র‍্যাঙ্কিং ও গবেষণা: বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোথায়? 

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে
৩০ জুন ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ১২:০০

প্রতি বছর যখন কিউএস বা টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই)-এর বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাঙ্কিং বেরোয়, বাংলাদেশের শিক্ষা মহলে একটা পরিচিত হতাশার ঢেউ বয়ে যায়। কয়েক দিন সংবাদপত্রে আলোচনা হয়, সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন, উপাচার্যরা আশ্বাস দেন। তারপর সব চুপ। পরের বছর আবার একই ঘটনা। কিন্তু আমরা কি কখনও নিজেদের জিজ্ঞেস করেছি—আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসলে কীসের ওপর দাঁড়িয়ে? কংক্রিটের ভবনের ওপর, নাকি গবেষণা ও জ্ঞানের শক্ত ভিত্তির ওপর?

সর্বশেষ কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিংস ২০২৬ অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক তালিকায় জায়গা পেয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সর্বোচ্চ ৫৮৪তম স্থান পেয়ে তালিকার শীর্ষে। বুয়েট ৭৬১-৭৭০ ব্র্যাকেটে, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ৯৫১-১০০০ ব্র্যাকেটে, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ১০০১-১২০০ ব্র্যাকেটে, এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১২০১-১৪০০ ব্র্যাকেটে অবস্থান করছে। পৃথিবীর দেড় হাজারের বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আমাদের ‘সেরা’ প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে ৫৮৪ নম্বরে।

টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিং ২০২৬-এর চিত্রও কাছাকাছি। টিএইচই- এর ২০২৬ সালের তালিকায় ২,১৯১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের ২৮টি প্রতিষ্ঠান স্থান পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৮০১-১০০০ ব্র্যাকেটে রয়েছে। বুয়েট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ১০০১-১২০০ ব্র্যাকেটে। অর্থাৎ বিশ্বের ২,১৯১টি র‌্যাঙ্কপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ই শীর্ষ ৮০০-এ নেই। দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান শুরু হয়েছে ৮০১-১০০০ ব্র্যাকেট থেকে।।

এই সংখ্যাগুলো দেখে অনেকে হয়তো ভাবেন—এত মাথা ঘামানোর কী আছে? র‍্যাঙ্কিং তো পশ্চিমা মানদণ্ড, আমাদের বাস্তবতায় এটা মেলে না। কথাটা একদম ভুলও নয়। কিন্তু র‍্যাঙ্কিং কেবল পশ্চিমের দর্পণ নয়—এটা একটা প্রশ্নও ছুড়ে দেয়। সেই প্রশ্ন হলো— আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি নতুন জ্ঞান তৈরি করছে? আমাদের গবেষণা কি দেশের সমস্যার সমাধান করছে? আমাদের শিক্ষকরা কি পৃথিবীর বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছেন?

উত্তরটা খুঁজতে গেলে যে চিত্র সামনে আসে, সেটি বেশ অস্বস্তিকর। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ৫৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট অনুমোদিত বাজেট প্রায় ১৩,২২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে গবেষণায় বরাদ্দ মাত্র ১৯০ কোটি টাকা—অর্থাৎ মোট বাজেটের মাত্র ১.৪৪ শতাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও গবেষণায় বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ২.০৮ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়টির বাজেটের প্রায় ৯৮ শতাংশই গবেষণার বাইরে অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়; গবেষণার জন্য বরাদ্দ থাকে সামান্য।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, গবেষণার জন্য যে সীমিত অর্থ বরাদ্দ করা হয়, তারও সবটুকু কাজে লাগানো যায় না। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের প্রায় ১৫ শতাংশ ব্যয় করতে পারেনি। এমনও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে গবেষণা খাতে বার্ষিক ব্যয় ছিল অতি নগণ্য। টাকা ছাড়া গবেষণা হয় না—এটা সত্য। কিন্তু টাকা বরাদ্দ থাকার পরও যখন তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যায় না, তখন বোঝা যায় সমস্যাটি শুধু অর্থের নয়; গবেষণা-সংস্কৃতি, পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতারও।

জাতীয় পর্যায়ে চিত্রটা আরও ফ্যাকাসে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ জিডিপির মাত্র ০.৩ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) ব্যয় করে। ভারত ব্যয় করে প্রায় ০.৭ শতাংশ, চীন আড়াই শতাংশেরও বেশি, আর দক্ষিণ কোরিয়া—যে দেশটি ৫০ বছর আগেও বাংলাদেশের চেয়ে দরিদ্র ছিল—এখন জিডিপির ৫ শতাংশেরও বেশি গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করে। শিক্ষায় সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির ইতিবাচক উদ্যোগ অবশ্যই স্বাগত। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে তা ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এই অগ্রগতি সত্ত্বেও গবেষণায় বিনিয়োগ, গবেষণার অবকাঠামো এবং জ্ঞান উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।

