সঙ্গীতের ‘আবোল-তাবোল’ বন্ধ হোক

Send
ফাহমিদা নবী
প্রকাশিত : ১৯:১৯, জুন ২১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৪৭, জুন ২১, ২০১৮

ফাহমিদা নবীআমি রান্না করছিলাম। একটি পত্রিকা অফিস থেকে ফোন এলো—২১ জুন বিশ্বসঙ্গীত দিবস। দিবসটি নিয়ে কিছু বলুন। তাদেরই প্রশ্ন করলাম—কী বলবো? আশার কথা না সঙ্গীত নিয়ে হতাশার কথা? ওপাশ থেকে উত্তর এলো—সবাই তো হতাশার কথাই বলেছে, আপনি একটু ভিন্নভাবে যদি আশার কিছু বলেন তো ভালো হয়।
যা বলার সেটুকু অল্প কিছু প্রত্যাশার কথা বলেছি। যারা আমাদের দেশের গণ্যমান্য শিল্পী, গীতিকবি, সুরকার; তারা অনেক আপসোস প্রকাশ করছেন। আশা বা আনন্দের  বার্তা কেন নেই? শুধুই কেন আর কেন, এই ‘কেন’ নিয়েই আজ  কথা বলি।
সঙ্গীত দিবসকে ঘিরে গান নিয়ে কিছু কথা বলার আছে। সবার কিছু কিছু বক্তব্যের সঙ্গে জোরালো করে, দেশের সঙ্গীতের রান্নাঘর নিয়ে কথা বলি আজ। একইসঙ্গে কিছু ‘কেন’র উত্তর দেই।

পড়ে একটু নিজেদের বক্তব্য জানাবেন প্রিয় পাঠক। তাতে হাঁটিহাঁটি পা-পা করে হয়তো অনেক কিছু না হলেও, অল্প কিছু তো হতেও পারে। সমালোচনা বা উপলব্ধি, মত-বিনিময় কাজে আসে, বিশ্বাস করি।

সঙ্গীতের সঙ্গে রান্নার একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। ভালো রান্না না হলে পরিবারের মানুষগুলো খুব বিরক্ত হয়, আবার ব্যস্ত জীবনে কেউ কেউ যা পায় তাই খায়, কেউ বা বদলে ফেলে খাবারের ধরন কিংবা অভ্যাস। কিন্তু সেই যে পুরনো হেঁসেলে রান্নার স্বাদে মাছে-ভাতে বাঙালি আজও ধারাবাহিকতা থেকে বের হতে পারেনি। কিন্তু ঠেকে গেলে যা পায়, তা একটা খেয়ে নেয়, এটাকে বলে আপস করে নেওয়া। কিন্তু তাতে মন তৃপ্ত হয় না।

আপস আমরা সঙ্গীতের সঙ্গেও করছি, প্রতিনিয়ত। যা ইচ্ছা গান তৈরি হচ্ছে। কী সিনেমা, কী সিঙ্গেল ট্র্যাক, রেডিও কিংবা চ্যানেলের লাইভ কোথাও ভালো গানের জোগান নেই। ভালো গানগুলো কোথায়? কোথায় ধারাবাহিকতার ধরন? নাই, কোথাও নাই। সবার সব করার প্রবণতা, অভিজ্ঞতা হয়ে গেলে সেই জ্ঞান কাজে লাগানো যায়, কিন্তু না জেনেই একদিনে কেউ তারকা হয়ে গেলেই তাকে শিল্পী বলা যায় না। তা হবেও না। তাই তো শ্রোতারা কেউ বিরক্ত, কেউ আর গানই শোনেন না, কেউবা নিজেই শিল্পী (তারকা) হতে ব্যস্ত। কারণ এখন ফেসবুকে অনেকেই গান গায়, লাইক পায়। প্রশ্ন হলো, তাহলেই কি সে শিল্পী হয়ে গেলো?

