আমাদের সামাজিক জীবনের রূপান্তর 

মোস্তফা মোরশেদ
০৯ মে ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ০৯ মে ২০২৬, ১৪:০০

সমাজ কখনও স্থির থাকে না। প্রতিটি সমাজ ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্মীয় আচার এবং বৈশ্বিক প্রভাবের মধ্যে দিয়ে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের সামাজিক জীবন এক ব্যাপক ও বহুমাত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে যে সমাজ ছিল সম্প্রদায়কেন্দ্রিক, নৈতিকতানির্ভর এবং পারস্পরিক সহযোগিতায় পরিচালিত, অনেকক্ষেত্রেই আজ তা ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ধাবিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজন, ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী অর্থনৈতিক বৈশ্বায়ন, প্রভৃতি ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ১৯৪৭ সালে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র ভাগের ফলে সামাজিক পুনর্গঠন হলেও ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে পূর্ব বাংলার জনগোষ্ঠীর মেরুকরণ হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের ভাষায় একটি ইমাজিনড কমিউনিটি নির্মাণ করে, যেখানে ভাষা সামাজিক সংহতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আমাদের ভাষা আন্দোলন এক স্বতন্ত্র জাতিসত্তা নির্মাণের শক্তিশালী উদাহরণ। এ আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্রসমাজ, নারী ও শ্রমজীবী মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়—যা সামাজিক গতিশীলতাকে ত্বরান্বিত করে। বাংলা ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক সংহতি, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরি, শহীদ মিনার, একুশের গান ও সাহিত্য, ইত্যাদি সামাজিক কর্ম ও রচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য পুনর্গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ এই ইমাজিনড কমিউনিটিকে আরও দৃঢ় করে একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে রূপান্তর করে।

