বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কি ‘পুরুষদের ক্লাব’ হবে?

শাকিলা জেরিন
০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৩৭আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৫৯

একটি রাষ্ট্রের আয়নায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে তার রাজনীতি। আর সেই আয়নায় যদি বারবার একই মুখ, একই লিঙ্গ, একই ক্ষমতার কাঠামোই প্রতিফলিত হয়- তবে প্রশ্ন ওঠে, এই রাষ্ট্র কাদের? আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা আমাদের সামনে ঠিক সেই প্রশ্নটিই দাঁড় করিয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যা বিবিএস এর তথ্য অনুযায়ী ১৭ কোটি ২৯ লাখ, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের হিসেবে ১৭ কোটি ৫৭ লাখ আর নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ১৯ কোটি। মোট সংখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ভোটার তালিকাতেও নারী-পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান। অথচ সংসদের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রার্থীদের মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ নারী। এই বৈপরীত্য শুধু হতাশাজনক নয়, গভীরভাবে আশঙ্কাজনক।

 আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা আধুনিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের ওপর এক বড় আঘাত। ৩০০ সংসদীয় আসনে ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর মধ্যে পুরুষ প্রার্থী ১ হাজার ৭৭৭ জন ও নারী প্রার্থী মাত্র ৬৫ জন অর্থাৎ মাত্র ৩.৫৩ শতাংশ। যদিও যেসব নারীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, ইসির সিদ্ধান্তের বিপরীতে আপিল করে জয়ী হলে দুই-একজন যোগ হতে পারে, তবে তাতে কোনও বিশেষ পার্থক্য তৈরি হবে না। অন্যদিকে নির্বাচনের আগে কোনও নারী প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করার সম্ভাবনাও অবান্তর নয়। 

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনের মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০।

এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন ১ হাজার ২৩২ জন। দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হওয়ার পরও রাজনীতির মূল মঞ্চে তাদের এই নগণ্য উপস্থিতি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কঙ্কালসার চেহারাটিকেই উন্মোচিত করছে।

কেন নারী প্রার্থী নেই বললেই চলে? প্রশ্নটি কেবল ‘কেন নেই’ নয়, বরং ‘কেন রাখা হয়নি’। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের দুর্বল গণতন্ত্র, পুরুষনির্ভর মনোনয়ন প্রক্রিয়া, অর্থ ও পেশিশক্তির রাজনীতি নারীদের জন্য প্রায় অপ্রবেশযোগ্য করে তুলেছে। তার ওপর রয়েছে সামাজিক ধারণা- নারী ‘জেতার মতো শক্ত প্রার্থী নয়’। এই ধারণাই সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এটি রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়মুক্তি দেয়। অথচ একই দলগুলো সংরক্ষিত আসনে নারী দিয়ে নিজেদের প্রগতিশীলতার দাবি তোলে, কিন্তু সরাসরি ভোটের মাঠে জায়গা দিতে ভয় পায়। নির্বাচনে নারীদের এই অনুপস্থিতি কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং কাঠামোগত বাধার ফল। রাজনৈতিক দলগুলো মুখে নারী ক্ষমতায়নের বুলি আওড়ালেও মনোনয়ন দেওয়ার সময় এখনও ‘উইনেবিলিটি’ বা জেতার সক্ষমতার দোহাই দিয়ে পেশিশক্তি ও অর্থবিত্তের অধিকারী পুরুষদের প্রাধান্য দিচ্ছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের পরে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, ভাঙা কাঠামো বদলে নতুন পথচলার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই নতুন পথে নারীরা নেই বা রাখা হয়নি। সংস্কার কমিশন, জুলাই সনদ, রাজনৈতিক সমঝোতা- সব জায়গাতেই নারীর অংশগ্রহণ ছিল প্রান্তিক, কখনও একেবারেই অনুপস্থিত। আর রাজনৈতিক দল? সেখানেও দেখা যাচ্ছে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব ও নারীবান্ধব নীতির তীব্র ঘাটতি। বছর পাল্টেছে, সরকার পাল্টেছে কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের সেই প্রতিশ্রুতি আজ কোথায়?

