একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে সরকারের মান যাচাই হয় নীতিমালা, উন্নয়ন পরিকল্পনা কিংবা সরকারি লক্ষ্যমাত্রার দীর্ঘ তালিকা দিয়ে নয়। তিনি সরকারকে দেখেন সেবা নিতে গিয়ে। সরকারি হাসপাতালের কাউন্টারে, ভূমি অফিসে, বিদ্যালয়ে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে কিংবা এখন ক্রমেই বেশি ব্যবহৃত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রাষ্ট্রের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে। কাগজে একটি নীতি যতই আকর্ষণীয় হোক—একটি সাধারণ সেবা পেতে যদি একই অফিসে বারবার যেতে হয়, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়, ব্যক্তিগত পরিচয় কাজে লাগাতে হয়, কিংবা অনানুষ্ঠানিক অর্থ দিতে হয়, তাহলে নাগরিকের কাছে সুশাসনের অর্থই বদলে যায়।
এই কারণেই বাংলাদেশে জনসেবার মানোন্নয়নকে কেবল প্রশাসনিক সংস্কারের একটি বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি সুশাসনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, দ্রুত নগরায়ণ, ডিজিটাল সংযোগ এবং মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারের কাছে নাগরিকের প্রত্যাশাও বদলেছে। মানুষ এখন এমন সেবা চান—যা সময়মতো পাওয়া যাবে, সহজে পাওয়া যাবে এবং যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ। অথচ দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত প্রক্রিয়া, দুর্বল জবাবদিহি এবং প্রতিষ্ঠানভেদে সক্ষমতার বড় পার্থক্য এখনও জনসেবার মানকে প্রভাবিত করছে। সবার আগে মনে রাখা প্রয়োজন যে সক্ষম প্রতিষ্ঠান ছাড়া ভালো সেবা প্রদান করা সম্ভব নয়।
জনসেবার মান শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে সেই মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর, যারা সেবা প্রদান করেন। কর্মকর্তারা যদি পুরোনো ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে কাজ করেন, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সীমিত থাকে এবং তাদের কর্মমূল্যায়ন যদি সেবার ফলাফলের চেয়ে নিয়ম প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর বেশি নির্ভর করে, তাহলে ধারাবাহিকভাবে উন্নত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন। এ কারণে কর্মসম্পাদন, দক্ষতা এবং পেশাগত অগ্রগতির মধ্যে আরও কার্যকর সংযোগ প্রয়োজন। একজন কর্মকর্তার মূল্যায়নে তিনি কতগুলো সভা করেছেন বা কতটি ফাইল নিষ্পত্তি করেছেন, সেটিই একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। বরং, তার দায়িত্বের বিপরীতে কী ফল এসেছে এবং সেবাগ্রহীতা কী ধরনের পরিবর্তন অনুভব করেছেন, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। সাধারণ ও গতানুগতিক প্রশিক্ষণের পরিবর্তে কর্মকর্তাদের প্রকৃত দক্ষতার ঘাটতি শনাক্ত করে প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা করা দরকার। ডিজিটাল দক্ষতা, নীতি বাস্তবায়ন, নৈতিকতা, নেতৃত্ব এবং নাগরিকের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ এখানে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। এর অর্থ আবার অসংখ্য নতুন কর্মসম্পাদন সূচক তৈরি করা নয়, কারণ দুর্বলভাবে তৈরি সূচক নিজেই আরেকটি আমলাতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হতে পারে।
কর্মসম্পাদন ব্যবস্থার আসল বিষয় হলো, সেটি প্রতিষ্ঠানকে সমস্যা শনাক্ত করতে এবং নাগরিকের সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে পারছে কিনা, তা বিবেচনা করা।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে এ ক্ষেত্রে কিছু শিক্ষা নেওয়া যায়, যদিও কোনও দেশের মডেল সরাসরি বাংলাদেশে প্রয়োগ সম্ভব নয়। সিঙ্গাপুরের জনপ্রশাসনে মেধা, পেশাগত উন্নয়ন ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসম্পাদন ব্যবস্থাপনার ওপর দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রুয়ান্ডার ইমিহিগো পদ্ধতিতে সরকারি পর্যায়ে কর্মসম্পাদন চুক্তি ও পরিমাপযোগ্য অঙ্গীকার ব্যবহারের
অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসব উদাহরণের প্রাসঙ্গিক দিকটি হলো, প্রত্যাশিত ফল স্পষ্ট হলে এবং সেই ফল যাচাইয়ের সুযোগ থাকলে দায়িত্ব ও জবাবদিহি আরও অর্থবহ হয়।
এটি এখন প্রমাণিত যে ডিজিটাল সেবা মানেই ডিজিটাল রূপান্তর নয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ডিজিটাল জনসেবায় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, কতগুলো সেবা অনলাইনে নেওয়া হয়েছে তা নয়—বরং বিভিন্ন সেবা একে অপরের সঙ্গে কতটা যুক্ত। একজন নাগরিককে একই তথ্য যদি ভূমি অফিস, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, কর কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনও সরকারি সংস্থাকে বারবার দিতে হয়, তাহলে সেবা ডিজিটাল হলেও প্রশাসনিক ভোগান্তি পুরোপুরি কমে না। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার তথ্যব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর আন্তসংযোগ গড়ে উঠলে একই তথ্য বারবার সংগ্রহের প্রয়োজন কমবে, সেবা দেওয়ার সময় কমতে পারে এবং একটি আবেদন বা সিদ্ধান্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে তা খুঁজে বের করা সহজ হবে।
ভূমি প্রশাসন, লাইসেন্স, কর, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় সরকার সেবায় সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। এতে নাগরিকের সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের সুযোগও কমতে পারে।
এস্তোনিয়ার ডিজিটাল সরকারের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। দেশটির অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, সফল ডিজিটাল সরকার শুধু কিছু ওয়েবসাইট ও অ্যাপের সমষ্টি নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরস্পর সংযুক্ত প্রশাসনিক অবকাঠামো।
কিন্তু প্রযুক্তিকে সমাধানের একমাত্র পথ ভাবাও ভুল হবে। একটি ধীর, জটিল ও অপ্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াকে অনলাইনে নিয়ে গেলে সেটি আধুনিক দেখাতে পারে, কিন্তু নাগরিকের ভোগান্তি সব সময় কমে না। তাই ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সরলীকরণ এবং জবাবদিহির প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বে বিবেচনা করতে হবে।
পাশাপাশি সেবা সংক্রান্ত অভিযোগে এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর আছে তাও সেবা মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। সিটিজেন চার্টার, অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা এবং প্রকাশ্য সেবামান নাগরিককে জানাতে পারে—তিনি কী সেবা পাওয়ার অধিকারী, কত সময়ের মধ্যে তা পাওয়ার কথা এবং ব্যত্যয় ঘটলে কোথায় অভিযোগ করবেন। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, অভিযোগ করার পর কী ঘটে।
কোনও প্ল্যাটফর্মে হাজার হাজার অভিযোগ জমা হলো, কিন্তু সেগুলো থেকে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলো না বা একই সমস্যা বারবার ঘটতে থাকলো, তাহলে অভিযোগ ব্যবস্থাটিই আরেকটি প্রশাসনিক স্তরে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। অভিযোগের সংখ্যা গণনার চেয়ে অভিযোগ থেকে কী শেখা হলো এবং তার ভিত্তিতে কী পরিবর্তন আনা হলো, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এ কথাও মনে রাখতে হবে যে নাগরিক শুধু সেবাগ্রহীতা নন, তথ্যের উৎসও। প্রশাসনিক তথ্যব্যবস্থায় এমন অনেক বিষয় ধরা পড়ে না, যা নাগরিক প্রতিদিন অনুভব করেন। কোন অফিসে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সারি, কোন ফরমটি বোঝা কঠিন, কোন নিয়ম অপ্রয়োজনীয় এবং কোথায় ঘোষিত সেবা প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছাচ্ছে না, নাগরিকের অভিজ্ঞতা এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। এই ক্ষেত্রে, নিয়মিত নাগরিক মতামত, সেবা মূল্যায়ন এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক বাজেটিং সেই অভিজ্ঞতাকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের উপযোগী তথ্যে রূপ দিতে পারে।
ব্রাজিলের পোর্তো আলেগ্রেতে অংশগ্রহণমূলক বাজেটিংয়ের অভিজ্ঞতা স্থানীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণে নাগরিকদের সরাসরি যুক্ত করার একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সমস্যা ও সেবার প্রয়োজন এক নয়, অথচ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখনও অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রনির্ভর। শুধু স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্ব হস্তান্তর করলেই অবশ্য সমাধান হবে না। অর্থ, দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছাড়া বিকেন্দ্রীকরণ কার্যকর হওয়ার সুযোগ সীমিত। যে কাজের জন্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহি করতে হবে, সেই কাজ করার মতো সম্পদ ও প্রশাসনিক সক্ষমতাও তাদের থাকতে হবে। ভারতের কেরালার বিকেন্দ্রীভূত শাসনের অভিজ্ঞতা স্থানীয় পরিকল্পনা, দায়িত্ব ও সেবা প্রদানের মধ্যে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে কিছু প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা দেয়।
সব সেবা প্রদানের দায়িত্ব কেবল সরকারের ওপর চাপালে হবে না। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক উন্নয়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে জনসেবা ব্যবস্থায় অবদান রাখতে পারে। যেখানে সরকারের সক্ষমতার প্রকৃত ঘাটতি রয়েছে, সেখানে অংশীদারত্ব কার্যকর হতে পারে। কিন্তু সেবা অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেওয়া হলেও রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সেবার মান, সহজপ্রাপ্যতা, জবাবদিহি এবং ন্যায্যতা নিশ্চিত করার চূড়ান্ত দায়িত্ব সরকারেরই। কারণ সেবা আউটসোর্স করা যায়, নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দায় আউটসোর্স করা যায় না।
সর্বোপরি, সেবা প্রদানে সাফল্যের সংজ্ঞা বদলানো দরকার। জনসেবা সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি সম্ভবত এখানেই। প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আমরা সাধারণত কত টাকা ব্যয় হলো, কতটি সভা অনুষ্ঠিত হলো, কতজন কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ পেলেন, কতটি প্রকল্প অনুমোদিত হলো বা কতটি ফাইল নিষ্পত্তি হলো, এসব সহজে পরিমাপ করি। কিন্তু নাগরিকের প্রশ্ন ভিন্ন। নাগরিক জানতে চান—তার কাজটি কত দিনে হলো, কতবার অফিসে যেতে হলো, নিয়মটি বুঝতে পেরেছেন কিনা, একই সেবা পেতে সবাইকে একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে কিনা। অর্থাৎ প্রশাসনিক কার্যক্রমকে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি না ধরে নাগরিকের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশের সামনে জনসেবা সংস্কারের নতুন কোনও দীর্ঘ তালিকা তৈরিই সম্ভবত সবচেয়ে জরুরি কাজ নয়। প্রয়োজনীয় অনেক উপকরণ ইতোমধ্যে কোনও না কোনোভাবে রয়েছে, যেমন ডিজিটাল সেবা, সিটিজেন চার্টার, অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, কর্মসম্পাদন ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ। কঠিন কাজ হলো এগুলোকে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হিসেবে না চালিয়ে একটি কার্যকর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিচালনা করা এবং সাফল্যকে নাগরিকের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিচার করা।
রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা বড় কোনও নীতিগত ঘোষণায় একদিনে তৈরি হয় না। প্রতিদিন অসংখ্য সাধারণ ঘটনায় তার নির্মাণ হয় যেমন- একটি জন্মনিবন্ধন পেতে, ভূমি সংক্রান্ত সেবা পেতে, হাসপাতালে সেবা নিতে, লাইসেন্স নবায়ন করতে কিংবা সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা পেতে গিয়ে। এসব অভিজ্ঞতা যখন সহজ, দ্রুত, ন্যায্য ও অনুমানযোগ্য হবে, তখন উন্নত জনসেবা সরকারি প্রতিশ্রুতির বিষয় হয়ে থাকবে না, নাগরিক নিজের অভিজ্ঞতায় তার পরিবর্তন দেখতে পাবেন।
লেখক: জনপ্রশাসন এবং জননীতি বিশ্লেষক