সরকারি সেবা অটোমেশন দুর্নীতি রোধে কতটা কার্যকর? 

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে
০৮ জুলাই ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১৪:০০

গত এক দশকে বাংলাদেশে ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে বাংলাদেশ— নানা নামে সরকারি সেবা অনলাইনে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। ই-নামজারি, ই-পাসপোর্ট, ই-জিপি (সরকারি ক্রয়ে ই-টেন্ডারিং), অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর, ওয়ান স্টপ সার্ভিসসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা রয়েছে এই তালিকায়। তবে প্রশ্ন হলো, এই বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দুর্নীতি কমাতে আসলে কতটা সফল হয়েছে?

সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, উত্তর যতটা আশাব্যঞ্জক হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবতা ততটা নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের করাপশন পারসেপশনস ইনডেক্স (সিপিআই) ২০২৫ অনুযায়ী বাংলাদেশের স্কোর ১০০-তে ২৪, যা বৈশ্বিক গড় স্কোর ৪২ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গড় ৪৫-এর তুলনায় অনেক পেছনে। ১৮২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৩তম সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, গত ২৫ জুন প্রকাশিত টিআইবি পরিচালিত ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এর ফলাফল। এই জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত, অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম এক বছরে— দেশের বিভিন্ন সরকারি ও আধা-সরকারি সেবা খাতে মোট প্রায় ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২৫ জুন, ২-০২৬)। একই সময়ে দুর্নীতির শিকার পরিবারের হার ৭০.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮১.৬ শতাংশে এবং ঘুষের শিকার পরিবারের হার ৫০.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে (বিডি টুডে, ২৫ জুন, ২-০২৬)।

সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ঘুষ-দুর্নীতির শীর্ষে রয়েছে ঠিক সেই সেবাগুলো, যেগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি ডিজিটাইজেশনের প্রচার চলেছে। পাসপোর্ট-সেবা গ্রহীতাদের ৭৬.৬ শতাংশ এবং বিআরটিএ সেবা গ্রহীতাদের ৬৩.৫ শতাংশ ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার হয়েছেন বলে জরিপে উঠে এসেছে। এরপরই রয়েছে— আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা (প্রথম আলো, ২৫ জুন, ২-০২৬)। জরিপে অংশ নেওয়া ৮১.৫ শতাংশ পরিবার মনে করে, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া এখনও কঠিন। টিআইবির প্রতিবেদনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে— বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল-সেবা চালু হলেও তা দুর্নীতি কমাতে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি, বরং দালালনির্ভরতা ও ডিজিটাল-ম্যানুয়াল ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা সেবাগ্রহীতাদের বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভূমি ব্যবস্থাপনা খাত এই প্রশ্নের একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত। ২০২০ সাল থেকে সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। বিভিন্ন ধরনের সেবার মধ্যে রয়েছে ই- নামজারি, ই-পর্চা, ও অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর আদায় ব্যবস্থা। কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। গত ডিসেম্বরে (২০২৫) দ্বিতীয় প্রজন্মের নতুন সফটওয়্যার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রযুক্তিগত দল গঠন ছাড়াই চালু করা হয়েছিল, যার ফলে এসএমএস নোটিফিকেশন না আসা এবং সিস্টেম ব্যর্থতার মতো সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করেছেন যে, নতুন সফটওয়্যারটি এখনও শুধু ঢাকা জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হচ্ছে (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১৯ জুলাই, ২০২৫)। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনা ও কারিগরি প্রস্তুতির ঘাটতিই এই ব্যর্থতার প্রধান কারণ। ফলে, নাগরিকরা এখনও নামজারির মতো মৌলিক সেবার জন্য দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীর দ্বারস্থ হচ্ছেন এবং ভূমি খাত জরিপে সর্বোচ্চ গড় ঘুষের অংকের তালিকায় স্থান পাচ্ছে।

এই দৃষ্টান্ত থেকে যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি পাওয়া যায় তা হলো— শুধু ওয়েবসাইট বা অ্যাপ চালু করলেই দুর্নীতি কমে না। প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন তা প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত (এন্ড- টু-এন্ড) মানুষের হস্তক্ষেপের সুযোগ বন্ধ করে দেয়। আংশিক ডিজিটাইজেশন—যেখানে আবেদন অনলাইনে জমা পড়ে কিন্তু অনুমোদন এখনও কোনও কর্মকর্তার বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল— নতুন এক ধরনের ব্যবস্থা তৈরি করে, যেখানে দালালরা সিস্টেমে আবেদন ঠিকভাবে জমা দেওয়ার নামে বাড়তি অর্থ আদায় করে।

