X
রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
১২ ফাল্গুন ১৪৩০

বেফাকে ‘গোপনে নির্বাচনি’ কার্যক্রম, এক আলেমের লিগ্যাল নোটিশ

সালমান তারেক শাকিল
০৪ অক্টোবর ২০২৩, ১৯:১৭আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৩, ১৯:১৭

বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) ১১তম কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল আলেমদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। আগামী ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এই কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বোর্ডের শীর্ষ কর্তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে তিনটি পক্ষ।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ অক্টোবর আসন্ন কাউন্সিলের কার্যক্রম গোপনে পরিচালনাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে বোর্ডের শীর্ষ কর্তাদের কাছে গাজীপুর জেলার বরমি জামেয়া আনোয়ারিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার মুহতামিম মাওলানা আশেকে মোস্তফার পক্ষে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন ব্যারিস্টার আশিকুর রহমান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেফাকের সহসভাপতি মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত (বুধবার, ৪ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৫টা) অফিসিয়াল কোনও ডকুমেন্ট পৌঁছেনি। অফিসিয়াল কোনও নোটিশও আসেনি।’

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোর্ড হলো বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বা বেফাকুল মাদারিসিলি আরাবিয়া (বেফাক)। এতে সারা দেশের প্রায় ২৫ হাজারের মতো মাদ্রাসা নিবন্ধিত।

কী আছে নোটিশে, নেপথ্যে তদন্ত প্রতিবেদন!

বেফাকের একাধিক দায়িত্বশীল জানান, প্রতি পাঁচ বছর পর পর বেফাকের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্ব নির্ধারণ হয় কাউন্সিলের মাধ্যমে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহমুদুল হাসান ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা মাহফুজুল হক। প্রায় আট মাস আগে এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়। মেয়াদ শেষ হলেও নানা কারণে নির্বাচনি কার্যক্রম প্রলম্বিত করেন কর্মকর্তারা।

বেফাকের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, গত ২৩ সেপ্টেম্বর (শনিবার) মজলিসে শুরার বৈঠকে ৭ অক্টোবর কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ওই সিদ্ধান্তের পর দুটি পক্ষ সমঝোতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্ধারণে মত দেয়।

‘একটি তদন্ত প্রতিবেদনকে ধামাচাপা দেওয়ার লক্ষ্যে পরস্পর বিপরীতমুখী দুটি পক্ষ ঐকমত্যে  এসেছে’ উল্লেখ করে একাধিক সূত্র। এসব জানায়, ওই তদন্ত প্রতিবেদনটি অভিযোগকারী পক্ষ ও তদন্তকারীদের কারও কারও অনাগ্রহের কারণে আড়ালে রয়েছে।

বেফাকের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছে, গত ২২ অক্টোবর শুক্রবার উত্তরার একটি অফিসে বেফাকের দুই জন (দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকা) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মধ্যে সমঝোতা বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে বেফাকের মজলিসে আমেলার একজন সদস্য ছিলেন। ওই বৈঠকে বর্তমান সভাপতি, মহাসচিবকে দায়িত্বে অব্যাহত রাখা, আল্লামা শফীপন্থিদের বিষয়ে আপত্তি না তোলা, বেফাকের কমিটিতে একজন সিনিয়র দায়িত্বশীলকে সরিয়ে নতুন একজনকে আনাসহ কয়েকটি বিষয়ে সমঝোতা হয় বলে সূত্রের দাবি।

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের মজলিসে আমেলার (নির্বাহী কমিটি) একাধিক সদস্য এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে উল্লেখ করেন, কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে দুটি পক্ষ চায় নির্বাচনি বিষয়গুলোকে গোপনে রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করতে। অন্য পক্ষটি চাইছে, সরকারপন্থি একাধিক আলেমকে সামনে আনতে।

যদিও কোনও কোনও আলেম বাংলা ট্রিবিউনের কাছে দাবি করেছেন, সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরোতেই বেফাকে আলেমদের মধ্যে ঐকমত্য এসেছে। আলেমরা চাইছেন, যেন সরকারি প্রভাবমুক্ত থেকে কমিটি গঠন করতে পারে।

বেফাকের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারপন্থিদের একটি পক্ষের প্ররোচনাতেই লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।’ তবে মজলিসে আমেলার একজন সদস্যের ভাষ্য, ‘অনুষ্ঠেয় কাউন্সিলে উপস্থিত কাউন্সিলরদের মতামত না নিয়ে কাউন্সিলে কেবল কমিটি অনুমোদন করার পাঁয়তারা করছে দুটি পক্ষ। এটি ঠেকাতেই লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।’

বরমি জামেয়া আনোয়ারিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার মুহতামিম মাওলানা আশেকে মোস্তফার পক্ষে বেফাকের সভাপতি, মহাসচিব ও মহাপরিচালককে লিগ্যাল নোটিশ দেন ব্যারিস্টার আশিকুর রহমান। নোটিশে বলা হয়েছে, ‘আগামী ৭ অক্টোবর কাউন্সিল অধিবেশন আহ্বান করলেও এজেন্ডা, আলোচ্যসূচি বা কার্যসূচি প্রকাশ করা হয়নি।’

এতে বলা হয়, ‘কাউন্সিল অধিবেশনের কাউন্সিলরদের নামের তালিকা, মজলিসে আমেলা ও মজলিসে খাস এর তালিকা, ভোটার তালিকা, নির্বাচনের বিস্তারিত তফসিল নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট বিধি-বিধান, নিয়ম-কানুন, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের গঠনতন্ত্র কোনও কিছুই প্রকাশ না করে সব কার্যক্রম গোপনে করার অপচেষ্টা করছেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি, গভীর ষড়যন্ত্রমূলক এবং অসৎ উদ্দেশ্যমূলক।’

