মমতার তৃণমূল কংগ্রেস: ভাঙনের শব্দ শুনি!

চিররঞ্জন সরকার
০৭ জুন ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ১৪:০০

‘ভাঙনের শব্দ শুনি’—বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসের এক কালজয়ী নাটক। আশির দশকের শুরুতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত সেলিম আল দীনের অনন্য রচনা এবং নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর পরিচালনায় নির্মিত এই নাটক কেবল নদীভাঙনের গল্প ছিল না; ছিল ক্ষমতা, লোভ, আধিপত্য এবং মানুষের অসহায়তার এক গভীর রাজনৈতিক রূপক।

যমুনাপাড়ের মানুষের জীবনসংগ্রাম, নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়া ভিটেমাটি এবং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল নাটকটির কাহিনি। কিন্তু কালজয়ী শিল্পের বৈশিষ্ট্যই হলো, তা কখনও তার সময় কিংবা ভূগোলের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। নদীভাঙনের গল্প বলতে বলতে নাটকটি আসলে সমাজের ভাঙন, ক্ষমতার ভাঙন এবং নৈতিক অবক্ষয়ের গল্পও বলে গেছে।

সেরাজ তালুকদার চরিত্রে হুমায়ূন ফরীদির অভিনয় আজও কিংবদন্তির মর্যাদা পায়। তাঁর সেই বিখ্যাত সংলাপ—‘আমি তো জমি কিনি না, পানি কিনি, পানি’—একটি নাটকের সীমা অতিক্রম করে সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিঘাতের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কারণ জমি কেনার চেয়ে পানি কেনা অনেক বেশি ভয়ংকর। জমি স্থির, কিন্তু পানি চলমান। পানি কিনে নেওয়া মানে ভবিষ্যতের ভাঙন কিনে নেওয়া, মানুষের দুর্ভাগ্যকে মুনাফার উৎসে পরিণত করা।

অনেকের মতে, নাটকটির প্রতীকী ভাষায় তৎকালীন ক্ষমতাকাঠামোর প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল বলেই একসময় এর প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। নাটকটি প্রমাণ করেছিল, সত্যিকার শিল্প কখনও কেবল বিনোদন নয়; কখনও কখনও তা ক্ষমতার জন্য অস্বস্তিকর আয়নাও হয়ে ওঠে।

আজ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে ঘিরে যে অস্থিরতা, তা দেখতে গিয়ে বারবার সেই নাটকের কথাই মনে পড়ছিল। কারণ নদীভাঙন আর রাজনৈতিক ভাঙনের মধ্যে বিস্ময়কর মিল রয়েছে। দুটোরই শুরু হয় অদৃশ্যভাবে। দূর থেকে কিছু বোঝা যায় না। পাড় তখনও দাঁড়িয়ে থাকে, ঘরবাড়িও অক্ষত দেখায়। কিন্তু নিচে নিচে মাটি সরে যেতে থাকে। ক্ষয় শুরু হয় ভেতরে। একদিন হঠাৎ দেখা যায়, যে জমিকে স্থায়ী বলে মনে হয়েছিল, সেটাই নদীর গর্ভে হারিয়ে গেছে।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও ভাঙনের শব্দ ঠিক এভাবেই শোনা যায়। প্রথমে ক্ষীণ, তারপর স্পষ্ট, তারপর অনিবার্য।

ইতিহাসে এমন মুহূর্ত আসে, যখন কোনো দলকে আর রাজনৈতিক সংগঠন বলে মনে হয় না; মনে হয় এক বিশাল প্রাসাদ, যার দেয়ালে এখনও রঙ আছে, পতাকায় এখনও বাতাস লাগে, প্রবেশদ্বারে এখনও প্রহরী দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু ভেতরের স্তম্ভে ইতিমধ্যে ফাটল ধরেছে। বাইরে থেকে যার মহিমা অটুট, ভেতরে ভেতরে সে তখন নিজের ওজনেই ভেঙে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই ভাঙনের শব্দ প্রথমে কেউ শুনতে পায় না। কারণ ক্ষমতার চারপাশে সবসময় করতালির এক কৃত্রিম ঝড় বয়ে যায়। সেখানে সতর্কবার্তার চেয়ে প্রশংসার আওয়াজ বেশি শোনা যায়। আনুগত্যের অভিনয় এত নিখুঁত হয়ে ওঠে যে নেতৃত্ব বিশ্বাস করতে শুরু করে—সব ঠিক আছে। অথচ ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক বাক্য সম্ভবত এটাই: ‘সব ঠিক আছে।’

