লকডাউনেও থেমে নেই ষড়যন্ত্র আর মিথ্যাচার

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৫:০৫, এপ্রিল ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৭, এপ্রিল ২২, ২০২০

প্রভাষ আমিনদুই প্রতিবেশীর মধ্যে খুব ঝগড়া। কেউ কারও ভালো দেখতে পারে না। একদিন রাজা তাদের একজনকে ডেকে বললেন, ‘তুমি যা চাও, তাই পাবে। কী চাও বলো?’ তবে একটা শর্ত আছে, তুমি যা পাবে, তোমার প্রতিবেশী পাবে তার দ্বিগুণ। এবার সেই লোক চিন্তায় পড়ে গেলেন। অনেক ভেবেচিন্তে তিনি বললেন, মহারাজা আমার একটি চোখ অন্ধ করে দিন। ২০ দলীয় ঐক্যজোটের শরিক দল খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আল্লামা জোবায়ের আহমেদ আনসারীর জানাজার পক্ষে যারা নানা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছেন, তাদের কথা শুনে আমার এই গল্পটা মনে পড়লো।
জানাজা ইসলাম ধর্মের একটি বিধান। কেউ মারা গেলে মরদেহ দাফন করার আগে জানাজার নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা হয়। এই নামাজ আবশ্যকীয়, তবে অত্যাবশ্যকীয় নয়। মানে এই নামাজ ফরজ নয়, ফরজে কেফায়া। বেশি সংখ্যায় জানাজায় অংশ নিয়ে মরহুমকে বিদায় জানাতে কোনও বাধা নেই। আবার পরিস্থিতি বিবেচনায় একজন জানাজার নামাজ পড়লেও হয়। করোনা পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরবে মক্কা-মদিনার দুই পবিত্র মসজিদসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে মসজিদ এখন বন্ধ, বন্ধ অন্য সব ধর্মীয় উপাসনালয়ও। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদ বন্ধ না হলেও বাইরের কেউ মসজিদে যেতে পারেন না। শুধু মসজিদের স্টাফ মানে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমরা নামাজ পড়তে পারেন। সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি তারাবি ও ঈদের নামাজও বাসায় পড়তে বলেছেন। বিশ্ব যখন এক কঠিনতম সঙ্কটকাল পার করছে, তখন কেউ মারা গেলে যত কম সংখ্যক জানাজায় অংশ নেন, ততই সমাজের জন্য মঙ্গল, দেশের জন্য মঙ্গল। করোনা আতঙ্কে করোনা রোগী বা সন্দেহভাজন কারও জানাজায় ইমামতি করার লোক পাওয়া যায় না, এমনকি কোথাও কোথাও মসজিদ কর্তৃপক্ষ খাটিয়াও দেয় না। লাশ মাটিতে রেখে ইউএনও ইমামতি করছেন, পেছনে কয়েকজন পুলিশ; এমন ছবিও আমরা দেখেছি। এই যখন অবস্থা, তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজনের জানাজায় লক্ষাধিক লোকের সমাগম অবিশ্বাস্য ও অকল্পনীয়। লোকসমাগম ঠেকাতে ব্যর্থতার জন্য সরাইল থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনার পর ব্যর্থতার জন্য তিনি যে যুক্তি দিয়েছেন তা আর কেউ করবেন কিনা জানি না, আমি বিশ্বাস করেছি। তিনি বলেছিলেন, এত লোক চলে আসবে সেটা তিনি বুঝতে পারেননি। আসলেই এটা অবিশ্বাস্য। আবার স্রেফ আল্লামা আনসারীর প্রতি ভালোবাসার টানে আশপাশের ৮/১০ জেলা থেকে লক্ষাধিক লোক স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছুটে এসেছে, এটাও অবিশ্বাস্য। খেলাফত মজলিসের মহাসচিব বলেছিলেন, লকডাউন এবং সচেতনতার কারণে লোক কম হয়েছে। নইলে এর ১০ গুণ লোক আসতো। এই দাবিও অবিশ্বাস্য। আল্লামা আনসারী কে? যার জানাজায় ১০ লাখ লোক আসবে? এই প্রশ্নের উত্তর একটু পর দিচ্ছি। তবে বলে রাখি, পুরো বিষয়টাই একটা গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ; প্রথমে এটা সন্দেহ ছিল, এখন বিশ্বাস জন্মেছে।