১৯৫০-এর দশকের বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছিল মূলত কৃষিনির্ভর, গ্রামীণ এবং সম্প্রদায়কেন্দ্রিক একটি সমাজ। গ্রামের মোড়ল, মসজিদ-মন্দির এবং লোকাচার সামাজিক নিয়ন্ত্রণের প্রধান মাধ্যম ছিল। সে সমাজে ব্যক্তির পরিচয় নির্ধারিত হতো তার পরিবার, বংশ ও গ্রামের পরিচয়ের মাধ্যমে। সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ছিল চোখে পড়ার মতো। লজ্জা, মান-সম্মান এবং সম্প্রদায়ের বিচার এসব বৈশিষ্ট্য মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করত। পরবর্তীকালে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যকে ঘিরে ১৯৭১ সালে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সামাজিক জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তন এ তত্ত্বগুলো সমন্বিত বিশ্লেষণের দাবি রাখে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি একটি ডায়নামিক সোশ্যাল ফরমেশন—যেখানে অর্থনৈতিক ভিত্তি, রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্ক একে অপরকে প্রভাবিত করে ক্রমাগত রূপান্তর ঘটিয়েছে। আগস্ট কোঁত ও এমিল দুর্খেইমের কার্যকরবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সমাজকে একটি সমন্বিত কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে, যেখানে ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটে। অপরদিকে, কার্ল মার্কসের দ্বন্দ্ব তত্ত্ব সামাজিক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে শ্রেণি সংঘাত ও উৎপাদন সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভূমি ব্যবস্থা, শ্রমবাজার ও শ্রেণি গঠনে এ দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। আবার ওয়াল্ট রোস্টোর আধুনিকায়ন তত্ত্ব উন্নয়নকে ধাপে ধাপে অগ্রগতির প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও আন্দ্রে গুনার ফ্রাঙ্কের নির্ভরতা তত্ত্ব দেখায় কীভাবে বৈশ্বিক কাঠামো উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামাজিক বৈষম্য পুনরুৎপাদন করবে। এ লেখায় কাঠামোগত কার্যকরবাদ, দ্বন্দ্ব তত্ত্ব, আধুনিকায়ন ও নির্ভরতা তত্ত্ব ইত্যাদি মৌলিক বিষয়গুলোর আলোকে বাংলাদেশের সামাজিক রূপান্তর বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলাদেশের সমাজে দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণ লজ্জাকর, সামাজিকভাবে বর্জনীয় ও অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ হিসেবে বিবেচিত হতো। যে ব্যক্তি ঘুষ খেতেন বা অসৎ পথে অর্থ উপার্জন করতেন, সমাজ তাকে চিহ্নিত করত। গ্রামের মানুষ তার সাথে স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্ক রাখতে দ্বিধা করতো। সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে তার এবং তার পরিবার অসুবিধায় পড়তো। মসজিদে বা উপাসনালয়ে তার উপস্থিতিকে ভালো চোখে দেখা হতো না। বর্তমানে ঘুষনির্ভর সমাজে দুর্নীতিকে অনেক ক্ষেত্রে ‘স্পিড মানি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—যা কাজের গতি বাড়াতে সাহায্য করে! দুর্নীতি অনেকাংশে স্বাভাবিক ও অনেকক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিক এ অর্থে যে সামাজিকভাবে এটি বয়কটের সুযোগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ এটাকে ‘সিস্টেমের অংশ’ হিসেবে মেনে নিয়েছে। সরকারি সেবা পেতে বা দ্রুত কাজের জন্য অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া অনেক সময় অস্বাভাবিক মনে করা হচ্ছে না। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও স্বদিচ্ছার অভাব, দুর্বল প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সামাজিক নৈতিকতার ক্ষয়। ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না; একটি ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, যা অতীতের লজ্জার বিষয় থেকে বর্তমানের বাস্তবতায় রূপান্তরিত হয়েছে। মূলত, দুর্নীতি কোনও ব্যক্তির জন্য শুধুমাত্র আইনি বিষয় নয় বরং সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করার বিষয়। তাত্ত্বিকভাবে, দুর্খেইমের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ তত্ত্ব অনুসারে, সমাজে নিয়মনীতির লঙ্ঘন হলে সামাজিক সংহতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সমস্যার জায়গা অন্যত্র। আগে একজন ‘ঘুষখোর’ ব্যক্তি সামাজিকভাবে সম্মান হারাতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তাকে বয়কটও করা হতো। কিন্তু মাত্র অর্ধ-শতাব্দী সময়ের পরিক্রমায় যিনি ঘুষ গ্রহণ করছেন, তিনি সম্মানের জায়গা ফিরে পেয়েছেন! সামাজিক এ পরিবর্তন মেনে নেওয়া যায় না। অবৈধ উপায়ে বিত্তবান হওয়া একজন ব্যক্তি এলাকায় মসজিদ বা মন্দির নির্মাণ করলে বা রাস্তা তৈরিতে অর্থ দিলে তিনি ‘দানবীর’ উপাধি পাচ্ছেন। অর্থাৎ, দুর্নীতির উৎস নিয়ে আমাদের সমাজ আর প্রশ্ন করে না, বরং দৃশ্যমান সম্পদ ও দানশীলতাকে মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করে।

এক দশক আগেও গ্রামে মাতব্বর, মুরুব্বি বা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিবাদ নিষ্পত্তি, সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কর্তৃত্ব করতেন। তাদের বৈঠক ছিল সামাজিক ন্যায়বিচারের কেন্দ্র। সামাজিক শাস্তি প্রভাবশালী ছিল। যেমন, জনসাধারণের সম্মান হারানো বা পারিবারিক সমাজে সম্মান হ্রাস পাওয়া ছিল বড় ধরনের প্রভাব। বর্তমানে পুলিশ, আদালত, ইউনিয়ন পরিষদ এবং গণমাধ্যমের প্রভাবে সে কর্তৃত্ব হ্রাস পেয়েছে। আইনের শাসন ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে লোকজন এখন সরাসরি প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ, জমি বিবাদ বা পারিবারিক কলহ এখন গ্রাম্য মাতব্বরের বদলে থানা বা কোর্টে নেওয়া হচ্ছে। ন্যায়বিচারের প্রশ্নে এটি অযৌক্তিক নয়। তবে এটি যুক্তিসঙ্গত হলেও অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ও খরচের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। স্থানীয় নেতৃত্ব থেকে আনুষ্ঠানিক শাসনের দিকে সরণ খারাপ হয়েছে কিনা বলতে হলে বিশদ গবেষণা লাগবে।

