বাড়ির পাশেই মৃত্যুফাঁদ, বছরে হারাচ্ছে শতাধিক প্রাণ

আবদুল আজিজ, কক্সবাজার
০৩ মে ২০২৩, ০৮:০০আপডেট : ০৩ মে ২০২৩, ০৮:০০

দেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায়। বাড়ির আঙিনায় কূপ, পুকুর ও জলাশয় থাকার কারণে এ হার বেশি। গত দেড় বছরে কক্সবাজারে পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ। যার অধিকাংশই শিশু। কুতুবদিয়া উপজেলায় ২০২২ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৫৯ জনের পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে। তিন বছরে মারা গেছে ১৯১ জন। এ ছাড়া মৃত্যুহারে জেলার মহেশখালী দ্বিতীয় এবং সদর উপজেলার অবস্থান তৃতীয়। এসব এলাকায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে সচেতনতা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সচেতন মহল বলছে, অসচেতনতার কারণে প্রতিনিয়ত পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু হলেও এ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি কোনও উদ্যোগ নেই। চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেকেই জানেন না পানিতে ডুবলে প্রাথমিক করণীয় কী। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পানিতে ডুবের মৃত্যুর সঠিক তথ্য নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। পুলিশের খাতায়ও লিপিবদ্ধ হয় না এর পরিসংখ্যান।

পানিতে ডুবে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহযোগিতায় কয়েক বছর ধরে মাঠ পর্যায়ে জরিপ করছে গণমাধ্যম উন্নয়ন ও যোগাযোগবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘সমষ্টি’। সংস্থাটির তথ্য বলছে, ২০২২ সালে কক্সবাজারে ১০১ জনের পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়। শতকরা ৭১ শতাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে সাঁতার না জানার কারণে। এ প্রবণতা পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সীদের মধ্যে বেশি।

সমষ্টির পরিচালক মীর মাসরুর জামান একটি সেমিনারে বলেছেন, ‘পানিতে ডুবে বেশির ভাগ শিশুর মৃত্যু ঘটে বাড়ির ২০ মিটারের মধ্যে। ঘটনাগুলো সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যেই বেশি ঘটে। কারণ, এ সময় মায়েরা ব্যস্ত থাকেন, বাবারা কাজে ঘরের বাইরে যান। বড় ভাই-বোন থাকলে তারা স্কুলে থাকে।’

মাসরুর জামানের ভাষ্যমতে, ‘গত বছর কক্সবাজারে মারা যাওয়াদের মধ্যে রয়েছে ০-৪ বছর বয়সী ৪৮ জন, ৫-৯ বছরের ৩৮ জন, ১০-১৪ বছরের ১০ জন, ১৫-১৮ বছর বয়সী ৪ জন এবং ১৮ বছর বয়সী ৬ জন। দরিদ্র পরিবারে এই মৃত্যু বেশি।’

কুতুবদিয়ার লবণমাঠ সংলগ্ন স্থানে মজুত রাখা পানিতে ডুবে যায় অনেক শিশু কুতুবদিয়ার ঘরে ঘরে মৃত্যুফাঁদ

কক্সবাজারের বিছিন্ন দ্বীপ কুতুবদিয়া উপজেলা। এ দ্বীপের চারপাশে সাগর। ৮২.৩২ বর্গমাইলের এ জনপদে দেড় লাখ মানুষের বাস। সেখানে প্রতিনিয়ত পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটে চলছে। স্থানীয়রা বলছেন, মৃত্যুরোধে সরকার কিংবা সংশ্লিষ্টদের এ নিয়ে কোনও পদক্ষেপ নেই। চিকিৎসরা বলছেন, কেউ পানিতে ডুবে গেলে উঠিয়ে তাৎক্ষণিক করণীয় সম্পর্কে এ দ্বীপের দরিদ্র জনগোষ্ঠী জানেন না।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও বেসরকারি সংস্থার তথ্য মতে, গত তিন বছরে সেখানে পানিতে ডুবে মারা গেছে ১৯১ জন। যার মধ্যে ২০২০ সালে ৮১ জন এবং ২০২১ সালে ৫৪ জন, গত ২০২২ সাল থেকে চলতি ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ৫৯ জনের মৃত্যু ঘটে।

কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা. মো. গোলাম মোস্তফা নাদিম বলেছেন, ‘উপজেলার সবচেয়ে বেশি মৃত্যু উত্তর ধুরুং ও দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নে। সচেতনতার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে দেশের শিশুরা।’

