মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন

তাবারক হোসেন আজাদ, (রায়পুর) লক্ষ্মীপুর
২৫ নভেম্বর ২০২৩, ১৭:৫৮আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৩, ১৭:৫৮

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে চরমোহনা গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা নুর মিয়াকে (৮০) (কাশিমপুর কারাগারের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি) রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। শনিবার (২৫ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে উপজেলার সোনাপুর গ্রামের ফয়েজবক্স বেপারি বাড়ির কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। নুর মিয়ার মৃত্যুতে বৃদ্ধ অসুস্থ স্ত্রী, ছেলে ও স্বজনদের আহাজারি চলছে।

মরহুমের জানাজায় রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অঞ্জন দাশ, ৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও পুলিশ কর্মকর্তারা অংশ নেন। এ সময় হাজারো গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান (গার্ড অব অনার) প্রদান করা হয়।

এ সময় ইউএনও মৃত নুর মিয়ার পরিবারকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা নুর মিয়া

বীর মুক্তিযোদ্ধা নুর মিয়া প্রায় ৪ বছর আগে তার এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধে হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কাশিমপুর কারাগারে বন্দি ছিলেন (মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত বন্দি নম্বর-৬১৩)। বৃহস্পতিবার (২৩ নভেম্বর) সকালে খুব অসুস্থ হলে তাকে ঢাকা মেলিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর দুপুর দেড়টার দিকে তিনি মারা যান। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।

রায়পুরের মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আলম দেওয়ান বলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা নুর মিয়া সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। রায়পুর উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে তিনি যুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ২৬ মার্চ প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।’

মৃতের বাড়িতে এলাকাবাসীর ভিড়

মামলার সূত্রে জানা যায়,২০১৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সকালে উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে আরশাদ উল্লাহ কারির বাড়ির সামনে তহিরুল ইসলামের পরিবারের সঙ্গে জমি নিয়ে সংঘর্ষ হয় মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা নুর মিয়া গংদের। ঘটনাস্থলে বৃদ্ধ আলী আকবর কারি (৭০) মারা যান।

এ ঘটনায় নিহতের ছেলে তহিরুল ইসলাম বাদী হয়ে রায়পুর থানায় বীর মুক্তিযোদ্ধা নুর মিয়া, তার ২ ছেলে, ১ মেয়ে, জামাতাসহ মোট ১১ জনের নামে হত্যা মামলা (নম্বর-১৭) করেন। এ মামলায় ১১ জনকে সাক্ষী করা হয়। পরে ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রায়পুরের হাজিমারা পুলির ফাঁড়ির ইনচার্জ আলমগীর হোসেন নুর মিয়া, তার মেয়ে ও পুত্রবধূসহ ১১ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।

উপজেলা পরিষদের শ্রদ্ধাঞ্জলি

দীর্ঘ শুনানির পর ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. রহিবুল ইসলাম এই হত্যা মামলায় ১১ আসামির মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা নুর মিয়াসহ ৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনকে যাবজ্জীবন এবং তিন জনকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন। আসামিদের মধ্যে নুর মিয়ার পুত্রবধূ আগেই মামলা থেকে অব্যাহতি পান। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নুর মিয়ার মেয়ে এবং দুই ছেলেকে কাশিমপুর কারাগারে রাখা হয়েছে। পলাতক রয়েছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন ও যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ২ জন।

নিম্ন আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল (নম্বর ২২/২০২২) করেছেন। যা এখন পর্যন্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে বলে মৃত মুক্তিযোদ্ধা নুর মিয়ার বড় ছেলে মো. জহির ও আইনজীবী মুনসুর জিলানির সহকারী মনোয়ার জানান।