সামাজিক শৃঙ্খলা এখন আর বিদ্যমান নাই। আগে পারিবারিক বিরোধ হলে গ্রামের প্রবীণরা মধ্যস্থতা করতেন এবং সে মধ্যস্থতা সাধারণত কার্যকর হতো। যুবকরা বড়দের সামনে সিগারেট খেতেন না, উচ্চস্বরে কথা বলতেন না। এগুলো ছিল সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অনানুষ্ঠানিক কিন্তু শক্তিশালী ব্যবস্থা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আইনের শাসন পাওয়া গেলেও সমস্যা অন্য জায়গায়। সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুটি ভিত্তি ছিল—প্রথমত, সমাজে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের উপস্থিতি, যেখানে একজন মানুষকে সারা জীবন একই মানুষগুলোর সঙ্গে বাস করতে হতো। দ্বিতীয়ত, সামাজিক সুনামের অর্থনৈতিক মূল্য অনেকটা সামাজিক জামানতের মতো কাজ করতো, যা কার্যত ইতিবাচক সামাজিক মূলধন। ভালো পরিবারের সন্তান হিসেবে পরিচিত হওয়ায় কৃষিজমি লিজ পাওয়া থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়া যেত। গ্রামের সালিশে এখন মাতব্বরের চেয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার কথা বেশি চলে। সমাজের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা এখন আর নৈতিক কর্তৃত্বে নয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়।

আরও ভয়ংকর হচ্ছে, দুই দশক আগেও বয়োজ্যেষ্ঠরা নিজের এবং আশপাশের সবাইকে শাসন করতে পারতেন। রাস্তায়, খেলার মাঠে মুরব্বিরা শাসন করে বলতেন, “ওরে বাছা, বাড়ি যা!” কিন্তু বর্তমানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কারণে কেউ কাউকে শাসন করে না। একজন তরুণ বা তরুণীকে যদি কোনও বয়স্ক কেউ শাসন করেন, তবে তা তার জন্য বিপদও ডেকে আনতে পারে। এমনকি ওই তরুণের বৈধ অভিভাবকরা তার সন্তানকে শাসন করার জন্য ওই ব্যক্তির জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারেন। যদিও অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাও সন্তানকে শাসন করার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন! শহরমুখী অভিবাসন, মোবাইল ফোনের প্রসার এবং সব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের অনুপ্রবেশের কারণে ঐতিহ্যবাহী সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কাঠামো ভেঙে পড়েছে। গিয়ার্ট হফস্টেডের সাংস্কৃতিক মাত্রা তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজগুলো সময়ের সাথে সাথে সমষ্টিবাদ থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার দিকে অগ্রসর হতে পারে—যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে। কেউ বিপদে পড়লে মানুষ সাহায্য করার আগে ভাবে ‘এতে আমার কী লাভ?’, ‘ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ব না-তো?’ অতীতে বিপদে এলাকাবাসী একসাথে এগিয়ে আসতো। বন্যা, দুর্ভিক্ষ, রোগ বা দুর্ঘটনায় শ্রমদান, অর্থসাহায্য, খাদ্য বণ্টন চলতো। গ্রামে বাড়ি তৈরি বা ফসল তোলায় সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছিল। এখনও অনেক প্রতিষ্ঠান, সংঘটন এসব কাজ করছে, কিন্তু, যা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক কোনও উদ্যোগ এক্ষেত্রে চোখে পড়ে না। এখন মানুষ বেশি নির্ভরশীল সরকার বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর। উদাহরণস্বরূপ, এলাকার ড্রেন পরিষ্কার করা বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এখন আর সাধারণ মানুষের যৌথ উদ্যোগে হয় না। সাম্প্রতিক সময়ের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদারীকরণ, গণমাধ্যমের প্রসার এবং স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর শক্তিশালীকরণের ফলে কেউ সহজে এককভাবে শাসন করতে পারছেন না, যা ইতিবাচক হলেও সামাজিক মূলধন বিনষ্ট করছে। ওয়েবারের সামাজিক ক্ষমতার তত্ত্ব অনুযায়ী, এখন ক্ষমতা একক ব্যক্তি থেকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনেকেই এগিয়ে আসেন না। কারণ বিভিন্ন রকমের ঝামেলার ভয়। অথচ একটু উদ্যোগ নিলে হয়তো একটি জীবন বাঁচানো সম্ভব। অযথা জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা অস্বীকার করার উপায় নাই। কিন্তু আমাদের সমাজে এ পরিবর্তন কেন হল সেটি গবেষণার দাবি রাখে। বর্তমানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে পারস্পরিক সাহায্য কমে গিয়েছে। দুর্ঘটনায় পাশের লোক ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে, কিন্তু সরাসরি সাহায্যে এগিয়ে আসে না। তার চেয়ে নতুন ধরনের নেটওয়ার্কে (ফেসবুক গ্রুপ, অনলাইন ক্রাউডফান্ডিং) এসব ঘটনার প্রচার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব নেটওয়ার্ক অনেকসময়ই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক নেটওয়ার্কের মধ্যে অগ্রাধিকার বদলেছে। আগের সমাজ ছিল সমষ্টিবাদী, ‘আমরা’ ধারণা ছিল শক্তিশালী। বর্তমানে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত সাফল্যের ওপর জোর বেশি। ফলে সামাজিক বন্ধন কিছুটা শিথিল হয়েছে।

