প্রশ্নপত্র ফাঁস: ভেতরে ইঁদুর রেখে বাইরে মাটি

Send
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশিত : ১২:২৬, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৯, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৮

শুভ কিবরিয়াপ্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো যায়নি। রাষ্ট্র তার সকল ক্ষমতা ব্যবহার করেও এই বিপদ ঠেকাতে পারেনি। চলমান এসএসসি পরীক্ষার সকল প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। সে কারণে সরকারি তরফে নানারকম নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারই একটি হচ্ছে আগামী বছর থেকে এসএসসি পরীক্ষা নতুন পদ্ধতিতে নেওয়া হবে। এই পদ্ধতিতে একটি প্রশ্নব্যাংক তৈরি করা হবে কয়েক শত প্রশ্ন নিয়ে। এটা একটা উদ্যোগ। আরেকটি উদ্যোগ হচ্ছে আগামী বছর থেকে এমসিকিউ তুলে নেওয়া হবে। অর্থাৎ বহুল আলোচিত মাল্টিপল চয়েস প্রশ্ন আর থাকছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনে করছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে এসব উদ্যোগ ভালো ফল দেবে। যদিও ইতোপূর্বে প্রশ্ন ফাঁসকারীরা নতুন নতুন পথ তৈরি করে সরকারি বাধা উৎরে তাদের কাজ অব্যাহতই রেখেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগাম ঘোষণা দিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। প্রশ্ন কেনার জন্য জয়েন্ট ফান্ড তৈরি করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ইকোনমি চালু করা হয়েছে। সরকারি সকল বাধা উৎরেই অবলীলায় এসব কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে শিক্ষামন্ত্রণালয় এডহক ভিত্তিতে ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিতে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। আদালত পর্যন্ত গেছে বিষয়টি। আদালত প্রশ্নপত্র ফাঁস বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করে বিচারিক ও প্রশাসনিক দুটি পৃথক কমিটি করে দিয়েছে। এসব আমলাতান্ত্রিক পথে মিটিং, সিটিং, ইটিং হয়েছে বিস্তর, তবু প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো যায়নি। সরকারের ডিজিটাল ও এনালগ সকল উদ্যোগ ব্যর্থ করে দিয়েছে শক্তিমান দুর্নীতিবাজ চক্র।

কেন প্রশ্নফাঁস?

প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে কেন? এই প্রশ্নের সহজ কোনও উত্তর জানা নেই। তবে বাজারের নিয়ম বলে চাহিদা একটা বড় কারণ। কষ্ট করে পড়াশোনা করে পাস করার চেয়ে পয়সার বিনিময়ে প্রশ্ন কিনে চটজলদি ভালো রেজাল্ট করার সহজ সুযোগের একটা বড় বাজার তৈরি হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীরা সেই বাজারের চাহিদা মেটাচ্ছে বড় মুনাফার বিনিময়ে। অর্থনীতির ভাষায় চাহিদা আর জোগানের এই খেলার চালক হিসাবে আছে দুর্নীতির বড় চক্র। প্রশ্ন যারা তৈরি করেন, যারা প্রশ্ন মডারেট করেন, যারা প্রশ্ন ছাপেন, যারা ছাপানো প্রশ্ন প্যাকেট করেন, যারা প্রান্তিক পর্যায়ে প্রশ্ন সরবরাহ করেন, ট্রেজারিতে যারা এই প্রশ্ন নিয়ে যান, ট্রেজারি থেকে পরীক্ষার হলে যারা প্রশ্ন পৌঁছে দেন, সেখান থেকে যারা এই প্রশ্ন পরীক্ষার হলে সরবরাহ করেন–এর যে কোনও জায়গা থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে পারে। যাদের ওপর দায়িত্ব থাকে তারা যেকোনও পর্যায়ে অসততা ও অসাধুতার আশ্রয় নিলেই এই বিপদ ঘটে। খবর পাওয়া যাচ্ছে এই অসাধুতার একটা বড় চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্র শুধু শক্তিমানই না, তারা প্রযুক্তি ব্যবহারেও দক্ষ। মানুষের লোভ আর অনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করেই টিকে আছে এই দুর্বৃত্ত চক্র। এবং যারা এই দুর্বৃত্তায়ন ভাঙার দায়িত্বে আছেন তাদের যোগসাজশেই ঘটছে এই বিপদ।