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান ছিল এক অর্থে অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। দীর্ঘ বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে দলটি রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের একটি নির্মম নিয়ম আছে। যে শক্তি একসময় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে উঠে আসে, সময়ের প্রবাহে সেই শক্তিই আবার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। আর প্রতিষ্ঠান যত বড় হয়, তার ভেতরে তত জন্ম নেয় গোষ্ঠী, উপগোষ্ঠী, ব্যক্তিস্বার্থ, আঞ্চলিক ক্ষমতার কেন্দ্র এবং উত্তরাধিকার নিয়ে নীরব প্রতিযোগিতা।

রোমান সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাসে দেখা যায়, বাইরের আক্রমণ ছিল শেষ আঘাত মাত্র। সাম্রাজ্য ভাঙা শুরু হয়েছিল অনেক আগে—দুর্নীতি, অন্তঃসারশূন্যতা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রায় একই সূত্র কাজ করে। কোনো দলের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ অনেক সময় বিরোধী শিবির নয়; দলের ভেতরেই জন্ম নেওয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

ক্ষমতা এক ধরনের মাদক। এই মাদক প্রথমে আত্মবিশ্বাস দেয়, তারপর অহংকার, শেষে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক সংগঠনগুলো প্রায়ই এই রোগে আক্রান্ত হয়। তারা ভাবতে শুরু করে, জনগণ যেন তাদের বেছে নেয়নি; বরং ক্ষমতা তাদের স্বাভাবিক অধিকার। ভোট যেন গণরায়ের ফল নয়, প্রাকৃতিক নিয়ম। আর ঠিক তখনই সময়ের নাটবল্টু আলগা হতে শুরু করে।

ফরাসি চিন্তাবিদ আলেক্সিস দ্য টকভিল লিখেছিলেন, কোনো শাসনব্যবস্থা সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় থাকে তখনই, যখন সে বিশ্বাস করে যে তার আর কোনো বিপদ নেই। রাজনৈতিক আত্মতুষ্টিই প্রায়শই পতনের প্রথম ঘণ্টাধ্বনি। আজ তৃণমূল কংগ্রেস তার ২৮ বছরের ইতিহাসে প্রথম বড় বিভক্তির সম্মুখীন হয়েছে। বহিস্কৃত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৫৮ জন বিদ্রোহী বিধায়ক বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার পদ দখল করেছে এবং স্পিকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছে ।

তাদের দাবি, তারাই ‘আসল তৃণমূল’। বিদ্রোহীরা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেতা হিসেবে মেনে নিলেও তাঁর ভাগ্নে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করেছে । এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা স্তরের বিধায়কদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন এবং দলের সব স্তরের কমিটি ভেঙে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। যদিও তাতে দল জোড়া লাগবে বলে মনে হয় না। দলের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এখন চরম আকার ধারণ করেছে। আর রাজনীতিতে অবিশ্বাসের চেয়ে ভয়ংকর বিষ খুব কমই আছে। মতাদর্শের দুর্বলতা নিয়েও দল টিকে থাকতে পারে। সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতাও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু পারস্পরিক বিশ্বাস ভেঙে গেলে দল আর দল থাকে না; হয়ে ওঠে সুবিধাভোগীদের অস্থায়ী জোট।
শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডিগুলো আমাদের বারবার এই শিক্ষাই দেয়। ‘কিং লিয়ার’– এ রাজা পরাজিত হন নিজের সিদ্ধান্তের কাছে। ‘ম্যাকবেথ’ ধ্বংস হয় নিজের লোভের কারণে। ‘হ্যামলেট’– এর রাজ্য বিপর্যস্ত হয় বাইরের আক্রমণে নয়, অন্তর্গত পচনের ফলে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও সেই একই কাহিনি বারবার ফিরে আসে।

একসময় মনে হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস এক অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক শক্তি। সংগঠন বিস্তৃত, নেতৃত্ব অপ্রতিদ্বন্দ্বী, বিরোধীরা দুর্বল। কিন্তু ইতিহাস কখনও স্থির থাকে না। যে শক্তি আজ পর্বতের মতো দৃঢ়, আগামীকাল তার গায়ে ফাটল ধরতেই পারে। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম বৈশিষ্ট্য হলো—সে কাউকে স্থায়ী ভাড়াটিয়া বানায় না।

