বাংলা ট্রিবিউন সম্প্রতি শহর এবং গ্রামের ১৬০০ জন গৃহিণী, ১৬০০ জন কর্মজীবী নারী, আর ১৬০০ জন ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলে একটা জরিপ চালিয়েছে। ‘সবদিক বিবেচনা করে আপনি কি নিজেকে সুখী মনে করেন?’ - এই প্রশ্নের জবাবে কর্মজীবী নারীর চেয়ে গৃহিণীরাই বেশি না বলেছেন। ‘আপনার বিভিন্ন সমস্যায় পরিবারকে ভালোভাবে পাশে পান কি?’ এর উত্তরে গৃহিণীদের না’এর সংখ্যাটা অন্য সবার না’এর সংখ্যার চেয়ে বেশি। মানসিক আর শারীরিক নির্যাতনের শিকারও গৃহিণীরা্ বেশি। নিজের সম্পত্তি ভোগ করতে না পারার মধ্যে গৃহিণীদের সংখ্যাই বেশি। সম্পত্তিতে নিজস্ব মালিকানা গৃহিণীদের কম। স্বাধীনভাবে যেখানে খুশি যেতে পারা, পছন্দমতো পেশা বেছে নেওয়া- এসবে কর্মজীবী নারীদেরই যতটুকু স্বাধীনতা আছে, গৃহিণীদের ততটুকু নেই। নিজের সিদ্ধান্তে পরিবারের অর্থ নিজের জন্য ব্যয় করতে পারে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে বেশির ভাগ গৃহিণী বলেছেন না।
দেখে শুনে মনে হচ্ছে, সমাজ আগের চেয়ে অতি সামান্যই বদলেছে। গৃহিণীরা এখনও ‘সবার পিছে সবার নিচে সবহারাদের মাঝে’, তাই বলে কর্মজীবী নারীরা কিন্তু মাথার ওপর বসে নেই! হাল দু’পক্ষেরই করুণ। গৃহিণী আর কর্মজীবীদের নারীর জীবন যাপনে বিশাল কোনও একটা পার্থক্য নেই। কর্মজীবী নারীদের নিজের উপার্জনের টাকাটাও গুনে গুনে স্বামীর হাতে দিয়ে দিতে হয়। গৃহিণীর মতো কর্মজীবী নারীকেও কপর্দকশূন্য বসে থাকতে হয়। কেন খুব একটা পার্থক্য নেই গৃহিনী আর কর্মজীবী নারীদের সুখে দুঃখে? কারণ নারী কর্মজীবী হলেও, উপার্জন করলেও, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করলেও নারী পুরুষতন্ত্রের শেকলে বন্দি। পুরুষতন্ত্র সব নারীকে এক চোখেই দেখে। গরিব, ধনী, ছোট জাত, বড় জাত, গৃহিনী কর্মজীবী –পুরুষতন্ত্রের চোখে সবাই সমান। পুরুষতন্ত্র কাউকে রেয়াত করে না।
অর্থনৈতিকভাবে অনেক নারী আজ স্বাধীন হলেও সামাজিকভাবে এবং পারিবারিকভাবে আজও পরাধীন, আজও পুরুষের অধীন। পুরুষতন্ত্র বা পিতৃতন্ত্রের রাজত্ব যতদিন থাকবে, ততদিন নারীর সত্যিকার মুক্তি নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে, পাশ্চাত্যের দেশগুলোতেও তো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, তবে কেন আমাদের দেশের নারীর চেয়ে পাশ্চাত্যের নারীরা স্বাধীনতা বেশি ভোগ করে। সম্ভবত ভোগ করে এই জন্য যে, পাশ্চাত্যে নারীর শিক্ষা, স্বনির্ভরতা, সচেতনতা আমাদের চেয়েও অনেক বেশি। পাশ্চাত্যের সভ্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় যেসব নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেসব নির্যাতনকে আমাদের দেশে ‘ঐতিহ্য’ বলে সম্মান করা হয়। পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রগুলোকে ধর্ম থেকে আলাদা করা হয়েছে, আইনগুলোকে সব আধুনিক করা হয়েছে, নারীবিরোধী ধর্মীয় আইনের ছিটেঁফোটাও কোথাও নেই। আর, আমরা এখনও অন্ধকারে।
