আমার মৃত্যুর পর আমার রেখে যাওয়া কিছু সোনা-দানা যেন রাস্তায় ছড়িয়ে রাখা হয়। কফিন আর আমার হাতটা যেন উম্মুক্ত থাকে। শেষযাত্রায় মানুষ দেখবে মৃত্যুর পর আমি খালি হাতে যাচ্ছি! সাথে করে সোনা দানা কিছুই নিতে পারি নি!---আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট।
উসাইন বোল্টকে নিয়ে একটা কৌতুক আছে এমন-বোল্ট ফাইভ স্টার একটা হোটেলে বন্ধুদের নিয়ে খেতে গেছেন। হোটেলের গার্ড বোল্টকে ঢুকতে না দিয়ে বললো- এখানে হাফ প্যান্ট পরে ঢোকা নিষেধ। উসাইন বোল্ট বললেন, আমি একটু আগেই হান্ড্রেড মিটার স্প্রিন্টে সোনা জিতে আসলাম। বন্ধুদের কথা দিয়েছিলাম অলিম্পিকে সোনা জিতলে তাদের ভরপেট খাওয়াব। গার্ড উত্তর দিলো-তাহলে আরো জোরে দৌড় দিয়ে বাসায় ফিরে যান এবং একটা ফুলপ্যান্ট পরে আসেন।
হাফপ্যান্ট কিংবা ফুলপ্যান্ট, লুঙি কিংবা ধুতি, পায়জামা কিংবা নেংটি যে যা কিছু পরুক না কেন, সোনার প্রতি সবার হয়তো মারাত্মক আকর্ষণ আছে! সম্পর্ক, ভালোবাসা কিংবা দেশপ্রেমেও আছে সোনার শক্ত অবস্থান। আছে গল্প, কবিতা, গান, নাটক, মানুষের নাম কিংবা সিনেমাতে সোনার বহুমুখী ব্যবহার। ইদানিংকালে অবশ্য সোনার বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন উঠেছে! কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন বাংলাদেশে নাকি সোনার ব্যবহার, ব্যবসা, সোনামুখী সব সম্পর্ক অবৈধ। হায়, সবকিছু নাকি খাদে ভরা, অস্বচ্ছ! তাই আসুন একটার পর একটা সোনা বিষয়ক জট খোলার চেষ্টা করি।
বাংলাদেশের সৃষ্টি লগ্নেই সোনার ব্যাপারটা জড়িয়ে ছিল। স্বাধীনতাকামী কোটি মানুষের স্লোগান ছিল- সোনার বাংলা শশ্মান কেন আইয়ুব শাহী জবাব চাই! পরে অবশ্য এই জবাব ইয়াহিয়া খানের কাছেও চাওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানি নিষ্ঠুর একনায়ক ও খুনি আইয়ুব এবং ইয়াহিয়া সম্ভবত খাটি সোনা কী জিনিস সেটা বুঝে উঠতে পারেননি, যেমন বুঝতে পেরেছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালিরা। স্বাধীনতাকামী বাঙালিরা রক্ত দিয়েছে, শহীদ হয়েছে, যুদ্ধের পরীক্ষায় ক্রমশ উর্ত্তীর্ণ হয়ে এদেশের মানুষ পুড়ে পুড়ে খাটি সোনা হয়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছে। একারণেই এইদেশের জাতীয় সঙ্গীত হচ্ছে- আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি!
বাংলা গানে সোনা অনেক সুন্দর একটা জায়গা দখল করে আছে। দেশের গান আছে এমন-সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা সোনা নয় যতো খাটি! বাংলা ছবির সুপার ডুপার বাম্পার হিট গান এমন- সব সখিরে পার করিতে নেব আনায় আনা/তোমার বেলায় নেব সখি তোমার কানের সোনা! এমন আরেকটি গান- সোনা দানা দামি গহনা। সোনা নিয়ে ধুন্দুমার জনপ্রিয় হিন্দিগানও আছে। যেমন- সোনা কিতনা সোনা হায়! বাপ্পী লাহিড়ীর একটি কালজয়ী গান হচ্ছে- সোনার আখরে লেখা ভুলে যাওয়া নাম/মনের আধারে আমি লুকিয়ে নিলাম!
