গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব সাত

প্রথম রেকর্ড হাতে পেয়ে ইন্দুবালা নিজেই ভেঙে ফেলেন!

শহীদ মাহমুদ জঙ্গী
২৭ জুন ২০২২, ১০:১৮আপডেট : ২৭ জুন ২০২২, ১৫:০০

গায়িকা হিসেবে সেই অল্প বয়সে ইন্দুবালার বেশ নামডাক হয়েছে। গ্রামোফোন কোম্পানি তাঁর রেকর্ড প্রকাশের   সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুযায়ী কোম্পানি ও শিল্পীর মধ্যে সমঝোতা হয় এবং গান রেকর্ড করা হয়। রেকর্ড প্রকাশিত হলে, কোম্পানির কর্মকর্তারা ইন্দুবালার কাছে একটি রেকর্ড পাঠিয়ে দেন। কিন্তু ইন্দুবালা রেকর্ড কীভাবে বাজাবেন?তাঁর তো গ্রামোফোনই নাই। রাগে ক্ষোভে রেকর্ডটি টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলেন! 

এই সংবাদ কোম্পানির কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে যায়। একটি নতুন গ্রামোফোন উপহার হিসেবে ইন্দুবালার বাসায় পৌঁছে দেন। সাথে গানের রেকর্ড। ইন্দুবালা তাঁর রেকর্ডকৃত প্রথম গান এভাবেই প্রথম শুনলেন।

কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিক রচিত ‘ওরে মাঝি’ নামের এই গানটি রেকর্ড করা হয় ১৯১৫ সালে।

ইন্দুবালার রেকর্ড ভাঙার গল্প থেকেই বুঝা যায় যে, গ্রামোফোন মানুষের কাছে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে পৌঁছুতে বেশ কিছুটা সময় নিয়েছিল। তাই বলে মানুষের রেকর্ডে গান শোনা বন্ধ ছিল না। পাড়া মহল্লায় এক বাসায় গ্রামোফোনে বাজানো গান,আশেপাশের বাসার বাসিন্দাদেরও গান শোনার সুযোগ করে দিতো। একটু ভালো অবস্থার রেস্টুরেন্টগুলোও অধিক পরিমাণ গ্রাহক আকর্ষণের জন্য গ্রামোফোন কিনে গ্রাহকদের গান শোনাতো। 

সাহিত্যিক মনমোহন বসুর ছোট ছেলে প্রিয়নাথ বসু ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’। পরে প্রিয়নাথের মেঝো ভাই মতিলালও সার্কাস দলে যোগ দেন। দুইজনের প্রজ্ঞা ও পরিশ্রমে কিছুদিনের মধ্যেই সাফল্য লাভ করে সার্কাস দল। 

এই সার্কাস দলে রাজবালা নামের এক বালিকা ট্রাপিজ ও ব্যালেন্সের খেলায় খ্যাতি লাভ করেন। বিভিন্ন শারীরিক কসরত তিনি এতো সহজে করতেন যে, তাকে বোনলেস রাজু নামে ডাকা হতো।
 
১৮৯৮ সালে উজ্জয়িনী সফরের সময় মতিলাল বসু বিয়ে করেন রাজবালাকে। সেই বছরে নভেম্বর মাসে পাঞ্জাব সফরকালীন সময়ে অমৃতসরে ইন্দুবালার জন্ম হয়। সন্তান জন্মের পর রাজবালা সার্কাস ছেড়ে দেন। তিনি কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। সার্কাস ছাড়লেও সংগীত চর্চা অব্যাহত রাখেন। সুকণ্ঠের জন্য রাজবালার সুনাম ছিল। 
মতিলাল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সার্কাসের দল নিয়ে যেতেন। সংগীতে দক্ষ মতিলাল কলকাতা এলে তাঁর কাছে ধ্রুপদ শিখতেন রাজবালা। প্রথম দিকে ইন্দুবালার গান শেখাও বাবারই কাছে। 