গ্রামের পাশাপাশি শহরের জীবনযাপনের এ চিত্র আরও ভয়ানক। শহরের আবাসিক এলাকায় একই ফ্লোরের প্রতিবেশীরা একে অপরকে চেনেন না! এটি নগরায়ণ ও ব্যক্তিগত জীবনের প্রাধান্যের ফল। গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন, বস্তি ও ফ্ল্যাট সংস্কৃতি, প্রতিবেশী সম্পর্কের দুর্বলতার কারণে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের পতন ঘটেছে। এ উদাহরণটি বাংলাদেশে সম্মিলিত দায়িত্ববোধ ক্ষয়ের একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত। দ্রুত নগরায়ণ, পারিবারিক বিভাজন এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সমাজে সমবায় মনোভাব কমে গেছে। সম্মিলিতভাবে দায়িত্বপালনের মনোভাব কমে যাওয়ার কারণে চুরির ভয়ে সিসিটিভি কিংবা লক লাগানো বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রবার্ট ডি পুটনামের সোশ্যাল ক্যাপিটাল তত্ত্ব দ্বারা এ পরিবর্তনের ব্যাখ্যা করা যায়। কম সামাজিক মূলধন (বিশ্বাস, সম্পর্ক, সামাজিক রীতিনীতি, ইত্যাদি) থাকলে মানুষ একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসে না। জরুরি বা বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে স্ব-স্ব স্বার্থ প্রাধান্য পায়, যা প্রাচীন সামাজিক সংহতির বিপরীত। এর সাথে ব্যাপকভাবে যোগ হয়েছে ‘গালাগালি’ যা ভয়ংকররূপ লাভ করছে।

বলতে দ্বিধা নাই, আগে শিক্ষকরা প্রভাবশালী ছিলেন, কেউ অশ্রদ্ধা করতো না। এখন শিক্ষার্থীদের আচরণ অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীন, শিক্ষককেও চ্যালেঞ্জ করা হয়। ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষার্থীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ১৯৭০-এর দশকে ১৫ শতাংশ হতে ২০২০ সালে ৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এটি ইতিবাচক হলে অবশ্যই ভালো। কিন্তু এটি সামাজিক আচার-আচরণের সাথে সাংঘর্ষিক। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ দায় এড়াতে পারবে না। প্রতিষ্ঠান হিসেবে শুধুমাত্র পরিবার অনেকাংশে কাজ করছে। অন্যগুলো (শিক্ষা, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, ইত্যাদি) সমাজে তেমন প্রভাব রাখছে না। ফলে শিক্ষার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। পিয়ের বোর্দিয়ুর কালচারাল ক্যাপিটালের ধারণা অনুযায়ী, শিক্ষা কেবল মেধার ফল নয়; বরং পরিবার থেকে প্রাপ্ত ভাষা, রুচি, আচরণ ও সামাজিক নেটওয়ার্ক শিক্ষাগত সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখে।

