X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

রাজনীতি ও ইতিহাসের ভুল পাঠ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২১, ১৪:৫৭

মো. জাকির হোসেন বিএনপির গঠনতন্ত্রে লক্ষ্য, উদ্দেশ্য যা-ই লিখিত থাকুক না কেন, বাস্তবে বিএনপির রাজনীতির বড় অংশ জুড়ে আছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা, তাঁকে কটাক্ষ ও অবমাননা করার অপচেষ্টা। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈরিতা করতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করতেও কুণ্ঠিত নয় বিএনপির কিছু নেতা। ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান বীরশ্রেষ্ঠ’র দেহাবশেষ পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা’ শীর্ষক এক ভার্চ্যুয়াল আলোচনা সভায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একাত্তরের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘এদের (আওয়ামী লীগ) ঘটনাবলি দেখলে মনে হয়, এ দেশে কোনও মুক্তিযুদ্ধ কেউ করেনি একমাত্র একজন ব্যক্তি ছাড়া। অথচ তিনি সেই দিন দেশেই ছিলেন না, পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। আওয়ামী লীগ আজকে একবারের জন্যও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানীর নাম উচ্চারণ করে না, সেই সময়ে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের অবদানের কথা বলেন না, লাখ লাখ সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার কথা তাঁরা উচ্চারণ করেন না।’

বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে কতটা ক্ষোভ আর গাত্রদাহ বিএনপি নেতার। বিএনপি নেতার কাছে প্রশ্ন, ‘শেখ মুজিবের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘তোমার নেতা, আমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ এইসব শ্লোগান মানুষ কেন দিয়েছে? মুক্তিযুদ্ধের জন্য এই দেশের মানুষকে কে প্রস্তুত করেছেন, কতদিন লেগেছে যুদ্ধের পর্যায়ে আসতে? ৭১ এর ২৬ মার্চ আকাশ থেকে টুপ করে পড়েনি। দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, মৃত্যু, কারাজীবন, নিপীড়ন, নির্যাতনের রক্ত পিচ্ছিল পথ বেয়ে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের মাহেন্দ্রক্ষণ।

পৃথিবীর ইতিহাসে কত স্বাধীনতার সংগ্রাম ব্যর্থ হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। বঙ্গবন্ধু ধাপে ধাপে জাতিকে প্রস্তুত করেছেন মুক্তিযুদ্ধের জন্য। পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা ভেবেছেন বঙ্গবন্ধু। ইংরেজদের তাড়িয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সময় থেকেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সময়েই বিভিন্ন জনসভায় বক্তৃতায় তিনি তুলে ধরতেন, ‘পাকিস্তান দুইটা হবে, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে। একটা বাংলা ও আসাম নিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র; আর একটা ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে – পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, সীমান্ত ও সিন্ধু প্রদেশ নিয়ে।’

স্বাধীন বাংলাদেশের আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে যেতে বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে রুপ দিয়েছেন। এরপর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে রুপ দিয়েছেন। স্বায়ত্তশাসনকে স্বাধীনতার আন্দোলনে রুপ দিয়ে অর্জন করেছেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সমর্থনপুষ্ট পাকিস্তান এবং সেই সঙ্গে পাকিস্তানের বিরোধিতা মানে ইসলামের বিরোধিতা এই আবেগের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আন্দোলন গড়ে তোলা কতটা কঠিন তা বিএনপি নেতারা অনুধাবন করেন কি?

গত ১৩ বছর ধরে সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে বিএনপি কত জোট গঠন করেছে, ফলাফল কী? বঙ্গবন্ধু যথার্থই বলেছেন, ‘আন্দোলন গাছের ফল নয়। আন্দোলন মুখ দিয়ে বললেই করা যায় না। আন্দোলনের জন্য জনমত সৃষ্টি করতে হয়। আন্দোলনের জন্য আদর্শ থাকতে হয়। আন্দোলনের জন্য নিঃস্বার্থ কর্মী হতে হয়। ত্যাগী মানুষ থাকা দরকার। আর সর্বোপরি জনগণের সংঘবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ সমর্থন থাকা দরকার।’   