আল্লামা আনসারীর জানাজায় লক্ষাধিক লোকের সমাবেশটা কোনও যুক্তিতেই অনুমোদনযোগ্য নয়। ধর্মীয় বিবেচনা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, করোনার বিস্তার—সব বিবেচনাতেই এখন যে কোনও ধরনের লোকসমাগম নিষিদ্ধ। এই সময়ে এইরকম একটা জানাজা করা যে ঠিক হয়নি, এটাই তাদের বোঝানো যাচ্ছে না। তারা বরং এই জানাজার পক্ষে হাজারটা যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন। তারা আইনমন্ত্রীর মায়ের জানাজা, সাবেক মন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর জানাজা, বরগুনায় কোনও এক আওয়ামী লীগ নেতার জানাজা বা বাজারে লোকসমাগমের ছবি, ভিডিও বা লিঙ্ক দিয়ে প্রমাণ করতে চাইছেন যেহেতু আইনমন্ত্রীর মায়ের বা আওয়ামী লীগ নেতার জানাজায় লোকসমাগম হয়েছে, তাই আনসারীর জানাজায় লোকসমাগমও ঠিক আছে। প্রথম কথা হলো, করোনাভাইরাসের সামাজিক সংক্রমণ ঠেকাতে সব ধরনের লোকসমাগমই ঝুঁকিপূর্ণ এবং বেআইনি; সেটা আইনমন্ত্রীর মায়ের জানাজা হোক, আনসারীর জানাজা হোক, মসজিদ হোক, বাজার হোক। নিজেকে নিরাপদ রাখার একমাত্র উপায় হলো ঘরে থাকা। আইনমন্ত্রীর মায়ের জানাজা প্রসঙ্গে পরে আসছি। বরগুনার আওয়ামী লীগ নেতার জানাজার ছবি আমি আগে দেখিনি। দেখলে অবশ্যই প্রতিবাদ করতাম। সাবেক মন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর জানাজা হয়েছে দিন বিশেক আগে। তখনও করোনা এতটা আতঙ্ক ছড়ায়নি। কিন্তু তবুও আমি মনে করি, এই সময়ে জানাজা যত কম লোকে করা যায় ততই ভালো।

লোকসমাগম মানেই করোনা ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা। সম্ভব হলে কমপ্লিট লকডাউনেই সমাধান। কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা প্রতিদিনই পুলিশের সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলছি, যেন আমাদের ঘরে আটকে রাখায় পুলিশের বিশাল কোনও লাভ আছে। আমরা পুলিশের সঙ্গে নয়, চোর-পুলিশ খেলছি ভয়ঙ্কর করোনাভাইরাসের সঙ্গে, আসলে মৃত্যুর সঙ্গে।

আল্লামা আনসারীর জানাজাকে সঠিক মনে করেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে আমার ফেসবুকে কথা হয়েছে। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু আওয়ামী লীগ নেতাদের জানাজায় লোকসমাগম হয়েছে, তাই আনসারীর জানাজাও ঠিক আছে। তাদের বললাম, আওয়ামী লীগ তো খারাপ কাজ করেছে। তাদের ভাবটা এমন, তাদেরও খারাপ কাজ করতে দিতে হবে। কয়েকজনের কথা শুনে মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগ যেহেতু বিষ খেয়েছে, আওয়ামী লীগ যেহেতু আত্মহত্যা করতে গেছে; তাই আমাকেও বিষ খাওয়ার অধিকার দিতে হবে। একটা ভুল যে কখনও আরেকটা ভুলের যুক্তি হতে পারে না, এটা তাদের বোঝানোই যাচ্ছে না। তাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, এটা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা। সরকার আওয়ামী লীগকে অনুমতি দিয়েছে, খেলাফত মজলিসকে দিচ্ছে না। অনেকে আবার কৌশলে বিশাল জানাজার বিরোধিতা করা বা মসজিদে জামাতের বিরোধিতা করাকে ইসলামবিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন। তাদের কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না, তাদের ঘরে আটকে রাখার মধ্যে সরকারের কোনও স্বার্থ নেই। সরকার প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার ক্ষতি মেনে নিচ্ছে তার এবং তার পরিবার ও স্বজনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

