নগরের রূপান্তরে স্যানিটেশনই মূলমন্ত্র 

ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ
০৬ মে ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ০৬ মে ২০২৬, ১৪:০০

প্রধানমন্ত্রী যখন সম্প্রতি একটি ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন ঢাকা’ গড়ার রূপকল্প তুলে ধরলেন, তখন সেই বার্তাটি কেবল প্রশাসনের উচ্চস্তরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি—বরং তা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার এক বলিষ্ঠ অঙ্গীকার হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন এবং সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে—এমন উদ্যোগের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর যে চিরাচরিত অনুরাগ, তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের নগর পরিকল্পনার নান্দনিকতার গভীরে তাকানোর সময় এসেছে। একটি বিশ্বমানের বাসযোগ্য নগরী গড়তে হলে সবার আগে মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অথচ উপেক্ষিত প্রয়োজনটির দিকে নজর দিতে হবে, আর তা হলো পাবলিক টয়লেট বা গণশৌচাগার।

প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ১২ দফা পরিকল্পনা কেবল একটি প্রশাসনিক রূপরেখা নয়, এটি একটি বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব মেগাসিটি গড়ে তোলার দিকনির্দেশনা। বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন, পাঁচ লক্ষ বৃক্ষরোপণ, খাল ও নদী উদ্ধার, ইটিপি (ইফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) বাধ্যতামূলক করা এবং গণপরিবহনের আধুনিকায়নের মতো পদক্ষেপগুলো ঢাকার পরিবেশগত চেহারা বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। তবে এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি অধিকারভিত্তিক পদ্ধতির ওপর।

বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন ঢাকা’ গড়ার কথা যখন বলি, তখন মূলত নাগরিকদের সেই সাংবিধানিক অধিকারেরই প্রতিফলন ঘটে। বর্তমানে ঢাকার মাত্র ২০-২৫ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। বাকি বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সরাসরি নালা, খাল এবং মূল্যবান জলাশয়গুলোতে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি।

দুই কোটিরও বেশি মানুষের এই মহানগরে প্রতিদিন প্রায় চার লাখ নতুন মানুষ যুক্ত হচ্ছে এক উন্নত জীবনের আশায়। কিন্তু এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বিশাল এলাকায় গণশৌচাগার রয়েছে মাত্র ৬৩টি। বিদ্যমান সুবিধাগুলোর চিত্রও বেশ হতাশাজনক, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো জরাজীর্ণ, নারীদের জন্য অনিরাপদ এবং প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহারের অনুপযোগী।

আকাশচুম্বী অট্টালিকা দিয়ে নয়, বরং সবচেয়ে অসহায় মানুষটির প্রতি আমরা কতটা সংবেদনশীল, তা দিয়েই প্রকৃত প্রগতি পরিমাপ করা হয়। পরিচ্ছন্ন শৌচাগার কেবল স্বাস্থ্যবিধির বিষয় নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে ‘পিঙ্ক টয়লেট’ বা নারীবান্ধব শৌচাগারের ধারণাটি কেবল শৌচাগার নয়, বরং এটি নারীদের চলাফেরা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার মাধ্যমে শহরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে উন্মোচিত করে।

প্রধানমন্ত্রীর ১২ দফা লক্ষ্যমাত্রাকে সফল করতে একটি নিবিড় বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা জাতীয় পাবলিক টয়লেট নীতিমালা চূড়ান্ত করা এবং স্যানিটেশনকে রাজস্ব আয়ের পরিবর্তে একটি নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা। ডিএনসিসির ‘ওয়াশ অ্যাকশন প্ল্যান’ এবং রাজউকের ‘মেকিং ঢাকা লিভেবল’ পরিকল্পনার আলোকে উত্তরা, মিরপুর ১০ ও কাওরান বাজারের মতো উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন এলাকাগুলোতে অবিলম্বে গণশৌচাগার নির্মাণের স্থান চূড়ান্ত করা।

প্রতিটি পাবলিক টয়লেটে পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিবর্তনের সুবিধা সংবলিত ‘পিঙ্ক টয়লেট’ এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে নির্মাণকাজ শুরু করা। ফিকাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট (এফএসএম) সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং একটি ‘স্টার রেটিং’ পদ্ধতির মাধ্যমে শৌচাগারের মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।

স্যানিটেশন জীবনের অধিকারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি ৬) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার যে বৈশ্বিক অঙ্গীকার রয়েছে, তা বাস্তবায়নে এই পদক্ষেপগুলো অপরিহার্য। সিডো সনদের ধারা ১৪ অনুযায়ীও স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সেবায় নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়বদ্ধতা।

নীতিনির্ধারক, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি আহ্বান—ঢাকার রূপান্তর কেবল বাহ্যিক চাকচিক্য দিয়ে নয়, বরং তার সেবার মান দিয়ে বিচার করুন। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন। ওয়াশ অ্যাকশন প্ল্যানকে নগর উন্নয়নের প্রতিটি প্রকল্পে অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। জলাশয় রক্ষায় দ্রুততম সময়ে মলমূত্র বর্জ্য শোধন ও নিরাপদ অপসারণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। শৌচাগারের রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় সম্প্রদায় ও নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা।

‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন ঢাকা’ গড়ে তোলা কোনও অলীক স্বপ্ন নয়, এটি একটি দৃঢ় সদিচ্ছার বিষয়। মর্যাদার এই অবকাঠামোই হবে আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর। আসুন, আমরা এমন একটি শহর গড়ে তুলি, যেখানে কোনও মানুষকে যেন গ্লানি সইতে না হয় এবং আমাদের নদীগুলো আবার ফিরে পায় তাদের হারানো প্রাণ। তবেই ঢাকা হবে প্রকৃত অর্থে একটি বিশ্বমানের রাজধানী।

লেখক: আইনজ্ঞ ও উন্নয়নকর্মী

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পলকের রিমান্ড শুনানির দিন আদালত প্রাঙ্গণে হট্টগোল: ৪ আসামি ৩ দিনের রিমান্ডে 
পলকের রিমান্ড শুনানির দিন আদালত প্রাঙ্গণে হট্টগোল: ৪ আসামি ৩ দিনের রিমান্ডে 
সবজি বিক্রেতা হত্যা মামলায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড
সবজি বিক্রেতা হত্যা মামলায় ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড
এবার নেপাল প্রিমিয়ার লিগে সাকিব, ভিড়লো পোখারা অ্যাভেঞ্জার্সে 
এবার নেপাল প্রিমিয়ার লিগে সাকিব, ভিড়লো পোখারা অ্যাভেঞ্জার্সে 
উদ্বেগ আর সাধারণ দুশ্চিন্তা কি এক? আপনি কোনটা করেন
উদ্বেগ আর সাধারণ দুশ্চিন্তা কি এক? আপনি কোনটা করেন
সর্বশেষসর্বাধিক