মানবজীবন অতি সংক্ষিপ্ত ও একবারের জন্য পাওয়া। মাত্র একবারের জন্য পাওয়া এই জীবনের কিয়দংশ কেউ বিসর্জন দিলেই তিনি ইতিহাসে অমর হন। জাতির কাছে নমস্য হয়ে জাতীয় বীর, জাতির পিতা নানা অভিধায় অভিষিক্ত হন। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু নিজের সকল ব্যক্তিগত সুখ-স্বপ্ন ও পরিবারের সুখ-সান্নিধ্যকে বিসর্জন দিয়েছেন বাংলা ও বাঙালিকে ভালোবেসে। কারাগারকে বাসস্থান বানিয়েছেন, নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন কোনও দ্বিধা-সংশয়-ভয় না করে। ১৯৭২ সালের ১৮ মার্চ সংবাদ পত্রিকায় কমরেড মণি সিংহের বরাত দিয়ে প্রকাশিত হয় বঙ্গবন্ধু ১৯৫১ সালে কারাগারে থাকাকালেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। চিঠি-পত্র আদান-প্রদানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর এই পরিকল্পনার কথা জানতে পেরেছিলেন বলে মণি সিংহ উল্লেখ করেন। মণি সিংহ আরও বলেছেন, যদিও আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল তথাপি বঙ্গবন্ধু তার কাছে এটা জানতে চেয়ে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন যে, স্বাধীনতা সংগ্রামকে তিনি (মণি সিংহ) সমর্থন করবেন কিনা।

’৫১ সালে পাকিস্তান ভাঙার কথা বোধ করি কেউ নির্জনে বসেও চিন্তা করার দুঃসাহস করেননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলার কথা কেবল চিন্তাই করেননি তা বাস্তবায়নের জন্য অন্য দলের নেতাদের সাহায্য কামনা করেছেন। ১৯৫৮ সালে ক্ষমতা দখলের পর আইয়ুব খান সামরিক একনায়কত্বের অন্যতম শত্রু হিসাবে মুজিবকে শনাক্ত করে। বঙ্গবন্ধু ১৪ মাসের বেশি বিনা বিচারে আটক থাকেন। পাঁচ বছরের জন্য রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হবেন না আইয়ুবকে এই মর্মে কোনও লিখিত অঙ্গীকার দিয়ে জামিনে মুক্তি নেওয়া প্রত্যাখান করেন বঙ্গবন্ধু। এজন্য বঙ্গবন্ধুকে আরও ছয় মাস জেলে থাকতে হয়। যার অন্তরে স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্নিশিখা জ্বলছে সেই বঙ্গবন্ধু রাজনীতি থেকে দূরে থাকার চেয়ে জেলে আটক থাকাকেই বেছে নিয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টিতে অপেক্ষার প্রহর বঙ্গবন্ধুকে অস্থির করে তুলেছিল।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত শশাঙ্ক এস ব্যানার্জী তাঁর বই India, Mujibur Rahman, Bangladesh Liberation & Pakistan-এ লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৬২ সালের ২৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে মানিক মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ভারতীয় উপ-হাইকমিশনে তাঁর সাথে দেখা করেন এবং প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে লেখা চিঠি হস্তান্তর করে বলেছিলেন, ‘আমি ভারতের কাছে সমমর্যাদার বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে স্বাধীনতার প্রশ্নে সমর্থন চাইছি।’ সেই সময়টাতে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টির কথা বলা রীতিমতো রাষ্ট্রদ্রোহিতা। শশাঙ্ক এস ব্যানার্জী লিখেছেন, ‘আমি পূর্ববাংলার স্বাধীনতার কথা চিন্তা করছি’ শেখ মুজিবের এই কথা শুনে আমি শুধু চমকেই যাইনি, রীতিমতো দাঁড়িয়ে গেলাম। অবাক হয়ে বললাম, ‘পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা যদি জানতে পারে তবে মেরে ফেলবে। এটা তো সাংঘাতিক ব্যাপার। এটা প্রকাশ হবে না তো! প্রকাশ হলে দেশদ্রোহী মামলা হবে। সাবধান! এভাবে ওপেন বলবেন না। আপনাদের প্রাণ তো যাবেই; ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।’ মুজিব সেদিন বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধ করতে নেমে ফাঁসিতে ঝোলার ভয় পায় না।’

