শান্তি ছাড়া ন্যায়বিচার করা সম্ভব না এবং ন্যায়বিচার ছাড়া ক্ষমা করাও সম্ভব না: পোপ জন পল দ্বিতীয় (১৯২০-২০০৫)
১. আমার দেশের মাটির গন্ধ: যে মাটি পৃথিবীতে কোথাও নেই
আমার জীবনে বিশাল একটা সময় কেটেছে বাংলাদেশের পবিত্র মাটির সংস্পর্শে। শৈশবের কিছু কথা স্মৃতিতে ভেসে আসে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ভ্যাপসা গরম ও তাপদাহ সহ্য করার পর যখন তেড়ে বৃষ্টি আসতো, শুষ্ক মাটির ওপর জলের ফোঁটা পড়া মাত্রই এক অদ্ভুত সোঁদা মিষ্টি সুবাস ছড়ায়। সেই সুগন্ধের মাদকতা আমাকে বারবার ভাবিয়ে তুলতো। এই মাটির পবিত্রতা, এই ধরিত্রী সম্পর্কে যে আমরা অনেক কিছুই জানি না, অনেক কিছুই বুঝি না। আমার সঙ্গে এই মাটি যেন কথা বলতো। আমাকে পাগলপ্রায় করে তুলতো যখন রেডিও তরঙ্গে ভেসে আসতো:
‘আমার দেশের মাটির গন্ধে
ভরে আছে সারা মন
শ্যামল কোমল পরশ ছাড়া যে
নেই কিছু প্রয়োজন’
কথা: মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (১৯৩৬-২০০৮)
গানটি শুনি আর ভাবি মাটি ও তার ঘামের গন্ধের কথা। আমি এই ঘ্রাণ অনুসরণ করে কেন উন্মাদ হয়ে যাই, তা অন্যকে বোঝাবো কী করে? আমার প্রবল ইচ্ছা ছিল, দেহে যদি পারফিউম মাখতে হয় তাহলে মাটির গন্ধের পারফিউম সারা জীবন থাকবে আমার ‘স্মেল অব চয়েস’। সেই ছোটবেলায় বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মাটির গন্ধের পারফিউম কি পাওয়া যায়? বাবা গম্ভীর স্বরে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘পলিমাটির গন্ধ কৃত্রিম উপায়ে সংরক্ষণ করা সম্ভব না।’ শুনে হতাশায় ছেয়ে যেতো আমার সমগ্র দেহমন। কত ফুলের সুগন্ধি বাজারে পাওয়া যায়, অথচ মাটির?
আমরা যে মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে আছি তা অনেকেই ‘সবই একই রকম’ মনে করলেও হিতার্থে তা মোটেও এক নয়। একেক জায়গার মাটি একেক রকম এবং বাংলাদেশের প্রতিটি স্থানে মানুষের মতো মাটিও বৈচিত্র্যতায় পরিপূর্ণ।
ক’বছর আগে বিদেশের চাকরি, ডলারের হাতছানি ত্যাগ করে, দেশপ্রেমিক মাটি প্রকৌশলী আব্দুন নাঈম দেশের মাটি নিয়ে অবাক করার মতো তথ্য দিলেন। বাংলাদেশে প্রায় ১৬ ধরনের ভিন্ন মাটির খোঁজ পেয়েছেন তিনি, ‘যা পৃথিবীর অন্য কোনও দেশে নেই’। বিশ্বের অন্যান্য দেশে চার-পাঁচ ধরনের মাটি পাওয়াই দুষ্কর বিষয়। সেখানে কেবল সিলেটেই তিনি একটি পাহাড়ে ৮ ধরনের মাটির খোঁজ পেয়েছেন। ভাবা যায়?
