আইএসের অস্তিত্ব অস্বীকার করার খেসারত দিচ্ছে বাংলাদেশ

চিত্ত বিশ্বাস
১৭ জুলাই ২০১৬, ১৫:৩৯আপডেট : ১৭ জুলাই ২০১৬, ১৮:২৩

চিত্ত বিশ্বাস বাস্তব থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে নেই। বরং স্বীকার করে তার মোকাবিলা করা ভালো। তা না করলে যে কী হয়, এখন বাংলাদেশ সরকার সেটা আশা করি বুঝতে পারছে।
যতবারই গুপ্তহত্যা হয়েছে আর নিজেদের দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে ইসলামিক স্টেট (আইএস), ততবারই ঢাকা থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আইএসের কোনও অস্তিত্ব নেই। বাংলাদেশ সরকার দাবি করেছিল, মুক্তমনাসহ অন্যদের হত্যা করে আইএসের তকমা দেওয়া রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রেরই অংশ। কিন্তু প্রথমে গুলশান আর তারপর ঈদের দিন নামাজের ঠিক আগে কিশোরগঞ্জে সন্ত্রাসী হামলা ঢাকার ওই দাবি ও আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে অনেকটাই। এতটাই যে সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তথ্যমন্ত্রী হাসানুক হক ইনু বলেছেন, ‘বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে কোনও আন্তর্জাতিক সংগঠনের যোগসূত্র তৈরি হয়েছে কিনা, বা তারাই কাজ করাচ্ছে কিনা, সেটা আমরা দেখছি। তথ্যটা উড়িয়ে দেওয়ার নয়।’
এতদিন অবশ্য উড়িয়েই দিয়ে এসেছে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতি হয়েছে ঢের বেশি।
আইএসের উপস্থিতি নেই, মানেটা কী? সিরিয়া বা ইরাক থেকে আইএসের যোদ্ধারা কি দল বেঁধে এসে আক্রমণ চালাবে, নাকি বাংলাদেশে কয়েকটি অফিস খুলে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ঘোষণা করবে, আমরা আইএস! আর তারা তো মানুষের বাইরে অন্য কোনও প্রজাতির বা ভিনগ্রহের জীব নয় যে, আকাশ থেকে টুপ করে পড়বে! সন্ত্রাসী মনোভাবাপন্ন বা পুরনো সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গি মানসিকতা ও উগ্রপন্থায় উদ্বুদ্ধ তরতাজা যুবকদের মধ্যে থেকেই আইএস জঙ্গি তৈরি হবে। বাংলাদেশে সেটাই তৈরি হয়েছে। ভারতও তার ব্যতিক্রম ন‌য়, এমনকী পশ্চিমবঙ্গও নয়। তবে তফাতটা হলো—ভারত আইএসের অস্তিত্ব প্রথম দিকে অস্বীকার করলেও পরে, দ্রুত ভুল শুধরে নিয়েছে। ভারতে আইএসের নামে কোনও সন্ত্রাসী হামলা হওয়ার আগেই।
আইএস-্এর নামে হওয়া গুপ্তহত্যা ও গুলশনের আগে হওয়া অন্যান্য হিংসার ঘটনার তদন্তে বাংলাদেশের পুলিশ ও গোয়েন্দারা জামাতুল মুজাহিদিন ও আনসারুল্লা বাংলা টিমের সদস্যদেরই জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছেন। এর মধ্যে কোনও ভুল নেই। কিন্তু জেএমবি বা আনসারুল্লার ওই সদস্যেরা যে সাইবার দুনিয়ায় ইরাক ও সিরিয়ায় বসে থাকা আইএসের মাথাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে না, সেটা কে বলল? একটা সময়ে জেএমবি আর আনসারুল্লা নিজেদের আল-কায়েদার শাখা সংগঠন বলে ঠারেঠারে দাবি করত। কিন্তু আল-কায়েদা ক্রমশ দুর্বল হওয়ার পর নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার তাগিদে তারাই সম্প্রতি আনুগত্য পাল্টে আইএস-এর অধীনস্থ হয়েছে, সেটা কি অসম্ভব?

এই বছর এপ্রিল মাসেই আইএসের পত্রিকা ‘দাবিক’-এর চতুর্দশ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের এক যুবকের নাম ও ছবি দিয়ে দু’পাতার একটি নিবন্ধ লেখা হয়েছে। তাতে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে সিরিয়ায় গিয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইসলামিক স্টেট-এর হয়ে যুদ্ধ করতে করতে শহিদ হয়েছে ওই যুবক। এ সব কি মাথায় রাখা হয়নি?

আমেরিকার ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টার-এর প্রাক্ত‌‌ন ডেপুটি ডিরেক্টর অ্যান্ড্রু লিপম্যান মনে করেন, ইসলামিক স্টেট আপাতত তিন ধরনের জঙ্গি হামলা চালাচ্ছে। এক. কিছু হামলার পরিকল্পনা কেন্দ্রীয়ভাবে করা হচ্ছে, ইরাক ও সিরিয়ায় বসে তার ছক তৈরি করছেন আইএস-এর শীর্ষনেতারা। দুই. কোনও কোনও হামলা চালানো হচ্ছে আইএস-্এর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে। তিন. কয়েকটি হামলা ছক তৈরি থেকে শুরু করে কয়েকজন স্থানীয় সন্ত্রাসী, যারা আইএসের প্রতি নিজেদের আনুগত্য প্রদর্শন করেছে।

বাংলাদেশের আইএসের নামে হওয়া জঙ্গি হামলা দ্বিতীয় নাকি তৃতীয় গোত্রে পড়বে, সেটা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, আলোচনা হতে পারে। তবে আইএসের অস্তিত্বের কথা আর অস্বীকার করা যাবে না। আইএস-কে ভূত না ভেবে রক্তমাংসের বিপদ ভাবাটাই বুদ্ধিমানের পরিচয়।

লেখক: সাংবাদিক
আরও খবর: আইএস - ইউএস: উভয়ের টার্গেট কেন বাংলাদেশ?

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে: জামায়াত
তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে: জামায়াত
সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচে প্রথমবার থাকছে ভিএআর 
সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচে প্রথমবার থাকছে ভিএআর 
বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
সর্বশেষসর্বাধিক