বিয়ের কয়েক বছর পর রাজবালার সাথে মতিলালের দূরত্ব তৈরি হয়। একসময় যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়। ইতিমধ্যে রাজবালার গায়িকা হিসাবে কদর বেড়েছে। মেহফিলের গায়িকারূপেও তাঁর চাহিদা বেড়েছে। সংগীতগুণীদের আগমনে সরগরম রাজবালার বাড়ি। গানের আসরের আয়োজনও হচ্ছে। এমনই এক গানের আসরে ইন্দুবালা প্রথম সংগীত পরিবেশন করেন। 

কাশীর প্রাচীন সারঙ্গ ধারার যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন গৌরিশঙ্কর মিশ্র। তিনি গওহর জানের গানের সঙ্গে সারঙ্গ বাজাতেন। ১৯১১ সালে দিল্লিতে পঞ্চম জর্জের দরবারে তিনি গওহর জানের গানের সঙ্গে সারঙ্গ বাজান। এর পরের বছরই ইন্দুবালা গৌরিশঙ্করের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে গৌরিশঙ্করের ভাই কালীপ্রসাদের কাছেও তালিম নেন।

ইন্দুবালা পরের বছর জন্মাষ্টমী উপলক্ষে, গৌরিশঙ্কর মিশ্রের বাসায় আয়োজিত গানের আসরে ইন্দুবালা গেছেন নেহায়েত শ্রোতা হয়ে। অনুষ্ঠানে দেশসেরা সব শিল্পীরা সমবেত হয়েছেন। অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন গওহর জান, কেরামতুল্লা খাঁ,ওস্তাদ মৈজুদ্দিন, জানকী বাঈ, কৃষ্ণ ভামিনী, আগ্রেওয়ালি মালকা, লখনউওয়ালি বেচুয়াবাঈ, কিরনবাঈ প্রমুখ। 
অনুষ্ঠানে ইন্দুবালাকে গাওয়ার  সুযোগ করে দিলেন কালীপ্রসাদ। ইন্দুবালা ওস্তাদ কালীপ্রসাদের কাছ থেকেই শেখা ইমন রাগের ওপর গান গাইলেন। এরপর সবার অনুরোধে গাইলেন ঠুমরি। গওহর জানের  অনুরোধে আরও কয়েকটি গান গাইলেন। ইন্দুবালার গান ও গায়কী গওহর জানের পছন্দ হলো। তারই  ইচ্ছায় গৌরিশঙ্করের সম্মতিতে ইন্দুবালা আনন্দের সঙ্গে গওহর জান-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। 

জমিরউদ্দিন খাঁ এবং এলাহি বক্সের কাছেও পরে তিনি তালিম নিয়েছেন। তাঁকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে নিয়ে যায় নজরুলের গান- কেউ ভোলে না কেউ ভোলে, মোর ঘুম ঘোরে এলে মনোহর অথবা অঞ্জলি লহ মোর প্রভৃতি। ইন্দুবালার কণ্ঠে এই গানগুলো প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। গাওয়ার জন্য ইন্দুবালাকে  প্রচুর গান দেন নজরুল। ইন্দুবালাও যত্নের সাথে প্রতিটি গানে কণ্ঠ দেন। বিপুলভাবে জনপ্রিয় ইন্দুবালা নিয়মিত চর্চায়, চমৎকার গায়কীতে দীর্ঘদিন শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রেখেছিলেন। 

তিনি মঞ্চে অভিনয়েও দক্ষ ছিলেন। নাট্যাচার্য শিশিরকুমার, অহিন্দ্র চৌধুরী, নির্মলেন্দু লাহিড়ীসহ সেই সময়ের খ্যাতিমান নাট্য ব্যক্তিত্বদের সাথে তিনি কাজ করেছেন। চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন। ‘মীরা বাঈ’, ‘চাঁদ সওদাগর’-সহ বেশকিছু ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। 