যতই বয়স বাড়তে লাগলো, যতই ‘নগরকেন্দ্রিক পশু’ হওয়া শুরু করলাম, মাটির সুগন্ধ আমার জীবন থেকে ক্রমেই হারানো শুরু করলো। কোথায় এখন মাটির গন্ধ? আর আজকের বাস্তবতা? অনেকের মতো ‘আধুনিক’ অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স নামের কংক্রিট বস্তিতে থাকি বলে বিষাক্ত সিমেন্টের ওপর বৃষ্টির কণার যে গন্ধ বের হয় তা নিমিষে আমার সমগ্র অস্তিত্বকে বিষাক্ত করে ফেলে।
করোনাকালে সর্বত্র ‘স্বাভাবিক প্রাকৃতিক শ্বাসপ্রশ্বাস’-এর আন্তরিক উৎসাহ সবাই দিয়ে থাকলেও রূঢ় বাস্তবটা হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বিশ্বের চতুর্থ ‘বাস অযোগ্য’ শহর ঘোষণা হয়েছে অনেক আগেই।
২. প্রকৃতির সাংকেতিক হুইসেল ও ব্র্যাম্বো’র গল্প
প্রকৃতির সঙ্গে আমরা নির্বিচারে বহু হেলাফেলা করেছি। ইদানীংকার কিছু সংকেত ও কিছু সতর্কতা হুইসেল আমাদের কান অবধি পৌঁছাচ্ছে না। কারণ, প্রকৃতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংকেত ও অনেক শব্দ মানুষ শ্রবণ করতে পারে না। মানুষ ২০,০০০ হার্টজের (এইচজেড) ঊর্ধ্বে কোনও শব্দ শ্রবণ করতে পারে না। অথচ কুকুর শুনতে পায় ৫০,০০০ হার্টজ পর্যন্ত। অনেক কারণের মধ্যে এই একটি মাত্র কারণে কুকুরকে মানবপ্রাণীর ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ বলা হয়।
কুকুর দলবেঁধে অকারণে সুর তুলে রাত্রিতে কান্না করলে আমাদের আবহমান সংস্কৃতিতে তা ‘কুলক্ষণ’ বলা হয়। কুকুরের সারা রাত ঘেউ ঘেউ ডাক চোর, ডাকাত বা অন্য কোনও সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কার ব্যাপারে আমাদের সতর্ক করে।
একাত্তরের ২০ মার্চের কথা। আমার কুকুর বাল্যবন্ধু ‘ব্র্যাম্বো’ সুর তুলে কান্না শুরু করলো। কত আদর করে বুঝিয়ে বলি, ‘এভাবে কাঁদতে নেই।’ কিন্তু তাতে উল্টোটা ঘটলো। দিনে-দুপুরে, সময়-অসময়ে তার কান্না অনবরত বাড়তেই থাকলো। উপরি ঝামেলা পাকালো সে আহার বন্ধ করে। মা বললেন, ‘ওকে চোখে চোখে রাখ।’ তাই করতাম। অথচ ২৫ মার্চের ভয়াল রাত্রিতে অনেক ডাকাডাকি করে ব্র্যাম্বো’কে আর খুঁজে পাই না। মাটি কাঁপানো ট্যাঙ্ক, কামান, মেশিনগানের গুলির শব্দ একটু থামা মাত্রই হঠাৎ লক্ষ করলাম ব্র্যাম্বো সিঁড়ির কোণে আশ্রয় নিয়েছে; যেখানে সে এর আগে কোনও দিনও ঢোকেনি। তার দু’চোখ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে নীরব অশ্রুর বন্যা। থেমে থেমে ফুঁপাচ্ছে। যখন ওকে জড়িয়ে ধরলাম, দেখি তার সমগ্র শরীর ঠিক আমার মতো ভয়ে থর থর কাঁপছে।
করোনাকালীন ১৮ মাসে যখন আমরা ঘরবন্দি ছিলাম, কুকুর ছাড়াও প্রকৃতির বহু প্রাণীর ডাক আমরা নিশ্চয়ই শুনেছি; যা আগে হয়তো বা কখনোই অনুসরণ করিনি। মহামারি সমগ্র মানবজাতির সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা, প্রকৃতিই আমাদের এসব শব্দ ও সংকেত শুনিয়ে যথেষ্ট মানসিক শক্তি ও প্রস্তুতি দিয়েছে। সে জন্যই হয়তো আমরা আজ হাজারো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ফের ‘আগের জীবনের’ গতি ধীরে ধীরে ফেরত পাচ্ছি।
৩. বাংলাদেশের মাটির মালিকানা কার?