জানাজা নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বলে অনেকে নাখোশ। কিন্তু, তাদের তো খুশি হওয়ার কথা। তাদের ঘরে আটকে রাখতে চাইছে মানে সরকার তাদের ভালো চায়, তাদের সুস্থ রাখতে চায়। কিন্তু কিছুতেই বোঝানো মুশকিল। যতই বোঝান তাদের কথা হলো, দোকান কেন খোলা, মসজিদ কেন বন্ধ। বাজারে এত মানুষ তাতে মাথাব্যথা নেই, জানাজাতেই যত সমস্যা। তাদের আবদার হলো, আগে দোকান বন্ধ করেন, বাজার বন্ধ করেন; তারপর আমরা ঘরে যাবো। কথা শুনে মনে হয়, তারা লাখে লাখে জানাজায় অংশ নেবে, আর কাতারে কাতারে মরবে; কিন্তু সরকার কিছুই বলতে পারবে না। সরকার তো তাদের মতো অন্ধ নয়। দেশের সব মানুষের, এমনকি সরকারবিরোধীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও সরকারেরই। তাছাড়া ঝুঁকিটা তো শুধু জানাজায় অংশ নেওয়া লোকজনের নয়, তারা তো ঝুঁকিটা ছড়িয়ে দেবেন সারাদেশে। তাই কারও কথা শোনা যাবে না। সরকার ছুটি দিয়েছে ঘরে থাকার জন্য, জানাজা পড়ার জন্য নয়। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে সবাইকে ঘরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে জানাজায় লোকসংখ্যা সর্বোচ্চ ১০ জনে বেঁধে দিতে হবে।

সময় এসেছে ‘সাধারণ ছুটি’র বদলে লকডাউন বা কারফিউ ঘোষণার। একটা বিষয় আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, করোনা কিন্তু মন্ত্রী, এমপি, মোল্লা, পুরোহিত চেনে না। আমরা কল্পনাও করতে পারছি না, আমাদের সামনে কী ভয়ঙ্কর দিন আসছে।

এবার আসি আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের মায়ের জানাজা প্রসঙ্গে। জাহানারা হকের পরিচয় শুধু আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের মা নন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার স্বামী অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, সাহসী রাজনীতিবিদ ও প্রথিতযশা আইনজীবী। জাহানারা হক উচ্চশিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। আনিসুল হক চাইলে ঢাকা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার মায়ের জানাজায় লক্ষাধিক লোক আসতে পারতো। কিন্তু তিনি চাননি। বরং সবাইকে নিরুৎসাহিত করেছেন। তারপরও প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্যসহ পারিবারিকভাকে ঘনিষ্ঠ লোকজন জানাজায় অংশ নিয়েছেন। একটি অনলাইন লিখেছে দুই শতাধিক, উপস্থিত একজনের দাবি শ’খানেক মানুষ জানাজায় অংশ নেন। শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে প্রত্যেকের দাঁড়ানোর জন্য লাল বৃত্ত এঁকে দেওয়া হয়েছিল। তারপরও আমি মনে করি এই দুঃসময়ে দুইশ’ লোকের জানাজাও অনাকাঙ্ক্ষিত।

তবে কেউ কেউ আইনমন্ত্রীর মায়ের জানাজা দিয়ে নিজেদের অপকর্ম আড়াল করতে চাইছেন। বরাবরই এই অপশক্তির মূল অস্ত্র মিথ্যাচার। আল্লামা আনসারীর জানাজায় লক্ষাধিক লোকের সমাবেশকে বৈধতা দিতে তারা আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মায়ের জানাজার একটি ভিডিও ছড়িয়ে দেয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু এটা মোটেই আইনমন্ত্রীর মায়ের জানাজার ভিডিও নয়। অবশ্য সাঈদীকে যারা চাঁদে দেখে বা পবিত্র মক্কা শরিফের গিলাফ পরিবর্তনের ছবিকে যারা সাঈদীর মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনের ছবি বলে চালিয়ে দেয়, তাদের পক্ষে সব ধরনের মিথ্যাচারই করা সম্ভব। তাদের দাবি, একই দিনে চার ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি জানাজা, দুটিতে সমান প্রতিবাদ হলো না কেন? তাদের অভিযোগের তীর সাংবাদিকদের দিকে। তাদের দাবি, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা নিরপেক্ষ নন, তারা সরকারের দালাল। আইনমন্ত্রীর ভয়ে সাংবাদিকরা তার মায়ের জানাজার প্রতিবাদ করেনি। প্রথম কথা হলো, আইনমন্ত্রী একজন নিরেট ভদ্রলোক, তিনি মোটেই ভয়ঙ্কর নন। আর নিরপেক্ষতা কখনও নিক্তি মেপে হয় না; হয় বিবেক আর বিবেচনাবোধ দিয়ে। আইনমন্ত্রীর মায়ের জানাজায় ১০ জন লোক থাকলে সেটা ভালো দৃষ্টান্ত হতো। কিন্তু যারা শ’ দুয়েক লোকের জানাজাকে লক্ষাধিক লোকের জানাজার ঢাল করতে চান, তারা আসলে অন্ধ। মানসিকভাবেও তারা পুরো সুস্থ নন। লকডাউন শেষে তারা চোখ এবং মনের ডাক্তার দেখাতে পারেন।

