বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, করোনা ও আমরা

Send
ড. হোসেন উদ্দিন শেখর
প্রকাশিত : ১৩:০১, জুন ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০২, জুন ২২, ২০২০

ড. হোসেন উদ্দিন শেখরকরোনার প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ও মন্তব্য জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট জনমনে নানান প্রশ্নের সৃষ্টি করে। এমনও দেখা যায় যে কিছু সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আবার কিছু সিদ্ধান্ত বিতর্কের সূচনা করেছে, যা তার অনুগত সদস্য দেশগুলোও মানতে চাইছে না। লক্ষণীয় যে, অনেক দেশই এখন করোনা মোকাবিলায় তাদের নিজস্ব চিকিৎসকের দেওয়া নিয়মনীতির অনুসরণ করছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সেখানে ভালো ফলও দিচ্ছে।
বছরের শুরুতে (১৪ জানুয়ারি, ২০২০) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি অ্যাকাউন্ট থেকে টুইট করা হয় এই বলে, চাইনিজ কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক পরীক্ষায় প্রতীয়মান হয় নভেল করোনাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর কোনও নিশ্চিত প্রমাণ নেই। শুরুটা এখান থেকেই।  তারপর থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিভিন্ন সময় এমন অনেক মন্তব্য করেছে যা জনমনে একাধারে  প্রশ্ন ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে সেগুলোকে সংশোধনও করে নিতে  হয়েছে।
ক’দিন আগেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাতে জানা গেলো, উপসর্গবিহীন আক্রান্তদের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা বিরল। এরপরই গবেষকদের তীব্র আপত্তির মুখে পড়ে সংস্থা। একদিন পর নিজেদের বক্তব্যে ভুল হয়েছে বলে জানায় সংস্থা।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে সংস্থাটির জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. এপ্রিল বলার বলেন, আপনার যদি জ্বর, কাশি, সর্দি না থাকে, তাহলে আপনার মাস্ক পরার দরকার নেই। মাস্ক শুধু স্বাস্থ্যকর্মীরা পরবেন। এছাড়া যারা করোনা রোগীর দেখাশোনা করছেন অথবা যাদের জ্বর এবং কাশি রয়েছে তারা পরবেন। ওই ভিডিও বার্তায় ড. এপ্রিল বলার আরও বলেন, মাস্ক মানুষের মধ্যে একটি মিথ্যা সুরক্ষা বোধ তৈরি করছে।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কথায়  গা’ না করে বিশ্বের বেশিরভাগ বিজ্ঞানী ও সরকার প্রথম থেকেই সংক্রমণ এড়াতে সবাইকে মাস্ক পরতে পরামর্শ দিয়ে এসেছে। দেরিতে হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তা মেনে নিয়েছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বায়ুকণার ও তরল কণার মাধ্যমে করোনা ছড়ায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই বক্তব্যের সঙ্গেও বহু বিজ্ঞানীর বিরোধ দেখা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তা ড. মারিয়া ভ্যান কেরখোভ বলেন, এখনও দেখা যাচ্ছে, উপসর্গবিহীন আক্রান্তদের থেকে দ্বিতীয় কারও দেহে সংক্রমণের ঘটনা খুবই বিরল। এই মন্তব্যেও বিজ্ঞানীদের দ্বিমত আছে। গবেষকদের আপত্তির মুখে ‘উপসর্গবিহীন আক্রান্ত’ প্রসঙ্গে ভ্যান কেরখোভ বলেন, তিনি একটি জিজ্ঞাসার জবাবে ওই কথা বলেছিলেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নীতি বা সেই সংক্রান্ত কিছু বলেননি। তিনি জানান, উপসর্গবিহীন আক্রান্তদের নিয়ে তার ওই মন্তব্যের ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের অপ্রকাশিত গবেষণা। কিন্তু অপ্রকাশিত গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তথ্য ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছাড়া এ ধরনের মন্তব্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ নষ্ট করছে বলে মন্তব্য করেছেন WHO সহযোগী সংগঠন ন্যাশনাল অ্যান্ড গ্লোবাল হেলথ ল’।

৯ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার ‘সিচুয়েশন রিপোর্ট’-এ জানায়, ভারতে করোনা সংক্রমণ তৃতীয় ধাপ, অর্থাৎ ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশনে’ পৌঁছে গেছে। কিন্তু ১০ এপ্রিল ভারতের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘এনডিটিভি' একটি প্রতিবেদনে জানায়, এই তথ্য ভুল ছিল, তা তাদের  কাছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকার করেছে। শুধু তাই নয়, এনডিটিভি এ-ও জানায়, ভুল তথ্য শুধরেও নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বর্তমানে ৯ এপ্রিলের যে সিচুয়েশন রিপোর্ট রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে, তা জানাচ্ছে যে, ভারতে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে করোনা রোগীর চিকিৎসায় অ্যান্টি ভাইরাল অন্যান্য ওষুধের মতো রেমডেসিভির ব্যবহারের কার্যকারিতার তেমন কোনও প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

