ট্রাম্পড্

Send
কাজী আনিস আহমেদ
প্রকাশিত : ১২:১৪, জানুয়ারি ২৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪৩, জানুয়ারি ২৪, ২০১৭

কাজী আনিস আহমেদশেষ পর্যন্ত আশঙ্কাটা বাস্তব হলো। ট্রাম্প এখন হোয়াইট হাউসে।
যে নগণ্য মানুষেরা তার উত্থানে ভূমিকা রেখেছেন, তারা ছাড়া আর কেউ এতে শিহরণ বোধ করেননি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউ ইয়র্কের একজন শীর্ষ ধনী। ছিলেন উদারবাদী ভাবধারার মানুষ। টেলিভিশনে জায়গা পেতে যখন বহু টাকা দিয়ে এয়ার টাইম কিনতে হয়, ট্রাম্প বিনে পয়সায় ট্রাম্প ব্র্যান্ডের প্রচারণার সুযোগ নিতে চেয়েছিলেন। এই ব্র্যান্ডটি ট্রাম্পের নিজের কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।
সেই উদারবাদী ট্রাম্পই প্রচারণায় নেমে এমন সব মানুষের মুখোমুখি হলেন, যাদের সঙ্গে আগে কখনও চেনাজানা হয়নি তার। এদের সঙ্গে ভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলেন ট্রাম্প। আলাপ করতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করলেন, যতোই তিনি ধর্মীয় ও জাতিগত সহিষ্ণুতা অতিক্রম করে বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা বলছেন, ততোই তা কাজে লাগছে। এক সময়কার শিল্প-সমৃদ্ধ তবে এখন ভয়ঙ্করভাবে পতিত যে অঞ্চলগুলো (রাস্ট-বেল্ট);  শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানরা উল্লসিত হয়ে উঠছে। তার স্থূলবুদ্ধি, সীমিত শব্দভাণ্ডার এবং বাজেভাবে বক্তব্যের পুনরাবৃত্তির অভ্যাস রয়েছে। এ যেন শাপে বড় হয়েছে। ওইসব শ্বেতাঙ্গ মানুষদের সংস্কৃতিতে ট্রাম্পের কথাবার্তার ধরন গভীর অনুররণ তুলেছে।
এ যুগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় জাতিগত ইস্যুটিকে এতো শক্তিশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে কেউ তা ভাবেনি। কিন্তু যা ঘটার সেটা ঘটেই গেছে। ঘটে গেছে কেননা সত্যিকারের প্রগতির পথে কয়েক দশকের যাত্রার পরও বর্ণবাদী শ্রেষ্ঠত্বের দিন শেষ হয়ে যায়নি। তার চেয়ে বেশি করে শ্বেতাঙ্গদের একটা বড় অংশের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা রয়ে গেছে সমাজের অভ্যন্তরে। আমরা যতোটা জানি, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে এই শ্বেতাঙ্গ-প্রাধান্য জারি আছে।

বলছি না ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া প্রায় ৬ কোটি মানুষের সবাই বর্ণবাদী। তবে সত্যিটা হলো, প্রচারণায় ব্যবহৃত ট্রাম্পের লোভনীয় সব প্রস্তাবনায় মশগুল হয়ে তারা তার প্রচারিত বিদ্বেষমূলক বক্তব্যগুলোকে হয়তো এড়িয়ে যেতে চেয়েছে।

হুম, এক সময়কার শিল্প-সমৃদ্ধ রাস্টবেল্ট অঞ্চলগুলো পতিত হয়েছে। সেগুলো এখন ভেসে যাচ্ছে আফিমের বন্যায়। অনেক গরীব শ্বেতাঙ্গই মনে করে, বৈষম্য নিরসনমূলক কর্মসূচিগুলোর সুযোগ নেওয়া তাদের জন্য যথাযথ নয়। অবৈধ অভিবাসীদের সঙ্গে যেমন করে তাদের প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ করতে হয়, উদারবাদীদের ক্ষেত্রে তেমনটা হয় না। অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পতনের পাশাপাশি তারা এটাও অনুভব করে যে, ক্ষমতাশালীদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে তাদের কথা শুনবে। বোঝার চেষ্টা করবে।

রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানোটা অন্যায় কিছু নয়। তবে শ্রমজীবী কিংবা গ্রামীন শ্বেতাঙ্গরাই কেবল কর্মসংস্থানজনিত সংকটে ভুগছেন এমন নয়। কর্মসংস্থানজনিত সংকটের অভিঘাত পড়েছে কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমজীবীদের ওপরও। আর সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে এস্টাবলিশমেন্ট তো বরাবরই অসন্তুষ্ট থাকে। এস্টাবলিশমেন্টের সব সময়ের জন্য বড় বড় শিল্প ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ‘অদৃশ্য হাত’র ছোঁয়া আছে, যেন একে কিনে রেখেছে তারা। এই শতাব্দীর শূন্য দশকে তারুণ্যে পৌঁছেছে যে উদারবাদী তরুণরা, তাদের অনেকেরই ঋণ ছাড়া পড়ার খরচ জোটানোর উপায় নাই। আবার উচ্চশিক্ষা নিয়েও তারা বিপাকে পড়েন। কেননা যথাযথ কাজের দেখা মেলে না। তবে অন্য সম্প্রদায়ের কারণে তাদের জীবনে এইসব ভয়াবহতা নেমে এসেছে; তা মনে করেন না ওই উদারবাদী তরুণরা। তবে তারা কোনওভাবেই মনে করে না, অন্যান্য সম্প্রদায়ের ঘরহারা-সহায়হারা মানুষরা তাদের দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী।

তো, ট্রাম্পের উত্থান সম্ভব হয়েছে বর্ণবাদবিরোধী কোনও শক্ত অবস্থানের অনুপস্থিতিতে। বর্ণবাদী ঘৃণা আর বিদ্বেষের প্রচারণায় কোনও হুমকি অনুভব করেননি তারা। আদতে বর্ণ ব্যাপারটা একটা অধিকারগত প্রশ্ন এবং কোনও একটি অধিকারগত প্রশ্নকে অস্বীকার করা গেলে আস্তে আস্তে ক্ষমতাশালীরা অন্যান্য অধিকারগত প্রশ্নগুলোকেও অস্বীকার করার সুযোগ পায়। এতে ‘অধিকার’ ব্যাপারটাই হুমকিতে পড়ে যায়। বোঝাই যায় যে রক্ষণশীলরা তাদের সমর্থকদের বাজে আচরণের কারণে বিব্রত। বিদ্বেষের যে নয়া ব্যাকরণকে ট্রাম্প নির্বাচনি প্রচারণার মতাদর্শ বানিয়েছিলেন, সেই বিদ্বেষ দিনকে দিন সংঘবদ্ধ হচ্ছে। বিদ্বেষগুলোকে এড়িয়ে গেলে এগুলো আরও শক্তিশালী হবে।

কৌশলগত ভুলও রয়েছে। গিংরিচ বিপ্লব থেকে আজকে এসে ট্রাম্পের রাস্ট-বেল্ট আস্ফালন পর্যন্ত নেওয়া পদক্ষেপগুলোতে কেবল কাগুজে রক্ষণশীলতা কমানো গেছে। উদারবাদীরা বিপথগামী হলে চলবে না। তাদের মধ্যকার পারস্পরিক আলাপ-আলোচনাকে বিপদগ্রস্ত করে; এমন পথে পরিচালিত হওয়া যাবে না। হুম, রুশ হ্যাকিং-এর বিষয়টি সত্য। তবে তা নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পেরেছে কিনা, তা নিয়ে এখনও মীমাংসা হয়নি। বিপরীতে উপযুক্ত সময়ে একজন দলঘেঁষা এফবিআই পরিচালকের হিলারিকে দায়মুক্তির সুযোগ দেওয়ার প্রভাবটা ছিল অনেক বেশি প্রত্যক্ষ। রুশ হ্যাকিং-এর কথিত অভিযোগ মার্কিন সমাজের জন্য একটা নতুন ইশারা বটে। আবার  ঠুটোঁ জগন্নাততূল্য ডানপন্থী অসত্য প্রচারণাগুলো হয়তো এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নতুন ব্যঞ্জনা পেয়েছে। তবে মুক্তমতের সমাজে এটা খুব সাধারণ ঘটনা।

