লালমনিরহাটের আদিতমারীতে সাত বছরের শিশু শিক্ষার্থীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে আটক করে থানায় নেওয়ার সময় স্থানীয়দের হামলার শিকার হয়েছে পুলিশ। এ সময় জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুর ২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এতে এসপি-ওসিসহ ২০ জন আহত হয়েছেন।
এর আগে সকালে উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের একটি গ্রামের ভুট্টাক্ষেত থেকে শিশুটির বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শিশুটি স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়তো।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্যমতে, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় লোকজন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত সন্দেহে একজনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের পর আগুন দেওয়া হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। দুপুরে জেলা প্রশাসক, এসপি ও পুলিশের গাড়ি গেলে সেগুলো ভাঙচুর করেন লোকজন। এ সময় ১৮ পুলিশ আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
পুলিশ জানায়, হামলায় জেলা পুলিশ সুপার ও আদিতমারী থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। বিক্ষুব্ধরা জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ প্রশাসনের অন্তত সাতটি গাড়ি ভাঙচুর করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে পুলিশ। প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষ ও অবরুদ্ধের ঘটনা ঘটে।
শিশুর পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, সোমবার বিকাল থেকে শিশুটি নিখোঁজ ছিল। তাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে মরদেহ বস্তায় ভরে ভুট্টাক্ষেতে পুঁতে রাখা হয়েছিল। আজ সকালে মরদেহ উদ্ধার করে আদিতমারী থানা পুলিশ। এরপরই পুলিশ ও অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়ি ঘিরে বিক্ষোভ শুরু করে স্থানীয়রা।
পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের ভাষ্যমতে, প্রতিদিনের মতো সোমবার বিকালে বাড়ির পাশে খেলতে যায় শিশুটি। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও বাড়ি না ফেরায় পরিবারের লোকজন রাতভর বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন। তবে কোনও সন্ধান পাননি। আজ সকালে গ্রামের লোকজন একটি ভুট্টাক্ষেতের কিছু গাছ ভাঙা ও কাঁচা মাটি দেখে সন্দেহ করেন। পরে সেখানকার একটি গর্তের ভেতর বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন।
শিশুটির বাবার অভিযোগ, মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর আমরা থানায় গিয়েছিলাম। এ সময় ২০ হাজার টাকা দাবি করে পুলিশ। আমরা ১০ হাজার টাকা দিতে চাইলেও ওসি তা নেননি। আরও বেশি টাকা দাবি করেছেন। মূলত এসব কারণে স্থানীয় লোকজন লাশ উদ্ধারের পর পুলিশের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে গাড়ি ভাঙচুর করেছেন।
বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তের বাড়িতে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের গাড়ি ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পুলিশ। এতে পুলিশ সদস্য ও এলাকাবাসীসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। মূলত ঘটনায় অভিযুক্তকে আটকের পর তাকে ছিনিয়ে নিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান স্থানীয় লোকজন।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লাশ উদ্ধারের পর পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র রায়কে (২০) আটক করে পুলিশ। তাকে আটকের পর থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের পথরোধ করে এবং আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ জনতা বিধানের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাশাপাশি পুলিশ ও প্রশাসনের গাড়িতেও ভাঙচুর চালায়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং ইউএনওসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। প্রশাসন স্থানীয়দের বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু আসামিকে নিয়ে ফিরে আসার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা পুনরায় প্রশাসনের গাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এতে ডিসি, এসপি এবং ইউএনও’র ব্যবহৃত সরকারি সাতটি গাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ‘ভুট্টাক্ষেতে শিশুটির মরদেহ পাওয়ার পর আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। কিন্তু আসামিকে নিয়ে আসার সময় জনতা বাধা দেয়। পরে বিজিবি ও বিপুল সংখ্যক পুলিশ নিয়ে আমরা সেখানে যাই। উপস্থিত জনতাকে বুঝিয়ে আসামি নিয়ে আসার সময় অতর্কিতভাবে হামলা চালানো হয়। এ সময় বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর এবং কয়েকজন পুলিশ আহত হন।’
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মূল অভিযুক্তকে নিয়ে আসার সময় পুলিশের গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসনের সাতটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। ১৮ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা দেওয়ার অপরাধে এ ঘটনায় একটি মামলা করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতি ও শিশুটির পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হককে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বর্তমানে এলাকার পরিবেশ স্বাভাবিক আছে। পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও হামলার কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, ‘স্থানীয়রা আসামিকে ছিনিতে নিতে চেয়েছিল। তারা বলেছিল আমাদের হাতে তুলে দেন, আমরাই বিচার করবো। আমরা তো আসামিকে তাদের হাতে তুলে দিতে পারি না। তারা একপর্যায়ে মেনেও নেয় বাধা দেবে না। কিন্তু যখন আমরা আসামি নিয়ে রওনা দিই তখন পথরোধ করে একদল যুবক হামলা-ভাঙচুর চালায়। আমরা সকাল ৯টা থেকে পরিস্থিতি শান্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছি। হঠাৎ দুপুরে আসামিকে আটকের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হামলা-ভাঙচুর ঠেকাতে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করি। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।’
শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, জনতা-পুলিশ সংঘর্ষে ডিসি-এসপির গাড়ি ভাঙচুর