জরিপের রিপোর্ট বলছে প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের সুখী মনে করেন নারীরা। তা ঠিক। সুখ আসলে কাকে বলে, সুখ ঠিক কী রকম হতে পারে, সে সম্পর্কে অভিজ্ঞতা না থাকলে, যা পাচ্ছে তারা, তার মধ্য থেকেই সুখ খুঁজে নেয়। সুখ তো আপেক্ষিক। এক মহিলাকে আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম তিনি সুখে আছেন কি না। আমাকে বললো, প্রতিরাতে বাড়ি ফিরে স্বামী তাকে জুতো দিয়ে মারতো, এখন আর জুতো দিয়ে মারে না, হাত দিয়েই মারে, চড়, কিল, এসব। জুতোর মার যেহেতু তাকে খেতে হচ্ছে না আর, সেহেতু আগের চেয়ে সে সুখে আছে।
সম্পত্তির মালিকানা থেকে বঞ্চিত দেশের বেশিরভাগ নারী। কর্মজীবী নারীদের মালিকানা থাকলেও তা ভোগ করতে পারছে না শহরের নারীরা। আমিই তো এর একটি উদাহরণ। আমার বাবার সম্পত্তির খুব কমই আমার জন্য বরাদ্দ হয়েছে। যেটুকু বরাদ্দ হয়েছে, সেটুকু ভোগ করারও, আমি লক্ষ্য করছি, আমার কোনও অধিকার নেই। নারীর সমানাধিকারের জন্য জীবনভর আন্দোলন করার পরও আমাকেই যদি বঞ্চিত হতে হয়, তবে সাধারণ নারীরা কী ভীষণ বঞ্চিত হয়, তা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারি।
জরিপে আরও দেখছি বিয়ের সিদ্ধান্তে পুরুষের ভূমিকা মূখ্য এবং নারীর ভূমিকা নিতান্তই গৌণ। এখনও নারীকে পুরুষের হাতে ‘সম্প্রদান’ করা হয়। কোনও বস্তু দান করার মতো নারীকে দান করা হয়। নারীকে বিয়ে করে পুরুষ তার বাড়িতে নিয়ে যায়। নারীর নামের শেষে পুরুষের নাম জুড়ে দেয়। পুরুষের স্ত্রী হিসেবে নারী পরিচিত হয়। পুরুষতান্ত্রিক বিবাহ পদ্ধতিতে খুব স্বাভাবিকভাবেই নারীর ভূমিকা প্রায় কিছুই নেই, অথবা থাকলেও তা গৌণ।
অন্যান্য পেশার জন্য যোগ্য হলেও চলাচলের স্বাধীনতা নেই গৃহিণীদের। নেই কারণ গৃহিণীদের পায়ে একটি শেকল বাঁধা থাকে। বড় শক্ত শেকল। কর্মজীবী নারীর পায়েও শেকল থাকে তবে তাদের শেকলটা গৃহিণীদের শেকলের চেয়েও দৈর্ঘে বেশি। শেকলের অন্য প্রান্ত যারা ধরে থাকে, তারা কর্তা পুরুষ। তারাই তাদের ইচ্ছেমতো শেকলের দৈর্ঘ কমায় বাড়ায়। নারীর জন্য এখন সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, তা হলো পায়ের এই শেকলটাকে ছিঁড়ে ফেলা।
পায়ের শেকলটাকে ছিঁড়ে ফেললেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। মস্তিস্কে যেসব ঢুকে গেছে, সেসবও দূর করতে হবে। পুরুষই বড়, পুরুষই বোঝে, পুরুষই জানে, পুরুষই পারে, পুরুষই ঈশ্বর – নারী ক্ষুদ্র, তুচ্ছ, নারী অমঙ্গল, নারী জানে না, বোঝে না- এসব ভুল জিনিস সেই আদিকাল থেকে নারী-পুরুষ উভয়ের মস্তিস্কে ঠেসে দেওয়া হয়েছে। এসব জঞ্জাল সাফ করা চাই সবার আগে।