১৯২৭ সালে কলকাতায় রেডিও সম্প্রচারের দ্বিতীয় দিনে গান পরিবেশন করেন ইন্দুবালা। প্রায় ৫০ বছর  নিয়মিত শিল্পী হিসাবে রেডিও’র বিকাশে অবদান রাখেন।

৩০ নভেম্বর ১৯৮৪ সালে ইন্দুবালা মৃত্যুবরণ করেন। 

চলবে…

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গীতিকবি

তথ্যসূত্র:
‘মাই নেম  ইজ ইন্দুবালা’
বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য 
Indubala Devi-the singing sensation of 1915 Calcutta! Debdutta Gupta
Get Bengal 17 January 2020
Banglalive.com
আনন্দবাজার 

প্রথম পর্ব: অ্যাঞ্জেলিনা ইয়ার্ড থেকে সুপার স্টার গওহর জান হয়ে ওঠার ইতিহাস

দ্বিতীয় পর্ব: শিল্পীদের আয়ের বিজ্ঞানসম্মত পথ খুলে দেয় গ্রামোফোন

তৃতীয় পর্ব: গান-বাণিজ্যে গওহর জান নায়িকা হলে, লালচাঁদ বড়াল নায়ক

চতুর্থ পর্ব: ‘সেকালের কলকাতার লোকেরা ছিলেন সংগীত-ছুট’

পঞ্চম পর্ব: রেকর্ডিং কোম্পানিগুলোর কাছে যোগ্য সম্মানি পাননি কে. মল্লিক

ষষ্ঠ পর্ব: অমলা দাশের কারণেই অনেক প্রতিভাবান শিল্পী এসেছিলেন

/এমএম/
সম্পর্কিত
শহীদ মাহমুদ জঙ্গী: আড্ডাময় সমৃদ্ধ এক সংগীতজীবন
গীতিকবির গল্পশহীদ মাহমুদ জঙ্গী: আড্ডাময় সমৃদ্ধ এক সংগীতজীবন
‘পদ্মশ্রী’ প্রাপ্তিতে সংগীত ঐক্যর পক্ষ থেকে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে ফুলেল শুভেচ্ছা
‘পদ্মশ্রী’ প্রাপ্তিতে সংগীত ঐক্যর পক্ষ থেকে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে ফুলেল শুভেচ্ছা
৫০-এ সোলস: ব্যান্ডের লোগো নির্বাচন ও গান লিখতে পারবেন আপনিও
৫০-এ সোলস: ব্যান্ডের লোগো নির্বাচন ও গান লিখতে পারবেন আপনিও
রবীন্দ্রনাথের সকল গানের ভাণ্ডারি দিনেন্দ্রনাথ
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৬রবীন্দ্রনাথের সকল গানের ভাণ্ডারি দিনেন্দ্রনাথ
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
পরীমণির প্রথম সিনেমায় পারিশ্রমিক কত ছিল
পরীমণির প্রথম সিনেমায় পারিশ্রমিক কত ছিল
ইন্ডাস্ট্রিতে কাস্টিং কাউচের অস্তিত্ব রয়েছে: শ্রেয়া ঘোষাল
ইন্ডাস্ট্রিতে কাস্টিং কাউচের অস্তিত্ব রয়েছে: শ্রেয়া ঘোষাল
 শিল্পীদের জ্ঞান সীমিত, রাজনৈতিক প্রশ্ন করবেন না: শ্বেতা
 শিল্পীদের জ্ঞান সীমিত, রাজনৈতিক প্রশ্ন করবেন না: শ্বেতা
শুটিংয়ে ১৭ বার চড় খেয়েছিলেন আমির, কী হয়েছিল তার সঙ্গে
শুটিংয়ে ১৭ বার চড় খেয়েছিলেন আমির, কী হয়েছিল তার সঙ্গে
ঢাকার পর নিউ ইয়র্কের মঞ্চে বন্যা মির্জা
ঢাকার পর নিউ ইয়র্কের মঞ্চে বন্যা মির্জা