ঈদের আনন্দ ও অর্থনীতির সম্পর্ক

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক 
২০ মার্চ ২০২৬, ২০:০০আপডেট : ২১ মার্চ ২০২৬, ১২:০৯

ঈদের দিন সকালবেলা মাঠের দিকে যখন মানুষের ঢল নামে, তখন পোশাকে ভিন্নতা থাকলেও মানুষের মুখে একটাই ভাষা, আনন্দের ভাষা। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শহুরে-গ্রামীণ সবাই সেদিন একই কাতারে দাঁড়ায়। নামাজ শেষ হলে কোলাকুলির যে মুহূর্তটা আসে, সেখানে কোনও পরিচয় লাগে না, কোনও পদবি কাজে আসে না। যে মানুষটি সকালে বাজার করতে পারেননি, তিনিও সেই মুহূর্তে একটু হাসি বিনিময় করেন, একটু উষ্ণতার ভাগ পান। বাংলাদেশের মতো বৈষম্যপীড়িত একটি দেশে, যেখানে সামাজিক দূরত্ব প্রতিদিনকার বাস্তবতা, সেখানে এই একটি উৎসব পারে যা আর কিছু পারে না, হাজার পার্থক্য ভুলিয়ে দিয়ে মানুষকে এক করতে। শুধু একটি দিনের জন্য হলেও এই মিলনটা কম কিছু নয়।

কিন্তু ঈদ শুধু আধ্যাত্মিক মিলনের উৎসব নয়। এর ভেতরে একটি বিশাল অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হচ্ছে, যেটার শব্দ আমরা সবসময় শুনি না। যে ভালোবাসার কথা বলছিলাম— সেই ভালোবাসার পেছনেও একটি বিশাল লেনদেনের চাকা ঘুরছে, চুপ করে, নিরলসভাবে। এবার সেই স্পন্দনের মাত্রাটা আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর হিসাব বলছে, চলতি বছর ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার তিন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই লেনদেন ছিল দুই থেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার মধ্যে। একটু থামা দরকার এখানে। তিন লাখ কোটি টাকা মানে কী? এই সংখ্যাটা বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের একটি বিশাল অংশের সমতুল্য। একটি উৎসব যখন একটি জাতির বার্ষিক বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশের সমান লেনদেন তৈরি করে, তখন তাকে নিছক উৎসব বলা যায় না, এটা একটি অর্থনৈতিক শক্তি, একটি জীবন্ত ইঞ্জিন।

তাহলে এই শক্তির সবচেয়ে বড় চালিকা কোথায়? পোশাক খাতের দিকে তাকালে উত্তরটা মেলে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুই হাজারেরও বেশি কারখানায় এবার ৯৮ শতাংশ শ্রমিক ঈদের আগেই বেতন ও উৎসব বোনাস পেয়েছেন। এটা ছোট্ট একটা তথ্য মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনের বাস্তবতাটা বিশাল। লাখ লাখ শ্রমিকের হাতে একসঙ্গে যখন অর্থ আসে, সেই অর্থ গ্রামে পাঠানো হয়, বাজারে খরচ হয়, ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ হয়। নরসিংদীর এক শ্রমিক যখন বোনাসের টাকায় মায়ের জন্য একটি শাড়ি কেনেন, সেই লেনদেনে একজন কাপড় ব্যবসায়ী বাঁচেন, একজন পরিবহন শ্রমিক আয় করেন, গ্রামের দোকানদার সচল থাকেন। এই প্রবাহটাই তলা থেকে অর্থনীতিকে চাঙা রাখে। অর্থনীতির বই যে মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্টের কথা বলে, ঈদের শ্রমিক বোনাস তার সবচেয়ে জীবন্ত উদাহরণ।

প্রবাসীরা কি পিছিয়ে আছেন? মোটেই না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মার্চের মাত্র প্রথম দুই সপ্তাহে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২২০ কোটি ডলারের বেশি, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে মালয়েশিয়া, ইউরোপ থেকে আমেরিকা, যেখানেই বাংলাদেশি আছেন, ঈদের আগে তারা বাড়তি কষ্ট করে টাকা পাঠান। দূরে থাকার যে কষ্ট, সেই কষ্টকে তারা ভালোবাসায় রূপান্তরিত করেন টাকার খামে। এই অর্থের বড় অংশ গ্রামে গিয়ে পড়ে এবং গ্রামীণ বাজারে তখন একটা অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়। কুষ্টিয়ার কোনও একটি হাটে সে সপ্তাহে বেচাকেনা দ্বিগুণ হয়, কারণ একটি গ্রামের কয়েকজন প্রবাসী একসঙ্গে টাকা পাঠিয়েছেন।

