কয়েকজন নারী ও শিশু। কয়েকজন বৃদ্ধ। কারও হাতে একটি ছোট ব্যাগ, কারও কাঁধে একটি পুরোনো চাদর। সামনে কাঁটাতারের বেড়া, দুই পাশে সশস্ত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনী। তারা কোথায় যাবে, কোন দেশের নাগরিক, কে তাদের গ্রহণ করবে— এসব প্রশ্নের উত্তর তখন আর তাদের হাতে থাকে না। তারা দাঁড়িয়ে থাকে দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে, শূন্যরেখায়। এমন এক ভূখণ্ডে, যেখানে মাটি আছে, কিন্তু রাষ্ট্র নেই; মানুষ আছে, কিন্তু নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা নেই। আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা নিয়ে সময় পার করছে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক পুশইন-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো আমাদের সামনে এমনই কিছু দৃশ্য হাজির করেছে। সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে সংখ্যা আছে, কূটনৈতিক ভাষ্য আছে, নিরাপত্তার যুক্তি আছে। কিন্তু সংখ্যার আড়ালে যে মানুষগুলো রয়েছে, তাদের গল্পই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নয়, মানুষের কাহিনি দিয়েই লেখা হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সীমান্ত কখনোই শুধু সীমান্ত ছিল না। এটি স্মৃতি, বেদনা, স্থানচ্যুতি এবং পুনর্গঠনের ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগের সময় যে সীমান্তরেখা আঁকা হয়েছিল, তাতে একদিনে কেউ রাতারাতি ভারতীয় হয়ে গিয়েছিল, কেউ পাকিস্তানি। কিন্তু মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মীয়তা কিংবা জীবনের বাস্তবতা তো কাগজে আঁকা রেখা মেনে বদলে যায় না। মানার কথাও নয়। ফলে সীমান্তের দুই পাশে মানুষের যাতায়াত, বসতি পরিবর্তন এবং পরিচয়ের জটিলতা বহু দশক ধরে এই অঞ্চলের বাস্তবতা হয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্মও এক অর্থে সীমান্তের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা থেকে বাঁচতে প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই সময় ভারত শুধু সীমান্ত খুলে দেয়নি; আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবিকতার একটি শক্তিশালী অবস্থানও নিয়েছিল। সেই ইতিহাস আজও বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে আছে। কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হল— এটি কখনও স্থির থাকে না। সময়ের সঙ্গে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বদলায়, রাজনীতির ভাষা বদলায়, জাতীয়তাবাদের চরিত্র বদলায়।
গত তিন দশকে বিশ্বের অনেক জায়গার মতো দক্ষিণ এশিয়াতেও জাতীয়তাবাদের নতুন উত্থান ঘটেছে। এই জাতীয়তাবাদ কেবল দেশের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে ‘অন্যকে’ চিহ্নিত করার রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কে নাগরিক, কে বহিরাগত, কে নিরাপত্তার অংশ, কে নিরাপত্তা হুমকি — এই প্রশ্নগুলো ক্রমেই রাজনৈতিক শক্তির উৎসে পরিণত হয়েছে।
ভারতে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ। বিশেষ করে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজনীতিতে এই বিষয়টি বহুবার নির্বাচনি ইস্যু হয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) এবং তথাকথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’ বিতর্কের মধ্য দিয়ে এই প্রশ্ন আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়। অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ বিশ্বের বহু দেশেই রয়েছে। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা দক্ষিণ -পূর্ব এশিয়াতেও সীমান্ত ও অভিবাসন প্রশ্নে বিতর্ক আছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সাধারণত একটি মৌলিক নীতি মেনে চলার চেষ্টা করে— কোনও ব্যক্তিকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তার পরিচয় যাচাই এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
ভারতে বসবাসরত যদি কোনও ব্যক্তি সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক হন, তাহলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যও একটি স্বীকৃত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া রয়েছে। দুই দেশের প্রশাসন তথ্য বিনিময় করতে পারে, নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারে, আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু কাউকে জোর করে সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে দেওয়া বা শূন্যরেখায় ফেলে রাখা সেই স্বীকৃত প্রক্রিয়ার অংশ নয়।
