বঙ্গবন্ধুর আদর্শ: তরুণ প্রজন্মের কাঁধে যে দায়

স্বদেশ রায়
১৪ আগস্ট ২০১৯, ২৩:৫৯আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৯, ১৩:২৮

স্বদেশ রায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামের পাশাপাশি মুক্তির সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর জাতির ভেতর সেই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তিনি জাগ্রত করেছিলেন। স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে হত্যাকারীরা শুধু আমাদের স্বাধীনতা ও সংবিধানের চরিত্র নষ্ট করেনি। জাতি হিসেবে আমাদের ভেতর যে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বঙ্গবন্ধু জাগিয়ে ছিলেন, সেই আকাঙ্ক্ষাও নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অবিরাম করে গেছে তারা। জাতিকে ধর্মীয় আচরণের নামে অন্ধকারে নিমজ্জিত করার চেষ্টা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের সমাজে ও মনোজগতে। যার ফলে দীর্ঘদিন থেমে ছিল আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরে জাতিকে অর্থনৈতিক মুক্তির দেওয়ার অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে আমাদের মনোজগত যেভাবে নষ্ট করা হয়েছে তাতে আমরা সঠিকভাবে সকলে এগুতে পারছি না সেই উন্নয়নের পথে। এ কারণে শেখ হাসিনাকে অনেকখানি এককভাবে চেষ্টা করতে হচ্ছে। জাতি হিসেবে আমরা নিজেদের চরিত্র এতখানি হারিয়ে ফেলেছি যে, নানাভাবে তাঁর উন্নয়ন কাজকে বাধা দিয়ে চলেছি। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও তাদের সুবিধাভোগী চক্র প্রতিমুহূর্তে বাধা সৃষ্টি করছে এই উন্নয়নকে। অন্যদিকে আমাদের চরিত্র এতই নষ্ট হয়েছে যে শেখ হাসিনার সঙ্গে থেকেও আমরা দুর্নীতি করে বাধাগ্রস্ত করছি অর্থনৈতিক উন্নয়নকে।

তরুণ প্রজন্মের তাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করতে হলে প্রথমে দুটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। যেসব কারণে আজ শেখ হাসিনার পাশে থাকার পরেও তাঁর অর্থনৈতিক উন্নয়নকে শতভাগ সহযোগিতা করা সম্ভব হচ্ছে না, সেই কারণগুলো তরুণ প্রজন্মকে খুঁজে বের করতে হবে। নিজ চরিত্রের ভেতর যদি সেই কারণগুলোর কিছু থাকে অর্থাৎ দুর্নীতির প্রতি আকর্ষণসহ নানা সুবিধাবাদ—সেগুলো থেকে নিজেকে বের করে আনতে হবে। আর এর থেকে আরও বড় হলো, তরুণ প্রজন্মকে এখন নিজ চরিত্রকে দৃঢ় করে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আহ্বানকে উপলব্ধি করতে হবে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এই মুক্তি ধাবমান সময়ের সঙ্গে চলমান। আমরা জাতি হিসেবে যতদিন বেঁচে থাকবো, যত সহস্র বছর আমাদের অস্তিত্ব থাকবে, ততদিনই থাকবে এই মুক্তির সংগ্রাম।