নোটিশে কাউন্সিলের ভেন্যু পরিবর্তনের কথা বলা হয়। লেখা হয়, ‘‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতির (মাওলানা মাহমুদুল হাসান) নিজস্ব মাদ্রাসা ‘জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসায়’ কাউন্সিল অধিবেশনের ভেন্যু নির্ধারণ করেছেন, যা আইন-কানুন, বিধি-বিধান, নীতি-নৈতিকতা, ন্যায়নীতি ও নিরপেক্ষতা নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং নির্বাচনকে অবৈধভাবে প্রভাবিত করার অপপ্রয়াস, বিধায় এই ভেন্যু পরিবর্তন করে অন্য কোনও নিরপেক্ষ ভেন্যুতে কাউন্সিল অধিবেশন হওয়া অত্যাবশ্যক।’’

নোটিশে উল্লেখকরা হয়, ‘লিগ্যাল নোটিশের মাধ্যমে শেষবারের মতো আপনাদেরকে সতর্ক করে অনুরোধ করা যাচ্ছে, লিগ্যাল নোটিশ প্রাপ্তির ২ দিনের মধ্যে কাউন্সিল অধিবেশনের ভেন্যু জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসা থেকে সরিয়ে অন্য কোনও নিরপেক্ষ ভেন্যুতে করার প্রকাশ্য লিখিত ঘোষণা প্রদান করবেন, কাউন্সিল অধিবেশনের এজন্ডা বা আলোচ্য সূচি বা কার্যসূচি প্রকাশ করবেন। কাউন্সিলদের নামের তালিকা, মজলিসে আমেলা মজলিসে খাস এর তালিকা, ভোটার তালিকা, নির্বাচনের বিস্তারিত তফসিল নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান, প্রতিষ্ঠানটির গঠনতন্ত্র প্রকাশ করবেন।’

‘ব্যর্থতায় উপযুক্ত আদালতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে’ বলে যোগ করা হয় নোটিশে।

জবাব না পেলে মামলা করবেন নোটিশদাতা

লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে মাওলানা আশেকে মোস্তফা বুধবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেফাকে নোটিশ পৌঁছেছে বলে আমি জানতে পেরেছি। তারা কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, জানি না। তাদের নোটিশের জবাব দিতে হবে। তারা দেবেন আশা করি।’

বরমি জামেয়া আনোয়ারিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার মুহতামিম মাওলানা আশেকে মোস্তফা ১৯৮২ সাল থেকে বেফাকে যুক্ত রয়েছেন। তিনি সংস্থাটির মজলিসে আমেলা (নির্বাহী কমিটি) ও মজলিসে শুরার সদস্য এবং সহ সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

নোটিশের জবাব না পেলে কী করবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে আশেকে মোস্তফা বলেন, ‘আমি জবাব না পেলে মামলা করবো।’

তিনি অভিযোগ করেন, তারা নির্বাচনি কার্যক্রম ধামাচাপা দিয়ে কাউন্সিল করতে চাইছে।

লিগ্যাল নোটিশের পেছনে সরকারপন্থি আলেমরা রয়েছেন, এতে করে সরকারের প্রভাব আরও বাড়তে পারে, কারও কারও এমন অভিযোগ রয়েছে— এ প্রশ্নে প্রতিক্রিয়ায় আশেকে মোস্তফা বলেন, ‘সরকারের প্রভাব সম্পর্কে জানি না। যারা বলে তারাই বলতে পারবে।’

উল্লেখ্য, এ বিষয়ে জানতে চেয়ে বেফাক (বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া) সভাপতি মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী ও মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
কওমি মাদ্রাসায় মাতৃভাষা চর্চা
৭৮ বছরেও পাকা ভবন হয়নি মাদ্রাসার, ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান
জাকাত নিয়ে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছেন মাদ্রাসা শিক্ষকরা
সর্বশেষ খবর
নেই সংযোগ সড়ক, ২৩ কোটি টাকার সেতুতে উঠতে হয় মই বেয়ে
নেই সংযোগ সড়ক, ২৩ কোটি টাকার সেতুতে উঠতে হয় মই বেয়ে
১ মার্চের মধ্যে শপথ নেবেন পাকিস্তানের নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী
১ মার্চের মধ্যে শপথ নেবেন পাকিস্তানের নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী
বিআইডব্লিউটিএতে চাকরি, আবেদন ফি ৬০৯ টাকা
বিআইডব্লিউটিএতে চাকরি, আবেদন ফি ৬০৯ টাকা
নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের বিশেষ তহবিল চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের বিশেষ তহবিল চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানববন্ধন
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানববন্ধন
ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে যা শিখেছে পেন্টাগন
ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে যা শিখেছে পেন্টাগন
গানে বাধা দিয়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ না করার মুচলেকা দিলেন সাবেক শিক্ষার্থী
গানে বাধা দিয়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ না করার মুচলেকা দিলেন সাবেক শিক্ষার্থী
মার্কিন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মির্জা ফখরুলের বৈঠক
মার্কিন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মির্জা ফখরুলের বৈঠক
অভিযান চালিয়ে হাসপাতাল বন্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘না’
অভিযান চালিয়ে হাসপাতাল বন্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘না’