বিত্তবানের মেদ ঝরুক

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৬:৩২, মে ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৪, মে ০২, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহএখন যে ফোনগুলো আসছে, সেখানে চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা চেয়ে আর্থিক সংকটের আকুতি বেশি। আর্থিক সংকটে যারা পড়েছেন, তারা কাজছাড়া হয়ে গেছেন এমন বলা যাবে না। তারা যেখানে কাজ করছেন, সেখান থেকে তাদের বিদায় বলা হয়নি। তবে বেতন দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে। মার্চের বেতন এপ্রিলে হাতে আসেনি। অনিশ্চয়তা নিয়ে মে শুরু। নিজেরা যারা ছোটখাটো ব্যবসা করতেন, সেই ব্যবসাতে তালা পড়ে গেছে। সেখান থেকে কোনও আয় আসছে না। অনেকে নির্ভরশীল ছিলেন দৈনিক বেচাবিক্রি এবং হাজিরার ওপর। যেমন, টিউশনি বা আদালতে হাজির হওয়ার মাধ্যমে অনেকের রোজগার ছিল। তাদের হাত এখন শূন্য। এই শূন্য হাতে মুদ্রার ঝলক দেখা দেবে কবে? বলা মুশকিল। লকডাউন শিথিল করার পক্ষে যারা যুক্তি দিচ্ছেন, তারা বলছেন অর্থনীতির স্থবির চাকা সচল করতে তালা খুলে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। বর্ষবরণ উৎসবে ব্যবসা হয়নি। রমজানের এই সময়টাতে ঈদ বাজার পুরোদমে জমে ওঠার কথা। মুশকিল হলো যখন ভাবা হচ্ছে শিথিলতার কথা, তখন স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যানের সূচক ঊর্ধ্বমুখী। মৃতের সংখ্যাও বাড়া কমার মধ্যে আছে।

চিকিৎসকদের পাশাপাশি পুলিশ সদস্য ও গণমাধ্যমকর্মীর মৃত্যুর খবর আসছে। পুলিশ সদস্য মৃতের সংখ্যা এখন পাঁচ। এই বাস্তবতাতেও ঢাকামুখী মানুষের জনস্রোত। এই স্রোত নোনা জলের। আতঙ্কিত কাজ ফিরে পাবে তো? গ্রামে যে সঞ্চয় নিয়ে গেছিল, তা ফুরিয়ে গেছে। শহর থেকে যাওয়া মানুষের পক্ষে গ্রামেগঞ্জে কাজ জুটিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। গ্রামে কাজ থাকলে তো আর তারা শহরে আসতো না। তাই শূন্য হাতে তারা ছুটে আসছে শহরের দিকে। খুলেছে পোশাক কারখানা। রেস্টুরেন্ট। পোশাক শ্রমিকরা যে এলাকাগুলোতে এসে ভিড় করেছেন, সেখানে আক্রান্তের তালিকায় তারাই সিংহভাগ। সামাজিক সংক্রমণ যখন বাড়তির দিকে, তখন রেস্টুরেন্ট রোগীর সংখ্যা কতটা বাড়াচ্ছে তা সপ্তাহখানেক পরে জানা যাবে। পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপির জন্য নগরবাসী এতই তীব্র ছিল যে, ঝাঁপ উঠাতেই হলো?

এমনিতেই অঘোষিত লকডাউনে, শহরে গ্রামের বেশিরভাগ জায়গা তালাখোলা অবস্থায় ছিল। ঢাকায় প্রবেশ-বাহির হওয়াও এখনও ঠেকানো যায়নি। বাজার-মসজিদের জনসমাগমও আসেনি শতভাগ নিয়ন্ত্রণে। এই পরিস্থিতিতেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিচ্ছে—মে হবে বাংলাদেশের জন্য ভয়ঙ্কর। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যানে ৫০ হাজার আক্রান্ত এবং সহস্রাধিক মৃত্যুর শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। গণিত ও বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যাবে কোন পথে? বিজিএমইএ যেভাবে বলেছিল, তারা সুরক্ষা নিশ্চিত করে শ্রমিকদের কারখানায় প্রবেশ করাবে, বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিজিএমইএ সভাপতি বলেছেন, কোনও শ্রমিক আক্রান্ত হলে তার দায়িত্ব নেবেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি নিয়ে টালবাহানা ও ভঙ্গের নজিরের মুখোমুখি হতে হয় যাদের নিত্য, তারা কী করে এমন আশ্বাসে বিশ্বাস রাখবেন।