টিআইবির জরিপ ও ভূমি খাতের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে অন্তত তিনটি কাঠামোগত সমস্যা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, জবাবদিহির ঘাটতি। অনলাইন সিস্টেম চালু হলেও যদি নির্দিষ্ট সময়ে সেবা না দেওয়ার জন্য কোনও কর্মকর্তাকে জবাবদিহি করতে না হয়, তাহলে বিলম্ব ও হয়রানি রয়েই যায় এবং সেই বিলম্বই ঘুষ আদায়ের সুযোগ তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ও ম্যানুয়াল ব্যবস্থার সমান্তরাল অস্তিত্ব। যখন একই সেবার জন্য অনলাইন ও অফলাইন— দুটো পথই খোলা থাকে, তখন দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তারা স্বাভাবিকভাবেই অফলাইন থেকে জটিল ও ধীর রাখার প্রণোদনা পান, যাতে মানুষ ঘুষ দিয়ে হলেও দ্রুত সেবা নিতে বাধ্য হয়। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অভাব। টিআইবি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে— নেপাল, লাওস, ভিয়েতনাম, তিমুর-লেস্তে, ইউক্রেন কিংবা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো, যাদের সিপিআই স্কোর একসময় বাংলাদেশের কাছাকাছি বা তার চেয়ে কম ছিল— এন্ড-টু-এন্ড ডিজিটাইজেশনের পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর মামলা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যকর করে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)।

তাহলে প্রযুক্তিকে সত্যিকার অর্থে দুর্নীতি রোধের হাতিয়ার বানাতে হলে কী করতে হবে? প্রথমত, প্রতিটি সেবায় এন্ড-টু-এন্ড ডিজিটাইজেশন নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত কোনও পর্যায়ে মানুষের অনুমোদনের সুযোগ না থাকে, বা তা ন্যূনতম পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি সেবার জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তা লঙ্ঘনের জন্য স্বয়ংক্রিয় জবাবদিহির ব্যবস্থা। যেমন- ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে স্বয়ংক্রিয় নোটিফিকেশন চালু করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, ডিজিটাল ও ম্যানুয়াল ব্যবস্থার মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে ধীরে ধীরে ম্যানুয়াল বিকল্প সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া দরকার। তাছাড়া, দুর্নীতির পুরোনো পথ খোলাই থেকে যাবে।

চতুর্থত, সিস্টেম চালুর আগেই পাইলট টেস্টিং, প্রযুক্তিগত দল গঠন ও ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়া নেওয়ার মতো মৌলিক প্রকল্প ব্যবস্থাপনার নিয়ম মেনে চলা জরুরি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞতা এখানে একটি সতর্কবার্তা। সবশেষে, প্রযুক্তির পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য আইনি পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনও সংস্কারই টেকসই হবে না।

পরিশেষে, বাংলাদেশে সরকারি সেবা অটোমেশনের যাত্রা প্রশংসনীয় হলেও এর ফলাফল এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় অর্জন করা সম্ভব হয়নি। টিআইবির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন আমাদের যে কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, সেটি হলো প্রযুক্তি নিজে থেকে দুর্নীতি দূর করে না, বরং তা মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ কতটা সংকুচিত করতে পারলো, তার ওপরই নির্ভর করে এই প্রক্রিয়ার সাফল্য। যতদিন না আমরা আংশিক ডিজিটাইজেশনের বদলে সম্পূর্ণ, জবাবদিহিমূলক এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা-সমর্থিত এক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছি, ততদিন সার্ভার আপডেট হলেও দুর্নীতির পুরোনো বাস্তবতা বদলাবে না।

লেখক: অধ্যাপক, লোক-প্রশাসন বিভাগ,  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদেশের মিশনে বড় রদবদল হচ্ছে
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদেশের মিশনে বড় রদবদল হচ্ছে
যুব মহিলা লীগ নেত্রী ও সাবেক প্যানেল মেয়র ফরিদা গ্রেফতার 
যুব মহিলা লীগ নেত্রী ও সাবেক প্যানেল মেয়র ফরিদা গ্রেফতার 
চাকরি ফেরত ও ভূতাপেক্ষ সুবিধা পাচ্ছেন সাবেক ১৬২ সেনা সদস্য
চাকরি ফেরত ও ভূতাপেক্ষ সুবিধা পাচ্ছেন সাবেক ১৬২ সেনা সদস্য
স্পেনের সঙ্গে সব বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশ ট্রাম্পের
স্পেনের সঙ্গে সব বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশ ট্রাম্পের
সর্বশেষসর্বাধিক