নিত্যনতুন নিরীক্ষার বিপত্তি

বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে বছরের পর বছর ধরে। তবু কোনও স্থিরতা আসেনি এক্ষেত্রে। নতুন বই এসেছে, নতুন নিয়ম চালু হয়েছে, নতুন পরীক্ষা পদ্ধতি এসেছে কোনও গবেষণা ছাড়াই। ফলে একেক ধরনের নিয়ম একেক বিপত্তি তৈরি করেছে। সবচেয়ে বড় বিপদ এসেছে নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। নতুন নিয়ম বাস্তবায়িত হবে যে হাতিয়ার দ্বারা, সেই মূল কারিগর শিক্ষককে বাস্তব ভিত্তিকভাবে তৈরি না করেই চলেছে এ প্রচেষ্টা। যথেষ্ট পরিকল্পনার অভাব আর দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি না থাকায় শিক্ষাক্ষেত্রের সকল উন্নয়ন প্রচেষ্টা ভীতিকর পরিণতি লাভ করেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস এ পরিণতির বড় উদাহরণ।

দেশের শিক্ষায়তনের অবকাঠামো বেড়েছে, শিক্ষার্থী বেড়েছে, পাসের হার বেড়েছে, শিক্ষকের সংখ্যাও বেড়েছে—এটা সংখ্যাগত উন্নয়ন। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল প্রাণ যে শিক্ষক তার মান বাড়েনি। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগ বাণিজ্য আর রাজনীতিকরণ পুরো শিক্ষায়তনের নৈতিক মানকে শুধু দুর্বলই করেনি, করেছে ক্ষয়িষ্ণু। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্তিকরণ, জাতীয়করণ, সরকারিকরণের ক্ষেত্রেও নীতির চাইতে প্রভাব রেখেছে দুষ্ট রাজনীতি। অন্যদিকে শিক্ষা ব্যবস্থাপনার নীতি-কৌশলকেও নষ্ট করেছে দলীয় আদর্শহীন রাজনীতি। আজ আমরা শিক্ষায়তনে যে দুর্বলতা আর অনৈতিকতা দেখছি তা গড়ে উঠেছে বছরের পর বছর ধরে এসব ভ্রান্ত ও ভ্রষ্ট নীতি-কৌশলের ফল হিসাবে। আমরা শিক্ষায়তনে নৈতিক মানুষ, ঋদ্ধ মানুষ তৈরির বদলে দলীয়-রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক মানুষ তৈরি করতে চেয়েছি। সেটা সমাজের  দুষ্টুক্ষত তৈরির উপকরণ হিসাবেই ব্যবহৃত হয়েছে। যার কুফল আজ বটবৃক্ষ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।

দায় নেবে কে?

প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। একদল এই অনৈতিকতার সুযোগ নিয়ে লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী যারা সারা বছর ঠিকমত ক্লাস করেছে, পাঠ্যবইয়ে চোখ রেখেছে, মন দিয়ে পড়েছে, তারা এই অনৈতিকতার বলি হচ্ছে। এটা জাতীয় ক্ষতি। একদিকে আমরা পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতি ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছি, অন্যদিকে একদল অযোগ্য মানুষকে অনৈতিক সুযোগ দিয়ে যোগ্যতরদের সামনে আনছি। আবার যারা সত্যিকার মেধাবী, যারা যোগ্য তাদের পেছনে ফেলছি। এভাবেই তৈরি হচ্ছে আগামী দিনের বাংলাদেশ। এটা জাতির ভবিষ্যতের জন্য এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে। এখন এই যে বিপদ, বিপত্তি, দুর্নীতি আর অনৈতিকতা সৃষ্টি হলো, এর দায় নেবে কে? শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষাসচিব, শিক্ষামন্ত্রী, না প্রধানমন্ত্রী? বাজারে কথা ওঠেছিল এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করবেন শিক্ষামন্ত্রী। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ হলেই সব মুশকিল কেটে যে তা নয়, তবে তাতে একটা সু-নজির তৈরি হতো। ভাবা যেত কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ আছেন, যিনি উদাহরণ তৈরি করতে পারেন। বাস্তবে তা হয়নি।