ডা. নাদিম জানান, সেখানে অপ্রয়োজনীয় পুকুর ও অধিক জলাশয় রয়েছে। লবণমাঠ সংলগ্ন স্থানে পানির মজুত রাখেন সেখানকার বাসিন্দারা। অরক্ষিত পুকুরে ঘেরা-বেড়া নেই। পাশাপাশি বাচ্চাদের ঠিকমতো নজরদারি করেন না অভিভাবকরা। সামাজিকভাবেও অসচেতন সেখানকার মানুষ।’

একই কথা বলেছেন কুতুবদিয়ার স্থানীয় সাংবাদিক আবুল কাসেম। তার মতে, ‘বছরের বেশির ভাগ সময়ে এই দুই ইউনিয়নে খাবার পানির তীব্র সংকট থাকে। এ কারণে দরিদ্র পরিবারগুলো বাড়ির পাশে গর্ত খুঁড়ে পানি জমিয়ে রাখে। এসব গর্তে পরিবারের সদস্যদের অগোচরে শিশুরা পড়ে গেলে আর উঠতে পারে না।’

কুতুবদিয়ার উত্তর ধুরুং এলাকার বাসিন্দা নুরুল হক বলেন, ‘দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারগুলোতে একাধিক শিশু রয়েছে। এ কারণে নজরদারির অভাবে থাকে পরিবারের সদস্যদের। তবে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও সরকারি-বেসরকারি কোনও কার্যক্রম নেই।’

এ ব্যাপারে মা ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এ জেড সেলিম বলেন, ‘কোনও বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা শিশু পানিতে ডুবলে তাকে উদ্ধারের পর কাত করে রাখা জরুরি। পাশাপাশি মুখ দিয়ে ময়লা পানি প্রবেশ করলে সেগুলো বের করতে বুকের ওপর জোরে জোরে চাপ দিতে হবে। এ ছাড়া হাসপাতালে নেওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মুখ চেপে শ্বাস দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বেশির ভাগ মানুষের সচেতনতার যথেষ্ট অভাব। হার্ট ও শ্বাস-প্রশ্বাস চালুর প্রাথমিক চেষ্টাও থাকে না।’

কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা

বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দিলে পানিতে ডুবে মৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব। এগুলোর মধ্যে রয়েছে– ৫ বছরের নিচের শিশুদের সঠিক তত্ত্বাবধান; ৫ বছরের বেশি বয়সীদের সাঁতার শেখানো; স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা; কর্মব্যস্ত অভিভাবকদের শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার চালু করা এবং বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশ ত্বরান্বিত করার ব্যবস্থা করা।

এদিকে, গত বছর সরকার মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রালয়ের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সাঁতার শেখানোসহ নানা কার্যক্রম চালু করলেও কক্সবাজার এ প্রকল্পের আওতাভুক্ত হয়নি।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার শিশু একাডেমির পরিচালক আহসানুল হক বলেন, ‘উত্তরবঙ্গের ১৪টি জেলায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে সাঁতার শেখানোসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে কক্সবাজার এর অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আমাদের কাছে এ ধরনের কার্যক্রম চালুর অর্থ বরাদ্দ নেই।’

/এমএএ/
সম্পর্কিত
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে এক শিশুর মৃত্যু
শিশুকে ‘আছড়ে হত্যা’ : বাবাকে রিমান্ডে চায় পুলিশ
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হামে প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে শিশু, থামবে কবে
সর্বশেষ খবর
লিবিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ১৭৪ বাংলাদেশি
লিবিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ১৭৪ বাংলাদেশি
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
জামায়াত বেশি বাড়াবাড়ি করলে ইনু-মেননের মতো অবস্থা হবে: নুরুল আমিন
জামায়াত বেশি বাড়াবাড়ি করলে ইনু-মেননের মতো অবস্থা হবে: নুরুল আমিন
সম্পদবিবরণী প্রকাশের শর্তে পে-স্কেল বাস্তবায়নের আহ্বান টিআইবির
সম্পদবিবরণী প্রকাশের শর্তে পে-স্কেল বাস্তবায়নের আহ্বান টিআইবির
সর্বাধিক পঠিত
বাংলাদেশ-পাকিস্তানে এলএনজি সরবরাহ বাতিল করলো কাতারএনার্জি
বাংলাদেশ-পাকিস্তানে এলএনজি সরবরাহ বাতিল করলো কাতারএনার্জি
নতুন পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা যেসব সুবিধা পাবেন
নতুন পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা যেসব সুবিধা পাবেন
এক জেলার ২ এসিল্যান্ডসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শোকজ
এক জেলার ২ এসিল্যান্ডসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শোকজ
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ৩ মিনিটে ৮১ বার ‘স্যার’ ডাকলেন সিভিল সার্জন
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ৩ মিনিটে ৮১ বার ‘স্যার’ ডাকলেন সিভিল সার্জন
আজ স্বর্ণের দাম কত
আজ স্বর্ণের দাম কত