সবকিছু অবশ্য মনের আধারে লুকিয়ে রাখা যায় না। গোল্ড স্ল্যাচ কিংবা ম্যাকানাস গোল্ড নামের ছবিগুলো যারা দেখেছেন তারা তা বহুদিন মনে রাখবেন। প্রেম আর সূর্যের আলো যেহেতু লুকিয়ে রাখা যায় না তাই একজন আরেকজনকে ভালোবেসে সোনা কিংবা যাদুমনি ডাকবেই! বাংলা ছবির নাম ছিল সোনাবউ, হাল আমলে সেটা আবারও নির্মিত হলে হয়তো নাম হয়ে যাবে- রঙিন সোনাবউ! (আপন জুয়েলার্স এই ছবির টাইটেল স্পনসর হতে পারতো। তখন নাম হতে পারতো আপন রঙিন সোনাবউ যার ইংলিশ নাম হতে পারতো the golden wife!) প্রেমাস্পদকে ডাকার মতো ছোট বাচ্চাদের সোনামনি বলে ডাকা হয়তো কখনোই বন্ধ হবে না।
প্রেমের ক্ষেত্রে সোনা কখনও সখনো পরিমাপক হয়ে দাঁড়ায়। গানের কথায় আছে- যে জন প্রেমের ভাব বোঝে না/তার সাথে নাই লেনা দেনা/ আসল সোনা ছাড়িয়া যে নেয় নকল সোনা! প্রেমের দিকে আপাতত না যাই। প্রেম আসল কী নকল সেই আলোচনা ভুলে দেশজুড়ে এখন একটাই আলোচনা- বাংলাদেশের সোনার দোকানগুলোতে নাকি নকল সোনার ছড়াছড়ি! এদেশের সোনা বেচাকেনার প্রক্রিয়াটাই নাকি অস্বচ্ছ! ঘোষণা দিয়ে এবং আমদানি রফতানি প্রক্রিয়ার বিধান মেনে সোনা আমদানি করে সেগুলো বিক্রি করলে নাকি লাভ হয় না। এদেশে তাই সোনা নাকি কেউ আমদানি কিংবা রফতানি করে না। এদেশের সোনা নাকি শুধু চোরাচালানের জন্যই! ব্যাগেজ রুলের অধীনে সোনা বা গহনা এনে বিক্রি করলে যা লাভ তার চেয়ে ঢের বেশি লাভ নাকি চোরাচালানে। তাই সোনার খনি ধরা পড়ে ঢাকা শাহজালার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে, আর যা ধরা পরে না তার বেশিরভাগ চলে যায় ভারতে। বাংলাদেশটা নাকি সোনা চোরাচালানের স্বর্ণরাজ্য! দেশজুড়ে যে সোনার গহনা বিক্রি হয় সেগুলো নাকি আর্ন্তজাতিক মানের নয়। সোনার গহনাতে নাকি খাদ থাকে অনেক বেশি! দুবাই আমেরিকা এমন কী ভারত থেকে সোনার গহনা কিনে যে কোন দেশে বিক্রি করা যায় কিন্তু বাংলাদেশ থেকে সোনার গহনা কিনলে সেটা বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে। এদেশের গহনায় সোনার যে পরিমাণ লেখা থাকে বাস্তবে সেটা নাকি দেওয়া হয় না। কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলে থাকেন খাদ বা কলঙ্ক থাকে দুই জায়গায়। চাঁদ এবং বাংলাদেশে তৈরি সোনার গহনায়! ব্যাগেজ রুলের অধীনে সোনা এনে যারা বিক্রি করেন এবং যারা এদেশে গহনা তৈরি করে বিক্রি করেন তারা নাকি কেউই ঠিক মতো কাগজপত্র দেন না! বাংলাদেশে সোনার অবস্থা যে এমন তা জানা গেছে কয়েকজন সোনার ছেলে রাতভর একটা বিলাসবহুল হোটেলে দুই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রীকে ধর্ষণ করার পর! (এই সোনার ছেলে এবং তাদের সোনার বাবাদের কথায় একটু পরেই আসছি। জানি না বাংলাদেশের অন্য সব ব্যবসার গোমর জানতে আরো কত শত ধর্ষণের প্রয়োজন হবে!)