উল্টো বরং প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যে দেশবাসীকে জানিয়ে বলেই ফেলেছেন, ‘মন্ত্রী কি নিজে প্রশ্নপত্র ফাঁস করতে গেছেন বা সচিব গেছেন বা যারা শিক্ষক তারা কি করেছেন?... এটা নিয়ে একবার সুর তুলে একবার মন্ত্রীকে দায়ী, একবার সরকারকে দায়ী করা হচ্ছে।’

বোঝা যাচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বড় দুর্নীতি ঠেকানোর অপারগতার দায় নিতে খোদ রাষ্ট্রযন্ত্র অপারগ!

উপায় তাহলে কী!

আমরা জানি আমাদের সন্তানেরা বছরের পর বছর ধরে ফাঁসকৃতপ্রশ্নেই পরীক্ষা দিয়ে বড় হচ্ছে। হয়তো এভাবেই চলবে। এই ঘটনার দায় নেওয়ার যেমন কেউ নেই তেমনি তা ঠেকানোরও তো কেউ নেই। কেননা আমরা সংকটকেই তো স্বীকার করার সাহস দেখাতে পারছি না। বিছানার নিচে ময়লা রেখেই আমরা সবকিছুকে ঝকঝকে দেখাতে চাইছি। এটা শুধু আমাদের মনে-বৈকল্যই নয় আমাদের ভুল নীতি-কৌশল। আমরা ভেতরে ইঁদুর রেখে ওপরে মাটি চাপা দিয়ে বাহবা নিতে চাইছি।

এই চিন্তার পরিবর্তনটাই জরুরি। আজ ভাবা দরকার গোটা জাতি এক বড় বিপদে পড়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় আলোচনা, ঐক্যমত দরকার। শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক-আমলা-প্রশাসক-শিক্ষা ব্যবস্থাপক-রাজনীতিবিদ-সুশীল সমাজ-আইনশৃঙ্খলা বাহিনী-গোয়েন্দা বিভাগ- প্রযুক্তিবিদ-মিডিয়া কর্মী-জনপ্রতিনিধি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার।

কেননা বাংলাদেশের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠছে যে বিদ্যায়তনে সেই ভবিষ্যৎ চোখের সামনে সমূলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই ধ্বংস যে কোনও মূল্যেই রুখতে হবে। এর অন্য কোনও বিকল্প নেই।

সামনে কোনও উপায় নেই বলেই উপায়হীনভাবে বসে থাকলে চলবে না। একটা টেকসই উপায় আমাদের বের করতেই হবে। এর অন্যথা হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। কেননা বাংলাদেশের একমাত্র এবং একমাত্র শক্তি হচ্ছে এর জনসম্পদ। এর বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী। আর এই জনগোষ্ঠীকেই আমরা বিপন্ন করে, অযোগ্য করে, অসৎ করে গড়ে তুলতে পারি না।

আমাদের বিপুল সংখ্যক তরুণ যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠে তাহলে তারা আমাদের সম্পদ হওয়ার বদলে সংকট হয়ে ওঠতে পারে। সেই সংকটে ভেসে যেতে পারে সকল উন্নয়ন প্রচেষ্টা। জাতির এই বিপদের দিনে তাই অহমিকা নিয়ে, হতবুদ্ধি হয়ে বসে থাকলে চলবে না। জাগতে হবে, জাগাতে হবে।

জরুরি ভিত্তিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে জন জাগরণ সৃষ্টি না হলে, এই সংকট উত্তরণের সম্মিলিত প্রয়াসের পথ বের না হলে বিপদের আগুন সবাইকেই স্পর্শ করবে।

সেই পুরনো কথাটাই আবার মনে করিয়ে দেই, নগর পুড়লে দেবালয়ও রক্ষা পায় না!

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