X
বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪
৪ বৈশাখ ১৪৩১
গীতিকবির গল্প

অনেক কিছুই ইচ্ছে করে, কিন্তু করা যায় না: মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান

মাহমুদ মানজুর
মাহমুদ মানজুর
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:২১আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৯:৪২

কিছু হচ্ছে না ভেবে রান্নার চুলোয় গানভর্তি চারটি খাতা পুড়িয়ে ফেলা যশোরের এক তরুণ, আজকের কিংবদন্তি গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান। শুধু গানের খাতায় মাপলে হবে না, তিনি এমনই একজন, যিনি একাধারে দারুণ কবি, একাত্তরের সংগ্রামী রেডিওকর্মী, সফল চিত্রনাট্যকার, প্রশংসিত অভিনেতা, শখের চিত্রশিল্পী; সর্বোপরি একজন অলিখিত শিক্ষক, সমালোচক ও নেতা। তাঁর ক্যারিয়ারগ্রাফ এতটাই দীর্ঘ, বর্ণাঢ্য আর সমৃদ্ধ, যেকোনও বিশেষণই এখন অনুজ্জ্বল প্রায়। এভাবেও বলা যায়, ‘কিংবদন্তি’ শব্দটি যেন স্বস্তি পায় তাঁর নামের সঙ্গ পেলে। আজই (১১ ফেব্রুয়ারি) তিনি জন্মের ৮১তম বছর অতিক্রম করলেন। দিন তিনেক (১৪ ফেব্রুয়ারি পহেলা ফাল্গুন) আগেই যেন সন্তর্পণে পা রাখলেন ৮২ বসন্তে। ফেলে আসা সমৃদ্ধ জীবনের কিছু গল্প উঠে এলো এবারের দীর্ঘ আলাপে—

বাংলা ট্রিবিউন: শুভ জন্মদিন। কেমন আছেন।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: ধন্যবাদ। ভালো আছি। এ বয়সে যতটা থাকা যায়, তারচেয়েও ভালো আছি।

বাংলা ট্রিবিউন: জন্মের ৮১তম বছর পূর্ণ করলেন। পেছনের দিনগুলোতে তাকালে কেমন দেখতে পান। কিছু হিসাব-নিকাশ নিশ্চয়ই নিজের মধ্যে হয়।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: আসলে জীবন তো একরকম চলে না, বিবিধ রকম। মানুষ একটা ভাবে, হয়ে যায় অন্যরকম। ফলে জীবনের গতিপথ বদলাতেই থাকে। কখনও একরকম ভাবনা থাকে, সেই ভাবনাগুলো আবার পরিবর্তিত হয়। আমার জীবনে বহুবার এটা হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: একটু যদি সবিস্তার বলতেন।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: গানের কবিতা ছাড়া, আর বহু ব্যাপারে; যেমন জীবনে একটা সময় খুব নাটক লিখতাম, অভিনয় করতাম, নির্দেশনাও দিতাম। মঞ্চ তৈরিসহ সমস্ত আয়োজন নিজেরাই করতাম। তখন চিন্তা করতাম, এটাই বোধহয় আমার জীবনের অন্যতম কাজ। আমি নাটক লিখবো, অভিনয় করবো। এটা কলেজ জীবনের কথা।

এর আগে চিত্রকর এস এম সুলতান ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো, তখন আমি ছোট। লোকটাকে দেখে আমার অদ্ভুত একটা সম্মোহন তৈরি হলো। তার ছবি আঁকা আমাকে মুগ্ধ করলো। মনে হলো আমি চিত্রশিল্পী হবো, সুলতান ভাইয়ের মতো। কিছু না ভেবে স্কুল ছেড়ে চলে গেলাম খুলনার মহেশ্বর পাশায়, ওখানে একটা আর্ট স্কুল ছিল। সুলতান ভাইয়ের তো কোনও নিশ্চয়তা নেই। এই আছেন, আবার কোথায় চলে গেলেন। এরকম একটা চিন্তায় আমি বাড়ি ছেড়ে চলে গেলাম খুলনায়। তখন কিন্তু আমি স্কুলের পাশাপাশি মঞ্চ নাটক নিয়ে খুব ব্যস্ত। নাইন পাস করেছি, ক্লাস টেনের পরিবর্তে খুলনায় গিয়ে ভর্তি হলাম আর্ট স্কুলে। একবার পরীক্ষার সময় চিত্রশিল্পী জয়নুল আবদীন স্যারকে নিয়ে এসেছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ। ওখানে তো শিল্পীরা ছিলেনই, তাঁকে স্পেশাল গেস্ট হিসেবে আনলো। উনি আমার খাতা দেখে খুবই ইম্প্রেসড হলেন। 

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান 

জন্ম ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩। বাংলাদেশের একজন গীতিকবি ও লেখক। তিনি শতাধিক চলচ্চিত্রের কাহিনি-চিত্রনাট্য-সংলাপ রচয়িতা। ১৯৮৪ ও ১৯৮৬ সালে শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে এবং ২০০৮ সালে শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।

আমাকে বললেন, ‘এই ছেলে… তোমার স্কেচ তো দারুণ। তুমি এক কাজ করো, মেট্রিক পাস করে ঢাকা আর্ট কলেজে চলে এসো’। তখন আমার চিন্তা হলো, মেট্রিক পাস করে আর্ট কলেজে যেতে হবে। স্যার যেহেতু বলেছেন, এটা মানতে হবে। বুঝলাম মেট্রিক পাস করে আর্ট কলেজে ভর্তি হলেই ভালো হবে। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে গেলাম নিজের বাড়ি। মেট্রিক পাস করলাম।

বাংলা ট্রিবিউন: এরপর সোজা আর্ট কলেজ!