জওহরলাল নেহরুর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা দীর্ঘ হওয়ায় বঙ্গবন্ধু গোপনে সীমান্তবর্তী ভারতের আগরতলায় ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে বার্তা পাঠাতে মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। বঙ্গবন্ধু মুখ্যমন্ত্রীকে এটাও জানালেন, ঢাকাস্থ ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ হলেও তারা সাড়া দিতে অনেক বেশি দেরি করছেন। কিন্তু তার হাতে খুব বেশি সময় নেই। আগরতলা থেকে ফিরে আসার পথেই পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা তার গোপন সফরের খবর পেয়ে যায়। দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে ৬ দফা নিয়ে তীব্র জনমত গড়ে উঠলে বঙ্গবন্ধুকে আবার গ্রেফতার করা হয়। আগরতলায় গমন ও ভারতের সহায়তার পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রের মামলা দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত। বঙ্গবন্ধু ৬ দফার পক্ষে যদি গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারতেন তাঁর ফাঁসি কি অবধারিত ছিল না? বিএনপি নেতা জানেন কি ১৯৭১ সনের ১৫ মার্চ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সারাবিশ্বের হালনাগাদ ঘটনাবলীর মাঝে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর একটি প্রতিবেদন দেয় যার সংক্ষিপ্ত উপ-শিরোনাম ছিল ‘Mujibur Rahman has announced his takeover of the administration of the East Pakistan’, অর্থাৎ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

সিআইএ’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, মুজিব আজ এক ঘোষণায় ঢাকা, কুমিল্লা ও যশোর বাদে পূর্বাঞ্চলের যাবতীয় প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজের অধিকারে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গত এক সপ্তাহ ধরে তার ডাকে চলা অসহযোগ আন্দোলনের পর এলো এই ঘোষণা। মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের অঘোষিত শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন।’ পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণার মধ্য দিয়ে মুজিব প্রদেশে সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠা করে ডি ফ্যাক্টো শাসকে পরিণত হন। মুজিব তাঁর শাসনকে সংহত করার জন্য একের পর এক নির্দেশ (মোট সংখ্যা ৩১) জারি করেন।’

বঙ্গবন্ধুর বাসভবনকে ডি ফ্যাক্টো প্রেসিডেন্ট ভবন হিসেবে উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার সালিক লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার জন্য মুজিব ইতিমধ্যে তাঁর সশস্ত্র সংগঠন তৈরি করে ফেলেছেন। কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানী কার্যত মুজিবের কমান্ডার-ইন-চিফ। তাঁর প্রাইভেট বাহিনী গড়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্তদের নিয়ে। আওয়ামী লীগের সামরিক প্রস্তুতির সঙ্গে যেসব সামরিক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন, তাঁরা হলেন- ব্রিগেডিয়ার মজুমদার, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাসুদুল হাসান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইয়াসিন, মেজর (পরে ব্রিগেডিয়ার) মুশাররফ, মেজর জলিল ও মেজর মঈন।’

২৫ মার্চের আগেই বঙ্গবন্ধুর ডি ফ্যাক্টো কমান্ডার-ইন-চিফ কর্নেল ওসমানী কর্তৃক প্রণীত সামরিক পরিকল্পনার বিবরণ দিতে গিয়ে ব্রিগেডিয়ার সালিক লিখেছেন, ‘তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সৈনিকদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করলেন, যাতে তাঁরা মুজিবের ডাকের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বেরিয়ে আসতে পারে। সামরিক পরিকল্পনার মধ্যে ছিল- এক. পূর্ব পাকিস্তান অবরোধের জন্য ঢাকা বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দখল করা। দুই. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘাঁটি করে ঢাকা নগরের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ। এর দায়িত্ব ছিল ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর। সশস্ত্র ছাত্ররা তাদের সাহায্য করবে। তিন. ইপিআর ও ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পরিত্যাগকারীদের দায়িত্ব ছিল ক্যান্টনমেন্ট দখলের জন্য প্রচণ্ড আঘাত হানা।’

