কোটি ভিউ হলেই সেলিব্রেটি হওয়া যায় না

Send
ফাহমিদা নবী
প্রকাশিত : ১৬:৩১, জুলাই ২৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩১, জুলাই ২৫, ২০১৮

ফাহমিদা নবীগান নিয়ে কথা বলতে গেলে, অনেক কথাই বেরিয়ে আসে। কারণ ছোটবেলা থেকে অনেক কিছু দেখে শিখতে শিখতে বড় হয়েছি। তাই পরিবর্তনের ধারার ব্যতিক্রম অনেকটা বাতাসের উল্টোপথে যাওয়ার মতো লাগে।
বাতাসের উল্টোদিকে কি যাওয়া যায়? গেলেও তার স্থায়িত্ব কতটুকু বা কতক্ষণ? একাল-সেকালের কথা বহু আগে থেকেই, বহু যুগ ধরেই সমাজে হয়ে আসছে। কিছু পরিবর্তন নিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বদলানোর চেষ্টা করেছে, করছে ও করবেও। মানুষ পরিবর্তনশীল, তবে রক্ষণশীলতাকে উপেক্ষা করে নয়।
সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে কতটুকু পরিবর্তনকে মানুষ বা শ্রোতাদর্শক মেনে নিতে পেরেছে?
ভাবতে হবে। আদৌ মানুষ কি অস্থিরতার চাপে মন বাড়ায়? নাকি অস্থিরতার মধ্যেও প্রশান্তচিত্তে একটু ভালো কিছুই খোঁজে?

শ্রোতাদর্শক এখনও পুরনো মৌলিক গান থেকেই বের হতে পারেনি। নতুন গানকে গ্রহণ করার জন্য বহু চেষ্টা চলছে। খুব ধীরে কিছু গান হয়তো মানুষের কাছে গেছে বা যাচ্ছে, তাও হাতেগোনা, যেখানে হাতেগোনা গানকে শ্রোতা গ্রহণ করে, তখন সেখানে পরিবর্তনের রূপরেখায় কোটি, লাখ ভিউ কিংবা ভাইরাল ফেসবুক সেলিব্রেটিদের কী হবে?

আজকে এই তথাকথিত লাখ ভিউ বা ভাইরাল অথবা ফেসবুক সেলিব্রেটিদের তাৎক্ষণিক রমরমা হঠাৎ  পাওয়া দামের, দর কষাকষির স্বল্পকালীন মূল্যায়ন নিয়ে কিছু কথা বলি।

আজকাল কথায় কথায় মুহূর্তে সবাই সেলিব্রেটি হতে চায়। সেলিব্রেটি হতে চাওয়াটা অসুবিধার কিছু নয়। কিন্তু মানুষের প্রিয় হওয়া কি এতই সহজ? ভিউয়ার অনেক হলেই কি তাকে বিখ্যাত বলা যায়? না হয় বুঝলাম একদিনেই ভাইরাল হয়ে বিখ্যাত হলো। তার মানে কি তিনি শিল্পী হয়ে গেলেন? ভাইরাল কেন দেখছে বা সেটা কতটা গ্রহণযোগ্য, তা ভাবতে হবে। ভিউ অনেক কারণেই হয়। হাস্যরসের কারণ হিসেবেও হয়। কিছুদিন আগে গান নিয়ে ‘পাগলামি’র গান গাইতে দেখেছিলাম। অনেক ভিউয়ার সে উদ্ভট গানের। কারণ উটকো একটি বিষয় দেখে একজন আরেকজনকে দেখতে বলছে, এবং মন্তব্য করছে, ‘ দেখো গান নিয়ে এ কী পরিহাস’! এভাবেই দুঃখজনকভাবে মন্দ বিষয়টা লাইকের যোগে কোটি ভিউতে চলে গেলো। কিন্তু বলতে পারবো না কে তারা। অনেকেই নাম বলতে পারবেন না কিন্তু বলবেন ওই যে ‘পাগলামি’ করেছিল সেটা। এটা কি ভালো কাজের ব্যাখ্যা হতে পারে? এতে কি কোনও সম্মান আদৌ এনেছে? সবাই হাসাহাসি করার বিষয় পেয়েছে। কত লজ্জার বিষয় এটা তাই না?

ভাইরাল হলো এমন কিছু, যা হাসির বা ব্যঙ্গাত্মক, তাহলে কি ভেবে নেবো আমাদের জীবন-যাপনে ভাঁড়ামো বিষয়ই টানছে বেশি? সুস্থ বিষয় কি আর ভালো লাগে না? কেন?