পরিবারকে ঘিরেও অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। নগরায়ণের ফলে শহরে বসবাস বেড়েছে। পপুলেশন কাউন্সিলের রিপোর্ট ২০২২ অনুযায়ী, শহুরে পরিবার ১৯৭১ এ ১৫ শতাংশ হতে এ দশকে ৪৫ শতাংশ হয়েছে। বড় পরিবার থেকে নিউক্লিয়ার পরিবারে রূপান্তর ঘটেছে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাংলাদেশে যৌথ পরিবার ছিল সামাজিক কাঠামোর মূল ভিত্তি। দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, ভাই-ভাবি— সবাই একসঙ্গে বাস করতেন। এ ব্যবস্থায় শিশু লালন-পালন, বৃদ্ধদের সেবা এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় একটি স্বাভাবিক সামাজিক নিরাপত্তা ছিল। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের একাকীত্ব কিংবা বাচ্চাদের বুয়া বা গৃহকর্মীদের হাতে লালন-পালন এখন বড় সামাজিক সমস্যা। এছাড়া, প্রেম ও বিয়েতে পরিবারের অনুমতির গুরুত্ব কমেছে। আগে প্রেম বা বিয়ে পরিবার ও সমাজের অনুমতি ছাড়া সম্ভব ছিল না। এখন তরুণ-তরুণীরা অনেকটা স্বাধীনভাবে সম্পর্ক করে, পরিবারের অনুমতি পরে আসে। বিবিএস-এর ২০২১ জরিপ অনুযায়ী, নগর এলাকায় তরুণ বা তরুণীদের ৬৫ শতাংশ প্রেম বা বিয়েতে নিজের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ইন্টারনেটভিত্তিক প্রেমের সম্পর্ক বেড়েছে এবং একইসঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদও বেড়েছে। চাকরির জন্য বিদেশে অবস্থান অনেকক্ষেত্রে পারিবারিক সম্পর্কে সমস্যা তৈরি করছে। প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স গ্রামীণ সমাজে ভোগ ও সামাজিক মর্যাদা বাড়ালেও পরিবার বিচ্ছিন্নতার সামাজিক অবস্থানও তৈরি করেছে। দেনমোহর ও যৌতুকের প্রথা এখনও আছে, কিন্তু শিক্ষিত মধ্যবিত্তে ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে।

বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যার জায়গা হচ্ছে বিশ্বাস। আমরা কেউ কাউকে বিশ্বাস করছি না। পীর তাঁর মুরিদকে কিংবা মুরিদ তার পীরকে বিশ্বাস করছে না! পুটনাম দেখিয়েছেন, সামাজিক নেটওয়ার্ক ও পারস্পরিক বিশ্বাস সমাজের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ সামাজিক পুঁজির অবক্ষয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে বাজারকে কেন্দ্র করে। যে যার মতো তার বক্তব্য দিয়ে গেলেও বাজারে কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। নাইলসেন বাংলাদেশ-এর রিপোর্ট বলছে, গ্রাহক সন্তুষ্টি সূচক ১৯৮০-এর দশকে ৮৫ শতাংশ হলেও এ সময়ে তা ৫৫ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। বাজারে অতিরিক্ত দাম নিলে আগে লোকজন কঠোরভাবে নিন্দা করতো, এখন তা থাকলেও সিদ্ধান্ত বদলানোর মতো কার্যকর নয়।

মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার নেটওয়ার্ক একটি সমাজের অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কাঠামোয় এ মূলধন প্রচুর ছিল। এখন মূলধনের পরিবর্তে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। উলরিখ বেকের ‘রিসক সোসাইটি’ ধারণা অনুযায়ী আধুনিক সমাজে ঝুঁকি প্রাকৃতিক নয়, বরং মানবসৃষ্ট ও কাঠামোগত। এ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে সামাজিক বৈষম্য আরও গভীর হয় এবং ফলশ্রুতিতে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