তবে আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। ‘সায়েন্টিফিক বাংলাদেশ’-এর সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ১৫,৪১৩টি এস্কোপাস -ইনডেস্কড গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হলেও ২০২৫ সালে তা প্রায় ২১ শতাংশ বেড়ে ১৮,৬১৩টিতে পৌঁছেছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু প্রকাশনার সংখ্যা বাড়লেই যে জ্ঞানের গভীরতা বা উদ্ভাবনী সক্ষমতা বাড়ে, তা নয়। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশি গবেষকদের নামে কোনও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পেটেন্ট নিবন্ধিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, শীর্ষ ১৫টি গবেষণা অর্থায়নকারী সংস্থার মধ্যে ৯টিই বিদেশি। অর্থাৎ আমাদের গবেষণা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখনও বহুলাংশে বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল।

এবার একটু পেছনে যাই। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মাত্র ৬টি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। আজ সেই সংখ্যা ১৬৮— ৫৩টি সরকারি, ১১৫টি বেসরকারি। এত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, কিন্তু গবেষণার সংস্কৃতি কি তৈরি হয়েছে? বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুনাফার উদ্দেশ্যে। পাঠদান আছে, ডিগ্রি আছে, কিন্তু গবেষণার ফান্ড নেই, ল্যাব নেই, প্রশিক্ষিত গবেষকের পোস্ট নেই। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবার রয়েছে ভিন্ন সংকট—রাজনৈতিক নিয়োগ, দলীয় প্রভাব, মেধা নয় আনুগত্য দিয়ে পদোন্নতি, এবং অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার সংকোচন। এই পরিবেশে মেধাবী তরুণরা কেন দেশে থাকবেন? তারা পাড়ি জমান বিদেশে। আর দেশ হারায় তার সম্ভাবনা।

তুলনামূলক একটি চিত্র সামনে রাখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। একসময় বাংলাদেশের সঙ্গে প্রায় একই ধরনের উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি থাকা মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালায়া আজ কিউএস বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ ৬০-এর মধ্যে যার বর্তমান অবস্থান ৫৬। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর (এনইউএস) রয়েছে বিশ্বের সেরা ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি, যার বর্তমান অবস্থান ০৮। আর ভারতের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও ধারাবাহিকভাবে বিশ্বসেরাদের কাতারে উঠে আসছে। এই দেশগুলো কী করেছে? তারা গবেষণা ও উদ্ভাবনকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তুলনামূলকভাবে অধিক অ্যাকাডেমিক স্বায়ত্তশাসন দিয়েছে, শিল্পের সঙ্গে গবেষণার কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলেছে এবং মেধাবী শিক্ষক ও গবেষকদের ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেছে।

র‍্যাঙ্কিং মানেই সব নয়—এটি সত্য। কিন্তু র‍্যাঙ্কিং একটা আয়না। সেই আয়নায় আমরা যা দেখছি, সেটি দীর্ঘদিনের অবহেলার ছবি। একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার কারখানা নয়—সেটি জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র, সমাজের বিবেক, জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর। যেদিন আমাদের একজন তরুণ গবেষক বিদেশে না গিয়ে দেশে বসে আন্তর্জাতিক মানের কাজ করার সুযোগ পাবেন, যেদিন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভাবন বের হয়ে কৃষিতে, শিল্পে, স্বাস্থ্যে বিপ্লব আনবে, যেদিন গবেষণা হবে কংক্রিটের চেয়ে বড় বিনিয়োগ—সেদিনই র‍্যাঙ্কিংয়ের গোলকধাঁধা থেকে সত্যিকার মুক্তি মিলবে। সেই দিনের জন্য বেশি অপেক্ষা না করে আমাদের এখনই কাজ শুরু করতে হবে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
হাছান মাহমুদসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ
মানবতাবিরোধী অপরাধহাছান মাহমুদসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ
জার্মানির বাতিল গোল নিয়ে বিতর্ক, ভিএআর নিয়ে ক্ষুব্ধ ক্লপ
জার্মানির বাতিল গোল নিয়ে বিতর্ক, ভিএআর নিয়ে ক্ষুব্ধ ক্লপ
ময়লার স্তূপ থেকে তোলা নবজাতককে কোলে নিয়ে ইউএনও বললেন ‘আমি নিজেও মা’
ময়লার স্তূপ থেকে তোলা নবজাতককে কোলে নিয়ে ইউএনও বললেন ‘আমি নিজেও মা’
‘আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা সরকারের নেই’ 
‘আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা সরকারের নেই’ 
সর্বশেষসর্বাধিক