কেন সুস্থ বিনোদন নিয়ে ভাবছি না? কেন এ প্রশ্রয়? যেহেতু যা মনে হয় তাই ফেসবুক, ইউটিউবে সহজে বলে দেওয়া যায়। কিংবা যার যা মনে হয় তাই করতে পারে।  কোনও বাঁধা নেই। তাই কি এই প্রহসন? ভাইরাল সেলিব্রেটি বনাম মৌলিক শিল্পীর গ্রহণযোগ্যতা এবং মূল্যায়ন দর্শক শ্রোতার কাছে কোন পর্যায়ে? দর্শক শ্রোতা কি এসবে আদৌ খুশি?

মানসিক শিক্ষার বিবেক বোধটাই দরকার। কী আমার করা উচিত আর কী করার সাহস করা উচিত নয়, সেই বোধ দরকার। কত কষ্ট করে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া যায়। এই দশ বছরের শিক্ষা না নিলেও তো চলে। কিন্তু এসবে হয় না। কেন হয় না? এই কেনটা ভাবা ভীষণ জরুরি। এই জ্ঞান চর্চাটা না করলে মানুষের কাছে সব সহজ হয়ে যাচ্ছে। দেখলেই ভাবছে–এ আর এমন কী? খুব সহজ গান গাওয়া। আসলে শিল্পী হতে সাধনা দরকার, জ্ঞান দরকার।

গান ফূর্তি নয়, ‘গান বিনোদিত করে বটে কিন্তু গান বিনোদন নয়’—একথা আমরা সবাই জানি। গান একধরনের প্রকাশ, যা নিজের ভেতর বোধগম্য না হলে তার প্রকাশ সুরে সুরে করা যায় না। সে কারণেই হয়তো বলা হয়–সঙ্গীত সুক্ষ্ণ কারুকাজের সুরে গল্প বলা।

না বুঝে গাইলে শ্রোতার কাছে তা পৌঁছায় না। হয়তো দুই একদিন মনে থাকে তারপর হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় মৌলিক গান না গাওয়া শিল্পীরা। কাউকে ছোট করে বলছি না, বাস্তবতার সত্যটা তুলে ধরছি।

অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী, গুরুজনেরাই বলে গেছেন। কিছু কাজ যে ভালো হচ্ছে অবশ্যই স্বীকার করি।  সেখানেও কথা আছে, একদিনে ভাইরাল নামকরা শিল্পী হয়ে গেলেও সে নামের জন্য আরও বহু বহু দিন কাজই করে যেতে হয়। মানুষের ভালো লাগা দায়িত্ব বাড়ায়। সে দায়িত্ব না নিয়ে নিজেকে সেলিব্রেটি ভেবে দামি ভাবলে তো চলবে না। দু’দিন পরে কেউ মনে রাখবে না, সেটাও ভাবতে হবে। কারণ কেউ একদিনে বড় হতে পারে না। হাজার হাজার শিল্পী সাধনায় রত তারা তাৎক্ষণিক বিষয়ে হতভম্ব হয়।

প্রত্যেক কর্মফল অপেক্ষায় থাকে সত্য বাক্যের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এটা আমি বিশ্বাস করি।

তাই প্রকৃত শিল্পী দু’দিনের জন্য নয়, চিরকালের জন্য সাধনা করে। যুগে যুগে মনে রাখার জন্য শুধু নয়, নিজের আত্মার তৃপ্তির জন্যও সাধনা করে যান তারা। এর জন্য সাধনা করাতেই প্রযুক্তিও একধাপ এগিয়ে। সেখান থেকে সুযোগ আছে কিছু শেখার।

সেলিব্রেটি নিজেকে মনে করা মানেই দু’দিন পরে তোমাকে কেউ নাও চিনতে পারে। তাতে তুমিই আঘাত পেতে পারো, হতাশায় ভুগতে পারো।

সত্য সবসময়ের জন্যই সত্য। সুন্দর সব সময় সাধনাকেই খোঁজে, ক্ষণস্থায়ীত্বে বিশ্বাসী নয়। মনে রাখতে হবে–প্রত্যেক সাফল্যের পেছনে সাধনার পথ হাঁটার গল্প আছে। ইতিহাস তাই বলে। তাই কবিগুরুর কথায় বলতে হয়–‘তোমায় গান শোনাবো, তাইতো আমায় জাগিয়ে রাখো’।

লেখক: সংগীতশিল্পী

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