ওয়াল্ট হুইটম্যান রোস্টোর মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমাজকে ঐতিহ্যগত কাঠামো থেকে আধুনিক কাঠামোর দিকে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ রূপান্তর নগরায়ণ ও শিল্পায়নের মাধ্যমে দৃশ্যমান। তৈরি পোশাক শিল্পকে ঘিরে বড় একটা অর্থনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কর্মরত, যার বড় অংশ নারী। তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি সমাজে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের পাশাপাশি পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনেও নারীর প্রভাব বৃদ্ধি করেছে। জেন্ডার অ্যান্ড পাওয়ার থিওরি অনুযায়ী, নারীর ক্ষমতায়নের ফলে পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক সম্পর্কগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ, যেমন- নারী শিক্ষার প্রসার, নারীদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা, রাজনৈতিক সংস্থাপন, ইত্যাদি নারী ক্ষমতায়নের উদাহরণ। আগে নারীরা বাড়ির বাইরে সীমিত কাজ করতেন। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব কম ছিল। এখন চাকরি, শিক্ষার সুযোগ, সামাজিক অংশগ্রহণের কারণে নারীর ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিবিএস’র সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ১৯৭১ সালে শিক্ষিত নারীর সংখ্যা ১৫ শতাংশ ছিল, যা এ সময়ে ৬০ শতাংশ। আইএলও রিপোর্ট অনুযায়ী, নারীর শ্রমবাজার অংশগ্রহণ ১৯৭১ সালে মাত্র ১০ শতাংশের বিপরীতে এখন ৩৫ শতাংশ। তবে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন ঘটলেও শ্রম নিরাপত্তা ও মজুরি বৈষম্য পূর্বের তুলনায় বেড়েছে। মার্কসীয় বিশ্লেষণে এটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদের অধীন শ্রম শোষণের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বর্তমানে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদির মাধ্যমে যোগাযোগ সহজ হলেও তা জীবনকেই অনেকক্ষেত্রে ভার্চুয়াল হিসেবে উপস্থাপন করছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১০ থেকে ২০২৫ সময়ে তরুণদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার ২০ শতাংশ থেকে অন্তত ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাস্তব সম্পর্কের গভীরতা অনেকসময় কমে যাচ্ছে। আগে যোগাযোগ ছিল সরাসরি, চিঠি, আড্ডা বা মুখোমুখি কথোপকথনের মাধ্যমে। এখন সবই আঙ্গুলের কাছে। এতে সমস্যা নাই। সমস্যা হচ্ছে যখন পরিবার কিংবা বন্ধুদের সবাই একসাথে থেকেও অনেক দূরে অবস্থান করে, কারণ সবাই যার যার ডিভাইস নিয়ে ব্যস্ত!

টেলিভিশন, সিনেমা, অনলাইন কনটেন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়া সামাজিক আচরণে প্রভাব ফেলছে। একই সাথে শিক্ষা বিস্তার ও গণমাধ্যমের প্রসার গ্রাম ও শহর উভয় জায়গাতেই নতুন মূল্যবোধ তৈরি করেছে যা বিশ্বায়ন ও জীবনযাত্রার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তরুণ প্রজন্মের পোশাক-পরিচ্ছদ ও জীবনযাপনে পরিবর্তন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে দ্বন্দ্ব সমাজকে গতিশীল করছে ঠিকই, কিন্তু অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খাদ্যাভ্যাসেও বৈচিত্র্য এসেছে। পাশ্চাত্যের খাবার এখন আভিজাত্যের লক্ষণ। এছাড়া, অর্থনৈতিক উন্নতির কারণে ধর্মীয় উৎসব আগে যেখানে একটি জামা দিয়ে উদযাপন করা হতো এখন সেখানে অনেক পোশাক কেনা হচ্ছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে ভুল তথ্য ও মেরুকরণও বৃদ্ধি করেছে। ম্যানুয়েল কাস্তেলসের নেটওয়ার্ক সোসাইটির ধারণা দিয়ে এ ডিজিটাল সামাজিক বাস্তবতা ব্যাখ্যা করা যায়।

