হাওরের কৃষকের মনে এখনও ২০১৭ সালের অকাল বন্যায় ফসলহানীর দগদগে স্মৃতি। সে বছর মার্চের শেষদিকে পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে একে একে তলিয়ে গিয়েছিল তাদের কৃষকদের স্বপ্নের ফসল। এর মাঝে এবছর মার্চ মাসের মাঝামাঝিতেই নেমেছে ভারী বর্ষণ। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে এবং শিলা বৃষ্টিতে অনেক হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাবমতে গত কয়েক দিনের শিলাবৃষ্টিতে ৩৭০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, আগামী একসপ্তাহ সুনামগঞ্জে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। এতে নদ-নদীর পানি বাড়বে। এরই মাঝে মুসলিম উম্মাহর কাছে আনন্দের বারতা নিয়ে এসেছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। কিন্তু ঈদের এই আনন্দ হাওরের কৃষকরা কতটুকু উপভোগ করতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। নিজেদের একমাত্র উপার্জনের পথ এক ফসলি বোরো জমির ফসল যখন গোলায় তুলতে পারবে কিনা— এই শঙ্কা রয়েছে তখন ঈদের আনন্দ তাদের কাছে হয়তো ফিকে হয়ে যাবে।
সারা দেশের মোট উৎপাদিত বোরো ধানের ৩০ ভাগই আসে হাওর থেকে। এসব ফসল রক্ষায় সরকার ফসল রক্ষা বাঁধ দিয়ে থাকে। এবছর সুনামগঞ্জ জেলায় দুই লাখ ২৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হেয়েছে। এই ফসল রক্ষার জন্য ১৪৫ কোটি টাকা খরচ করে দেয়া হচ্ছে ৬০২ কিলোমিটার ডুবন্ত বাঁধ। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এর মাধ্যমে সরকারি খরচে কৃষকরা দিচ্ছেন এসব বাঁধ। কিন্তু এই বিশাল পরিমাণ অর্থ খরচ করে বাঁধ দেওয়ার পরও ফসল হারানোর শঙ্কা কৃষকদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ফসলের চিন্তায় তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার ২০ দিন পরেও এখনও শতভাগ বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। অনেক জায়গায় দুর্বল বাঁধ হয়েছে। সেসব বাঁধে এখনই ফাটল দেখা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে গেল কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ এবং শিলা বৃষ্টিতে ফসলের অনেক ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতচিহ্ন বুকে ধারণ করছে বিভিন্ন হাওর। তাই হাওরের কৃষকদের জন্য এবারের ঈদ যেন শঙ্কার ঈদ।
গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিতে জেলার তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, সদর উপজেলার জোয়ালভাঙা হাওর ও কানলার হাওর, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওর, শান্তিগঞ্জ উপজেলার খাই হাওর ও পাখিমারা হাওর, জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওর, শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে কমবেশি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পানিতে নিমজ্জিত আছে শত শত একর জমির ফসল।
মার্চের মাঝামাঝি ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা সত্যি আশঙ্কার বিষয়। এখনও ধান গাছে থোড় (চাল) আসেনি। ধান গাছ কাঁচা রয়েছে। কয়েকদিন পানিতে নিমজ্জিত থাকলে পঁচে যাবে ধান গাছ। বাকি সময় যদি আরও বৃষ্টিপাত হয়— তবে পানির চাপ বাড়বে। পানির রিজার্ভার যদি ভরা থাকে, তাহলে পরবর্তী বৃষ্টিতে আসা পানি কোথায় যাবে? তার সঙ্গে দুর্বল বাঁধ হাওরের ফসল কতটুকু রক্ষা করতে পারবে, সে চিন্তার ভাঁজ ও আছে কৃষকের কপালে।
কেন সময়মতো বাঁধ হয়নি?
এ বছর বাঁধের কাজ অনেক দেরিতে শুরু হয়েছে। পিআইসি গঠন হয়েছে অনেক দেরিতে। পিআইসি-তে রাজনৈতিক প্রভাব ও ভাগ বাটোয়ারার হিসাব মিলাতেই এই দেরি হয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। অনেক হাওরের পানিও দেরিতে নেমেছে। অপরদিকে এবছর ছিল নির্বাচনের বছর। নির্বাচনের কারণে স্থানীয় প্রশাসন বাঁধের দিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। পিআইসিদের অর্থ ছাড় দিতে অনেক বিলম্ব হয়েছে। সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও অর্ধেক টাকাও পায়নি বাঁধের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষকরা। কৃষকদের দিয়ে বাঁধ দেওয়ার কথা বলবেন, আর কৃষকদের টাকা দেবেন না, তা তো হয় না। কৃষকরা তো পূঁজিপতি নয় যে, তারা নিজেদের জমানো টাকায় বাঁধ করবে।
দেরিতে বাঁধ হওয়ার দায় পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং উপজেলা ও জেলা প্রশাসন এড়াতে পারে না। সর্বোপরি বাঁধের দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দায় রয়েছে।
এই মুহূর্তে করণীয় কী?