অনেকে ট্রিবিউট গান ফেসবুকে ছেড়ে তারকা বনে যান, মিডিয়াও তাকে তারকাখ্যাতিতে এমন হাওয়ায় উড়িয়ে দেন যে, সেখান থেকে তার নিচের দিকে তাকাতেই কষ্ট হয়। শেখার আগ্রহ বন্ধ হয়ে যায়, ভালো গাইতে পারে মানে তাকে শিখতে হবে, চর্চা করতে হবে। তারকা হয়ে চলতে গেলে তা সে নিজেই ধরে রাখতে পারবে না। এখানে সেই তারকাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাস্তবতা হলো—দর্শক-শ্রোতা তারকাকে খুব সহজে ভুলে যায়, ভোলে না শুধু প্রকৃত শিল্পীকে। যারা অনেক সাধনায় কাজ করে যায়, মনের ভেতর আজীবন ভালোবাসায় আগলে রাখে নিজের সাধনাকে। তাদের কেউ ভোলে না। এটাই চির সত্য।  

তাহলে সঙ্গীত দিবসের স্লোগান কী হতে পারে? ‘বন্ধ হোক আবেল-তাবোল।’

গানের জন্য গান হচ্ছে। প্রচুর গান চারপাশে কিন্তু কষ্ট করে, সাধনা দিয়ে যে গান, তা হচ্ছে না। ভালো ভালো গানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।

শখের বশে গান এখন সবাই গায়, কেউ বলে না—গান শিখছি। সবাই গান গাইতে পারে, সবাই তারকা। সাজগোজ করে গান গাইছে, যার  যেভাবে মন চাইছে। কোনও মাথাব্যথা নেই কারও।

কেউ লিখছে তার শখ, তার একটা গান হোক, কেউ একজন সুর করতে শখ করলো, সে না শিখেই সুর করে ফেললো, কারও শখ গান গাওয়ার, সে না শিখেই গান গাইলো—এবার শুরু হলো  ইউটিউবে প্রচারণা, স্টেজ শো, টিভি লাইভ।

পারুক আর না-ই বা পারুক—গান গেয়েই যাচ্ছে। টিভি চ্যানেলগুলোর কাজ হলো স্লট ঠিক রাখা। দর্শক কী চায়, তা নিয়ে যেন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু মাথাব্যথা তো হতে হবে চ্যানেলগুলোর।

শিল্পী হওয়া তো এত সহজ কাজ না। তার জন্য দিনরাত সাধনা-ভালোবাসার প্রয়োজন। একদিকে তারকা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা, অন্যদিকে চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান স্লট পূরণ করার প্রবণতা বন্ধ কি হবে না?

এই বিষয়কে বলা যায়—ধারাবাহিকতার অবক্ষয়।

দর্শক-শ্রোতা কিন্তু চরমভাবে বিরক্ত। কিন্তু এফএম রেডিও ও টিভি চ্যানেলগুলো পরিকল্পনা ছাড়া সঙ্গীত আয়োজনে ব্যস্ত। ‘সস্তার তিন অবস্থা’র মতো। কেন এমন  হচ্ছে?

উত্তর হলো—টাকা নেই, বাজেট নেই। তাই গানের শিল্পীরা টকশো করে। আর যারা শখের রান্না করে, তারা গানের লাইভ শো করছে। দর্শক-শ্রোতা বোকা হয়ে যায়। তাদের প্রশ্নও ‘কেন?’ তারা বলছেন, ‘আমরা ভালো শিল্পীর গান শুনতে চাই। তাদের টকশো দেখতে চাই না’।

সঙ্গীতের ধারা বদলায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া বা কিছু নতুনত্ব আসবেই। কিন্তু তাই বলে, না জেনে না শিখে শখের মালা পরানো কি উচিত টিভি চ্যানেলগুলোর?

