আমাদের বিজয় ফুল!

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৮:৩৩, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪১, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯

রেজানুর রহমানপ্রায় ২০ বছর পর দেশে ফিরেছেন আজিজ সাহেব। ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ থেকে নেমেই যেন একটু হোঁচট খেলেন। বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ট্রলিতে লাগেজ টেনে নিয়ে বাইরে আসতেই সদরঘাটের লঞ্চের মতো একসঙ্গে ৪-৫ জন লোক সামনে এসে দাঁড়ালো। ওদের দেখেই আজিজ বুঝে নিয়েছেন ওরা ট্যাক্সি ড্রাইভার। কিন্তু এভাবে ভিমরুলের মতো ঘিরে ধরেছে কেন? সকলেই একই বাক্য উচ্চারণ করছে– স্যার ট্যাক্সি লাগবে? আজিজ যারপরনাই বিরক্ত হয়েছেন। স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশটার কি কোনও উন্নতি হয়নি? কথায় আছে কোনও দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি এবং দেশটা কতটা সভ্য তা সহজেই বোঝা যায় তার রাস্তাঘাট, বাস, রেলস্টেশন, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন যাতায়াত ব্যবস্থার চিত্র দেখে। কোনও বাড়িতে হয়তো আপনি নতুন গেছেন। বাড়ির সদর দরজায় কলিং বেল টিপলেন। এবার আপনাকে আহ্বান জানানোর চিত্র দেখেই আপনি বুঝে নিতে পারবেন বাড়ির লোকগুলো কেমন? দরজা খুলে কাকে চাই? বলার মধ্যেও বোঝা যায় পরিবারটি কতটা ভদ্র। কতটা বিনয়ী? এ কথা খাটে একটি দেশের বেলায়ও। এক কথায় বিমানবন্দর তো একটি দেশের সদর দরজা। আকাশে উড়ে এসে আপনি এই দরজায় নামলেন। এবার দরজায় দাঁড়ানো মানুষগুলোর ভাবভঙ্গি, আদব-কায়দা, বিনয় দেখেই বুঝে নিতে পারবেন দেশটা কেমন?

আজিজ পরিস্থিতিটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। হচ্ছেটা কী? একজন যাত্রী বিমানবন্দরে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পরিবহন ব্যবস্থা থাকবে! নির্ধারিত ভাড়ায় যাত্রীকে পৌঁছে দেওয়া হবে তার গন্তব্যে... এটাই তো নিয়ম। কিন্তু এরা এভাবে টানাহ্যাঁচড়া করছে কেন? ওদের মধ্যে কম বয়সের ড্রাইভারটি আজিজকে একটু দূরে টেনে নিয়ে প্রশ্ন করলো, স্যার কোথায় যাবেন? ড্রাইভারকে ফাজিল টাইপের মনে হচ্ছে। ব্যাটা কি আদব-কায়দা শেখেনি। তাকে কষে একটা থাপ্পড় দিতে ইচ্ছে করলো আজিজ সাহেবের। কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে দমন করলেন। ফাজিল টাইপের ড্রাইভারটি আবারও একই প্রশ্ন করলো- স্যার কোথায় যাবেন? আমার গাড়িতে চলেন। এসি গাড়ি...।

আজিজ বললেন, পুরনো ঢাকায় যাবো..., আগামসী লেন? ভাড়া কত?

আগামসী লেনের কথা শুনে ড্রাইভারটি মৃদু হেসে বললো, ওইদিকে স্যার অনেক জ্যাম হয়। ভাড়া দেড় হাজার টাকা দিয়েন...।

ড্রাইভারের কথায় চমকে উঠলেন আজিজ। বলে কী এই লোক? ২০ বছর আগে আড়াইশ টাকায় আগামসী লেন থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসেছিলেন তিনি। এখন বিশ বছর আগের ভাড়ায় তো আর আগামসী লেনে যাওয়া যাবে না। তাই বলে আড়াইশ টাকার ভাড়া দেড় হাজার?

লম্বা মতো আরেকজন ড্রাইভার আজিজের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সে ভাড়া হাঁকলো ১২শ’। তার দেখাদেখি বেঁটে মতো ড্রাইভারটি এগিয়ে এসে বললো, স্যার... যান আমাকে আপনি এক হাজার টাকা দিয়েন। আমার নতুন গাড়ি, টয়োটা করোলা... লেটেস্ট মডেল। এসি আছে!

