X
শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪
৩০ চৈত্র ১৪৩০

পরিত্যক্ত ভবনেই চলছে দৃষ্টি, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের পাঠদান

আতিক হাসান শুভ
০১ মার্চ ২০২৩, ১০:০০আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৩, ১৫:৪১

ভবনটির অনেক অংশ ধসে পড়েছে, বিভিন্ন স্থানের বিম এবং পলেস্তারা খসে পড়ে রড বের হয়ে আছে। এই জরাজীর্ণ অবস্থা খুলনার গোয়ালখালি উপজেলায় অবস্থিত দৃষ্টি বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় ভবনের। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ২০১৮ সালে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (পিডব্লিউডি)। তবে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় এই পরিত্যক্ত ভবনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা আর পাঠদান করছেন শিক্ষকরা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিন তলা বিশিষ্ট এই বিদ্যালয়ের তৃতীয় তলা একেবারেই পরিত্যক্ত। সেখানে ক্লাস হয় না। বাকি দুটি তলায় ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে। ভবনটির প্রতিটি পিলারে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ভবনের চারপাশের পলেস্তরা খসে খসে পড়ছে। তৃতীয় তলার বিম ভেঙে পাশে রড বের হয়ে গেছে। ভেতরের বিমগুলোর অবস্থাও করুণ। দিনের বেলায়ও বিদ্যালয়ের ভেতরে অন্ধকারাচ্ছন্ন ভূতুড়ে পরিবেশ। যেকোনও সময় ভবনটি ধসে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পরিত্যক্ত ভবনেই চলছে দৃষ্টি, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের পাঠদান সরকারি দৃষ্টি ও বাক শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফজিলাতুন্নেসা বেবি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই এই স্কুলের জীর্ণশীর্ণ অবস্থা। সবশেষে ২০১৮ সাল থেকে এই বিল্ডিংটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু স্কুলে অন্য কোনও ভবন না থাকায়, এখনও পর্যন্ত এখানেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। এখানে পড়াতে ভয় ও শঙ্কা দুটোই কাজ করছে। বৃষ্টি হলে দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ে। আল্লাহ মাপ করুন, বড় কোনও দুর্ঘটনা হলে— আমরা সবাই শেষ হয়ে যাবো। যতদিন না নতুন ভবন হয়, এখানে পড়ানো ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।’

আবাসিক দৃষ্টি ও বাক শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধায়ক নার্গিস আক্তার (৫২) বলেন, ‘দীর্ঘ ৩১ বছর ধরে আমি এখানে আছি। ইশারায় কথা বলতে বলতে এখন আমি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে মাঝেমধ্যে কিছুটা বিব্রতবোধ করি। আমার পরিবারের সবাই বেশিরভাগ ইশারায় কথা বলে। এখানকার সবাই আমার সন্তানের মতো। এখানে খুবই জরুরি ভিত্তিতে নতুন ভবন দরকার। স্থায়ীভাবে ভবন না হলে অস্থায়ীভাবে হলেও কিছু একটা করা দরকার। এতগুলো শিক্ষার্থীর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত এখানে পড়াশোনা হচ্ছে। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন অনাকাঙ্ক্ষিত কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায় নেবে কে?’

২০১৮ সালে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (পিডব্লিউডি) তিনি জানান, এই স্কুলের অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের কাজে পারদর্শী। কেউ ছবি আঁকায়, কেউ গান গাওয়ায়, আবার কেউবা কবিতা আবৃত্তিতে। বেশিরভাগ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী গান এবং কবিতা পাঠে পারদর্শী। অপরদিকে বাক শ্রবণ প্রতিবন্ধীরা ছবি আঁকায় পারদর্শী। ছবি এঁকে এ পর্যন্ত এই স্কুলের ছয় শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এক লাখ টাকা করে পুরস্কার পেয়েছে। তা দিয়ে তারা বাড়িতে নতুন ঘর করেছে, আবার কেউ গরু কিনেছে।