ক্ষমতার করিডরে আজ যারা একে অপরের বিরুদ্ধে ফিসফিস করছেন, আগামীকাল তারাই হয়তো নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করবেন। যারা আজ একটি পতাকা বহন করছেন, কাল অন্য পতাকার নিচে দাঁড়াতেও পারেন। রাজনীতিতে আনুগত্য প্রায়ই আদর্শের চেয়ে পরিস্থিতির সন্তান। তাই ভাঙনের শব্দকে হালকাভাবে নেওয়া যায় না। ভাঙন কখনও আকস্মিক নয়। ভবন ভেঙে পড়ার আগে যেমন দেয়ালে ফাটল ধরে, চুন খসে, লোহার রডে মরচে পড়ে; তেমনি রাজনৈতিক পতনের আগেও দেখা যায় ছোট ছোট লক্ষণ। প্রকাশ্য অসন্তোষ, গোপন বৈঠক, আঞ্চলিক গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন, উত্তরাধিকার নিয়ে অস্বস্তি—সবই আসন্ন ভূমিকম্পের পূর্বাভাস মাত্র। 

কিন্তু ক্ষমতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সে প্রায়ই এসব কম্পনকে গুরুত্ব দেয় না। কারণ ক্ষমতা নিজের প্রতিধ্বনিই সবচেয়ে বেশি শোনে। পিবি শেলির ‘ওজিম্যান্ডিয়াস’–এর ভগ্নমূর্তির মতো ইতিহাস আজও প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তিকে একই সতর্কবার্তা দেয়—দম্ভের আয়ু সীমিত, কর্তৃত্বেরও শেষ আছে, এবং কোনো পতাকাই চিরস্থায়ী নয়।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন কিছু বলে না। এখানেও এমন রাজনৈতিক শক্তি ছিল, যারা একসময় নিজেদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে করত। ক্ষমতার দম্ভে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে ইতিহাস যেন তাদের পক্ষেই স্থায়ীভাবে থেমে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ক্ষমতা কখনও স্থায়ী নয়। যে শক্তিকে একসময় অপরাজেয় মনে হয়েছে, সময়ের পরিবর্তন, জনমতের স্রোত কিংবা নিজেদের ভুলের কারণে সেই শক্তিই একদিন রাজনীতির প্রান্তে সরে গেছে।

তবু সেই শিক্ষা থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। এখনও কেউ কেউ এমন ভঙ্গিতে কথা বলেন, যেন রাজনৈতিক ভবিষ্যতের মালিকানাপত্র তাদের হাতেই লেখা আছে। আবার কেউ নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন, ‘অমুক দল’ আর কোনো দিন রাজনীতির মূল ধারায় ফিরতে পারবে না। কিন্তু ইতিহাস এমন নিশ্চয়তার ভাষা বোঝে না। রাজনীতিতে ‘কখনও না’ শব্দটি সবচেয়ে অনির্ভরযোগ্য শব্দগুলোর একটি। যে দল আজ দুর্বল, সে কাল শক্তিশালী হতে পারে; যে দল আজ ক্ষমতার শীর্ষে, সে কাল অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে। ইতিহাসের চাকা প্রায়ই অপ্রত্যাশিত দিকে ঘুরে যায়, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়, জনমতের নদী নতুন খাত খুঁজে নেয়।

তাই রাজনীতির সবচেয়ে করুণ সত্য হলো—যে শব্দ আমরা প্রথমে উপেক্ষা করি, শেষ পর্যন্ত সেই শব্দই হয়ে ওঠে পতনের বজ্রধ্বনি। আর ভাঙনের শব্দ, একবার যদি সত্যিই প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করে, তাকে থামানোর ক্ষমতা খুব কম মানুষেরই থাকে। কারণ কখন, কীভাবে, কোন মুহূর্তে গণেশ উল্টে যাবে—তার নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষমতা ইতিহাস আজ পর্যন্ত কাউকে দেয়নি।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

/ইউএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
লাকী আখান্দের সুরে এলো অপ্রকাশিত গান ‘উড়ছে ধুলো ছুটছে ঘোড়া’
লাকী আখান্দের সুরে এলো অপ্রকাশিত গান ‘উড়ছে ধুলো ছুটছে ঘোড়া’
লাকী আখান্দের সুরে এলো অপ্রকাশিত গান ‘উড়ছে ধুলো ছুটছে ঘোড়া’
লাকী আখান্দের সুরে এলো অপ্রকাশিত গান ‘উড়ছে ধুলো ছুটছে ঘোড়া’
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু
রামিসাসহ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার শুনানিতে হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ
রামিসাসহ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার শুনানিতে হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ
সর্বশেষসর্বাধিক