‘ব্যবসা করতে আসিনি, দেশ গড়তে এসেছি’—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
আমাদের মূল সমস্যা হলো জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ ধ্বংসকরণ ইত্যাদি আলাপে যখন বসি, দেখা যায় সবকিছুই ‘উপরকেন্দ্রিক’। ‘উপর শ্রেণি’র মানুষ আকাশ-বাতাস, তালগাছ, মাথার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া ‘হাইথট’ ভাষ্যে ও আখ্যানের ওপর নির্ভরশীল ও সীমাবদ্ধ। এমন অবস্থায় যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছি তা নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা তো আমাদের নেই, তার ওপর রয়েছে ‘ধরিত্রী মা’র ধর্ষণ দেখে মাজা দুলিয়ে নাচার’ মতো আমাদের বেহাল দশা।
‘উন্নয়ন’ কি শুধু একটি বিশেষ শ্রেণির জন্য? বাংলাদেশের উন্নয়নবিরোধী নাগরিক আমি নই। কিন্তু উন্নয়নের নামে যে পরিমাণ খাল-বিল, নদী-নালা ভরাট ও অবৈধ দখলের রাজত্ব চলছে তা প্রকৃতির নিদারুণ প্রতিশোধের মুখে কি কখনোই পড়বে না? অবশ্যই প্রকৃতি প্রতিশোধ নেবে এবং তা নিতে সে বাধ্য। দয়াল আমাদের অনেক কিছুই সহ্য করেছেন, করছেন ও করবেন। কিন্তু তারও সহ্যের, ধৈর্যের সীমা আছে। দয়াল সীমা লঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।
৪. নর্দমায় পড়ে মৃত্যু: বাংলাদেশের ভয়াল চিত্র
অলস, ঘুষখোর, মুনাফালোভী প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতা কোন পর্যায়ে গেছে, তা গত ২৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাদামতলীতে ১৯ বছর বয়সী সেহেরীন মাহবুব সাদিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যু কি আমাদের চোখে আঙুল খোঁচা দিয়ে প্রমাণ করছে না? মেয়েটি অন্ধকারে বর্জ্য ও মাটিভর্তি খোলা নর্দমায় স্লিপ করে পড়ে গেলে তার মৃতদেহ উদ্ধার করতে লেগেছিল ৫ ঘণ্টা। শুধু তা-ই নয়, ৫ টন বর্জ্য সরানোর পর কেবল তা সম্ভব হয়েছিল। কী করুণ অবস্থা! কিন্তু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বলছে এটি একটি ‘তুচ্ছ ঘটনা’। অথচ জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরও চার জন ওই একই স্থানে একইভাবে মৃত্যুবরণ করেছে।
তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করারও একটা সীমা থাকে। সেই সীমা লঙ্ঘিত হচ্ছে একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়ে। এমনকি রাস্তায় বাতি লাগানো বা জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব কার তা আজ অবধি বোঝা গেলো না।
জনগণের স্বার্থে জমি ‘উদ্ধার’ করে ফেরত নিয়ে আনার বাহাদুরি ঘোষণার আইওয়াশ শেষ হলে ফের প্রশাসনের মদতে গোপনে সেই জমি ও নদী বেদখল হওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক তামাশা। এসব ঘটনা যখন ঘটে, ‘বেকুব জনগণ’কে ব্যস্ত রাখা হয় অন্য কোনও ‘চাঞ্চল্যকর’ ইস্যুতে। কিছু না হলে ক্রিকেট খেলার মতো বিনোদন তো আছেই!
