বাংলা বছরের শেষ দুদিন ও নববর্ষের প্রথম দিনটি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য উৎসবের সময়। এ উৎসবটি জাতিভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন- বিঝু, বিহু, বৈসু, সাংগ্রাই, চাংক্রান ইত্যাদি। পার্বত্য চট্টগ্রামের এ উৎসবটিই একমাত্র বড় সামাজিক উৎসব, যে উৎসবে কোনও ধর্মীয় আবহ নেই। এ উৎসবটি পুরোনো বছরকে বিদায় দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার উৎসব। একইসঙ্গে এটি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সব ধরনের ভেদাভেদ ভুলে পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করে।
তাই এ উৎসব কেবল আনন্দেরই নয়, এটি পুরোনো সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে যেমন সংরক্ষণ করে, তেমনই সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার অন্যতম একটি মাধ্যমও।
একসময় বিঝু মানেই হলো ঐতিহ্য নির্ভর একটি উৎসব, যেখানে ছিল প্রকৃতির নির্মলতা আর সহজ সরল খাবারের সঙ্গে সামাজিক আনন্দের এক সুন্দর মিশ্রণ। বিঝুর মূল আকর্ষণ হলো— পাজন বা পাঁচন। এরসঙ্গে যোগ হতো নানান পদের চালের পিঠা, সেদ্ধ মিষ্টি আলু আর চৈত্রের তপ্ত গরমে প্রশান্তির জন্য সাধারণ পানীয় হিসেবে লেবুর শরবত। এ আন্তরিকতার মধ্যেই পরম আনন্দ আর পরিতৃপ্তিতে আকণ্ঠ ডুবে থাকা হতো। কিন্তু এখন গ্রাম আর শহরের মধ্যে ব্যবধান কমে যাওয়ায় বিঝুর আয়োজনেও এসেছে পরিবর্তন। কালক্রমে বিঝুর আয়োজনে যুক্ত হচ্ছে রুটি-গোস্ত, হালিম, চটপটি, কাস্টার্ড, কোল্ড ড্রিংকসহ নানান আধুনিক উপদেয় খাবার। এসব খাবার পরিবেশনের মধ্যেই যেন সমাজে নিজের সামাজিক অবস্থান তুলে ধরার একটা নীরব প্রতিযোগিতা দেখা দেয়।
বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রতিযোগিতামূলক দৌড়ে পাহাড়ের সরল ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকাগুলো ফিকে হয়ে যাচ্ছে! হ্যাঁ, সংস্কৃতি সবসময় পরিবর্তনশীল। কিন্তু নিজের সংস্কৃতিকে পেছনে পুঁতে রেখে আরেক সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরলে তখনই ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।
বহুকাল আগে বিঝু উপলক্ষে চট্টগ্রামের রাজানগরে চাকমা রাণী কালিন্দীর প্রতিষ্ঠিত মহামুনি বৌদ্ধ মন্দিরে মাসব্যাপী মহামুনি মেলা’র আয়োজন করা হতো। সময়ের আবর্তে সেসব বিঝুমেলার জৌলুস আর নেই। বর্তমানে বিঝুকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মেলার আয়োজন করা হয়। কিন্তু সেসব মেলা ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে অনেক সময় শুধু বিকিকিনি নির্ভর হয়ে ওঠে। তাই বর্তমানে বিঝু উৎসব ‘ইভেন্ট’-এ পরিণত হচ্ছে! মেলা চলাকালীন মঞ্চে বাজে আধুনিক হিন্দি আর ব্যান্ডের গান। কোথায় আমার উবো গীত! কোথায় আমার হেঙ্গরঙ, ধুধুক, শিঙার সুর! অথচ এসব আদি বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের পাহাড়ের জীবন প্রকৃতি আর গভীর অনুভূতির নিঃশ্বাস!
একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের অনন্য বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে সত্তর দশকের দিকে ‘গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী’ নামের একটি সাংস্কৃতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ‘এক মুঠো আলো’ শিরোনাম দিয়ে ১৯৭২ সালে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি প্রথম আত্মপ্রকাশ করে, যা তৎকালীন সময়ে পাহাড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীকালেও বিভিন্ন গানের দল ও একক শিল্পী গড়ে ওঠেছে। সেই সময়ে রচিত গানের মধ্যে কর্ণফুলির হ্রদের জলে তলিয়ে যাওয়া চাকমা রাজবাড়ি, গ্রামের পর গ্রাম ডুবে যাওয়া বাস্তুহারা মানুষদের দুঃখগাঁথাগুলো ফুটে উঠত। একেকটি গান যেন দুঃখী জাতির ইতিহাস আর স্মৃতির ডায়েরির পাতা খুলে দেয়! সেই সময়কার গানগুলো যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের কঠিন বাস্তবতার একেকটি প্রামাণ্যচিত্র! কর্ণফুলির নীল জলের হ্রদের নিচে তলিয়ে যাওয়া পাহাড়ি জনপদের নীল দুঃখগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ফুটে ওঠে একেকটি গানের ভেতর থেকে! কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমান প্রজন্মের কাছে সেসব স্মৃতি বিজরিত গানের গভীরতা খুব একটা নাড়া দিতে পারছে বলে মনে হয় না। আমরা জানি, যেকোনও সংস্কৃতিতে যদি আধুনিকতার স্থান বেশি হয়, তাহলে সেই সংস্কৃতিতে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। আমি এ কথা বলছি না যে, বর্তমান প্রজন্মকে সবসময় উবো গীত নিয়ে পড়ে থাকতে হবে। কিন্তু একথা স্বীকার করতে হবে যে, একসময়ের সাড়া জাগানো উবো গীত, হেঙ্গরঙ, ধুধুক, শিঙা’র গভীর অনুভূতির সুরগুলোই পারবে বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে আগের প্রজন্মের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির মধ্যে মেলবন্ধন রচনা করতে।
বিঝুকে ঘিরে ঐতিহ্যবাহী খেলার আয়োজন শুধু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য নয়, বরং এ আয়োজনের মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মকে নিজেদের শেকড়ের সঙ্গে পরিচিত করানোর একটি অন্যতম অংশও। তাই ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা বা সংস্কৃতি শুধু অতীতকে ধরে রাখা নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান প্রজন্মকে অতীতের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত করিয়ে ভবিষ্যতের সঠিক পথ চিনিয়ে নেওয়ার একটি পন্থা হতে পারে।
আমাদের বিশ্বাস, একমাত্র বিঝু উৎসবই পারে পাহাড়ের সব বিভাজনের দেয়াল ভেঙে দিয়ে অপরূপ এক মিলনমেলার আবহ তৈরি করতে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত পরিচয়ের চেয়ে একসঙ্গে সারা বছরের দুঃখ, গ্লানিকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাবার প্রেরণা যোগায় এ উৎসব। এ উৎসবের মর্ম-ই সব ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান ও আস্থা নিয়ে সহাবস্থান করার বড় শক্তি যোগায়। কাজেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চেতনা আর ঐক্যের অনুভূতিগুলোই পাহাড়ের সম্প্রীতি বজায় রাখতে অনন্য ভূমিকা রাখবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
লেখক: মানবাধিকারকর্মী