এই কালের যাত্রার পথে ধাবমান মুক্তির সংগ্রামের যাত্রী হতে হবে প্রতিমুহূর্তের তরুণ প্রজন্মকে। এ মুহূর্তের তরুণ প্রজন্মকে তাই চিহ্নিত করতে হবে তাদের সামনে মুক্তির সংগ্রাম কী কী? এ দেশের তরুণরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলো। ওই নিরাপদ সড়কের দাবির আন্দোলনকে একশ্রেণির কুচক্রী রাজনীতিক ও সুশীল সমাজ সরকার পতনের আন্দোলনে প্রবাহিত করার জন্যে গুজবের মাধ্যমে ভিন্নখাতে নিয়ে গিয়েছিলো ঠিকই, তবে এটা সত্য যে আমাদের নিরাপদ সড়ক দরকার। রোড সেফটির কোনও বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্য সেই নিয়মতান্ত্রিক স্বাধীন দেশ চেয়েছিলেন, যেখানে রাস্তায় যথেচ্ছ গাড়ি চালাবে না কেই। সেখানে প্রতিনিয়ত উন্নত হবে নিয়ম-কানুন। তাই কোনও সরকারবিরোধী আন্দোলন নয়, তরুণ প্রজন্মকে এমনভাবে এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে যাতে মানুষের চরিত্রের ভেতর নিয়ম মানার একটা নৈতিকবোধ শক্ত অবস্থান নেয়। একটি স্বাধীন জাতির সবথেকে বড় গুণ সব ক্ষেত্রে তার ভেতর একটা নিয়ম মানার নৈতিকবোধ জন্মাবে। এই নিয়ম মানার নৈতিকবোধের শিক্ষাই কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন অর্থাৎ অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের শিখিয়ে গেছেন। কীভাবে মানুষ সর্বোচ্চ প্রতিবাদেও নিয়মতান্ত্রিক থাকতে পারে তার শিক্ষা তিনি সেদিন আমাদের দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রিকশা চলবে, রেল চলবে, যাতে আমার সাধারণ মানুষ কষ্ট না পায়। ব্যাংক দুই ঘণ্টা খোলা থাকবে। এভাবে নিয়মের মধ্য দিয়ে মানুষকে পরিচালিত করে তিন সেদিন হরতাল পালন করিয়েছিলেন। ওই আন্দোলন থেকে আমাদের ব্যক্তিজীবনে শিক্ষা নেওয়া উচিত একটি স্বাধীন জাতির কতটা নিয়মতান্ত্রিক হতে হয়। আজ নিরাপদ সড়কের জন্যে কী যাত্রী, কী চালক, কী পথচারী সকলের মনোজগতে নিয়মকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের। আর যে তরুণ বুকে বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করে তাকে অবশ্যই নীতিবান হতে হবে। হতে হবে নিয়মতান্ত্রিক। তার নিজেকে যেমন সে গড়ে তুলবে, নিজেকে যেমন একজন প্রতিষ্ঠিত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যাবে, তেমনি নিজের জীবনের ও কাজের ভেতর দিয়ে সমাজকেও এগিয়ে নেবে। সমাজের প্রতি প্রতিমুহূর্তে দায়িত্ব পালন করলেই তবে দেশ ও জাতি মুক্তির পথে এগিয়ে যায়।যেমন এ মুহূর্তে দেশের তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব হলো দেশকে চিরদিনের জন্যে ডেঙ্গু রোগমুক্ত করা। এটি কিন্তু কঠিন কোনও কাজ নয়। সারা বছর যাতে সবাই তার বাড়ি ও বাড়ির আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখে। বাড়িতে কিছু সচেতনতা পালন করে ও সরকারিভাবে বছরজুড়ে যেন ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা ও তার লার্ভা মারা হয়। তরুণরা দলবেঁধে, নিজের দায়িত্ব মনে করে এ কাজ যদি বছরজুড়ে সপ্তাহের কয়েকটি ঘণ্টা করে এবং পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা তাদের দায়িত্ব পালন করছে কিনা সেটা খেয়াল রাখে, তাহলেই সম্ভব। এই খেয়াল রাখার জন্যে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে কোনও একটি ব্যানারে তাদের কাজ এগিয়ে নিতে পারে। এভাবে প্রতিমুহূর্তে দেশের জন্যে, দেশের মানুষকে যে যে সমস্যা থেকে মুক্তি দেওয়ার দায় সামনে আসবে, সেটাই ওই প্রজন্মের দায়ভার। এটা পালন করার অর্থই হলো বঙ্গবন্ধুর আদর্শ পালন করা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অর্থাৎ কখনোই এই নয় যে, আমরা শুধু তাঁকে জন্ম ও মৃত্যু দিনে স্মরণ করবো।