কিছু দায়িত্ব এড়ানো অন্যায়। দর্শকের সঙ্গে কেন বিড়ম্বনার সেতু তৈরি করা? এতে করে দর্শক কমে যাচ্ছে, শ্রোতা কমে যাচ্ছে। ভাবছি না কেন? ক্ষতি যখন হয় তখন একটু একটু করে হয়। একদিন পুরোটাই ক্ষতির হয়ে যায়। সব কিছুর সঙ্গে আপস চলে না। তাতে ভালো শিল্পীরা হারিয়ে যায়, অভিমানে। তার যথার্থ সম্মান নিয়ে নিজের সঙ্গে নিজের ও শ্রোতার কাছে কিছু উত্তর দিতে হয়, যা তার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। তাহলে সমাধান কী?

আমরা সত্যটাকে নিয়ে ভাবি। তার সঙ্গে পরিচিত হই নতুন করে, প্রত্যাশার কথা বলছি।

মান নিয়ে ভাবি, ‘স্লট ভরাট’ নিয়ে নয়। প্রিয় টিভি চ্যানেলগুলো একটু ভাবুন, অনুষ্ঠানের মান নিয়ে ১০বার ভাবুন। মাধ্যমের অনেক দায়িত্ব, এড়িয়ে যাবেন না। সংস্কৃতিকে বাঁচাতে, আপনাদের সহযোগিতাই প্রয়োজন। স্পন্সরের অজুহাত দেখাবেন না প্লিজ।

তাতে হয়তো দর্শক-শ্রোতা ফিরতেও পারে। এবার ঈদে ক্লান্ত দর্শকের বক্তব্য—‘ভালো একটা অনুষ্ঠান মনে করে বলতে পারছি না।’

দর্শক বোকা নয়। যতই অন্য দেশের গান শুনুক না কেন, নিজেদের দেশের ভালো শিল্পীকেই গুনে গুনে খোঁজে, আর বিরক্তি প্রকাশ করে, ফেসবুকে সরাসরি।

সে কথা আমরা সংস্কৃতি অঙ্গনের সবাই জানি, বুঝি কিন্তু সমাধান করি না। বিনোদন সাধারণ মানুষকে শুধু বিনোদিত করে না। গান দিয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করা যায়, সুস্থতা ফিরিয়ে আনা যায়। মিউজিক থেরাপি নামে একটা চিকিৎসা পদ্ধতি অনেকদিন থেকেই চালু আছে। যে  সঙ্গীত দিয়ে মানুষকে সুস্থ করা যায় তাকে অশুদ্ধতার মানদণ্ডে যেন না ফেলি। অনেকেই আবার পথ চলায় অনুপ্রাণিত হয় প্রিয় গুণী শিল্পীর গান শুনে।

আমি গান নিয়ে সবসময় আশাবাদী। কারণ চেষ্টা করি, যা শিখেছি, শিখছি তা নিয়ে এগিয়ে যেতে। সমসাময়িক গানের বাণী ও সুর চমৎকার, তবে ধারাবাহিকতাকে ছাপিয়ে যেন না যায়, নতুন প্রজন্মের কাছে অনুরোধ। শিখতে শিখতে আগাও, সেটাই হবে সবচেয়ে বড় আশাবাদ, যারা ভালো কাজ করছে, তাদের জন্য শুভকামনা। শিল্পীর শেখার কোনও শেষ নেই। মনে রাখতেই হবে। দায়িত্ব নিয়ে মাধ্যমগুলোর সংশ্লিষ্টরা কাজ করুন, প্রিন্ট মিডিয়া সংশ্লিষ্টরাও এই দায়িত্ব নিতে ভুলবেন না, পাঠক-শ্রোতাকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দেওয়া আপনাদের দায়িত্ব।

সঙ্গীতের সুবাতাস ছড়াক। এই প্রত্যাশা। গান আরামের বিষয়। তাকে আরামের ছায়া দিতে হবে।

বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে সব সঙ্গীত প্রেমীকে জানাই শুভেচ্ছা।

লেখক: সঙ্গীতশিল্পী

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