বক্তব্য রাখছেন ইউপি চেয়ারম্যান সফিকুর রহমান পাঠান

রায়পুরের চরমোহনা ইউপি চেয়ারম্যান সফিকুর রহমান পাঠান বলেন, ‘স্বাধীন দেশে একজন নিরপরাধ বীর মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। তা মেনে নিতে পারছি না। শুধু আমি না, পুরো ইউনিয়নবাসী বলবে নুর মিয়া নিরপরাধ ছিল। সাক্ষীদের ভালো করে জেরা করলেই আসল হত্যাকারীর নাম বলতো। সে তো পরিবার নিয়ে বিদেশে পলাতক। পুরো পরিবারটি আজ ছন্নছাড়া।’

নুর মিয়ার ছেলে ট্রাকচালক মো. জহির বলেন, ‘বাবার জন্য আইনি লড়াই করতে গিয়ে আমাদের পরিবার আজ নিঃস্ব। সরকার সহায়তা দিলে অবশ্যই বাবা মুক্তি পেতো। তার চিকিৎসাও চালাতে পারতাম। আমার এক বোন ও দুই ভাইসহ ৫ জন নিরপরাধ মানুষ জেলবন্দি। তদবির করতে না পারায় উচ্চ আদালতে করা আপিলও শুনানি করতে পারছি না।’

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলে তাদের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শ্রদ্ধা জানানো যাবে না—সংশ্লিষ্ট আইনে এ বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। যেমন, দণ্ডপ্রাপ্তরা নির্বাচন করতে পারবেন না—তা আইনেই বলা আছে। সুতরাং আইনে যেহেতু কোনও বাধানিষেধ নেই সেহেতু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়ে কোনও বাধা থাকছে না।’

/কেএইচটি/
সম্পর্কিত
যানজটে আটকে সড়কে জন্ম নেওয়া সেই নবজাতক মারা গেছে
মদপান করে দুই রুশ নাগরিকের মারামারিতে একজনের মৃত্যু, আরেকজন আইসিইউতে
হামের উপসর্গে আরও ৪, ডেঙ্গুতে দু’জনের মৃত্যু
সর্বশেষ খবর
‘এখনও দেখি টেবিলটা ফাঁকা, ঘরে নেই আদরের বাবা, এভাবে চলে যাবে বুঝি নাই’
‘এখনও দেখি টেবিলটা ফাঁকা, ঘরে নেই আদরের বাবা, এভাবে চলে যাবে বুঝি নাই’
মোকতাদিরকে জামিন দিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অচল করে দেবো: হেফাজতের মহাসচিব
মোকতাদিরকে জামিন দিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অচল করে দেবো: হেফাজতের মহাসচিব
স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য ৫ আগস্ট আনন্দের দিন: প্রধানমন্ত্রী
স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য ৫ আগস্ট আনন্দের দিন: প্রধানমন্ত্রী
ভিসা বাতিল হওয়া ৯৮৫ বাংলাদেশির তালিকা আমিরাত সরকারকে দিয়েছে দূতাবাস
ভিসা বাতিল হওয়া ৯৮৫ বাংলাদেশির তালিকা আমিরাত সরকারকে দিয়েছে দূতাবাস
সর্বাধিক পঠিত
দুই বছর কাজ নেই, ফেসবুক লাইভে কাঁদলেন জ্যোতিকা জ্যোতি
দুই বছর কাজ নেই, ফেসবুক লাইভে কাঁদলেন জ্যোতিকা জ্যোতি
অভিযান থেকে পালিয়ে এসপিকে খোঁচা দিয়ে ফেসবুক পোস্ট দিলেন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’
অভিযান থেকে পালিয়ে এসপিকে খোঁচা দিয়ে ফেসবুক পোস্ট দিলেন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’
আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডারকে পেতে দুই ক্লাবের লড়াই 
আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডারকে পেতে দুই ক্লাবের লড়াই 
‘১০০ শতাংশ’ দাবিতে ডাবরের মধু-ঘি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা
‘১০০ শতাংশ’ দাবিতে ডাবরের মধু-ঘি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা
লোকসংগীত শিল্পী মুজিব পরদেশী কারাগারে  
লোকসংগীত শিল্পী মুজিব পরদেশী কারাগারে