অথচ জুলাই বিপ্লবের রাজপথে নারীরা ছিলেন অদম্য। কাঁদানে গ্যাস, বুলেট আর লাঠিপেটা উপেক্ষা করে যে নারীরা আন্দোলনে শামিল হলেন, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাদের ব্রাত্য করে রাখা হচ্ছে। মূল ধারার রাজনীতিতে নারীদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা এক প্রকার ‘ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা’। অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে নারীদের এই বঞ্চনা তারই প্রমাণ। নতুন বাংলাদেশ যদি পুরোনো পুরুষতান্ত্রিক ছকে আঁকা হয়, তবে বলতে হয় সেই নতুনত্ব কেবল শব্দেই সীমাবদ্ধ এবং নারীদের কেবল ব্যবহার করা হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বার্থ আদায়ের জন্য।

নারীর অনুপস্থিতি কোনও সংখ্যাগত সমস্যা নয়, এটি দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের জায়গা নয়, এটি সমাজের স্বপ্ন, চাহিদা ও বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সেখানে নারীর কণ্ঠ অনুপস্থিত মানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রম, নিরাপত্তা, পরিবার, কর্মক্ষেত্র—সবখানেই একচোখা সিদ্ধান্ত। যে সংসদ নারীর অভিজ্ঞতা জানে না, সে সংসদ রাষ্ট্রের অর্ধেক বাস্তবতাকেই অস্বীকার করে। দীর্ঘমেয়াদে এই অস্বীকার রাষ্ট্রকে নিয়ে যাবে অসমতা, সামাজিক অস্থিরতা ও নীতিগত দুর্বলতার দিকে।

ইসির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিএনপি থেকে নয় জন, জাতীয় পার্টি থেকে পাঁচ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে তিন, গণঅধিকার পরিষদ থেকে দুই, গণসংহতি আন্দোলন থেকে চার, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ থেকে তিন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ মার্ক্সবাদী) থেকে আট, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি থেকে ছয়, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে ছয় ও গণফোরাম থেকে দুই জন নারী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধতা ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমানে প্রধান ও আলোচিত কয়েকটি দলের চিত্র এটি।

এছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), নাগরিক ঐক্যসহ কয়েকটি দলে একজন করে নারী প্রার্থী রয়েছেন। এবং সারা দেশে ৭ জন স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী বৈধতা পেয়েছেন।

অন্যদিকে অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ইসলামী দলগুলোর কর্মকাণ্ড ছিল চোখে পড়ার মতো। নারী ইস্যুতে বিভিন্ন সময় তাদের বক্তব্যও ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। সরকার গঠন করলে নারীদের কল্যাণে অনেক ইসলামী দল নারীদের কর্মঘণ্টা কমানো, বিশেষভাবে সম্মানিত করার প্রচারণাও চালিয়েছিল। অথচ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টসহ অন্য দলগুলোর প্রার্থী তালিকা নারীশূন্য। ইসলামী দলগুলোর কোনও নারী প্রার্থী না দেওয়া একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। সেই বার্তা হলো- নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনও গ্রহণযোগ্য নয়। এটি শুধু নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্ন নয়, এটি ধর্মের ব্যাখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক অধিকার সঙ্কুচিত করার প্রবণতার ইঙ্গিত। এই বার্তা সমাজে আরও গভীরভাবে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দরজা আরও সংকীর্ণ করে দেয়। জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা দলগুলো যখন নারী শাখা দিয়ে কেবল ‘ঘরোয়া বৈঠক’ বা ‘তালিম’-এর মাধ্যমে ভোট গোছানোর কৌশল নেয়, তখন তা নারীর রাজনৈতিক অধিকারকে সীমাবদ্ধ করার ইঙ্গিত দেয়। ধর্মীয় ব্যাখ্যার দোহাই দিয়ে রাজনীতির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নারীদের দূরে রাখা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত।