জাতিসংঘের স্বাস্থ্য বিষয়ক এই সংস্থাটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত নতুন স্বাস্থ্যবিধিতে করোনাভাইরাসের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে প্লাজমা থেরাপি না দেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যবিধিটি এমন এক সময় প্রকাশিত হলো যখন বাংলাদেশের কয়েকটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য সরকারের অনুমোদন নিয়ে রেমডেসিভির উৎপাদন শুরু করেছে। এছাড়া, অন্যান্য কয়েকটি দেশের মতো বাংলাদেশে করোনা রোগীর চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপিও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় অ্যান্টি ভাইরাল ওষুধের কোনোটিরই উচ্চমানের ইতিবাচক ফল পাওয়ার প্রমাণ মেলেনি বরং এসকল ওষুধের জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। সংস্থাটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে করোনাভাইরাসের চিকিৎসার জন্য কোনও ধরনের অ্যান্টি ভাইরাল ওষুধ ব্যবহারের অনুমোদন তারা এখন পর্যন্ত দেয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে যে পৃথিবী থেকে নভেল করোনাভাইরাস ‘হয়তো কখনও নির্মূল হবে না’। এই ভাইরাস কবে নির্মূল হবে, সে বিষয়ে ধারণা প্রকাশ করার ব্যাপারেও সতর্ক করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইমার্জেন্সি বিষয়ের পরিচালক ডা. মাইক রায়ান। তিনি বলেছেন, প্রতিষেধক যদি পাওয়াও যায়, তবুও এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ‘ব্যাপক প্রচেষ্টা’ চালাতে হবে। এই ধরনের নেতিবাচক কথাবার্তা মহামারির এই মুহূর্তে বলাটা কতটা সঙ্গত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্তাব্যক্তিরাই তা ভালো বোঝেন। কোভিড-১৯ যেভাবে আমেরিকাসহ গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়ে রীতিমতো ক্ষোভ প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কীভাবে এতটা ছড়িয়ে পড়লো, তা নিয়ে প্রকৃত সত্য সামনে আনছে না। পাশাপাশি চীনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছে হু, এমন অভিযোগও ছিল তার। এর ফলেই সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তহবিলে অনুদান দেওয়া বন্ধ করে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে তিনি নিয়মিতই হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন সেবন করছেন। এছাড়া করোনার লড়াইয়ে অনেক ফ্রন্টলাইন কর্মীও ওষুধটি নিয়মিত ব্যবহার করছেন বলে জানিয়েছিল ট্রাম্প। 

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের পরীক্ষামূলক ব্যবহার আপাতত বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বলা হয়েছে, করোনায় আক্রান্ত রোগীর সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ থেকে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।

যদিও সংস্থাটি গেলো জানুয়ারিতেই করোনাভাইরাসকে ‘গ্লোবাল হেলথ ইমার্জেন্সি’  হিসেবে অভিহিত করেছিল, কিন্তু এই ভাইরাস যে একটি মহামারির রূপ ধারণ করেছে, সেই সিদ্ধান্তে আসতে  তাদের সময় লেগে যায়  মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ, আর  ততদিনে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে শতাধিক দেশে। সংক্রামক ব্যাধির বিস্তারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে একই রকম সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে এর পূর্বেও বেশ কয়বার দেখা যায়। যেমন, H1N1 বা সোয়াইন ফ্লু যখন ২০০৯ সালে প্রথমে ছাড়ানো শুরু করে, তখন তাদের ধারণা ছিল ভাইরাসটি ধীর গতিতে বিস্তার ঘটে। পরবর্তীতে তাদের ধারণা বদলায়। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ Guinea-তে ইবোলা ভাইরাস যখন ২০১৩ সালে এপিডেমিক তার ৫ মাস পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঘোষণা আসে আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থার (ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি)।

করোনাভাইরাসে সংক্রমণের জন্য অ্যান্টিবডি টেস্টকেই বর্তমানে সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকরী মনে করা হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে ভিন্ন কথা। অ্যান্টিবডি টেস্ট নিয়ে সতর্কতা জানিয়েছে সংস্থাটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে অ্যান্টিবডি টেস্ট দিয়ে কারও ইমিউনিটি পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ অ্যান্টিবডি থাকা মানে এই নয়, ওই ব্যক্তি পুনরায় আক্রান্ত হবেন না। পরিশেষে বিশ্বখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানসেট-এর সম্পাদক রিচার্ড হরটন-এর একটি উক্তি দিয়ে শেষ করি, ‘The WHO has been drained of power and resources. Its coordinating authority and capacity are weak. Its ability to direct an international response to a life-threatening epidemic is non-existent.’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার ১৯৪টি সদস্য দেশসহ গোটা বিশ্বকে গ্রহণীয় নেতৃত্ব ও সঠিক পথ নির্দেশনার মাধ্যমে এই মহামারি থেকে উত্তরণের পথ  দেখাবে, এটিই আমাদের কাম্য।     

লেখক: অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