লিবারেল এবং ডেমোক্র্যাটরা যেখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়, তা হলো – মিশিগান, উইসকনসিন এবং পেনিসিলভ্যানিয়া। এসব জায়গায় শেষদিকে হিলারি ক্লিনটনের প্রচারণা তেমন ছিল না। নির্বাচনি শিবিরের ম্যানেজারদের অপ্রীতিকর আচরণ আর অদক্ষতার কারণে হিলারি ক্লিনটনকে হারতে হয়েছে। আর যে শিবিরটি সরকার পরিচালনার মূল দায়িত্বই ঠাহর করতে পারেনি বলে মনে হয়েছে, সেই রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্প ২৭০ ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট নিশ্চিত করেছে। সবচেয়ে বড় বিজয়ের গৌরব অর্জন করে নিয়েছে।

এতে করে কিছু সুবিধাও পেতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। পরেরবার তাদের নির্বাচনি শিবির আরও জোরদার হতে পারে। রাশিয়া কিংবা ডানপন্থীদের নিয়ে ভুয়া খবরগুলো নিয়ে মোকাবিলার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে। ইকো চেম্বার নিয়েও কাজ করার সুযোগ আছে তাদের।

ইকো চেম্বার হলো, একই খবর বা ব্যাপার বারবার উচ্চারিত হওয়া বা ছড়ানো। এই বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। রিপাবলিকানরাও এই জয় খুব সহজে পায়নি। এই সময়টাতে তাদের উদ্দেশ্য ও কারণ নিয়ে স্পষ্ট ধারণা ও লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন ছিল। ইকো চেম্বারকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তবে ইকো চেম্বারের তথ্যগুলো কিছুটা পরিবর্তন করা সম্ভব এবং এতে করে ভালো ফলও আসতে পারে। ট্রাম্পের অভিষেক থেকে ‘নারী পদযাত্রা’ ছিল অনেক বেশি অনুপ্রেরণাদায়ক। আর ডেমোক্র্যাটদের জন্য নতুন করে শুরু করার এটাই উপযুক্ত সময়।

বলা হয়ে থাকে, ‘ফ্যাসিবাদের কালো ঘোড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে ইউরোপে যায়। যুক্তরাষ্ট্র এই ঝুঁকি থেকে মুক্ত।’ রাষ্ট্র পরিচালনার তিন স্তম্ভ আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ, বিচারবিভাগ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সবগুলো ক্ষেত্রই কর্তৃত্ববাদের হুমকি সামলে আসছে। তবে এখন সেই নিরাপত্তা বলয় অনেকটাই দুর্বল।

এখন রিপাবলিকানরা সরকার, কংগ্রেস, রাজ্য সবজায়গাতেই আধিপত্য বিরাজ করছে। এফবিআই প্রধানও রিপাবলিকানদের পাঁড় সমর্থক। রক্ষণশীলদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সুপ্রিম কোর্টেও রদবদল আনতে পারেন ট্রাম্প। তবে রিপাবলিকান পার্টিসহ যুক্তরাষ্ট্রের পুরো জটিল রক্ষণশীল ব্যবস্থা ট্রাম্পের আক্রমণের শিকার হয়েছে।

এ সময়ে মার্কিনিদের অধিকার সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করা সবাই ভাবতে পারে, ইতিহাসে এমন অনেক সময়ই আসে, যেখানে নিরপেক্ষ বলে কিছু থাকে না। এই নিরপেক্ষতায় থাকে অশুভের কাছে আত্মসমর্পণের হুমকি।

মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো সবসময়ই জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জনগণের প্রত্যাশার চাপ তারাই বাড়িয়ে দেয়। মানুষ যতটা না ভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী তারা। তাই যে ব্যক্তি সরাসরি সংবাদমাধ্যমকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে তাকে কিভাবে সামলাবে তারা।

বেশিরভাগ সমাজ যখন এই ফ্যাসিবাদী বাস্তবতাকে স্বীকার করছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাদের বোকামোর জন্যই নয়, তাদের বিভ্রান্তির জন্যও সময় থাকতে তা বুঝতে পারেনি। যে দেশ গণতন্ত্র নিয়ে এত গর্ব করে তাদের জন্য এটা আসলেই স্বীকার করাটা লজ্জাকর। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমনটাই ঘটছে।

লেখক: প্রকাশক, বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউন এবং কথাসাহিত্যিক

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