৫. ‘স্বদেশি আকাশে ওড়ে বিদেশি শকুন’ ও গ্লোবাল গোলামিকরণ
আমাদের অনেক ‘বোকামি’র মধ্যে অন্যতম হলো, বিদেশিদের প্রেসক্রিপশন দেওয়া জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানোর ফর্মুলা, উন্নয়ন অংশীদার ও দাতা দেশগুলোর টাকার মোহ। এছাড়া আছে হাজারো ফন্দি করা কিছু ‘মানবিক প্রতিষ্ঠান’। আরও আছে বিদেশিদের কাঁচা টাকার ছড়াছড়ি এবং দেশি ‘হায়েনাদের’ শিকার খোঁজার গোস্তাকি।
পশ্চিমা বিজ্ঞান যে গত ১৮-১৯ মাসে আমাদের কি বাজে জাঁতাকলে পিষ্ট করে রেখেছে ও আরও কিছু বছর হয়তো রাখবে; সেই করুণ অভিজ্ঞতা কি এখনই আমরা মস্তিষ্ক থেকে মুছে ফেলবো? জাতিসংঘ কী বলছে, অমুক-তমুক উন্নত দেশ কী বলছে, বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন, গ্রেটা থানবার্গ কী বলছেন- এ সবই মাথা নত করে মানতে হবে।
আমরা এতটাই মেধা দুর্ভিক্ষে ভোগা জাতি যে নিজেদের জান বাঁচানো যেখানে ‘ফরজ কর্ম’, সেখানে আমাদের একান্ত নিজস্ব কোনও বক্তব্য নেই। তদুপরি রয়েছে আমাদের ভিক্টিমহুড মেন্টালিটি বা ‘আহা আমরা কী বেচারা জাতি’র মানসিকতা। ‘আমাদের কী দোষ ভাই! বিদেশিদের প্রকৃতির সঙ্গে বেইমানির জীবন্ত বলি বাংলাদেশ কেন হতে যাবে?’ কথা তো ঠিক; তাই জান বাঁচানোর জন্য ওদের কাছ থেকে ‘টেকা বাইর কর ব্যাটা, টেকা না দিয়া জাবি কই’- পথঘাটের চাঁদাবাজ মাস্তানদের মতো এভাবে জোরপূর্বক টাকা আদায় করা ছাড়া আর কি কিছু করার আছে... হুম? আমরা ভুলে বসেছি প্রাচীনতম প্রবাদবাক্য: ‘অর্থই সকল অনর্থের মূল’।
৬. দেশপ্রেম ও ‘আখেরি স্বপ্ন’
দেশপ্রেম ইতর শ্রেণির শেষ গুপ্তাবাস: স্যামুয়েল জনসন (১৭০৯-১৭৮৪)
বিভিন্ন ‘দিবসে’ খুব জোরেশোরে আমরা ‘স্বাধীনতার রক্ত শপথ’সহ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার প্রতিশ্রুতি ও প্রস্তুতি বারবার পুনর্ব্যক্ত করি। তবে আদতে স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা সেই ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তানি আমলের মানসিক দাসত্ব থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারিনি। খুব সহসা যে পারবো তাও আমি বিশ্বাস করতে রাজি নই।
‘দেশ সমস্যা অনুসারে ভিন্ন বিধান হতে পারে,
সূক্ষ্ম জ্ঞানের হিসেব করলে
পাপ পুণ্যির আর নাই বালাই’
ফকির লালন সাঁইজির ওপর উল্লেখিত বাণীর মর্মকথা হলো, বাংলাদেশের সমস্যার ভিনদেশি সমাধান দেওয়া সম্ভব না। ঠিক যেমন ভিনদেশি সমস্যার বাংলাদেশি সমাধান দেওয়া অসম্ভব।
আছেন কোনও সরকারি আমলা বা পাঁচটা বুদ্ধিজীবী, যারা ‘সূক্ষ্ম জ্ঞানে’ ও জ্ঞানচক্ষুর মাধ্যমে বিষয়গুলো বিবেচনা করে নতুন কোনও সময়োপযোগী পথ বাতলাবেন?
না, নেই। সূক্ষ্ম জ্ঞানচর্চা বা সাধনা ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মধ্যম পথ অবলম্বীদের এ ক্ষেত্রে কোনও জায়গা নেই। কোনও সুযোগ নেই। আমরা জাতিগতভাবে ‘ঘুমিয়ে’ আছি।
৭. ‘বাঁচাও বাঁচাও খেলা’ ও জর্জ কারলিনের ভবিষ্যদ্বাণী
মার্কিনি প্রথা ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী রেডিক্যাল বুদ্ধিজীবী, ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ও স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান জর্জ কারলিন (১৯৩৭-২০০৮) সেই ১৯৯২ সালে এক ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন, “আমরা আজকাল সবকিছু ‘বাঁচানো’ নিয়ে তৎপর। অরণ্য বাঁচাও, বৃক্ষরাজি বাঁচাও, বাঁচাও ভ্রমর আর প্রজাপতি, বাঁচাও শামুক, বাঁচাও ঝিনুক, বাঁচাও পুকুর, খাল ও নদী, বাঁচাও ব্যাঙ, বাঁচাও মাছ ও তিমি, বাঁচাও সিংহ, বাঘ, খেকশিয়াল ও শূকর, বাঁচাও পঙ্খী ইত্যাদি। সবকিছু বাঁচানোর জন্য আমরা অতীব উদগ্রীব। সবাই আজ ফ্যাশনেবল ‘সবুজবান্ধব অ্যাক্টিভিস্ট ও বিপ্লবী’। সবই মেনে নিলাম। কিন্তু আপনাদের সবচেয়ে দর্শনীয় স্টুপিডিটি হচ্ছে, ‘আমরা সমগ্র পৃথিবী গ্রহ বাঁচাবো’, তাও বলছেন, হোয়াট? কী সর্বনাশা কাণ্ড! কী ঔদ্ধত্য আপনাদের, কী দুঃসাহস এই মানবজাতির?