এবার আসি ষড়যন্ত্র তত্ত্বে। লকডাউন-‘ফকডাউন’কে পাত্তা না দিয়ে আনসারী হুজুরের জানাজায় বিপুল লোক এনে সরকারকে উচিত শিক্ষা দেওয়া এবং বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টার একটি টেলি কথোপকথন ফাঁস হয়েছে। জামায়াত নেতার সঙ্গে খেলাফত মজলিসের নেতার মধ্যে টেলিফোন আলাপে বাধা দিলে মতিঝিলের চেয়েও খারাপ কিছু ঘটানোর হুমকিও ছিল। তবে সেই টেলি কথোপকথনের সত্যাসত্য যাচাই করতে পারিনি। তাই আমি সেটিকে আমলে নিচ্ছি না। সত্য প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত আমি বরং সেটিকে মিথ্যাই ধরে নিচ্ছি। তবে আল্লামা আনসারীর জানাজায় লক্ষাধিক লোকের অংশগ্রহণ যে ষড়যন্ত্রের অংশ, তা নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। 

আল্লামা আনসারী একাধিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। ওয়াজের কারণে গ্রামে-গঞ্জে তার এক ধরনের পরিচিতি ছিল। তারপরও স্রেফ আল্লামা আনসারীর প্রতি ভালোবাসার টানে তার মৃত্যুর খবরে লাখো মানুষ লকডাউন ভেঙে ছুটে আসবেন; এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আর আল্লামা আনসারী সবার গ্রহণযোগ্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্বও নন। তিনি আসলে ধর্মের লেবাসে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার সংগঠন খেলাফত মজলিস বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক। তিনি নিজেও রাজনীতির মাঠে সক্রিয়। ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনে ইসলামী ঐক্যজোটের মনোনয়নে নির্বাচন করে জামানত খুঁইয়েছিলেন আনসারী। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সে নির্বাচনে ৯১ হাজার ৫৫৬ জন ভোটার ভোট দিয়েছিলেন। আর মৃত্যুর পরে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা বনে যাওয়া আল্লামা আনসারী ভোট পেয়েছিলেন ১ হাজার ৬৬৮টি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১ হাজার ৬৬৮ ভোট পাওয়া কারও জানাজায় লকডাউন ভেঙে লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছুটে আসার গল্প আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন কোনও মাসেই কেউ বিশ্বাস করবে না।

ক্যানসারে ভুগে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে মারা গেছেন আনসারী। তার বাসা সরাইলে, জানাজাও হয়েছে সরাইলে। সরাইল-আশুগঞ্জ মিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন। ঐতিহ্যগতভাবে এটি আওয়ামীবিরোধী এলাকা। আওয়ামী লীগ একবারই এ আসনে জিতেছিল, ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদে। এমপি কে ছিল জানেন? বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড তাহেরউদ্দিন ঠাকুর। ’৭৫-এর পর কখনও বিএনপি, কখনও জাতীয় পার্টির প্রার্থী; কখনও বিএনপির মদতে ফজলুল হক আমিনী জিতেছেন। এমনকি গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে যেখানে সারাদেশে মাত্র চারটি আসন পেয়েছে, তার একটি কিন্তু এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২। আওয়ামীবিরোধীদের সেই ঘাঁটিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে সরকারকে ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়ার ক্ষেত্র হিসেবে।

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষের অন্যতম পরিচর্যাকারী আমিনীর উত্তরাধিকাররা এখনও সেখানে ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পাতে। আল্লামা আনসারীর লাশকে সামনে রেখে, কোটি মানুষকে করোনা ঝুঁকিতে ঠেলে দিয়ে তারা সরকারকে ‘উচিত শিক্ষা’ দিতে চেয়েছে। আনসারী যতই জনপ্রিয় হোন, রাতারাতি লাখো লোক ছুটে আসা সম্ভব নয়। এক লাখ লোককে আনা নেওয়া করতে অনেক টাকা লাগে। ২০১৩ সালের ৫ মে মাদ্রাসার ‘বড় হুজুর’রা নিরীহ ছাত্রদের এনে মধ্যরাতে মতিঝিলে ঝুঁকির মুখে ফেলে পালিয়েছিলেন। এবারও ‘বড় হুজুর’রা নিরীহ ছাত্রদের জানাজায় এনে করোনার ঝুঁকিতে ঠেলে দিলেন। তবে এই ‘বড় হুজুর’দের সংগঠিত করলেন কারা, টাকা দিলেন কোন ‘বড় হুজুর’—সেটা জানা খুব জরুরি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ চিরতরে উপড়ে ফেলতে হলে, এখনই পেছনের কুশীলবদের খুঁজে বের করতে হবে এবং তাদের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