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সোনা চোরাচালান করে কাড়ি কাড়ি টাকা কামিয়েছেন বাংলাদেশে এমন লোকের সংখ্যা নাকি কম নয়। তবে এমন কাজের সাথে জড়িতদের নামের আগে বা পরে নাকি সোনা যুক্ত হয়ে যায়। যেমন সোনা রফিক বা সোনা রতন! অবশ্য ধর্ষণে সেঞ্চুরি করার পরও কারো কারো নামের সাথে সোনা যুক্ত হয়ে যায়। যেমন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেঞ্চুরিয়ান মানিক ওরফে সোনা মানিক! মানিকের নামের সাথে কেন সোনা যুক্ত হলো আমরা সেটা নিয়ে আলোচনা না করি।
তবে কয়েকজন সোনার ছেলে ধর্ষণ করে সারাদেশে নিন্দার ঝড় তোলার পর এবার অন্যরকম দুই সোনা মিঞার গল্প শোনা যাক। ধর্ষকদের একজনের পিতা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার। এই সোনা মালিক সাহেব মনে করেন ছেলেরা বয়সকালে একটু আধটু এমন কাজ করেই থাকে! ধর্ষণে নাকি দোষের কিছু নেই! ছেলের কারণে সোনা বাবা ফেঁসে গেছেন এবং আপন জুয়েলার্সের অন্য মালিক যারা দিলদারের আপন ভাই তাদের সাথে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের আগে হাতাহাতিও হয়েছে! আপন জুয়েলার্সের মালিক বাবা সোনার ছেলে সাফাতের পকেট খরচ মাসে দুই লাখ টাকা। সোনার ছেলের আবার বডিগার্ড আছে। গার্ড শুধু সোনার ছেলেকে গার্ডই দেয় না ধর্ষণের ভিডিও করে। যে মেয়েরা ধর্ষিতা হয়েছে তাদের বাসাতে যেয়ে হুমকি দেয়! এইসব সোনার ছেলেরা বিলাস বহুল হোটেল ভাড়া করে বন্য আর উদ্দাম পার্টি দেয়! এই সব সোনার ছেলের কারণে বাবা সোনার ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়, আপন জুয়েলার্সের কর্মচারিদের চাকরি চলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। সারা দেশে যারা স্বর্ণের ব্যবসা করে তাদের ব্যবসায়িক সততা প্রশ্নবিদ্ধ হয়! সোনা বেচা টাকার কারণে পুলিশ ধর্ষিতাদের মামলা নিতে গড়িমসি করে। সামাজিক গণমাধ্যমে ঝড় ওঠার পর সেই পুলিশই আবার মামলা নেয় এবং সব আসামিকে গ্রেফতার করে। মুহূর্তেই যেন পুলিশরা হয়ে যায় সক্রিয়!
আরেকজন সোনা হচ্ছেন যে হোটেলে সোনার ছেলেরা পার্টি করে সেটার মালিক সরকার দলীয় এমপি বি এইচ হারুন! পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র না থাকায় একবার এই হোটেল সিলগালা করে দেওয়া হয়েছিল!
এই এমপি আবার গত পাঁচ বছরে ঈর্ষনীয় সম্পদের মালিক হয়েছেন। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী সই জাল করে অন্যের একশ চৌত্রিশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন! আপন জুয়েলার্স থেকে শত কেজি সোনা ও হীরা জব্দ করা হলেও এমপি সাহেবের হোটেলের কিছইু হয়নি! মদের বারের লাইসেন্স না থাকলেও রেইন ট্রি হোটেলে দিব্যি মদের পার্টি চলে, সেখান থেকে মদের বোতলও উদ্ধার করে পুলিশ! এমপি সাহেব আবার ধর্ম বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি! এমপি সাহেব আত্মীয়তা করেছেন সাবেক ধর্মমন্ত্রী ও চিরকালীন রাজাকার আবদুল মান্নানের নাতির সাথে। হায়রে ধর্ম!
লেখাটা ছিল সোনা বিষয়ক। ভারতীয় উপমহাদেশে বিয়ে উৎসবে কনেকে সোনা দিয়ে সাজানোর রেওয়াজ আছে। মুসলিম বিয়েতে দেনমোহরের সাথে উসুল বলে একটা ব্যাপার প্রচলিত যা দেনমোহরের টাকা থেকে কনের সোনার গয়না বাবদ যে টাকা খরচ করা হয় সেটা কেটে নেওয়াকে বোঝায়। ব্যঙ্গ করে কেউ কেউ তাই বিয়েকে বলে থাকেন সোনামুখী সম্পর্ক! স্থায়ী সম্পদ হিসেবে টাকার সমান্তরালে সোনাও জমায় মানুষ, গচ্ছিত রাখে ব্যাংকে। হয়তো জীবনটাও সোনামুখী! কিন্তু জীবন যাদের সোনামুখী নয় রাষ্ট্রের কাছে কেমন তারা?
আট বছরের আয়েশা আক্তার। স্কুলে যাওয়ার পথে বখাটেরা তাকে ডিস্টার্ব করতো। একদিন ধর্ষিতা হয় মেয়েটি। মেয়েকে নিয়ে বিচার চাইতে যান পিতা হযরত আলী। উল্টো নিন্দা জোটে তার কপালে। ক্ষুব্ধ অভিমানাহত হযরত আলী তার মেয়েটিকে নিয়ে দ্রুত ধাবমান ট্রেনের সামনে এসে দাঁড়ান। ধাবমান ট্রেনের চাকা বাবা মেয়ের সব অভিমান কেড়ে নিয়ে তাদের পৌঁছে দেয় পরপারে। হযরত আলীর স্ত্রী হালিমা বেগম অতোটা সাহসী নন। ট্রেনের সামনে দাঁড়াতে পারেননি বলে আজও বেঁচে আছেন!
জীবনটা মনে হয় সোনামুখী! যাদের সোনা আছে তারা রেইনট্রি হোটেলের মতই টিকে থাকবে, তাদের টিকিটিও স্পর্শ করা যাবে না। আর যাদের সোনা নেই, যারা হযরত আলী কিংবা আয়েশা আক্তার, তাদের গন্তব্য ট্রেনের চাকার নিচে।
লেখক: রম্য লেখক।