আজিজ চরম বিরক্ত হয়ে পড়েছেন। একটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চিত্র এমন হবে কেন? দেশে আসার আগে কত ভালো কথা শুনেছেন। দেশ নাকি আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে। দেশের মানুষ একটা নিয়মের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। এই কী তাহলে নিয়ম পালনের নমুনা?

নিউ ইয়র্কে উড়োজাহাজে ওঠার আগে ঢাকায় বড় ভাইয়ের ছেলে মাসুদকে ফোন দিয়েছিলেন আজিজ সাহেব। মাসুদ বলেছিল, এয়ারপোর্টে গাড়ি নিয়েই অপেক্ষা করবে। কিন্তু তার তো কোনও দেখা নেই। ফোনও বন্ধ! তার মানে এই বেয়াদব টাইপের ড্রাইভারদের কারও গাড়িতেই কি যেতে হবে আজিজকে? হাজার টাকা ভাড়া হাঁকানো ড্রাইভারটি তরমুজের বিচির মতো ময়লা দাঁত বের করে বিশ্রীভাবে হাসছে... স্যার চলেন। এটা বলেই আজিজ সাহেবের লাগেজে হাত দিলো সে। আজিজ সাহেব ধমক দিলেন, ‘অ্যাই ব্যাগে হাত দেবে না। আমি কি বলেছি তোমার গাড়িতে যাবো!’

এই এয়ারপোর্টে কি ট্যাক্সি সার্ভিস নেই? দূর থেকে একজন যাত্রী বললেন, আছে তো, আপনি একটু এগিয়ে যান। ওই যে... কাউন্টার দেখা যাচ্ছে! যাত্রীটির কথায় ট্যাক্সি ড্রাইভারেরা চরম হতাশ হয়ে খিচতি আওড়াতে আওড়াতে চলে গেলো। সরকারি ট্যাক্সি সার্ভিস বুথের দিকে পা বাড়িয়েছেন আজিজ। হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠলো। মাসুদ ফোন দিয়েছে। আংকেল আমি মাসুদ?

আজিজ উৎকণ্ঠ নিয়ে বললেন, তুমি এখন কোথায়?

আমি তো আংকেল রাস্তায় জ্যামে আটকে আছি... আপনার ফ্লাইট কি ল্যান্ড করেছে?

হ্যাঁ। তা তো প্রায় আধঘণ্টা হয়ে গেছে...।

আপনি কি এখন এয়ারপোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন?
হ্যাঁ।
আপনি ওখানেই থাকেন। আমি উবারে কল দিচ্ছি। আপনাকে নেওয়ার জন্য গাড়ি এসে যাবে?
এটা কি সম্ভব? মাসুদকে প্রশ্ন করলেন আজিজ। মাসুদ বললো, কেন সম্ভব না। আপনি পাঁচ মিনিট ওয়েট করেন। উবারের গাড়ির ড্রাইভারই আপনাকে কল দেবে।

পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে হলো না। তার আগেই আজিজ সাহেবের ফোন বেজে উঠলো...।

স্যার, আমি উবার থেকে বলছি! আপনি কি স্যার এক নম্বর টার্মিনালের সামনে দাঁড়ানো।
আজিজ বললেন হ্যাঁ।

ড্রাইভার বললো, স্যার আমি ২-৩ মিনিটের মধ্যে আসছি...।
দুই মিনিটের মধ্যে সুন্দর, ঝকঝকে তকতকে একটা নতুন গাড়ি এসে দাঁড়ালো আজিজ সাহেবের সামনে। মোবাইলের মেসেজে পাঠানো গাড়ির নম্বর দেখে গাড়িটা চিনে ফেললেন আজিজ সাহেব। সুদর্শন এক তরুণ গাড়ি থেকে নেমে সালাম দিয়ে আজিজ সাহেবের লাগেজ গাড়িতে উঠিয়ে নিলো। গাড়িতে উঠে বসলেন আজিজ সাহেব। গাড়ি পথে নামলো।

হ্যাঁ, এবার বেশ স্বস্তি পাচ্ছেন আজিজ সাহেব। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়ি মূল রাস্তায় নামতেই বামে উড়াল সড়কের কাঠামোযজ্ঞ দেখে অবাক হয়ে গেলেন আজিজ। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতেই সে গর্বের সঙ্গে জবাব দিলো, স্যার এটা তো মেট্রোরেলের...।

ড্রাইভারের কথা টেনে নিয়ে আজিজ খুশি হয়ে বললেন, ও... এটাই কি মেট্রোরেলের...(!), কাজ তো দেখি অনেকদূর এগিয়ে গেছে!

ড্রাইভার বললো, স্যার, কিছুদিনের মধ্যেই দেখবেন ঢাকার চেহারা আরও বদলে যাবে। এয়ারপোর্টের এই রাস্তাটার কথাই বলি স্যার। এখন পাশ দিয়ে ট্রেন যায়। উপরে আকাশে উড়োজাহাজ যায়। ভবিষ্যতের চিত্রটা কল্পনা করেন স্যার... একই সঙ্গে রেলপথে ট্রেন যাচ্ছে। সড়কে বাস, ট্রাক, মোটরগাড়ি যাচ্ছে। আকাশ পথে যাচ্ছে উড়োজাহাজ। আর যাচ্ছে উড়াল পথে মেট্রোরেল। পৃথিবীর অন্য কোনও দেশে বোধকরি এমন সুন্দর দৃশ্য খুঁজে পাবেন না!

ড্রাইভার বেশ আবেগ আপ্লুত হয়ে উঠেছে। আজিজ সাহেবও আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। ভবিষ্যতের সুন্দর দৃশ্যটা নিজের কল্পনায় আঁকতে শুরু করলেন। পাশাপাশি রাস্তা, রেললাইনে বাস, কার ও ট্রেন যাচ্ছে। আকাশ দিয়ে যাচ্ছে উড়োজাহাজ। একই সময় উড়াল পথে ছুটছে আধুনিক ট্রেন! অবিশ্বাস্য! এও কি সম্ভব?

ড্রাইভারের কথায় চমক ভাঙলো আজিজ সাহেবের। স্যার, যদি কিছু মনে না করেন একটা প্রশ্ন করতে পারি?

হ্যাঁ, করো..., সায় দিলেন আজিজ।

ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো, স্যার কি অনেক বছর পর দেশে এলেন?
হ্যাঁ।
তাহলো তো স্যার আপনার কাছে অনেক কিছুই নতুন মনে হচ্ছে? ঠিক কিনা?
হ্যাঁ। সবকিছুই নতুন মনে হচ্ছে।
স্যার কী দেশেই থাকবেন, নাকি চলে যাবেন। ড্রাইভারের প্রশ্নের উত্তরে আজিজ বললেন, এবার দেশে থাকবো কিছু দিন। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আর আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী দেখে তারপর ফিরে যাবো।
তাহলে তো স্যার এবার বেশ কিছুদিন দেশে থাকবেন। এরই মধ্যে স্যার দেশের আরও অনেক পরিবর্তন দেখবেন। ততদিনে আমাদের পদ্মা সেতুও হয়তো হয়ে যাবে স্যার। কাজ একটা হচ্ছে স্যার। কাজের মতো কাজ। পারলে একবার পদ্মা সেতু এলাকা দেখে আসবেন। দেশটার প্রতি এখন অনেক মায়া হবে স্যার। আমাদের বলা হতো তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ! সেই দেশ উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবেন না... বলতে বলতে তরুণ ড্রাইভারটি হঠাৎ যেন কেঁদে ফেললো।
আজিজ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, অ্যাই... তুমি কাঁদছো নাকি?
ড্রাইভার চমকে ওঠে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, স্যরি স্যার, মাফ করবেন...।

না, না, তুমি মাফ চাচ্ছ কেন? দেখে মনে হচ্ছে তুমি বেশ শিক্ষিত ছেলে। উবার চালাচ্ছ কেন? তোমার পড়াশোনা কি শেষ?

ড্রাইভার বললো, ন্যা স্যার, পড়াশোনা এখনও শেষ করিনি। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করছি। অবসরে ট্যাক্সি চালাই। আমার মতো এখন অনেকেই এভাবে ট্যাক্সি চালায়।
তার মানে ট্যাক্সি চালিয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ নিজেই চালাও?
হ্যাঁ।
তোমার বাবা কী করেন?
তরুণ ড্রাইভার এবার যেন একটু ভাবলো। তারপর বলল, আমার বাবা একজন সরকারি চাকুরে। বলতে পারেন আমরা সচ্ছল পরিবার। তবু আমি ট্যাক্সি চালাই কেন? আমাকে এই প্রশ্নটা কি আপনি করতে চাচ্ছেন?
না, কাজ তো কাজই... এ নিয়ে আমার কোনও প্রশ্ন নেই। তবে আমার কিছু জিজ্ঞাসা আছে।
বনানী এলাকায় এসে বিরাট যানজটে পড়ে গেলো ট্যাক্সি। নড়ে না চড়েও না। আজিজ জানতে চাইলেন, কতক্ষণ থাকতে পারে এই ট্রাফিক জ্যাম?
বলা মুশকিল!
তার মানে এই শহরে কোনও ট্রাফিক সিস্টেম নেই?
আছে, কিন্তু তা কার্যকর নয়!
তাহলে তো মহা ঝামেলা! রাস্তার আইন কার্যকর না হলে তো জনজীবন স্বস্তি পাবে না!
গাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভার বললো, স্যার আপনি বোধকরি আমার কাছে কিছু জানতে চান?
হ্যাঁ! তোমাদের বয়সী ছেলেমেয়েদের সম্পর্কে কিছু জানতে চাই। দেশ নিয়ে ওদের ভাবনা কী?
ড্রাইভার ভেবে নিয়ে বললো, সত্যি কথা বলবো স্যার?
হ্যাঁ, তুমি সত্যি কথাই বলো। জোর দিয়ে বললেন আজিজ।
ড্রাইভার বললো, তরুণরা স্যার দেশের প্রতি দারুণ কমিটেড। দেশের কোনও অর্জন দেখলেই তারা খুশি হয়। আমাদের ক্রিকেটের কথাই ধরেন। ক্রিকেট জিতলে বাংলাদেশ জিতে যায়। তবে একটা সমস্যা আছে স্যার...?
সমস্যা? সেটা কী?
রাজনীতি নিয়ে দেশের তরুণদের একটা সমস্যা আছে স্যার। অনেকেই রাজনীতি পছন্দ করে না?
ড্রাইভারের কথা শুনে আজিজ অবাক হয়ে বললেন, বলো কী? রাজনীতিই তো এই দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে! অথচ রাজনীতিই...।

ড্রাইভার মৃদু হেসে বললো, এ ব্যাপারে তরুণেরা অনেক সচেতন। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাজনীতি তো স্যার আর রাজনীতিতে থাকেনি। অনেকটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে নীতিহীনরাই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফলে তরুণরা হয়েছে বিভ্রান্ত। আমার কথাই বলি। আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। অথচ এই অপরাধে চাকরি জীবনের একটা সময়ে তাকে অনেক ঝামেলা সহ্য করতে হয়েছে। অফিসের দেয়ালে তিনি বঙ্গবন্ধুর ছবি টানাতে চেয়েছিলেন। এজন্য তাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। ৯ মাসের স্বাধীনতা সংগ্রাম করে দেশটা স্বাধীন হয়েছে অথচ তরুণদের সামনে স্বাধীনতার সত্য গল্প বলতে দেওয়া হয়নি। রাজনীতির নোংরা খেলা হয়েছে। সে কারণে তরুণরা রাজনীতি নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। আমিও হয়েছিলাম। রাজনীতিবিদদের দেখলেই মনে হতো ধান্দাবাজ!

এখনও কি তা-ই মনে হয়? আজিজ সাহেবের প্রশ্ন শুনে ড্রাইভার বললো, না, এখন আর তা মনে হয় না। এখন আমি আমাদের এই দেশটা নিয়ে অনেক আশাবাদী স্যার। ছোট মুখে একটা বড় কথা বলি স্যার... আমাদের দেশটা অনেক সুন্দর। কিন্তু আমরা দেশের মানুষরা সবাই সুন্দর না। এক বালতি দুধে এক ফোঁটা টক পড়লেই কিন্তু বালতিভর্তি দুধ নষ্ট হয়ে যায়। তেমনি হাজার মানুষের মাঝে একজনও যদি বেইমান, অসৎ হয়, তাহলেই বাধে বিপত্তি। তবে স্যার আমাদের দেশ এগুবেই। আর কেউ এই দেশের উন্নয়ন- অগ্রযাত্রা ঠেকাতে পারবে না।
ট্রাফিক জ্যাম ছুটে গেছে। ট্যাক্সি চলছে। ড্রাইভার এবার নিজেই কথা বলতে শুরু করলো। স্যার গাড়ি চালানোর সময় আমাদের উচিত প্রয়োজন ছাড়া কথা না বলা। যদি স্যার আপনি অনুমতি দেন তাহলে আরও কিছু কথা বলতাম।
আজিজ সম্মতি জানিয়ে বললেন, হ্যাঁ তুমি বলো...।
ড্রাইভার বললো, দেশটা কিন্তু অনেক এগিয়ে গেছে স্যার। গ্রাম আর গ্রাম নেই। শহরের মতো অনেক উন্নত সেবা গ্রাম পর্যায়ে চলে গেছে। গ্যাস বিল, টেলিফোন বিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, কেনাকাটা এখন ঘরে বসেই করা সম্ভব। মানুষের চিন্তাচেতনার মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। আগে মানুষ ট্যাক্স দিতো না। ট্যাক্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ভীতি ছিল। এখন সেই ভীতি দূর হয়েছে। সাধারণ মানুষও এখন ট্যাক্স দেয়। সবই আশাব্যঞ্জক সংবাদ! তবু সংশয় কাটেনি।
ড্রাইভারকে থামিয়ে দিলেন আজিজ। সংশয় কাটেনি মানে? তুমি কী বলতে চাচ্ছ?

ড্রাইভার বললো, ওই যে বললাম স্যার, এক বালতি দুধে টকের কথা... আমরা স্যার সবাই নীতিবান না। মুখে যা বলি, অনেকেই তা করি না। দেশটাকে গড়তে হলে নীতির প্রশ্নে কারোরই আপস করা ঠিক হবে না।

বাংলামোটর এলাকায় এসে আবার ট্রাফিক জ্যামে পড়লো ট্যাক্সি। আজিজ দেখলেন এলাকায় মেট্রোরেলের নির্মাণযজ্ঞ চলছে! ট্যাক্সি দাঁড়িয়েই আছে। হঠাৎ একজন পতাকা বিক্রেতা আজিজ সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। ট্যাক্সির কাচের জানালায় টোকা দিয়েছে সে। আজিজ সাহেব একটু বিরক্ত হয়ে জানালার কাচ সরিয়ে পতাকা বিক্রেতার দিকে তাকালেন। কী চাও?
পতাকা বিক্রেতা মৃদু হেসে বললো, স্যার, একটা পতাকা কিনবেন?
লোকটির কথা বলার ধরন মুগ্ধ করেছে আজিজকে। ভাবলেন একটি পতাকা কিনবেন। দেশ থেকে চলে যাওয়ার সময় পতাকাটা সঙ্গে নিয়ে যাবেন! পতাকার দাম জানতে চাইলেন।

পতাকা বিক্রেতা মৃদু হেসে বললো, পতাকার কি দাম হয় স্যার? আপনার যা খুশি দ্যান....।
আজিজ যেন একটু উভয় সংকটে পড়ে গেলেন। একটা বড় পতাকা নিতে চান? কিন্তু দাম কত দেওয়া উচিত। ড্রাইভার ছেলেটিকে কি জিজ্ঞেস করবেন? পরক্ষণেই মনে হলো, এটা ঠিক হবে না। পকেটে হাত দিয়ে দেখলেন ডলার ভাঙানো হয়নি। দেশের টাকা আছে দেড় হাজারের মতো! পতাকাওয়ালাকে এক হাজার টাকা দিতে মন চাইছে। কিন্তু ট্যাক্সির ভাড়া কত উঠবে কে জানে? তবু এক হাজার টাকাই পতাকাওয়ালার হাতে তুলে দিলেন তিনি। অভিভূত হয়ে উঠলো পতাকাওয়ালা! অতি যত্নে তার বাঁশের ডগায় টানালো বড় পতাকাটা খুলে নিয়ে পরম মমতায় ভাঁজ করে আজিজের হাতে তুলে দিয়ে বললো, স্যার, পতাকা ব্যবহারের একটা নিয়ম আছে। সূর্যোদয়ের পর পতাকা ওড়াতে হয়। আর সূর্যাস্তের আগেই পতাকা নামায়ে ফেলতে হয়। এইটা স্যার নিয়ম। পতাকাটার যত্ন নিয়েন... বলেই পতাকাওয়ালা সামনের দিকে চলে গেলো! আজিজ সাহেব অবাক হয়ে পতাকাওয়ালার গমন পথের দিকে তাকিয়ে আছেন।

এবার ড্রাইভার বললো, স্যার, বুড়া মিয়া দারুণ কথা বলে গেলো। নিয়মটাই হলো স্যার আসল। আমরা যদি স্যার নিয়ম মানি তাহলে এই দেশকে আর কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না...।
‘দাবায়া’ শব্দটা শুনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সেই ভাষণ কানের কাছে ধ্বনিত হতে থাকলো আজিজ সাহেবের। আমাদেরক কেউ আর ‘দাবায়া’ রাখতে পারবে না...। সত্যি তো! কে দাবায়ে রাখবে আমাদের? কার এত বড় সাহস? বিজয়ের এই দিনে সবার জন্য রইলো বিজয় ফুলের শুভেচ্ছা।
দেশকে ভালোবেসে ভালো থাকুন সবাই…।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

 

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