আরে থামেন জনাব। রসুন খেয়ে কয়েকটা হিসাবে বসুন। পৃথিবী গ্রহ আজ বেঁচে আছে ৪৫০০ বিলিয়ন বছর ধরে আপনাদের ‘আন্তরিক হস্তক্ষেপ’ ছাড়া। আর আমরা মানবপ্রাণী? খুব বেশি হলে ২ লক্ষ বছর হবে এই গ্রহে এসেছি; তাই তো? এত বিলিয়ন বছরে পৃথিবী বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন- খরা, বন্যা, ভূমিকম্প, সাগর এসে ভাসিয়ে ডুবিয়ে দিয়ে নতুন মাটি, মরুভূমি, দেশ, পাহাড়, বরফ সৃষ্টি করেছে, আগ্নেয়গিরি ফেটে তাণ্ডব ঘটিয়ে কোটি কোটি মানুষ মেরেছে। এই পৃথিবীতে ৯০ ভাগেরও বেশি প্রাণপ্রজাতি যা ছিল, তা আজ নেই।
অপরদিকে প্রতিদিন ২৫টা করে প্রাণপ্রজাতি অধুনালুপ্ত হচ্ছে। জি জনাব, গতকাল যে প্রাণপ্রজাতি আমাদের মাঝে ছিল, আজ তারা ফুশশশ! আর নেই। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। আপনারাসহ আজ যা কিছু আছে তা আগামীকাল থাকবে না, সব নাই হয়ে যাবে। প্রকৃতি তার নিজের সেলফ কারেক্টিং মেকানিজম দিয়ে সবই নিয়ন্ত্রণ করে। আর আপনি এসেছেন পৃথিবীকে, গ্রহকে বাঁচাতে? বুলশিট! এই পৃথিবী গ্রহ বাঁচানোর প্রয়াস হলো, ‘সাদা মানুষের প্রভুত্বে’ ভরপুর প্রকৃতিকে তার নিজের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করার আরেক হীন ষড়যন্ত্র।
আপনারা আবার ‘প্লাস্টিক’ নিয়ে মহাচিন্তিত? বাহ! কয়েকটা শপিং ব্যাগ, কফিকাপ, ড্রিংকিং স্ট্র, তরল পানীয় বোতল, বয়াম হাবিজাবি এসব প্লাস্টিকই বা এলো কোথা থেকে? আপনারাই তা সৃষ্টি করেছেন। ধরিত্রী মাতৃগর্ভ থেকে উত্তোলন করা জ্বালানি তেলের বর্জ্য দিয়ে। আর ধারণা করছেন তাতে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে; সাগরের মাছ, তিমি, প্রবাল প্রাচীর সব মরে শেষ হয়ে যাবে?
আরে জনাব, প্রকৃতি ও পৃথিবী গ্রহ ওই প্লাস্টিককেই কাজে লাগিয়ে বিশ্বজগতের মূল ভিত আরও শক্ত করবে। আপনাদেরই মতো পৃথিবী গ্রহ প্লাস্টিকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে বলে নতুন ‘প্লাস্তিকায়িত’ পৃথিবী সৃষ্টি করবে। ওসব পৃথিবী গ্রহ বাঁচানোর ফালতু চিন্তা বাদ দেন। নিজের চাকায় নিজে তেল দিন। মানবপ্রাণী কী করে বাঁচবে তা নিয়ে ভাবুন প্লিজ।” (ভাষণের বঙ্গানুবাদ: লেখক)
জর্জ কারলিন সেই একই ভাষণে করোনাভাইরাস কী করে ও কীভাবে মানবজাতির দুর্বল ইমিউন সিস্টেম ধ্বংস করে মানুষ মারবে তারও একটা স্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েছিলেন।
৮. তারপর কী?
