প্রতি বছরের শেষে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বের হচ্ছে লক্ষাধিক তরুণ গ্র্যাজুয়েট। তাদের হাতে রয়েছে সনদ, বুকে স্বপ্ন, চোখে ভবিষ্যতের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। কিন্তু গেটের বাইরে পা রাখতেই সেই প্রতিচ্ছবি ঝাপসা হতে শুরু করে। চাকরির দরখাস্ত পাঠানো হয়, সাক্ষাৎকার দেওয়া হয়, মাসের পর মাস অপেক্ষা করা হয়—অথচ উত্তর আসে না। এই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা এখন আর ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়, এটি একটি জাতীয় সংকটের আকার ধারণ করেছে। ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশে পৌঁছেছে—যেখানে জাতীয় গড় মাত্র ৩.৬৬ শতাংশ। শুধু স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যাই ৮ লাখ ৮৫ হাজার। এই সংখ্যাটি কোনও বিমূর্ত পরিসংখ্যান নয়—এটি আট লাখেরও বেশি মানুষের থমকে যাওয়া জীবনের হিসাব।
এই সংকটের গভীরতা বুঝতে হলে একটু পেছনে তাকাতে হবে। গত দুই দশকে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটেছে অভূতপূর্ব গতিতে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, ভর্তির আসন বেড়েছে, পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও প্রতিবছর নতুন রেকর্ড ছাড়াচ্ছে। এটি একটি সাফল্যের গল্প হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যে প্রশ্নটি আমরা এড়িয়ে যেতে থেকেছি, সেটি হলো—এই শিক্ষা কি আসলে কাজের উপযোগী দক্ষতা তৈরি করছে? শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে জ্ঞান নিয়ে বের হচ্ছে, নিয়োগকর্তারা কি সেটাই খুঁজছেন? এই দুই প্রশ্নের উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে উচ্চশিক্ষার বিস্তার কেবল সনদ বিতরণের মহোৎসবে পরিণত হয়— আর বাংলাদেশে ঠিক সেটাই হয়েছে।
দক্ষতার এই অমিলটি সবচেয়ে প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে প্রযুক্তি খাতে। প্রতিবছর প্রায় ১২ হাজার কম্পিউটার সায়েন্স ও প্রকৌশল স্নাতক বের হচ্ছেন, অথচ স্থানীয় প্রযুক্তি বাজার মাত্র পাঁচ হাজার নতুন এন্ট্রি-লেভেল পদ তৈরি করতে পারছে। বাকি সাত হাজার তরুণ কোথায় যাবেন? একই সময়ে, আইসিটি খাত দুই লাখেরও বেশি দক্ষ প্রযুক্তিকর্মীর শূন্যতায় ভুগছে। এই অদ্ভুত বৈপরীত্যটি বুঝতে পারলেই পুরো সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু স্পষ্ট হয়ে যায়—আমরা ঢালাওভাবে স্নাতক তৈরি করছি, কিন্তু শিল্পের প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত দক্ষতা তৈরিতে পিছিয়ে আছি। বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগে গতানুগতিক ডিগ্রিধারীদের উপচে পড়া ভিড়, আর প্রযুক্তি ও প্রকৌশলে দক্ষ কর্মীর তীব্র অভাব—এই দুটি সংকট একসঙ্গে চলছে, পাশাপাশি।
কিন্তু সমস্যাটা কেবল পাঠ্যক্রমের নয়। এর শিকড় আরও গভীরে—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মানসিকতায়। বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীদের যে ধারণা দেওয়া হয়েছে—তা হলো পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলেই সাফল্য আসে। মুখস্থ করো, লেখো, পাস করো— এই ছাঁচে তৈরি একজন শিক্ষার্থী যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তখন সে দেখে নিয়োগকর্তা চাইছেন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা, সৃজনশীল চিন্তা এবং যোগাযোগের পারদর্শিতা। এই দুটি জগতের মধ্যে যে ফাটল, তা ভরাট করতে না পারলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে কিছু হবে না। শিক্ষার বাজেটের হিসাব দেখলেও হতাশা আসে—২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষায় জিডিপির মাত্র ১.৫৩ শতাংশ বরাদ্দ, যেখানে ইউনেস্কোর ন্যূনতম লক্ষ্যমাত্রা হলো ৪ থেকে ৬ শতাংশ। একটি দেশ তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এতটুকুই বিনিয়োগ করতে পারে, এটি ভাবলে লজ্জা হয়।
এই সংকটের আরেকটি মর্মবেদনাদায়ক মাত্রা হলো নারীদের অভিজ্ঞতা। নারী স্নাতকদের বেকারত্বের হার পুরুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি—বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী এই হার ১৬.৮ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা বা কর্মে নেই এমন তরুণীর হার প্রায় ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রায় অর্ধেক নারী তরুণী উৎপাদনশীল কার্যক্রমের বাইরে রয়েছে। এটি শুধু নারীর জন্য ক্ষতি নয়—একটি দেশ তার মোট মানবসম্পদের এই বিশাল অংশকে কাজে না লাগাতে পারলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কতটা অপচয় হচ্ছে, তা কল্পনা করাও কঠিন। সমাজে এখনও প্রচলিত কিছু ধারণা রয়েছে, যেমন- নারী উচ্চশিক্ষা নেবে, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে যাওয়া তার জন্য ‘উপযুক্ত’ নয়। এই মানসিকতা না বদলালে কোনও নীতিই কাজে আসবে না।
