রাজীবকে হারানো দুই ভাইয়ের জন্য

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৪:২৫, এপ্রিল ১৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৬, এপ্রিল ১৮, ২০১৮

আহসান কবিররাজীব চলে গেছে।
শতবর্ষী বৃক্ষ কিংবা বিদায়ী পাখিরা একদিন কোথায় যেন চলে যায়! চলে যায় চেনা-অচেনা অনেক মানুষ। তারা আসলে কোথায় যায়? রাজীব কি ফেরারি পাখি? প্রাচীনতম স্মৃতির রোদে বেড়ে ওঠা এবং একদিন মুখ থুবড়ে পড়া কোনও বৃক্ষ? চলে যাওয়া গাছের ছায়াতে যে মায়া ছিল, কোনও পথিক কি সেটা মনে রাখে? রাজীব কি সেই গানের মানুষ, যে গানটার শেষ লাইন— ‘শেষ হোক এই খেলা এবারের মতন/ মিনতি করি আমাকে, হাসিমুখে বিদায় জানাও!’?
‘আমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না’— রাজীব ফেরারি পাখি, আর কোনোদিন কুলায় ফিরবে না!
রাজীবকে নিয়ে শেষ লেখাতে লিখেছিলাম, ‘রাজীব টিকটিকি হলে পারত। লেজ খসে গেলে যেমন লেজ গজায়, তেমনি হয়তো তার নতুন হাত গজাত। রাজীব মানুষ। তাই আজীবন সে হারানো হাতের স্মৃতি নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বাঁচবে। চারদিক থেকে সান্ত্বনা আর সহমর্মিতার কোনও কোনও হাত হয়তো তাকে সাময়িক শান্তি দেবে। শুধু আজীবন ধুঁকে ধুঁকে বাঁচার কষ্টটা একান্তই তার হবে। আমরা বাস করছি পরাজিত সময়ের বেদনা নিয়ে... যে জীবন দোয়েলের-ফড়িংয়ের, যে জীবন স্বপ্নের, যে জীবন মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রেনেডের, যে জীবন রুখে দাঁড়াবার— তার সঙ্গে যেন দেখা হয় তুহিনের। তার সঙ্গে যেন দেখা হয় রাজীবের!’

রাজীবের সঙ্গে আর কোনও ‘মানব জীবনে’র দেখা হবে না। হাসপাতালের হিমঘর থেকে রাজীব চলে গেলো কবরের অন্ধকারে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, রাজীবের জন্য এটাই ভালো ছিল। আজীবন পঙ্গু হয়ে বাঁচার চেয়ে চলে যাওয়াটাই ভালো। যারা এই ভালো থাকার কথা বলে সান্ত্বনা পেতে বা দিতে চান আমি তাদের দেখে নিতে রাজি আছি। চলে যাওয়ার চেয়ে বড় কোনও বেদনা নেই পৃথিবীতে। যার যায় শুধু সেই বোঝে।

এপ্রিলের ৪ তারিখ (২০১৮), ঢাকার কাওরান বাজারের কাছে সার্ক ফোয়ারার অদূরে চলছিল বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের দুই বাসের রেস। সেই রেসে দুই বাসের মাঝখানে পড়ে প্রথমে থেঁতলে যায়, অতঃপর কাটা পড়ে রাজীবের হাত। রাজীবের কাটা হাত পড়ে থাকে রাস্তায়, সেগুলোর ছবি তোলে মানুষ। রাজীব হাসপাতালে যাওয়ার দুই-তিন ঘণ্টা পর কাটা হাতও নেওয়া হয় হাসপাতালে, কিন্তু সেটা আর জোড়া লাগানো যায় না। বেসরকারি একটা হাসপাতাল থেকে রাজীবকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। অবস্থার অবনতি হয় তার। হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হলে ডাক্তাররা জানান, তার মাথার খুলিতে ফাটল ধরেছে, চোখের পেছনে মস্তিষ্কে পানি ও রক্ত জমেছে। রাজীবকে জীবনে ফেরানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয় চিকিৎসকদের। ৪ থেকে ১৭ এপ্রিল— দুই বাসের মাঝখানে পড়েছিল রাজীবের হাত, আর রাজীব পড়েছিল ফেরা না ফেরার দ্বন্দ্বের মাঝে। শেষমেষ চলেই গেলো রাজীব।