শুধু কি পোশাক আর রেমিট্যান্স? ঈদের অর্থনীতি আরও গভীরে প্রোথিত। যাকাত ও ফিতরা বাবদ লেনদেন হয় প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরেও অনানুষ্ঠানিকভাবে আরও বিশাল পরিমাণ অর্থ গরিবের হাতে যায়, যার কোনও হিসাব রাষ্ট্রের খাতায় ওঠে না। খাদ্যপণ্যের বাজার থেকে শুরু করে যানবাহন, প্রসাধনী, মিষ্টি, জুতা, আসবাবপত্র, প্রযুক্তিপণ্য, অনলাইন শপিং সব কিছুতেই ঈদের আগের সপ্তাহগুলোতে লেনদেন বহুগুণ বেড়ে যায়। ইকমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো জানাচ্ছে, ঈদের আগের তিন সপ্তাহে তাদের বার্ষিক বিক্রির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয়। এর মানে হলো, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সারা বছর যা বিক্রি করে, তার তিন ভাগের এক ভাগ মাত্র তিন সপ্তাহে বিক্রি করে ফেলে। এই তথ্যটা ঈদের অর্থনৈতিক শক্তির গভীরতাটা বোঝার জন্য যথেষ্ট।

ঈদের অর্থনীতির একটি বড় অধ্যায় লেখা হয় রাস্তায় এবং টার্মিনালে। ঈদের আগের সপ্তাহে বাংলাদেশের পরিবহন খাত রীতিমতো যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলে। বাস, ট্রেন, লঞ্চ, বিমান, প্রতিটি যানবাহনে আগাম টিকিট শেষ হয়ে যায় দিনের মধ্যে। কোটি মানুষের এই গ্রামে ফেরার স্রোত শুধু ভাবাবেগের বিষয় নয়, এটি বিশাল একটি অর্থনৈতিক চলাচল। জ্বালানি তেল, চালকের মজুরি, যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ, রাস্তার পাশের খাবার দোকান, এই পুরো শৃঙ্খলটাই ঈদের মৌসুমে তার সর্বোচ্চ আয় করে। শুধু ঢাকা থেকে নয়, প্রতিটি শহর, প্রতিটি মফস্বল থেকে একটা বিপুল জনস্রোত গ্রামের দিকে হাঁটে, এবং সেই হাঁটার প্রতিটি পদক্ষেপে কোথাও না কোথাও একটি অর্থনৈতিক সুতো টান খায়।

তাহলে কি ঈদ এখন শুধুই একটি বাণিজ্যিক উৎসবে পরিণত হয়েছে? এই প্রশ্নটা মাথায় এলে একটু থামতে হয়। না, পুরোটা সেরকম নয়। বাণিজ্যের এই রমরমার নিচে এখনো সেই পুরোনো সামাজিক মূল্যবোধটা অটুট আছে। মানুষ এখনও ঈদে বাড়ি ফেরে, মায়ের পাশে বসতে চায়, পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে একটা দুপুর কাটাতে চায়। গ্রামে এখনও প্রতিবেশীর বাড়িতে সেমাই দিয়ে আসার রেওয়াজ আছে। সেই সেমাইয়ের বাটিতে শুধু মিষ্টি নেই, আছে দশকের পুরনো সম্পর্কের ভার, আছে একটু খোঁজখবর নেওয়ার সদিচ্ছা। শহরের ফ্ল্যাটবাড়িতে এটা হয়তো একটু কমেছে, কিন্তু বিলুপ্ত হয়নি। বরং কেউ কেউ বলেন, ডিজিটাল যুগের একাকিত্বের ক্লান্তি মানুষকে আবার এই পুরনো সামাজিকতার দিকে টানছে। ঈদ সেই টানের সবচেয়ে স্বাভাবিক উপলক্ষ।

যেটা উদ্বেগের বিষয়, সেটা হলো ঈদের আনন্দ ক্রমেই অসমভাবে বিতরণ হচ্ছে। শহরের মধ্যবিত্ত পরিবার যখন কয়েক হাজার টাকার পোশাক কেনে, তখন কাছের বস্তিতে একজন দিনমজুরের ছেলে হয়তো নতুন একটি জামার জন্য অপেক্ষা করছে। এই দৃশ্যটা নতুন নয়, কিন্তু বছর বছর এই বৈষম্যের রেখা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ঈদের সময় শহর থেকে গ্রামে অর্থের প্রবাহ ঘটে ঠিকই, কিন্তু সেই প্রবাহ সমাজের সবচেয়ে নিচের স্তর পর্যন্ত সবসময় পৌঁছায় না। রেমিট্যান্সের টাকা আসে, কিন্তু সেই টাকার বড় অংশ যায় ভোক্তা পণ্যে, বাড়ির সংস্কারে, মোবাইলে। দরিদ্রতম মানুষটির কাছে সেই টাকার সরাসরি প্রবাহ খুব কম। এই বিভাজনটা ঈদের মূল চেতনাকে চ্যালেঞ্জ করে। ইসলামের মূল দর্শনে ঈদ হওয়ার কথা সাম্যের উৎসব, যেখানে ধনী তার সম্পদের একটা অংশ গরিবের হাতে তুলে দেবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই দর্শনের প্রয়োগ যত দিন যাচ্ছে, ততই ক্ষীণ হচ্ছে।