আন্তর্জাতিক আইনও এ বিষয়ে কিছু মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি অনুযায়ী কোনও ব্যক্তিকে এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া যাবে না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রও মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার কথা বলে। অনেকেই যুক্তি দিতে পারেন, রাষ্ট্রের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেটি অবশ্যই রয়েছে। কোনও রাষ্ট্র তার সীমান্ত রক্ষা করবে, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন ঠেকাবে— এটি তার বৈধ দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্রের সেই অধিকার মানবাধিকারের মৌলিক নীতিগুলোকে অস্বীকার করার লাইসেন্স নয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের ভেতর থেকেও প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং কিছু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক প্রকাশ্যে বলেছেন যে, পুশব্যাক বা পুশইন কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এটি একটি রাজনৈতিক সমস্যাকে মানবিক সংকটে রূপান্তরিত করে। এই বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ বিষয়টি ভারত বনাম বাংলাদেশ নয়, বরং মানবিকতা বনাম রাজনৈতিক সুবিধাবাদের প্রশ্ন।
যদিও দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই নিজেদের সভ্যতার ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে। ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশই রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী, বঙ্গবন্ধু, নজরুল কিংবা লালনের মানবিক মূল্যবোধের কথা বলে। কিন্তু সীমান্তে যদি নারী, শিশু ও বৃদ্ধ মানুষ দিনের পর দিন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে থাকে, তাহলে সেই মানবিকতার দাবিগুলোও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সাম্প্রতিক পুশইন ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে এবং দুই দেশের সম্পর্কও নতুন এক সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বিষয়টি কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নয়— এর মধ্যে বৃহত্তর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বার্তাও থাকতে পারে।
এই বিশ্লেষণ সঠিক হোক বা না হোক, একটি বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই আর তা হলো— সীমান্তে উত্তেজনা কখনোই সুসম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে না। বরং এটি দুই দেশের জনগণের মধ্যে সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং ক্ষোভ বাড়ায়।
এ মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— এই পরিস্থিতির মোকাবিলা আবেগ দিয়ে নয়, রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞা দিয়ে করা। প্রথমত, সীমান্তে যাদের ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, তাদের পরিচয় যাচাইয়ের দাবি আরও জোরালোভাবে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলোকে সক্রিয়ভাবে অবহিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিষয়টিকে কেবল দ্বিপক্ষীয় বিরোধ নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্ন হিসেবেও তুলে ধরতে হবে। চতুর্থত, সীমান্ত পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হলেও বাংলাদেশকে সংযম বজায় রাখতে হবে। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে, সীমান্তে একটি ভুল সিদ্ধান্ত কখনো কখনও বহু বছরের কূটনৈতিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এখন সামনে প্রশ্ন এসে যাচ্ছে , দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো কি ভবিষ্যৎকে সহযোগিতার ভিত্তিতে নির্মাণ করবে, নাকি ভয়ের রাজনীতির ওপর দাঁড় করাবে? ইউরোপের ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে, শতাব্দীর পর শতাব্দী যুদ্ধের পরও রাষ্ট্রগুলো সহযোগিতার পথ খুঁজে নিতে পারে। দক্ষিণ এশিয়াও পারতো। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যদি পারস্পরিক সম্মান, আইনের শাসন ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারে— তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু দুই দেশ নয়, পুরো অঞ্চল।
শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো আমাদের সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে। তাদের হাতে কোনও পতাকা নেই। তারা কোনও কূটনৈতিক বার্তা বহন করে না। তারা কেবল বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। রাষ্ট্র দুটি যদি তাদেরকে কেবল সংখ্যা, নিরাপত্তা ঝুঁকি বা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখতে শুরু করে, তাহলে সীমান্ত আরও কঠোর হবে, কিন্তু মানবিকতা আরও দুর্বল হবে। আর ইতিহাসের শিক্ষা হলো— যে রাষ্ট্র মানবিকতাকে দুর্বল করে, সে শেষ পর্যন্ত নিজের নৈতিক শক্তিকেও দুর্বল করে। সীমান্ত রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু মানুষের মর্যাদা রক্ষা সভ্যতার দায়িত্ব। দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই দুই দায়িত্বের মধ্যে কোনটিকে আমরা বেশি গুরুত্ব দিই তার ওপর। আজ বাংলাদেশের সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো সেই প্রশ্নটিই আমাদের সামনে নতুন করে তুলে ধরছে।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী