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পরিষ্কার হয়ে যায় ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে পরামর্শ দেন আত্মগোপনে যেতে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু দৃঢ়তার সঙ্গে আত্মগোপনে যাওয়া প্রত্যাখ্যান করেন। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু জানতেন কী ভয়ংকর পরিণতি অপেক্ষা করছে তার জন্য। বেলুচ স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা আব্দুল করিম খানের অনুসারী জেহার উপজাতীয়দের প্রধান নওরোজ খান স্বাধীনতার দাবিতে মিরঘাট পাহাড়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা তাদের প্রতি অস্ত্রবিরতির আহ্বান জানান। তারা কোরআন হাতে নিয়ে এই প্রতিশ্রুতি দেন যে, অস্ত্রবিরতি করলে নওরোজ খান ও তার সহযোগীদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে এবং সবাই সাধারণ ক্ষমার সুযোগ পাবেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক পাকিস্তান সরকার নওরোজ খান ও তার দুই ছেলেকে অস্ত্রসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ ক্ষমার পরিবর্তে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়। এরপর ১৯৬০ সালের জুলাইতে নওরোজের দুই ছেলেকে ফাঁসি দেয় পাকিস্তান সরকার। আর ১৯৬২ সালে কোহলু জেলে নওরোজ খানের আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিও এমন ঘটতে পারে এটা জেনেও আত্মগোপনে যেতে রাজি হননি।

১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ ‘ট্যাংক ক্র্যাশ রিভল্টস ইন পাকিস্তান’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়তার সঙ্গে আত্মগোপনে যেতে অস্বীকৃতির কথা তুলে ধরে। প্রতিবেদক সাইমন ড্রিং লিখেছেন, ‘একজন শুভাকাঙ্ক্ষী শেখ মুজিবুর রহমানকে টেলিফোনে আত্মগোপনে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলে তিনি উত্তরে বলেন, আমি যদি আত্মগোপনে চলে যাই ওরা আমাকে খোঁজার জন্য পুরো ঢাকা শহর জ্বালিয়ে দেবে।’

বাঙালির কল্যাণের কথা ভেবে আত্মগোপনে না গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন বঙ্গবন্ধু। মোহনলাল ভাস্কর পাকিস্তানি পুলিশের হাতে বন্দি হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন। মুক্তিলাভের পর তিনি তাঁর কারাজীবন নিয়ে ‘An Indian Spy In Pakistan’ শিরোনামে একটি বই লিখেন। মিয়ানওয়ালি কারাগারে আটক থাকার স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘একরাতে আমাদের কারাগারে শেখ মুজিবকে লায়লাপুর কারাগার থেকে আনা হয়েছে। জেল সুপার ছিলেন চৌধুরী নিসার। তিনি এসে জানান, শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য আনা হয়েছে’। একদিন ডেপুটি সুপার ফাজালদাদ আমাকে ও অন্য সাতজন ভারতীয় বন্দিকে বললেন, আট ফুট লম্বা আর চার ফুট চওড়া একটি গর্ত খুঁড়তে। সেই রাতে শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া হবে। এরপর তাঁকে এই গর্তে কবর দেওয়া হবে। সকাল ৯টা নাগাদ কবর খোঁড়া হয়ে গেলো। আমরা রাতভর উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু সকালে খবর পেলাম, সেই রাতে মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া হয়নি। পরে শুনেছি, ফাঁসির প্রস্তুতি যখন চলছিল, ভুট্টো ইয়াহিয়ার সঙ্গে গিয়ে দেখা করেন এবং তাঁকে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি সৈনিক কর্মরত আছে। মুজিবের ফাঁসির খবর সেখানে পৌঁছলে বাঙালিরা তাদের একজনকেও জীবিত রাখবে না’।

অনেক মানুষ একসাথে কাজ করেন, কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ একজন তার নেতৃত্ব, ত্যাগ, মেধা, দূরদর্শীতার কারণে অন্য সবাইকে উতরে ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে যান। জাতির কাছে তিন নমস্য হন।

বিশ্বের অন্তত ৭০টি দেশের জাতির পিতা আছে। কিন্তু বিএনপি নেতা বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা স্বীকার করা দূরে থাক, স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অবদানকেও অস্বীকার করে বলেছেন ‘অথচ তিনি তখন তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন।’ নেলসন ম্যান্ডেলা অস্ত্র হাতে রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করেননি, দশকের পর দশক কারাবন্দী ছিলেন। অথচ তিনি কেবল দক্ষিণ আফ্রিকা নয়, সারা বিশ্বে নন্দিত। নেলসন ম্যান্ডেলাকে অভিহিত করা হয় ‘South Africa’s Liberator as Prisoner’। নেলসন ম্যান্ডেলার সহযোদ্ধা ছায়াসঙ্গী ছিলেন ওয়াল্টার সিসুলু, আহমেদ কাদারদা, ম্যাক মহারাজ ও ইশু চিবা।

কয়জন জানেন তাদের নাম? অন্যদিকে, বায়াফ্রার আড়াই বছরের অসফল স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ হয়েছে ২০ থেকে ৩০ লাখ নাগরিক। মুক্তিযুদ্ধের নেতা ওজুকু রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী আইভরি কোস্টে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হিসাবে তিনি নন্দিত নন, বরং ব্যাপকভাবে নিন্দিত। ইতিহাসে নেলসন ম্যান্ডেলা, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পেলে, ম্যারাডোনা, আইনস্টাইন, মহাত্মা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু একজন করেই হয় যদিও তাদের সমসাময়িক সহযোদ্ধা অনেকেই থাকেন।

বিএনপি নেতার অভিযোগ ওসমানীর নাম আওয়ামী লীগ উচ্চারণ করে না। বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে যাদের নাম এসেছে ওসমানী তাদের একজন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সাংবিধানিকভাবে অবৈধ খুনি মোশতাক সরকারের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হয়েছিলেন ওসমানী। বঙ্গবন্ধুর খুনির সহযোগীকে স্মরণ না করাটাই স্বাভাবিক নয় কি?

বিএনপি নেতার আরেকটি অভিযোগ তাজউদ্দীন আহমদের অবদানের কথা আওয়ামী লীগ বলে না, লাখ লাখ সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার কথা তাঁরা উচ্চারণ করে না। এটি ডাহা মিথ্যাচার। জাতীয় চার নেতা মন্ত্রী ছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদের সহধর্মিনী জোহরা তাজউদ্দীন আমৃত্যু আওয়ামী লীগ এর সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। জাতীয় চার নেতার পরিবারের সদস্যদের অনেকেই দলের নেতা, সাংসদ, মন্ত্রী হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের অধিকাংশ সাংসদ ও মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা কিংবা মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সদস্যরা। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এমনকি নাতি-নাতনিদের জন্যও কোটা সংরক্ষণ করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের জন্য ভাতা-বাড়ির ব্যবস্থা করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। 

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যায় সহযোগিতা করে, বিচারের পথ রুদ্ধ করতে খুনিদের দায়মুক্তি দিয়ে সংবিধান সংশোধন করে, দায়মুক্তি আইন বাতিলের বিরুদ্ধে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে, বিচারের রায়ের দিন হরতাল আহ্বান করে, উচ্চ আদালতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বৈধতার পক্ষে আইনগত লড়াই করে, খুনি রশিদকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বানিয়ে এবং উচ্চ আদালতে পরিকল্পিতভাবে বিচার বাধাগ্রস্ত করেও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে শত্রুতার অবসান হয়নি বিএনপির। এখনও বিদ্বেষ-শত্রুতা অব্যাহত রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রাণভোমরা বঙ্গবন্ধুর সাথে শত্রুতা করে কি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের বলে দাবি করা যায়?

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
অপূর্বকে উত্ত্যক্ত করতেন সাবিলা, এবার বিয়ে!
অপূর্বকে উত্ত্যক্ত করতেন সাবিলা, এবার বিয়ে!
ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা, ২ জনের মৃত্যুদণ্ড
ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা, ২ জনের মৃত্যুদণ্ড
ঢাবি ‘ঘ’ ইউনিটে পাসের হার ৮.৫৮ শতাংশ
ঢাবি ‘ঘ’ ইউনিটে পাসের হার ৮.৫৮ শতাংশ
মহাসড়কে পশুর হাট, যানজটে ভোগান্তি
মহাসড়কে পশুর হাট, যানজটে ভোগান্তি
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