এক মন্ত্রী দেখতে গিয়েছিলেন রাজীবকে। তার চিকিৎসা ও চাকরির ভার নিয়েছিলেন। রাজীবের আরও দুই এতিম ভাই আছে। খুব ছোটকালে রাজীব ও তার ভাইয়েরা বাবাকে হারিয়েছিল। তারপর তাদের মাও মারা যান। টিউশানি আর ছোটখাট কাজ করে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিল রাজিব। ভর্তি হয়েছিল তিতুমীর কলেজে। পড়ালেখা চালিয়ে নিচ্ছিল ছোট দুই ভাইয়ের। দুর্ঘটনার পর সংবাদপত্র আর টেলিভিশনগুলোর কারণে রাজীব হয়ে উঠেছিল সংবাদ শিরোনাম। তার চিকিৎসা হচ্ছিল। হয়তো কোনোরকম একটা চাকরিও জুটতো তার। কাটা হাত দেখে হয়তো কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলত, কেউ বাড়াত সহমর্মিতার হাত। এখন রাজীব নিজেই চলে গেছে না ফেরার দেশে। তার এতিম দুই ভাই আছে, যাদের ঠাঁই হয়েছিল এতিমখানায়। বড় ভাই রাজীব ছিল তাদের কাছে স্বপ্ন আর ভরসার প্রতীক, বটগাছের ছায়া। খুব বেশি অসহায় হয়ে বাঁচতে হবে তাদের। পৃথিবী বা প্রকৃতির কোনও সহজাত মায়া হয়তো থাকবে না তাদের কপালে। তারপরও বেঁচে থাকাটাই হয়তো সব! হয়তো হারানো সেই বটবৃক্ষের ছায়া খুঁজবে তারা কারও কারও কাছে।

রাজীব আহত হওয়ার পর গ্রেফতার করা হয় দুই বাসের চালককে। তারা এখনও কারাগারে। এরপর হাইকোর্ট এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে রুল জারি করেন। কৃত্রিম হাত সংযোজন ও রাজীবের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করার নির্দেশ দেন স্বজন পরিবহন ও বিআরটিসি বাস কর্তৃপক্ষকে। হাইকোর্টের এই রুল কি বাস্তবায়িত হবে কোনোদিন? রাজীব বেঁচে থাকলে তার চিকিৎসায় আরও কিছু টাকা হয়তো ব্যয় হতো। হাইকোর্টের এই টাকা কি কখনও পাবে রাজীবের দুই ভাই? কেউ কি তাদের পাশে দাঁড়াবেন? হাইকোর্ট কিংবা সুপ্রিম কোর্টের নিয়ম কানুন, মামলা চালানো, সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ রায় এবং শেষমেষ দুই মালিকের কাছ থেকে জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়াটা অনেক দীর্ঘ। রাজীবের দুই ভাই পরিণত বয়সের কেউ নন। রিট, রুল জারি, মামলা, রায়— কোনও কিছু বোঝার ক্ষমতা তাদের নেই। চলার মতো, দু’মুঠো ভাত জোগাড়ের টাকাও তাদের কাছে নেই।

মানুষ জাগবে ফের। দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষ পৌঁছে দেবে মানুষকে। আকাশের ঠিকানায় যেখানেই থাকুক রাজীব, দুই ভাই ভালো থাকলে তার হয়তো ভালো লাগবে। কেউ কি আছেন রাজীবের দুই ভাইয়ের পাশে দাঁড়ানোর জন্য?

কেউ কি এখন এই অবেলায় বাড়িয়ে দেবে হাত?

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