একটি উন্নত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো জনস্বাস্থ্যের টেকসই উন্নয়ন। বর্তমানে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল যখন সরগরম, তখন অত্যন্ত মৌলিক একটি বিষয়—নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (WASH)— নির্বাচনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসা অপরিহার্য ছিল।
সম্প্রতি ‘নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কস’ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তাদের ৮ দফা সংবলিত একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছে। ২০২৫ সালের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (MICS) অনুযায়ী, দেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ বেসিক স্যানিটেশনের আওতায় এলেও গুণগত মান, টেকসই ব্যবস্থাপনা ও বৈষম্যহীন প্রাপ্যতা এখনও একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও মানবিক পুনর্গঠনের একটি রূপরেখা। সরাসরি ‘ওয়াশ’ শব্দটির কারিগরি ব্যবহার এখানে কম হলেও, এর সংস্কার প্রস্তাবগুলো পানি ও স্যানিটেশন অধিকার নিশ্চিত করতে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে।
সনদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার কথা (পয়েন্ট ১৮ ও ১৯) বলা হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE) বা ওয়াসার মতো সংস্থাগুলোর মাঠ পর্যায়ের কাজ যদি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অধীনে থাকে, তবে বরাদ্দ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা আসবে।
গবেষণায় দেখা যায়, ‘বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারের অংশগ্রহণ পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে’ (World Bank, 2021)। সনদে মৌলিক অধিকারের তালিকা সংশোধন ও সম্প্রসারণের কথা ((পয়েন্ট ৯) বলা হয়েছে। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে যদি সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে এটি রাষ্ট্রের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে।
নেটওয়ার্কের অন্যতম দাবি ছিল জাতীয় বাজেটে ওয়াশ খাতে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং ভৌগোলিক বৈষম্য কমাতে একটি ‘WASH Equity Index’ তৈরি করা। বিএনপি তাদের ইশতেহারে বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য উন্নত পানি ও স্যানিটেশনের কথা বলেছে। এবি পার্টি প্রান্তিক পর্যায়ে সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
তবে জুলাই সনদের মূল সুর —বৈষম্যহীন সাম্য— অনুসরণ করে কোনও দলই সুনির্দিষ্ট ‘ইক্যুইটি ইনডেক্স’ বা বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন জিডিপির ১ শতাংশ) ওয়াশ খাতের জন্য বরাদ্দের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। অথচ এসডিজি ৬ অর্জনে বাংলাদেশের জন্য বর্ধিত বিনিয়োগ অপরিহার্য।
নেটওয়ার্ক আর্সেনিক, লবণাক্ততা ও বন্যারোধী টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের আহ্বান জানানো হয়েছিল। সনদে (পয়েন্ট ৬.১) জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ শব্দবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত করেছে। জামায়াতে ইসলামী উপকূলীয় অঞ্চলে লোনা পানি প্রবেশ রোধে শক্তিশালী টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিএনপি ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের কথা বলেছে, যা ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করবে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বরেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পৃষ্ঠস্থ পানি সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে। এটি ‘ওয়াটার স্ট্রেস’ মোকাবিলায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
নেটওয়ার্কের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে নারী ও কিশোরীদের জন্য বিনামূল্যে ও মানসম্মত মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী নিশ্চিত করা। বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রধান দলগুলোর ইশতেহারে এই বিষয়টি প্রায় অনুপস্থিত। মাসিক স্বাস্থ্যবিধি কেবল একটি নারী স্বাস্থ্য ইস্যু নয়, এটি কিশোরীদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে প্রায় ৪১ শতাংশ কিশোরী মাসিকের সময় স্কুলে অনুপস্থিত থাকে (World Bank, 2018)। এই ‘পিরিয়ড পভার্টি’ নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা হতাশাজনক।
নেটওয়ার্ক ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছিল। বিএনপি ‘সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ প্রবর্তন এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও সার উৎপাদনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সিপিবি শহরগুলোকে পরিচ্ছন্ন ও বসবাসযোগ্য করতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সকল শিল্পকারখানায় ইটিপিস্থাপন বাধ্যতামূলক করার অঙ্গীকার করেছে। এটি জলাশয়ের দূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়াশ খাতে বিনিয়োগ একটি উচ্চফলনশীল পদক্ষেপ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ওয়াশ পরিষেবাগুলিতে বিনিয়োগকৃত প্রতি ১ ডলারের বিপরীতে স্বাস্থ্য খরচ হ্রাস এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ৪.৩ ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক লাভ ফিরে আসে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে এই অর্থনৈতিক লাভজনক দিকটি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা ওয়াশকে কেবল একটি ‘সামাজিক সেবা’ হিসেবে দেখেছে, যা আদতে একটি ‘অর্থনৈতিক বিনিয়োগ’।
জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর মূল চেতনা হলো বৈষম্যহীনতা। বাংলাদেশে বর্তমানে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার বিশাল ফারাক বিদ্যমান। জুলাই সনদের ৯ নম্বর পয়েন্টের আলোকে যদি ‘নিরাপদ পানির অধিকার’ মৌলিক অধিকারে উন্নীত হয়, যা ইতোমধ্যেই হাইকোর্ট বিভাগ নিশ্চিত করেছে, তবে রাষ্ট্র এই বৈষম্য দূর করতে বাধ্য থাকবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার ও জুলাই সনদের এই তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, দলগুলো ভৌত অবকাঠামো (নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ) নিয়ে যতটা সচেতন, গুণগত মান ও জেন্ডার সংবেদনশীলতা (মাসিক স্বাস্থ্যবিধি, ইক্যুইটি ইনডেক্স) নিয়ে ততটাই উদাসীন।
জুলাই সনদের সংস্কার অনুযায়ী স্থানীয় সরকারকে ওয়াশ বাজেটের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দিতে হবে। পিরিয়ড পভার্টি দূর করতে করছাড় ও বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসামগ্রী বিতরণের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে। জলবায়ু অর্থায়নের একটি বড় অংশ উপকূলীয় ওয়াশ অবকাঠামোতে বরাদ্দ করতে হবে।
নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (WASH) সবার মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করা হবে এবং শহর–গ্রাম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে বলে কথা দিয়েছে এনসিপি তাদের ইশতেহারে। তারা আরও বলেছে যে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য জেন্ডার–সংবেদনশীল WASH ও মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সুবিধা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হবে।
আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের উচিত হবে জুলাই সনদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রার্থীদের প্রশ্ন করা—আপনার উন্নয়ন পরিকল্পনায় আমার নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা কোথায়? রাজনৈতিক অঙ্গীকার যখন কেবল কাগজের ইশতেহার থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখনই কেবল আমরা একটি প্রকৃত ‘মানবিক রাষ্ট্র’ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো।
লেখক: আইনজীবী এবং উন্নয়নকর্মী