শ্রমবাজারের অনানুষ্ঠানিক চরিত্র পুরো বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থানের ৮৪ শতাংশই ছিল অনানুষ্ঠানিক খাতে। নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৯৬ শতাংশ। শহরেও চার জনের মধ্যে মাত্র একজন আনুষ্ঠানিক চাকরি পান। একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণ চার-পাঁচ বছর পড়াশোনা করে যদি চুক্তিহীন, সুরক্ষাহীন এবং ক্যারিয়ার বিকাশের সুযোগশূন্য কোনও কাজে যোগ দিতে বাধ্য হন, তাহলে সেটিকে কি সাফল্য বলা যায়? তরুণরা মোট কর্মসংস্থানের ৩৫ শতাংশ হলেও বেকারদের ৭৬ শতাংশই তরুণ—এই সংখ্যাটি জাতির জন্য একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা। একটি প্রজন্ম যখন বুঝতে পারে যে পড়াশোনা তাদের জীবন বদলে দেবে না—তখন তাদের মধ্যে যে হতাশা জন্ম নেয়, তার সামাজিক পরিণতি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর দেশ বলা হলে তা গভীর বিদ্রূপ বলে মনে হয়। দেশের ৩০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ১৫ থেকে ২৯-এর মধ্যে। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ হতে পারতো এশিয়ার অন্যতম সেরা অর্থনৈতিক শক্তি। কিন্তু সেই জনশক্তিকে দক্ষতায় রূপান্তরিত না করতে পারলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পরিণত হয় ডেমোগ্রাফিক বোঝায়। হতাশ তরুণ, বেকার স্নাতক এবং সুযোগহীন নারী—এই তিনটি উপাদান একত্রে সামাজিক অস্থিরতার একটি ভয়াবহ রসায়ন তৈরি করতে পারে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটেছে, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে—এই পরিস্থিতিতে তরুণদের হতাশা আরও গভীর হয়েছে, যার সতর্কসংকেত আমরা ইতোমধ্যে দেখতে পেয়েছি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র কি হাত গুটিয়ে বসে আছে? তা হয়তো নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার তরুণদের জন্য বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। সর্বশেষ, ২০২৫-২৬ বাজেটে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ঋণের সীমা বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করেছিল। ৪৮টি জেলায় ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে, ২০২৮ সালের মধ্যে ৯ লাখ তরুণকে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর সংস্থা ‘এ টু আই’ চালু করেছে নাইস (এনআইএসই)—একটি তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম যা চাকরিপ্রার্থী, প্রশিক্ষণ সংস্থা এবং নিয়োগকর্তাদের মধ্যে সেতু তৈরির চেষ্টা করছে। এই উদ্যোগগুলো ইতিবাচক, তবে শুধু অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। ভূমির সুযোগ, প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক বাজারের সংযোগ এবং নিয়ন্ত্রক সহায়তা ছাড়া পাঁচ লাখ টাকার ঋণও যথেষ্ট নয়। খণ্ডিত উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে না। এই সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি সামগ্রিক ও সুচিন্তিত কৌশল।
সেই কৌশলের কেন্দ্রে থাকতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার। বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জীবন্ত সংযোগ গড়তে হবে—ইন্টার্নশিপ, ইন্ডাস্ট্রি প্রজেক্ট এবং যৌথ পাঠ্যক্রম প্রণয়নের মাধ্যমে। পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল সাক্ষরতা, আর্থিক সচেতনতা এবং যোগাযোগ দক্ষতার মতো বাস্তব বিষয়গুলোকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি সমাজের যে অবজ্ঞা রয়েছে তা ভাঙতে হবে—একটি দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান বা সফটওয়্যার টেস্টারের সামাজিক মর্যাদা একজন বেকার স্নাতকের চেয়ে কোনও অংশেই কম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষায় মোট ভর্তির মাত্র ১৯ শতাংশ—এই হার দ্রুত বাড়ানো জরুরি। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে জাতীয় দক্ষতা কর্তৃপক্ষের কাছে ১০ বছরের জনশক্তি পরিকল্পনা জমা দিতে বাধ্য করতে হবে—এটি এখন আর ঐচ্ছিক থাকা উচিত নয়।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও বাংলাদেশের অব্যবহৃত সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে দক্ষ কর্মীদের জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের দরজা আরও প্রশস্ত করতে হবে—শুধু শ্রমিক পাঠানো নয়, দক্ষ পেশাদার পাঠানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, যার মধ্যে মাত্র ১০ লাখ বিদেশে কর্মসংস্থান পাচ্ছে। বাকি ১২ লাখের জন্য দেশীয় বাজারে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাটাই এখনকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উদ্যোক্তা উন্নয়নেও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে—ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সহজ ঋণ, মেন্টরশিপ এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করলে তরুণরা নিজেরাই কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবেন।
পরিশেষে, এই সংকট কোনও একক মন্ত্রণালয় বা নীতির মাধ্যমে সমাধান হবে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং পরিবার—সবাইকে একযোগে মানসিকতা বদলাতে হবে। সনদের মূল্য এবং দক্ষতার মূল্য—এই দুটোকে সমান চোখে দেখতে না শিখলে সংকট কেবল গভীর হবে। একটি জাতি তার তরুণদের সঙ্গে যে আচরণ করে, সেটাই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। প্রতিটি বছর আরও কয়েক লাখ তরুণ স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হবেন—রাষ্ট্র যদি তাদের জন্য পথ তৈরি করতে না পারে, তাহলে সেই স্বপ্নের মৃত্যু হবে নীরবে, আর জাতির ক্ষতি হবে সরবে। তরুণরা করুণা চায় না, সুযোগ চায়। সেই সুযোগ তৈরি করা এখন আর কেবল নীতির প্রশ্ন নয়—এটি জাতীয় দায়িত্বের প্রশ্ন এবং এই দায়িত্ব পালনে আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর




