কোভিড-১৯: পুঁজিবাদের ইনপুট-আউটপুট

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৫:৩৫, এপ্রিল ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৯, এপ্রিল ০৮, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাকরোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ রোগের সঙ্গে লড়ছে গোটা বিশ্ব। শক্তিধর পশ্চিমা উন্নত রাষ্ট্রগুলোই বেশি হিমশিম খাচ্ছে। আমেরিকা আর ইউরোপে মৃত্যু বেশি, আক্রান্ত বেশি। একশ’ বছর আগে স্প্যানিশ ফ্লু-তে লাখ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। একশ’ বছর পর আবার এক লড়াই, ধনী বা গরিব সবার জন্য।
প্রথাগত শাসনব্যবস্থা যারা মানেন না তারা হয়তো বলবেন, সময় এসেছে পৃথিবীর সম্পদ পুনর্বণ্টনের। এটা কতটা হবে জানা নেই, কিন্তু করোনাউত্তর পৃথিবীতে ন্যায্যতার প্রত্যাশা জাগবেই। আশাবাদীরা ভাবছেন, পৃথিবীর সবাই একে অন্যের দিকে দৃষ্টি দেবেন, মানুষের মূল্যবোধ ও সহানুভূতির এক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সৃষ্টি হবে। গণতন্ত্র রফতানির নামে বড় দেশ ছোট দেশকে আক্রমণ করা, গণহত্যা চালানো, স্বাধীনতাকামী মানুষকে দমিয়ে রাখা, আর্থিকভাবে শোষণ করা, অর্থনৈতিক আর প্রযুক্তিগত ক্ষমতায় সবকিছু ধনী দেশের করায়ত্ত করে রাখার মতো অন্যায়গুলো নিয়ে ভাবনা শুরু হবে।

সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের বড় বড় আবিষ্কারের পর ইউরোপীয় ও মার্কিন সমাজে গণতন্ত্র যেমন বিকশিত হয়েছে, তেমনি পুঁজিও তার ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে। বড় বড় পুঁজিপতির সৃষ্টি হয়েছে, অর্থনৈতিকভাবে এই দেশগুলো সমৃদ্ধশালী হয়েছে। কিন্তু তাই বলে সেখানকার শ্রমিক শ্রেণির ভাগ্যের যে খুব পরিবর্তন হয়েছে, সেটা বলা যাবে না। এর বাইরে বড় যেটি ঘটেছে তা হলো বিশ্বব্যাপী বড় দেশগুলোর নিষ্ঠুর উপনিবেশ সৃষ্টি। আর এর মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া আন্তর্জাতিক সামন্তবাদের সূচনা হওয়া। বিশ শতক পর্যন্ত দু’দুটি বিশ্বযুদ্ধ, বেশকিছু বড় মহামারি বলতে গেলে ধনী দেশগুলোকে আরও ধনী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, আরও সম্পদ আহরণে তারা সমৃদ্ধ হয়েছে।

ন্যায্যতার কথা বলে কমিউনিস্টরা এসেছিল, ৭০ বছরের একটা ঠান্ডা-গরম লড়াই করে সমাজতন্ত্র বিদায় নিয়েছে। কারণ কমিউনিস্ট দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে সফল হতে পারেনি আর মানবাধিকারের প্রশ্নে নিজেরাই ন্যায্যতার জায়গায় ছিল না। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা আর উৎপাদনশীলতার বিপরীতে এই দেশগুলোতে কথা বলার স্বাধীনতা ও আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না বললেই চলে, যদিও রাষ্ট্র নিজেই মৌলিক চাহিদাগুলো ঠিকই মিটিয়ে দিচ্ছে বলে দাবি করছিল।

নব্বই দশকে সমাজতন্ত্রের পতনের পর যাদের সাম্রাজ্যবাদী বলা হতো, তাদেরই কদর বাড়ে এবং সম্পদ কুক্ষিগত হতে থাকে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি আর প্রতিষ্ঠানের কাছে। আর ৯/১১-এ আমেরিকার টুইন টাওয়ারে আক্রমণের পর পুরো বিশ্ব ওলটপালট হয়ে যায়। রাজনৈতিকভাবে শুধু নয়, সব প্রশ্নে বিভাজিত এক পৃথিবীতে বাস করতে শুরু করি আমরা।

এটা পুরোটাই বিচ্যুতি। সিস্টেমের ইনপুট আর আউটপুটে সমন্বয় নেই। একটা বড় কারণ সারা পৃথিবীতেই প্রতিষ্ঠানগুলোয় অকার্যকর করার চেষ্টা হয়েছে অনেক বেশি। আদর্শ আর মূল্যবোধকে পাশ কাটিয়ে পুঁজিকে বাড়তে দেওয়া হয়েছে নির্দয়ভাবে। এবং এটা হয়েছে সাম্যবাদকে সরিয়ে বিশ্বজুড়ে সামরিক ক্ষমতাকে সম্প্রসারিত করে ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভারসাম্যকে পরাজিত করে।

পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নিজেদের সমাজে সহিষ্ণুতা এবং মুক্তদৃষ্টির পরিবেশ রাখলেও অন্যান্য অঞ্চলে কথা বলেছে ক্ষমতার ভাষাতেই। দেশের পর দেশকে বশীভূত করে রাখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শাসকরা শক্তির মানসিকতা সঞ্চারিত করেছেন অনেক বেশি।

কোভিড-১৯ পুঁজিবাদের জন্য কী নিয়ে আসছে সেটা নিয়ে ভাবনা শুরু হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এই করোনাভাইরাস সংকট থেকে পৃথিবীর মুক্তি মিলতে পরে। পুঁজিবাদের ইনপুট আর আউটপুট সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ধনিক শ্রেণি ঠিকই নিজেদের সমস্যার সমাধান বের করে নিতে পারবে। কিন্তু যদি এই ভাইরাস তার আগ্রাসী মনোভাব অব্যাহত রাখে আরও বেশি সময় ধরে, তাহলে অনেক খাতই দেউলিয়ার পথে এগোবে। তখন একের পর এক বেইল আউট প্যাকেজে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করতে হবে। ঋণে জর্জরিত প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে কর কাঠামোতে পরিবর্তন এলে ধনীদের ওপর বেশি কর চাপ দেওয়ার চাপ আসতে বাধ্য। আদর্শহীন পুঁজির বিকাশের কারণে এই সংকট বেশিদিন দীর্ঘায়িত হলে জনপদে জনপদে আইনশৃঙ্খলা অবনতি ঘটে পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

এগুলো সবই অনুমান। এমনটা হয়তো ঘটবে না। কিন্তু ঘটবে যেটা সেটা হলো শূন্যস্থান পূরণ। সন্ত্রাসী আর মাফিয়ারা অনেক কিছুর নিয়ন্ত্রক হতে পারে, চীন আর রাশিয়ার মতো একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত রাষ্ট্র আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ফলে একটা ন্যায্য পৃথিবী হয়তো আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে।

এই করোনাভাইরাস বুঝিয়ে দিলো রাষ্ট্রীয় বাহুবলের যে কাহিনিগুলো জেনে জেনে আমরা বড় হয়েছি, সেগুলো কোনও কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে কাজে আসে না। দেশে দেশে শাসনব্যবস্থায় যে ন্যায় ও ন্যায্যতার কথা বলি, গণতন্ত্রের কথা উচ্চারিত হয়, সেই প্রয়োজনটা সার্বজনীন। সুচিন্তা ও সাহসের সঙ্গে কথাগুলো বলতে হবে দরিদ্র দেশগুলোকেই, যেন বিশ্বব্যবস্থাকে ন্যায্যতার দিকে নিয়ে যাওয়া যায়। বিশ্ব রাষ্ট্রনায়করা ভাবতে পারেন এই ব্যাধির মোকাবিলায় মানুষকে তার বিশেষ বিশেষ মতামতের ঘেরাটোপে বন্দি না করে তার বহুমাত্রিক সামগ্রিকতায় মুক্তদৃষ্টিতে দেখতে পারেন কিনা।

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