এই সিরিজের লেখা শেষ করতে চাই একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে। যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, ২০৩০-এর পর সব জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত যানবাহন নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। বিকল্প যানবাহন সবই লিথিয়াম ব্যাটারি দিয়ে চলবে। ওই একই ব্যাটারি আমার-আপনার সেলফোন, অ্যান্ড্রয়েড, আইফোনকে ‘জীবিত’ রাখে। সমস্যা হলো, পৃথিবীতে চীন এই লিথিয়ামের সবচেয়ে বৃহৎ উত্তোলনকারী। তবে সমগ্র বিশ্বকে তা সরবরাহ করার ক্ষমতা দেশটির নেই। অন্তত আগামীর বিশ্বের সম্ভাব্য চাহিদা মেটানো যাবে না। দেখার বিষয় হলো, এরপর কী হবে এবং আমাদের ভাগ্যলিখনীতেই বা কী আছে।
এই মুহূর্তের পৃথিবীতে যেকোনও দেশের জন্য স্বর্ণ সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাংকের কঠোর নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি দেশের ধনসম্পদ, উন্নয়নের সূচক সবই নির্ধারিত হয় তার স্বর্ণের মজুত কতটা আছে, তা দিয়ে।
বাংলাদেশের পবিত্র মাটির তলায় স্বর্ণ আছে কী নেই, সবই দূরকল্পী অনুমান করা যেতে পারে এবং ‘শক্ত প্রমাণ’ রাষ্ট্রের কাছে গোপনে থাকলেও থাকতে পারে, আমাদের কাছে তা নেই। অদ্ভুত হলেও সত্য, কোনও দেশেরই স্বর্ণ দিয়ে বেচাকেনা করার অনুমতি নেই। সবই হতে হবে কাগুজে ডলার বা অন্য উন্নত দেশের মুদ্রায়।
কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার ধ্যানের অন্যতম প্রশ্ন থেকে যায়। ৫০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের মাটিতে যদি সত্যি সত্যি স্বর্ণ আবিষ্কার হয় ও স্বর্ণ যদি তেল ও জীবাশ্ম জ্বালানির মতো আজকের নিয়মে তার মূল্য হারিয়ে টিন বা অ্যালুমিনিয়ামের মতো নিম্নে নেমে ‘মূল্যহীন’ হয়ে যায়, তাহলে এই ‘সোনার বাংলা’ হয়েই বা আমাদের কী লাভ?
ফিরে আসা যাক আব্দুল লতিফের (১৯২৪-২০০৬) অবিস্মরণীয় বাণীতে:
‘সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা
সোনা নয় তত খাঁটি
বলো যত খাঁটি তার চেয়েও খাঁটি
বাংলাদেশের মাটি
আমার বাংলাদেশের মাটি’।
আমার চিন্তা করতে কোনও ভয় নেই, বাংলাদেশের পবিত্র মাটির তলায় স্বর্ণ তো দূরের কথা, লিথিয়ামের চেয়েও ‘খাঁটি’ প্রাকৃতিক উপাদান অবশ্যই আছে এবং তা অতি সম্প্রতি আবিষ্কার হওয়ারও ‘জোর সম্ভাবনা’ রয়েছে। আমাদের ভাগ্যে ‘স্বর্ণের চেয়েও খাঁটি’ ও বহু মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ ধরিত্রীর মাটির গর্ভে অপেক্ষা করছে, এই আশা করতে অন্তত আমাদের টাকা তো খরচ করতে হচ্ছে না! তাই বিশাল এই আশা ব্যক্ত করে আজ শেষ করছি। জয় বাংলা, জয় মাতৃভূমি, দীর্ঘজীবী হোক বাংলাদেশ।
লেখক: সংগীতশিল্পী




