১৩%, দূরপাল্লায় ১৬%
সিটিতে বাসের ভাড়া বাড়তে পারে ১৩%, দূরপাল্লায় ১৬%
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লো
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লো