এই মুহূর্তে সবার আগে বিশেষ ব্যবস্থায় যেসব হাওরের জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, দ্রুত সেসব হাওরের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। কিছু জায়গায় মাটি কেটে পানি বের করার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তবে এতে হিতে যাতে বিপরিত না হয়, তাও খেয়াল রাখতে হবে। কিছু জায়গায় মেশিনের মাধ্যমে পাম্প আউট করে পানি বের করা যেতে পারে।
যেসব বাঁধের কাজ এখনও শেষ হয়নি, সেসব বাঁধের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনও গড়িমসি করা যাবে না। বাঁধের সামান্য কয়েকফুট জায়গা অরক্ষিত থাকলে, সেদিকে পানি ঢুকেই তলিয়ে যেতে পারে সমস্ত হাওর। তাই বাঁধে শতভাগ কাজ না হওয়ার অর্থ হলো— কোনেও কাজই হয়নি।
হাওরের জলকপাটগুলো ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না। এগুলো ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা করতে হবে। জামালগঞ্জের হালির হাওরে জলকপাটের ডালা বন্ধ না করার কারণে পানি ঢুকেছে। এটি হাওরের ফসল রক্ষা কার্যক্রমে চরম অবহেলার নজির।
দীর্ঘ মেয়াদে করণীয়
বাঁধ কোনও স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। বাঁধের বিকল্প হিসেবে ব্যাপকভিত্তিতে নদী খনন করতে হবে। শুধুমাত্র হাওরের নদী খনন করলে হবে না, পুরো হাওর অববাহিকার নদীর পাশাপাশি মেঘনা অববাহিকার যে দিক দিয়ে হাওরের পানি যায়, সেখানেও নদী খনন করতে হবে।
হাওরের উপযোগী স্বল্প জীবনের এবং পানি সহনীয় ধান আবিষ্কারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ইতোমধ্যে কিছু ধান আবিষ্কার হয়েছে। কিন্তু সেটি কৃষক পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। ধান শুধু আবিষ্কার করলেই হবে না, ধান যাতে কৃষক পর্যন্ত পৌঁছায় সেজন্য প্রয়োজনীয় প্রচার-প্রচারণা করা এবং বীজকে সহজলভ্য করা জরুরি।
হাওরে অনেক অপ্রয়োজনীয় বাঁধ হচ্ছে। আবার যেসব জায়গায় বাঁধ হওয়ার কথা সেসব জায়গায় বাঁধ হচ্ছে না। অপ্রয়োজনীয় বাঁধ হাওরের প্রতিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এতে জলাবদ্ধতা সৃষ্ঠি হয়ে ফসলের ক্ষতি হয়্। জোয়াল ভাঙা হাওরসহ বেশ কয়টি হাওরে বাঁধের কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এ বছরই বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এসব অপ্রয়োজনীয় বাঁধের তালিকা করা হোক। কোথায় বাঁধ করা দরকার হয়নি এবং কোথায় প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু বাঁধ হয়নি— তার একটি তালিকা প্রতিবেদন আকারে জেলা প্রশাসন সংরক্ষণ করুক। আগামীতে যারা বাঁধের দায়িত্বে থাকবেন, তারা সেটি দেখে যেন ব্যবস্থা নিতে পারেন।
এখনই অনেক বাঁধের জন্য মাটি পাওয়া যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে এ সংকট আরও বাড়বে। অপরদিকে বাঁধের মাটি আবার পানিতে ধুয়ে নদীতে পড়ছে। এতে নদীর নাব্যতা কমছে। তাই হাওরের ফসল রক্ষায় বাঁধের বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে। এজন্য বিস্তর গবেষণা দরকার।
হাওরের জমিগুলো এক ফসলি জমি। এসব জমির ফসল হারালে কৃষকদের যেন সর্বস্ব চলে যায়। তাই হাওরের ফসল রক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। ফসল রক্ষার জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০১৭ সালের মতো ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তখন হাওরবাসীর দুর্ভোগের সীমা থাকবে না। এর প্রভাব পড়বে দেশের চালের বাজারে। বিশ্ব পরিস্থিতি যখন অস্থিতিশীলতা আর অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন এই ধকল সামলানো আমাদের দায় হবে। হাওরের ফসলহানী হলে এই ক্ষতিকে সংখ্যা দিয়ে বিবেচনা করলে চলে না। এর প্রভাব অনেক গভীর হয়। সবাই হাওর বাসীর পাশের পাশে দাঁড়ান। দোয়া করুন। হাওরের ফসল রক্ষায় আওয়াজ তুলুন। হাওরবাসীকে নিঃশঙ্ক চিত্তে ঈদ উদযাপনের সুযোগ করে দিন।
কাসমির রেজা, সভাপতি, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা




