বাংলাদেশে আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে অনেক কথা বলি। তাদের জন্য ভাতা দিই, বিশেষ দিবস পালন করি, কখনও কখনও চাকরির সুযোগও তৈরি করি। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন খুব কমই করি—আমরা কি আসলে জানি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হয়? উত্তরটি খুব আশাব্যঞ্জক নয়।
সেদিন এক করপোরেট অনুষ্ঠান শুরুর আগে দেখলাম, সবাই যার যার মতো গল্প করছেন, কুশলাদি বিনিময় করছেন। দর্শকের আসনে একজন চুপচাপ বসে আছেন। তিনি একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। কেউ তার সঙ্গে কথা বলছেন না। হয়তো কেউ বলতে গিয়েও পিছিয়ে এসেছেন। চেনা-জানা মানুষ হলে তবেই না গল্প করা যায়। অচেনা হলেও চোখাচোখি হলে তখন আলাপচারিতা শুরু করা যায়, পরিচিত হওয়া যায়, কথা বলা যায়। কিন্তু তার ক্ষেত্রে যেন সবাই একটু দ্বিধায়।
এই দ্বিধাটিই আসলে আমাদের সমস্যার একটি বড় প্রতিচ্ছবি। আমরা জানিই না কীভাবে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে হয়। ফলে অস্বস্তি এড়াতে আমরা কথা না বলাকেই সহজ পথ মনে করি।
আমাদের অনেকেই এখনও ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটিকেই একজন মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করি। আবার ‘এক হাত নেই’, ‘হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী’, ‘অন্ধ’, ‘বোবা’, ‘কানা’, ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বা ‘বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী’—এ ধরনের শব্দ বা বিশেষণও অনেকেই ব্যবহার করি।
এর কিছু ঐতিহাসিকভাবে প্রচলিত হলেও বর্তমানে এগুলোর সবই আসলে অগ্রহণযোগ্য, অসম্মানজনক বা মানুষকে তাঁর একটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে চিহ্নিত করে ফেলে। অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাই ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তি’ বলা অধিক যথাযথ। কারণ প্রতিবন্ধিতা তার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়; তিনি প্রথমে একজন মানুষ। একজনের প্রতিবন্ধিতা তার পরিচয়ের একটি অংশ মাত্র। মানুষ আগে, পরিচয় পরে।
শুধু ভাষার বিষয় নয়, আমাদের ধারণাগত সমস্যা আরও গভীর। আমরা অনেকেই মনে করি, অপ্রতিবন্ধী মানুষই যেন সমাজের ‘স্বাভাবিক’ মানুষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষের সক্ষমতার ধরন ভিন্ন হতে পারে। কেউ দেখতে পান না, কেউ শুনতে পান না, কেউ হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন, কেউ বুদ্ধিবৃত্তিক বা মানসিক প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে জীবনযাপন করেন। তাই ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অস্বাভাবিক’—এই বিভাজনটি যেমন বৈজ্ঞানিক নয়, তেমনি মানবিকও নয়।
আমরা প্রায়ই ভাবি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা সমাজ, আলাদা ব্যবস্থা, আলাদা পৃথিবী দরকার। অথচ প্রয়োজনটি সম্পূর্ণ উল্টো। প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে ভিন্ন সক্ষমতার মানুষও সবার মতো সমান সুযোগ, মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারেন। আর এখানেই আমাদের একটি বিব্রতকর বিষয়ের মুখোমুখি হতে হয়—আমরা জানিই না আমরা আসলে কতজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কথা বলছি।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে অন্তত একটি প্রতিবন্ধিতা রয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৬০৪ জন, যা মোট জনসংখ্যার ১.৪৩ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জাতীয় জরিপ ২০২১-এ প্রতিবন্ধিতার হার ২ দশমিক ৮ শতাংশ বলা হয়েছে। সাম্প্রতিক সরকারি নীতিগত আলোচনাতেও বিভিন্ন জরিপ ও তথ্যভাণ্ডারে এই হারের বড় পার্থক্যের কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ, আমরা শুধু তাদের অধিকার ও সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই; তাদের সংখ্যা নিয়েও আমাদের পরিসংখ্যান একমত নয়।
এটি নিছক পরিসংখ্যানের সমস্যা নয়। একজন নাগরিককে যদি তথ্যের মধ্যে ঠিকমতো দেখা না যায়, তাহলে নীতি, বাজেট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান কিংবা সামাজিক সুরক্ষার পরিকল্পনাতেও তিনি বাদ পড়ে যেতে পারেন। যাঁদের আমরা গুনতেই পারছি না, তাঁদের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা কীভাবে করব?
একটু আমাদের রাস্তার দিকে তাকাই। একই সড়কে রিকশা চলে, সাইকেল চলে, মোটরসাইকেল চলে, প্রাইভেট কার চলে, বাস চলে, ট্রাকও চলে। সবার গতি এক নয়। সবার আকারও এক নয়। রিকশা একটু ধীরে চলে, মোটরসাইকেল অনেক দ্রুত সরু গলি দিয়ে এগিয়ে যায়, বাস তার নিজস্ব গতিতে চলে, প্রাইভেট কারও চলে। তবুও একই রাস্তায় সবার চলার অধিকার আছে। রাস্তা এমনভাবেই পরিকল্পনা করা উচিত, যাতে ভিন্ন গতির ও ভিন্ন আকারের যানবাহন সবাই নিরাপদে চলতে পারে।
রাষ্ট্রও ঠিক তেমনই। সব নাগরিক একইভাবে চলবেন না, একই গতিতে হাঁটবেন না, একইভাবে শিখবেন না বা একইভাবে কাজ করবেন না। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবাইকে এক রকম বানানো নয়; বরং সবাই যেন নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী সমান সুযোগ নিয়ে এগোতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করা।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক অধিকার কাঠামোতেও স্বীকৃত। বাংলাদেশ ২০০৭ সালে জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ সনদ (সিআরপিডি) অনুসমর্থন করেছে এবং পরে ২০১৩ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করেছে। জাতিসংঘের নথিতে ২০১৩ সালের আইনটিকে সিআরপিডি-এর নীতি ও অধিকারকে দেশের আইনি কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিত করা কেবল দয়া, সহানুভূতি বা কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনি ও নাগরিক দায়িত্ব। দুঃখজনকভাবে, আমাদের অজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে।
ধরুন, একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে গেলেন। কতজন কর্মকর্তা জানেন, তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে হবে, সঙ্গে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে নয়? একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী গ্রাহক এলে কয়টা প্রতিষ্ঠান লিখিত বা ডিজিটাল যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখে? একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী কি অনায়াসে সেবাকেন্দ্র, হাসপাতাল, আদালত কিংবা সরকারি অফিসে প্রবেশ করতে পারেন? ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কলসেন্টারে কি শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য বিকল্প উপায়ে সেবা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে?
আমরা অনেক সময় সমস্যার কারণ মানুষটিকে ভাবি। অথচ সমস্যা আসলে পরিবেশে। যে ভবনে র্যাম্প নেই, সেখানে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। যে ওয়েবসাইট স্ক্রিন রিডার সমর্থন করে না, সেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যবহারকারী বাধার সম্মুখীন হন। অফিসের ইমেইলে কোনো ছবির সঙ্গে অল্টারনেটিভ টেক্সট বা বর্ণনা না থাকলেও একই সমস্যা তৈরি হয়। যে প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা অন্তর্ভুক্তিমূলক আচরণের প্রশিক্ষণ পান না, সেখানে গ্রাহক নয়, প্রতিষ্ঠানই অপ্রস্তুত।
এটি শুধু সেবার প্রশ্ন নয়; অর্থনীতির প্রশ্নও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার মাত্র ২২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৩২ শতাংশ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে মাত্র ১১ শতাংশ। অর্থাৎ, কর্মক্ষম ও কাজ করতে আগ্রহী বিপুলসংখ্যক মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগই যথাযথভাবে পাচ্ছেন না। তাঁদের একটি অংশকে আমরা সহায়তার প্রয়োজন আছে এমন মানুষ হিসেবে দেখি, অথচ তাঁদের বড় অংশকে কর্মী, উদ্যোক্তা, করদাতা ও অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার হিসেবেও দেখা যেত। এই জায়গাতেই আমাদের চিন্তার পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এখনও অনেক ক্ষেত্রে কল্যাণনির্ভর—কীভাবে তাদের সাহায্য করা যায়, কীভাবে ভাতা দেওয়া যায়, কীভাবে তাদের জন্য কিছু করা যায়। অথচ অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রশ্নটি উল্টো করে দেয়: কীভাবে এমন বাধাগুলো সরানো যায়, যাতে তারা নিজেরাই শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, ব্যাংকিং, প্রযুক্তি ও নাগরিক জীবনে পূর্ণ অংশগ্রহণ করতে পারেন?
এই কারণেই প্রতিবন্ধিতা নিয়ে সচেতনতা শুধু সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। এটি প্রতিটি চাকরিজীবীর জানা প্রয়োজন, শিক্ষকের জানা প্রয়োজন, চিকিৎসকের জানা প্রয়োজন, পুলিশের জানা প্রয়োজন, গণপরিবহনের কর্মীদের জানা প্রয়োজন, এমনকি দোকানদার ও নিরাপত্তারক্ষীদেরও জানা প্রয়োজন।
আজ বিশ্বের বহু দেশে ‘ডিজ্যাবিলিটি এটিকুয়েট’ বা প্রতিবন্ধিতা-সংবেদনশীল আচরণ কর্মক্ষেত্রের প্রশিক্ষণের অংশ। সেখানে শেখানো হয়—কীভাবে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সঙ্গে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে হয়, কখন সাহায্য করতে হবে, কীভাবে সাহায্যের প্রস্তাব দিতে হবে, কীভাবে একজন প্রতিবন্ধী গ্রাহককে স্বাধীনভাবে সেবা গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাহায্য করার আগে ব্যক্তির সম্মতি নেওয়া এবং তাঁর হয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়া।
বাংলাদেশে আমরা এখনও এই জায়গায় অনেক পিছিয়ে। অথচ বিষয়টি দয়া বা সহানুভূতির নয়; এটি নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন।
যখন আমরা কাউকে করুণা করি, তখন অজান্তেই নিজেদের একটি উঁচু অবস্থানে দাঁড় করাই। কিন্তু যখন সমান অধিকার নিশ্চিত করি, তখন তাঁকে একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিই। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রয়োজনকে ‘বিশেষ সুবিধা’ হিসেবে দেখা তাই সমস্যার অংশ। প্রয়োজনটি আসলে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকা উচিত। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ থাকা উচিত। প্রতিটি গ্রাহকসেবা প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবার ন্যূনতম মানদণ্ড থাকা উচিত। পণ্য, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা পরিকল্পনার সময় শুরু থেকেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া উচিত। সবচেয়ে ভালো হয়, তাঁদের জন্য কোনো পণ্য বা সেবা তৈরি করার সময় তাঁদের নিজেদেরও পরিকল্পনা ও পরীক্ষার অংশ করা গেলে।
অন্তর্ভুক্তি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি ন্যায্যতার আরেকটি নাম। আমরা যদি সত্যিই একটি উন্নত, মানবিক ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে শুধু ভবন নয়, আমাদের মনন ও চিন্তাধারাকেও স্মার্ট ও প্রবেশযোগ্য করতে হবে। শুধু র্যাম্প নির্মাণ করলেই হবে না; মানুষের মনেও প্রবেশের পথ তৈরি করতে হবে।
একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা বোঝা যায় শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো বা প্রযুক্তির উন্নতি দিয়ে নয়; বোঝা যায়, সে তার সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়া নাগরিককে কতটা মর্যাদা দিয়ে বাঁচার সুযোগ দেয়।
যেদিন আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আলাদা মানুষ হিসেবে নয়, আমাদেরই মতো একজন নাগরিক হিসেবে দেখতে শিখব, সেদিনই অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পথে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটি নেওয়া হবে।
কারণ একই রাস্তায় যখন রিকশা, বাস, মোটরসাইকেল আর গাড়ি একসঙ্গে চলতে পারে, তখন একই রাষ্ট্রে ভিন্ন সক্ষমতার মানুষও সমান মর্যাদা, সমান অধিকার এবং সমান সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারবেন। এটাই তো একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে স্বাভাবিক দৃশ্য।
লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।