তরুণ প্রজন্ম একটুখানি ভেবে দেখতে পারে, বঙ্গবন্ধু যদি এই প্রজন্মের স্বাধীন দেশের একজন তরুণ হতেন তাহলে এ মুহূর্তে তিনি সারা পৃথিবীর কোনও না কোনও দায়ভাব কাঁধে তুলে নিতেন। সারা পৃথিবী এখন অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদে ভুগছে। পৃথিবীতে এ মুহূর্তে এক দেশ আরেক দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে না। সেই যুদ্ধ ক্ষেত্রের যুদ্ধাস্ত্রে কোনও মানুষ মারা যাচ্ছে না ঠিকই, তবে প্রতিমুহূর্তে আধুনিক সমরাস্ত্রের আঘাতেই মানুষ মারা যাচ্ছে। আর সেটা মারা যাচ্ছে ভাইয়ের হাতে ভাই। অর্থাৎ একশ্রেণির লোক ধর্মের নামে মানুষকে এতই অন্ধ গলিতে নিয়ে যাচ্ছে যে সে নিজের ভাইকে হত্যা করতেও পিছপা হচ্ছে না। শুধু তা-ই নয়, মানুষ হত্যার জন্যে আত্মাহুতি দিচ্ছে। আর এর পেছনে কাজ করছে দুনিয়ার সমরাস্ত্র ব্যবসায়ীদের ইন্ধন। আজ যদি বঙ্গবন্ধু একজন তরুণ হতেন তিনি নিশ্চয়ই এই রক্তপাত বন্ধ করার জন্যে সারা পৃথিবীর তরুণদের এক করার জন্যে ইউরোপ থেকে আমেরিকা, আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য, আবার আফ্রিকা থেকে সাউথ ইস্ট এশিয়া, যেখানেই রক্তপাত হচ্ছে ধর্মের নামে সেখানেই যেতেন। তিনি মানবতাকে, শান্তিকে জাগিয়ে তোলার জন্যে ছুটে বেড়াতেন সারা পৃথিবীতে। আর তার আগে নিজ দেশে যাতে এই রক্তপাত না ঘটে তার জন্যে জাগিয়ে তুলতেন মানুষকে।
আজ যদি তরুণ প্রজন্ম এই সমাজের ও মানুষের মনোজগতের এই ভ্রান্তিকে কাটিয়ে তোলার জন্যে না নেমে পড়ে, নিজেকে যদি ওই মিথ্যা, অসার অন্ধ চিন্তা থেকে বের করে আনতে না পারে, তাহলে সে আর যাই হোক, মুক্তির সংগ্রামের সৈনিক নয়। আর সেই তরুণ তখনই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের তরুণ হবে যে তার দেশ ও পৃথিবীর মুক্তির সংগ্রামের আদর্শের সৈনিক হবে। এজন্য প্রথমেই মুক্তির সংগ্রাম শুরু করতে হবে তার নিজ মনোজগতে। নিজের মনোজগত যেদিন সব ধরনের ভ্রান্তি থেকে বের হয়ে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হবে, তখন সেই হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের তরুণ। তার হাতেই সম্ভব হবে সমাজের অন্তত একটি কুঁড়িকে ফুটিয়ে তোলা। প্রতিটি তরুণ তার সারা জীবন দিয়ে যদি একটি কুঁড়িকে ফুলে রূপ দিতে পারে, তাহলেই তো একটু একটু করে তার আপন মাতৃভূমি ফুলের বাগানে রূপান্তরিত হবে। আর এটাই মানুষের মুক্তির সংগ্রাম। এই সংগ্রামের জন্যেই বঙ্গবন্ধু প্রতিটি বাঙালি তরুণের জন্যে, অনাগত তরুণের জন্যে দিয়ে গেছেন একটি স্বাধীন ভূখণ্ড আর রেখে গেছেন মুক্তির সংগ্রামের আহ্বান।
লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

 

 

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে: জামায়াত
তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে: জামায়াত
সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচে প্রথমবার থাকছে ভিএআর 
সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচে প্রথমবার থাকছে ভিএআর 
বিদুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
বিদুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
সর্বশেষসর্বাধিক