নীতিনির্ধারকদের কাছে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ লুকিয়ে আছে। ঈদকেন্দ্রিক এই বিশাল অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার না করলে তা সাময়িক ফানুসের মতো উঠে আবার নেমে যাবে, আলো দেবে কিন্তু উষ্ণতা রেখে যাবে না। সরকার যদি যাকাত ও ফিতরার অর্থ সংগ্রহ ও বিতরণে একটি কেন্দ্রীয় ও স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করতে পারে, তাহলে দারিদ্র্য বিমোচনে ঈদ একটি বার্ষিক হাতিয়ার হতে পারে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য ঈদের মৌসুমে বিশেষ ঋণসুবিধা ও বাজার প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে সুবিধার বৃত্তটা আরও বড় হবে। ই-কমার্স খাতকে ঈদের সময় গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যুক্ত করার নীতি থাকলে শহর ও গ্রামের মধ্যে অর্থনৈতিক দূরত্ব কিছুটা হলেও কমবে। শ্রমিকদের ঈদ বোনাস সময়মতো নিশ্চিত করা শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়ানোর একটি কার্যকর হাতিয়ারও বটে। এই পদক্ষেপগুলো আলাদা আলাদাভাবে ছোট মনে হলেও একসঙ্গে নিলে একটা বড় রূপান্তরের সূচনা হতে পারে।

ঈদের সামাজিক মূল্যটাও ভুলে গেলে চলবে না। শহরে মানুষ এখন ঈদের আগের রাতে পরিবারকে ভিডিও কলে ঈদ মোবারক জানায়। প্রযুক্তি দূরত্বটা কমিয়েছে, কিন্তু একসঙ্গে বসে যে খাওয়া, সেই উষ্ণতা কোনও স্ক্রিন দিতে পারে না। মায়ের হাতের রান্না একটু ঠান্ডা হলেও যে তৃপ্তি, সেটা কোনও রেস্তোরাঁর পাঁচতারা খাবারে মেলে না। নগরায়ণের চাপে পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, সামাজিক বন্ধনগুলো আলগা হচ্ছে। ঈদ এই বিচ্ছিন্নতাকে সাময়িকভাবে জোড়া লাগায়। বছরের অন্য সময়গুলোতে যে মানুষটির খোঁজ নেওয়া হয় না, ঈদের সকালে তার বাড়িতে একটু উঁকি দেওয়া হয়, একটা মিষ্টি পাঠানো হয়। কিন্তু সেই জোড়াটা যদি বছরে মাত্র একবারই হয়, তাহলে সংকটটা আসলে আরও গভীর। এই ক্ষণস্থায়ী মিলনকে স্থায়ী সম্পর্কে পরিণত করার দায়িত্ব কিন্তু শুধু উৎসবের নয়, মানুষের নিজের।

আরও একটি প্রশ্ন এসে যায়। ঈদের বিজ্ঞাপন এখন কোন দিকে যাচ্ছে? টেলিভিশনের পর্দায়, সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডে, রাস্তার বিলবোর্ডে ঈদের ছবিটা আঁকা হচ্ছে পোশাক আর পণ্যের ভাষায়। সুন্দর হওয়ার জন্য এটা কিনুন, পরিবারকে খুশি করতে ওটা কিনুন, ঈদ সম্পূর্ণ হয় এই ব্র্যান্ডে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঈদকে ব্যবহার করছে তাদের পণ্য বিক্রির জন্য, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু একটা সময় আসে যখন পণ্যের এই বিজ্ঞাপনী ভাষা উৎসবের নিজের ভাষাটাকে ঢেকে দেয়। শিশু জানে ঈদ মানে নতুন জামা, কিন্তু জানে না ঈদ মানে পাশের বাড়ির দুঃখী মানুষটির মুখে একটু হাসি ফোটানো। এই শিক্ষাটা পরিবার থেকে আসার কথা, সমাজ থেকে আসার কথা। কিন্তু পরিবার যখন ব্যস্ত কেনাকাটায়, সমাজ যখন ব্যস্ত প্রতিযোগিতায়, তখন শিক্ষাটা আর দেওয়া হয় না।

আকাশছোঁয়া বিজ্ঞাপনের ভিড়ে, নতুন পোশাকের উত্তেজনায় এবং কেনাকাটার ব্যস্ততায় ঈদের যে আসল অর্থটা আছে, সেটা যেন হারিয়ে না যায়। তিন লাখ কোটি টাকার অর্থনীতি যে উৎসবকে ঘিরে গড়ে উঠেছে, সেই উৎসবের কেন্দ্রে আছে একজন মানুষ, যে একটু ভালোবাসা চায়, একটু কাছে থাকতে চায়। টাকার হিসাব যদি মানুষের হিসাবকে ছাপিয়ে যায়, তাহলে ঈদের সেরাটুকু আমরা নিজেরাই নষ্ট করে ফেলছি। ঈদের সকালে মাঠে যখন সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়, সেই মুহূর্তটার একটা শক্তি আছে, একটা সততা আছে। সেই শক্তিকে বাজারের হাতে বন্দি না করে, মানুষের হাতেই রাখতে হবে। কারণ শেষ বিচারে ঈদ কোনো অর্থনৈতিক সূচক নয়, এটা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের পরীক্ষা।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক  

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বশেষসর্বাধিক