গত কয়েক দশকে বিশেষকরে, শেষ দশকে স্থানীয় সমাজে ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও প্রভাব প্রথাগতভাবে অনেকটাই কমে গেছে। এক যুগ পূর্বে গ্রামের বা শহরের স্থানীয় মানুষদের সামাজিক প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল—যে তারা সহজেই অন্যদের আচরণ বা সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারতেন। এসব ক্ষেত্রে ধর্ম ও নৈতিকতা প্রাধান্য পেতো, এখন পায় ব্যক্তিগত স্বার্থ ও স্বাধীনতা। স্বাধীনতার পর ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে ধর্মীয় পরিচয় জোরদার হওয়া, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ বৃদ্ধি, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বাণিজ্যিকীকরণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। স্থানীয় লোকসংস্কৃতির পরিবর্তে গ্লোবাল কালচারের প্রভাব বাড়ছে। ঈদ বা পূজা উদযাপনে ব্যাপকতা, ধর্মীয় নেতাদের প্রভাব, পহেলা বৈশাখের উৎসবে বাণিজ্যিকীকরণ, গ্রাম্য মেলা ও লোকগানের স্থান হ্রাস– এগুলো সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য কমিয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের সমাজে ধর্মের প্রভাব সবসময়ই গভীর ছিল। কিন্তু এ প্রভাবের চরিত্র বদলে গেছে। আগে ধর্মীয় অনুশাসন মানুষের দৈনন্দিন আচরণকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করত। সততা, অন্যের অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার এ মূল্যবোধগুলো ধর্মের সাথে সরাসরি সংযুক্ত ছিল। আজকের প্রবণতা ভিন্ন। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বাড়ার সাথে সাথে দুর্নীতি, প্রতারণা, ধর্ষণ, সামাজিক অনাচার বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বৈপরীত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। এ প্রবণতাকে সমাজতাত্ত্বিক ভাষায় ‘রিচুয়ালিজম উইথআউট এথিকস’’ বলে অভিহিত করা যায়। আচারের বাহ্যিক রূপ রক্ষা পাচ্ছে, কিন্তু নৈতিক সারবস্তু হারিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সামাজিক জীবন একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। শহরায়ন, শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং বৈশ্বায়নের প্রভাবে সমাজের প্রতিটি স্তরে পরিবর্তন এসেছে। এ পরিবর্তনের কিছু দিক ইতিবাচক, যেমন- নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার সম্প্রসারণ, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি। কিন্তু অনেক পরিবর্তনই উদ্বেগজনক, যেমন- সামাজিক বন্ধনের শিথিলতা, নৈতিক অবক্ষয়, দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং সামষ্টিক দায়িত্ববোধের বিলোপ।

এমিল দুর্খেইম যাকে ‘অ্যানোমি’ বা নিয়মহীনতা বলেছেন, বাংলাদেশের নৈতিক ক্ষেত্রে সে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পুরোনো নিয়ম ভেঙে পড়ছে, কিন্তু নতুন কোনও সর্বসম্মত নৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। সমস্যা এখানেই।

পরিশেষে, দীর্ঘ এ লেখা পড়ার জন্য পাঠকগণকে অশেষ ধন্যবাদ দিয়ে আমাদের সামাজিক জীবনের রূপান্তরের একটি কারণ এবং একটি সমাধান লিখেই শেষ করছি। মূলত পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার কারণেই সামাজিক রীতিনীতির বাইরে গিয়ে নতুন এক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। দুঃখজনক হলেও পুঁজিবাদী এ ব্যবস্থার কার্যত কোনও বিকল্প নাই এবং যা আসলে আবশ্যক এবং অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সমাধানের পথ একটাই, সামাজিক সব প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে একযোগে এগিয়ে যেতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যয় না বাড়িয়ে শিক্ষা, সংস্কৃতির ব্যয় বাড়ানোর যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, যাতে সামাজিক প্রতিষ্ঠাননির্ভর মূলধন বৃদ্ধি পায়।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ভিএআর বিতর্ক, গোল বাতিল, হলুদ কার্ড: আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচে যা যা ঘটলো
ভিএআর বিতর্ক, গোল বাতিল, হলুদ কার্ড: আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচে যা যা ঘটলো
কোয়ার্টার ফাইনালের সূচি চূড়ান্ত, কোন কোন দল মুখোমুখি
কোয়ার্টার ফাইনালের সূচি চূড়ান্ত, কোন কোন দল মুখোমুখি
টাইব্রেকারে কলম্বিয়াকে হারিয়ে ৭২ বছর পর শেষ আটে সুইজারল্যান্ড
টাইব্রেকারে কলম্বিয়াকে হারিয়ে ৭২ বছর পর শেষ আটে সুইজারল্যান্ড
ফেনীতে পর্যটক এক্সপ্রেসের ধাক্কায় প্রাণ গেলো ব্যবসায়ীর
ফেনীতে পর্যটক এক্সপ্রেসের ধাক্কায় প্রাণ গেলো ব্যবসায়ীর
সর্বশেষসর্বাধিক