কেবল বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর অর্থনীতিই তছনছ হয়ে গেছে। পরাক্রমশালী দেশগুলোও কোভিড-১৯-এর কাছে কাবু। আমেরিকা ও ইউরোপ এখন লকডাউন শিথিল করার কথা ভাবছে এজন্য যে, করোনা সংক্রমণের চূড়াতে তারা এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে। এখন ধীরে ধীরে আক্রান্তের সংখ্যা নেমে আসার কথা। কিন্তু তারপরও কোভিড-১৯ সেখানে আচমকা লাফ দিয়ে উঠছে। মৃতের সংখ্যা হয়ে উঠছে দ্বিগুণ। দক্ষিণ এশিয়া এখন চূড়ার কাছাকাছি। এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে। মে মাস ধৈর্য ধরলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, এই মত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। লকডাউন শিথিল বা তুলে নিলে ঈদ বাজার ও ঈদে ঘরমুখী মানুষের ঢল কোনও বাঁধ দিয়েই আটকে রাখা যাবে না। তখন সত্যিই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাবে।

এখন চঞ্চল না হয়ে, ঈদের পর নতুনভাবে শুরু করার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। যদি লকডাউনে আগামী অন্তত ১৫ দিন কঠোর হওয়া যায়, তাহলে ঈদের পর নতুনভাবে অর্থনীতির চাকা ঘুরানো কঠিন হবে না। বিত্তহীন, নিম্ন ও স্বল্প আয় এবং মধ্যবিত্তের আর্থিক সমস্যা ঈদের আগে মেটানো যাবে না। সরকারের প্রণোদনার টাকাও এতটা নিম্নগামী হবে না, এটা নিশ্চিত। বিত্তবান ও শিল্প-মালিকদের মধ্যে হাত গুটিয়ে থাকা বা কৃপণতার ভান দেখানোর মূল উদ্দেশ্য সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনার টাকা আদায় করা। শিল্প-মালিকরা বছরের পর বছর রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে, শ্রমিক ফাঁকি দিয়ে যে টাকার পাহাড় গড়েছেন, সেখান থেকে কয়েক মুঠো করে বা এক সাজি করে টাকা বিতরণ করলে, শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এই সংকট সময় পাড়ি দিতে পারবেন। পরিবহন খাতে বছরের পর বছর ধরে যে চাঁদা উঠানো হলো, সেই টাকা কার পকেটে? ওই টাকার কয়েক মুঠো শ্রমিকদের মাঝে ছড়িয়ে দিলেও তো একটি খাতের মানুষ ভালো থাকে। অর্থনৈতিক সংকটকে তীব্র করার বেলায়ও সমাজের একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ আছে। কিন্তু সরকারকে আপাতত জনস্বাস্থ্যের কথাই ভাবতে হবে। জনস্বাস্থ্য কাহিল হলে, অর্থনীতির স্বাস্থ্যও খারাপ হতে বাধ্য। সমাজের যাদের শরীরে পুঁজি বা টাকার মেদ জমেছে, সরকার বরং তাদের মেদ কমাতে বাধ্য করতে পারে। তবে সেই মেদ কমানোর ব্যায়ামে যেন আবার কোনও ফাঁকি না থাকে। তাহলে আপাতত খুব ভালো না থাকলেও মোটামুটি থাকার চেষ্টা করতে পারি আমরা।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