সরকারি দৃষ্টি ও বাক শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সৈয়দ শাইখ সাজ্জাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এই স্কুলটি ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতি বছর ৭ ফেব্রুয়ারি ‘ইশারা ভাষা দিবসে’ এখানে ফর্ম পূরণের মাধ্যমে ভর্তি নেওয়া হয়। বর্তমানে এই স্কুলটিতে ১২৩ জন দৃষ্টি ও বাক শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রয়েছে। এরমধ্যে ১০৮ জন আবাসিক শিক্ষার্থী এবং ১৫ জন অনাবাসিক শিক্ষার্থী। এই বিদ্যালয়ের ভবনের অবস্থা দেখে পিডব্লিউডি ২০১৮ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। নতুন ভবনের জন্য আমরা সমাজসেবা অধিদফতরে একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছি। কিন্তু তার কোনও অগ্রগতি নেই। আমাদেরকে বারবার আশ্বাস দিচ্ছে নতুন ভবন হবে। একনেকে ওঠার কথা রয়েছে। কিন্তু কবে হবে বা উঠবে তা সঠিক বলতে পারছি না। উপায়ান্তর না দেখে আমরা ও শিক্ষার্থীরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’’

ভবন ধসের ঝুঁকিতে আছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তিনি জানান, নতুন ভবন ছাড়া এখানে আরও বেশ কিছু জিনিস প্রয়োজন আছে। স্কুলে মাত্র ৭ জন শিক্ষক। সর্বমোট ৪৪ পদে মাত্র ১৯/২০ জনের মতো জনবল রয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য এখানকার সীমানা প্রাচীর ঠিক করতে হবে। আগে শৌচাগারের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। শৌচাগার ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হতো দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের। শৌচাগারের সমস্যার কারণে অনেক শিক্ষার্থী যেখানে-সেখানে পায়খানা ও প্রস্রাব করতো।’

সৈয়দ শাইখ সাজ্জাদ বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী বাগানে জরুরি কাজ সারতে যাওয়ার পথে তাকে সাপে কাটে। তারপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। গতবছর নবলোক ও ওয়াটার এইডের সহযোগিতায় দৃষ্টি ও বাক শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য আধুনিক শৌচাগার নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে এখন কোনও সমস্যা হয় না।’

কয়েকজন দৃষ্টি ও বাক শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সরকারি দৃষ্টি ও বাক শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের বিষয়ে খুলনা জেলা সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালক খান মোতাহার হোসেন বলেন, ‘আমাদের এই পিএইচটি সেন্টারটি পুনর্নির্মাণের জন্যে একনেক থেকে কয়েকবার তদন্ত হয়েছে এবং তার কাজও চলছে। খুলনার এই পিএইচটি সেন্টার এবং চট্টগ্রামের আরেকটি—এই দুটো মিলিয়ে একনেকে পাস হওয়ার কথা রয়েছে। একনেকে পাস হলেই নতুন ভবনের কাজ শুরু হবে। আপাতত আমাদের অল্টারনেটিভ আর কোনও ওয়ে নাই। এজন্য এখনও ওই ভবনেই কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আমরা বারবার সমাজসেবা অধিদফতরে তাগিদ দিচ্ছি, যেন কাজটা তাড়াতাড়ি হয়।’

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাসিক ভাতা ৫ হাজার টাকা করার দাবি
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি স্কুলে যায় না: ইউনিসেফ
রমনা অটিস্টিক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়আধুনিক ওয়াশ ব্লক, খুশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা
সর্বশেষ খবর
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ভ্রমণে কানাডার সতর্কতা
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ভ্রমণে কানাডার সতর্কতা
যশোরে শুরু হচ্ছে ১০ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা
যশোরে শুরু হচ্ছে ১০ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা
ইউরোপে বৈধ পথে শ্রমিক পাঠানো সহজ হবে
ইউরোপে বৈধ পথে শ্রমিক পাঠানো সহজ হবে
লুটনকে উড়িয়ে দিলো ম্যানসিটি
লুটনকে উড়িয়ে দিলো ম্যানসিটি
সর্বাধিক পঠিত
ঈদের তৃতীয় দিন: দেখতে পারেন যেসব নাটক
ঈদের তৃতীয় দিন: দেখতে পারেন যেসব নাটক
বাংলাদেশে বিমান মেরামতের কারখানা করতে চায় কানাডিয়ান কোম্পানি
বাংলাদেশে বিমান মেরামতের কারখানা করতে চায় কানাডিয়ান কোম্পানি
ভরা মৌসুমে অস্থির কেন পেঁয়াজের বাজার?
ভরা মৌসুমে অস্থির কেন পেঁয়াজের বাজার?
হুন্ডি প্রতিরোধে কী করছে সরকার?
হুন্ডি প্রতিরোধে কী করছে সরকার?
ইসরায়েল থেকে ফ্লাইট আসার ব্যাখ্যা দিলো বেবিচক
ইসরায়েল থেকে ফ্লাইট আসার ব্যাখ্যা দিলো বেবিচক