পর্যটন অর্থনীতি-২: বাংলাদেশের অদেখা সম্পদের অর্থনৈতিক মূল্য

সালেক উদ্দিন
০৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০

পর্যটন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে তথা বাংলাদেশকে বদলে দিতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা। তাদের মতে, কোনও দেশের অর্থনৈতিক শক্তি শুধু তার শিল্পকারখানা, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজসম্পদ বা কৃষি উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। আধুনিক অর্থনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে—অনেক সময় একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার মাটির নিচে নয়, বরং মাটির ওপর থাকে। সেই সম্পদ হতে পারে একটি সমুদ্রসৈকত, একটি বনভূমি, একটি ঐতিহাসিক নগরী, একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কিংবা একটি জীবনধারা।

বিশ্বের বহু দেশ তাদের এই অদৃশ্য সম্পদকে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে। মালদ্বীপের সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনও শিল্পাঞ্চল নয়; তার দ্বীপগুলো। সুইজারল্যান্ডের অন্যতম অর্থনৈতিক সম্পদ তার পাহাড়ি সৌন্দর্য। মিসর তার হাজার বছরের ইতিহাসকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দিয়েছে। থাইল্যান্ড প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তাকে একত্র করে একটি শক্তিশালী পর্যটন অর্থনীতি গড়ে তুলেছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দিকে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—আমরা কি আমাদের প্রকৃত সম্পদগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছি? বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই সাধারণত কক্সবাজার কিংবা সুন্দরবনের নাম উঠে আসে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা এই কয়েকটি স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পুরো দেশটিকেই যদি একটি অর্থনৈতিক সম্পদ মানচিত্র হিসেবে দেখা যায়, তাহলে বোঝা যায়—বাংলাদেশ এমন এক পর্যটন ভাণ্ডারের অধিকারী, যার বড় অংশ এখনও অব্যবহৃত বা স্বল্পব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে।

অর্থনীতির ভাষায় কোনও সম্পদ তখনই প্রকৃত সম্পদে পরিণত হয়, যখন তা থেকে নিয়মিত অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করা যায়। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের বহু পর্যটন সম্পদ এখনও ‘পটেনশিয়াল অ্যাসেট’ বা সম্ভাব্য সম্পদ হিসেবে রয়ে গেছে; ‘ইকোনোমিক অ্যাসেট’ বা অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারেনি।

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। আমরা কক্সবাজারকে একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেখি, কিন্তু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অনেক বড় কিছু। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলকে যদি সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করা যায়, তাহলে এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন করিডোরে পরিণত হতে পারে। সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন, অবকাশযাপন, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, স্বাস্থ্য পর্যটন, ক্রুজ পর্যটন এবং সামুদ্রিক বিনোদন—সব মিলিয়ে এটি একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

একইভাবে সুন্দরবনকে আমরা সাধারণত একটি বনভূমি হিসেবে দেখি। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটনের ভাষায় সুন্দরবন একটি ‘গ্লোবাল ন্যাচার অ্যাস্টে’। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল এবং অনন্য জীববৈচিত্র্যের এই অঞ্চল প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের জন্য বিরল আকর্ষণ। পৃথিবীর বহু দেশ একটি এমন সম্পদ অর্জনের জন্য শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করে; বাংলাদেশ এটি প্রাকৃতিকভাবেই পেয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের আরেকটি কৌশলগত সম্পদ। বান্দরবান, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি শুধু পাহাড়ি সৌন্দর্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এগুলো অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, ইকো-ট্যুরিজম এবং সাংস্কৃতিক পর্যটনের জন্যও অসাধারণ সম্ভাবনাময়। বর্তমান বিশ্বে তরুণ পর্যটকদের একটি বড় অংশ অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভ্রমণ খোঁজেন। তারা শুধু ছবি তুলতে যান না; তারা পাহাড়ে হাঁটতে চান, স্থানীয় সংস্কৃতিকে জানতে চান, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে চান। পার্বত্য চট্টগ্রাম সেই সুযোগ দিতে পারে।

সিলেট অঞ্চল বাংলাদেশের পর্যটন বৈচিত্র্যের আরেকটি অনন্য উদাহরণ। চা-বাগান, জাফলং, বিছানাকান্দি, রাতারগুল, লালাখাল এবং হাওরাঞ্চল মিলিয়ে সিলেট প্রকৃতির এমন একটি সংমিশ্রণ উপস্থাপন করে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় বিরল। বিশেষ করে পরিবেশভিত্তিক পর্যটন এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভ্রমণের বাজারে এই অঞ্চলের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি শুধু প্রকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাস এবং সংস্কৃতিও আমাদের বড় অর্থনৈতিক সম্পদ হতে পারে। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, মহাস্থানগড়, ময়নামতি, ষাটগম্বুজ মসজিদ, পানাম নগর, আহসান মঞ্জিল এবং অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পর্যটনের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে ঐতিহাসিক পর্যটন একটি বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে আমাদের অদৃশ্য সাংস্কৃতিক সম্পদগুলোকে।

পহেলা বৈশাখ, নবান্ন, বাউল সংস্কৃতি, লালনের দর্শন, নৌকাবাইচ, লোকসংগীত, আঞ্চলিক খাবার, গ্রামীণ জীবনধারা এবং বাংলার আতিথেয়তা—এসবও পর্যটনের ভাষায় মূল্যবান সম্পদ। আধুনিক পর্যটক শুধু কোনো স্থাপনা দেখতে চান না; তারা একটি সমাজকে জানতে চান, একটি সংস্কৃতিকে অনুভব করতে চান এবং একটি গল্পের অংশ হতে চান।এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বৈচিত্র্য।

পৃথিবীর খুব কম দেশেই সমুদ্র, বন, পাহাড়, নদী, দ্বীপ, প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতির এমন সমন্বয় একসঙ্গে দেখা যায়। বাংলাদেশের বিশেষত্ব এখানেই।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে—এই সম্পদগুলোর প্রকৃত বাজারমূল্য কত?

বাস্তবতা হলো, আমরা এখনও সেই মূল্য পুরোপুরি নির্ধারণই করতে পারিনি। কারণ একটি সমুদ্রসৈকত, একটি পাহাড় বা একটি বনভূমি নিজে নিজে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয় না। তার জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, দক্ষ মানবসম্পদ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বিপণন। অন্যভাবে বললে, সম্পদ থাকা এবং সম্পদকে কাজে লাগানো—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। আমাদের সম্পদের ঘাটতি নেই; ঘাটতি রয়েছে সেই সম্পদকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার। এই কারণে পর্যটন অর্থনীতির আলোচনা মূলত প্রকৃতি নিয়ে নয়; সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে। এটি কেবল ভ্রমণের প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রশ্ন। এটি শুধু সৌন্দর্যের গল্প নয়; এটি মূল্য সৃষ্টির গল্প।

বাংলাদেশের সামনে আজ একটি বিরল সুযোগ রয়েছে। আমরা যদি আমাদের অদেখা ও অব্যবহৃত সম্পদগুলোর প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য অনুধাবন করতে পারি এবং সেগুলোকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে পারি, তাহলে পর্যটন অর্থনীতি দেশের জন্য একটি নতুন প্রবৃদ্ধির খাত হয়ে উঠতে পারে। কারণ ইতিহাস বলছে, যে দেশ তার সম্পদকে চিনতে পারে, সেই দেশই তার ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে নির্মাণ করতে পারে।

আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই ভবিষ্যতের একটি বড় নাম হতে পারে পর্যটন অর্থনীতি।

লেখক:  সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে বিদেশ গেলেন স্বামী, বুলডোজার দিয়ে বাড়ি গুঁড়িয়ে দিলেন দ্বিতীয় স্ত্রী
প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে বিদেশ গেলেন স্বামী, বুলডোজার দিয়ে বাড়ি গুঁড়িয়ে দিলেন দ্বিতীয় স্ত্রী
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান-প্রশাসকদের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল দিতে ডিসিদের নির্দেশ
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান-প্রশাসকদের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল দিতে ডিসিদের নির্দেশ
ভারত থেকে আসছে কাঁচা মরিচ, কমবে দাম
ভারত থেকে আসছে কাঁচা মরিচ, কমবে দাম
জন্মদিনে ফোন করে সিনেমার প্রস্তাব শাকিবের, ববিতা চাইলেন ‘চ্যালেঞ্জিং গল্প’
জন্মদিনে ফোন করে সিনেমার প্রস্তাব শাকিবের, ববিতা চাইলেন ‘চ্যালেঞ্জিং গল্প’
সর্বশেষসর্বাধিক