যদিও প্রতিটি দল থেকে সাধারণ আসনে প্রতিযোগিতার জন্য ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার ব্যাপারে দলগুলো একমত হয়েছিল। কিন্তু আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী রাজনৈতিক দল ৫১টি যার মধ্যে ৩০টি দলই নারী প্রার্থী বর্জিত। শুধু ইসলামী দলগুলো নয় ৫ শতাংশ নারী প্রার্থীর বিষয়টি ডান, বাম, মধ্যপন্থি কোনও দলই রক্ষা করেনি। নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া প্রমাণ করে তারা রাজনৈতিক অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেনি। তারা কেবল নারীদের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবেই দেখতে আগ্রহী, ‘নেতৃত্ব’ হিসেবে নয়। যা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করে।

এখন প্রশ্ন আসে সাড়ে তিন শতাংশে সংসদে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? ৭২ জন নারী প্রার্থী, তারও অনেকেই ছোট দল বা স্বতন্ত্র। বাস্তবতা হলো এই সংখ্যায় সংসদে নারীর উপস্থিতি হয়তো এক অংকেই আটকে থাকবে। অর্থাৎ একটি প্রায় নারীশূন্য সংসদ। সংরক্ষিত আসনের ওপর নির্ভরশীল প্রতিনিধিত্ব আবারও নারীদের রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করবে, কারণ সেটি সরাসরি জনগণের ভোটে অর্জিত ক্ষমতা নয়।

নারীশূন্য সংসদ বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাবে? প্রায় নারী শূন্য বা এক অঙ্কের নারী সংসদ সদস্য নিয়ে গঠিতব্য সংসদ হবে কার্যত ‘পুরুষদের ক্লাব’। যা বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে একটি অসম রাষ্ট্রের দিকে। যেখানে অর্ধেক জনসংখ্যার দুঃখ-দুর্দশা, অধিকার এবং চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলার মতো পর্যাপ্ত কণ্ঠস্বর থাকবে না। একটি নারীশূন্য বা নামমাত্র নারী প্রতিনিধিত্বের সংসদ বাংলাদেশকে একপাক্ষিক ও রক্ষণশীল নীতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। যেখানে সিদ্ধান্ত হবে একপাক্ষিক, নীতি হবে একমাত্রিক, আর উন্নয়ন হবে অসম বণ্টনের। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের মালিকানা থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকার ভঙ্গ নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে বড় বাধা।

গণতন্ত্র কেবল ভোটের উৎসব নয়, এটি প্রতিনিধিত্বের নৈতিক চুক্তি। সেই চুক্তিতে নারীর নাম না থাকলে রাষ্ট্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আসন্ন নির্বাচন আমাদের সামনে এক কঠিন সত্য তুলে ধরেছে- রাজনৈতিক দলগুলো এখনও নারীদের সমান নাগরিক, সমান নেতৃত্ব হিসেবে দেখতে প্রস্তুত নয়। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নকে যদি সত্যিই বাস্তবতায় রূপান্তরিত করতে হয়, তবে সেই স্বপ্নে নারীর মুখ, কণ্ঠ ও নেতৃত্ব স্পষ্টভাবে থাকতে হবে। নইলে এই সংসদ হবে সংখ্যায় পূর্ণ, কিন্তু গণতন্ত্রে অপূর্ণ। আর ‘বৈষম্যবিরোধী’ বাংলাদেশের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

 

লেখক: সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
৩৭ বছর ধরে স্কুলে পড়ানো শিক্ষক বাড়ি ফিরলেন ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে
৩৭ বছর ধরে স্কুলে পড়ানো শিক্ষক বাড়ি ফিরলেন ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে
‘ডার্ক ম্যাটার’ কণা অনুসন্ধানে ট্র্যাকার আবিষ্কার 
‘ডার্ক ম্যাটার’ কণা অনুসন্ধানে ট্র্যাকার আবিষ্কার 
যার বিরুদ্ধে মামলা করতে ভয় পায় মানুষ, তাকেই গ্রেফতার করলো র‍্যাব
যার বিরুদ্ধে মামলা করতে ভয় পায় মানুষ, তাকেই গ্রেফতার করলো র‍্যাব
শুরুতে পিছিয়ে পড়েও চেলসিকে হারালো আর্সেনাল
শুরুতে পিছিয়ে পড়েও চেলসিকে হারালো আর্সেনাল
সর্বশেষসর্বাধিক