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: শুরুতেই বলেছিলাম না, মানুষ একটা ভাবে, সময় নিয়ে যায় অন্যদিকে। মূলত সেই ব্যাখ্যাটাই দিচ্ছি এতক্ষণ। যাহোক, মেট্রিক পরীক্ষায় টেনেটুনে সেকেন্ড ডিভিশন পেলাম। কারণ মন তো আমার সুলতানের ডেরা অথবা ঢাকার আর্ট কলেজে পড়ে আছে। ভাবলাম, যেহেতু টেনেটুনে পাস করেছি সেহেতু পরিবার থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আর চাপ আসবে না, আর্ট কলেজে চলে যেতে পারবো সহজে। কিন্তু বিপত্তিটা বাধালো বাংলা সাবজেক্ট। সব বিষয়ে সেকেন্ড ডিভিশনের নম্বর পেলেও একমাত্র বাংলায় আমি লেটার মার্ক পেলাম। পুরো বোর্ডে (তখন গোটা পূর্ব পাকিস্তানে একটাই বোর্ড ছিল, ঢাকা) আমার সাত বছর আগে একজন বাংলায় লেটার মার্ক পেয়েছিল! ফলে বিষয়টি সবার কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো।

যেটা সন্দেহ করেছি, বড় ভাই ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (অধ্যাপক ও কবি) চেপে ধরলেন, ‘যেহেতু লেটার মার্কস পেয়েছিস, তোকে বাংলায় পড়তে হবে’। এরপর আর আর্ট কলেজে যাওয়া হলো না। সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করি।
 
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউন: এক লেটার মার্ক আপনার জীবনের গতি বদলে দিলো...

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: বলা যায়। তবে ছবি আঁকা কিন্তু আমি ছাড়িনি। আঁকার আগ্রহটা আজও রয়ে গেছে। কিন্তু সেটা রেগুলার হলো না। যেমন কিছু দিন আগে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম শত বছরের পুরনো মাটির মটকা (ধান বা চাল রাখার বড় মাটির পাত্র) ঘরে পড়ে আছে। খেয়াল হলো মটকাটাকে একটু রঙ-তুলিতে সাজাই। কিন্তু আঁকার রসদ তো নিয়ে যাইনি। কি আর করা, বাজার থেকে কৌটার রঙ দিয়ে মটকার গায়ে ছবি আঁকলাম। এই যে বাসার দেয়ালে যেসব ছবি দেখছেন, সব আমার আঁকা।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি যে সময়ের কথা বলছেন, তখন অভিনয়, ছবি আঁকা কিংবা গান করার জন্য তো আসলে পারিবারিক বা সামাজিক সমর্থন থাকার কথা নয়। যদি ভুল না বলি, তখন মনে করা হতো এগুলো অর্থহীন কাজ। সে জায়গায় আপনার পরিবারের কাছ থেকে এসব বিষয়ে প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: বলছি। তার আগে বলে রাখি, আমি কিন্তু ক্লাস ফাইভ-সিক্স থেকেই নাটকে অভিনয়, কবিতা লেখা, ছবি আঁকা, ফুটবল খেলার দিকে ঝুঁকে ছিলাম। একটা গল্প মনে পড়ে গেলো। কবিতা লেখার আগেই কবি পরিচিতি পাওয়ার ঘটনা এটা। ফাইভ বা সিক্সে পড়ি। যশোর জিলা স্কুলে পড়ি। ক্লাস থেকে এক স্যার চলে গেলে, আরেক স্যার আসতে আসতে মাঝখানে যে সময়টা পেতাম; তখন সবাই বেশ হইচই করতাম। এমনই এক হইচইয়ের মধ্যে আমি কাগজে লিখলাম, ‘স্যার আসছেন চুপ, পিঠে পড়বে ঢুপ’! হুট করে মনে এলো, তা-ই লিখলাম। সেটা আমার পাশের বন্ধু দেখলো।

এরপর স্যার এসে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এমন হইচই করছিলে কেন? তখন পাশে বসা বন্ধু আমাকে দেখিয়ে বললো, ‘স্যার এটা নিয়ে তো ও একটা পদ্য লিখে ফেলেছে’। স্যার বললেন, ‘কী লিখেছিস দেখি?’ দেখে স্যার অবাক হয়ে বললেন, ‘আরে তুই তো কবি’! এরপর থেকে স্কুলজুড়ে আমার নাম হয়ে গেলো কবি।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

১৯৪৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান ঝিনাইদহ জেলার লক্ষ্মীপুরে মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি যশোর জেলার সদর উপজেলার খড়কীতে। তার বাবার নাম শাহাদাত আলী এবং মায়ের নাম সাজেদা খাতুন।

বাংলা ট্রিবিউন: সেই নাম তো সার্থক হয়েছে। যতদূর জানি, গীতিকবিতা লেখার আগে আপনি মূলত কবিই ছিলেন। বিভিন্ন নামকরা পত্রিকায় আপনার কবিতা ছাপা হতো, বইও বেরিয়েছিল।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: সেটা আরও পরে। তবে তখনই স্কুল ম্যাগাজিনে আমার একটা পদ্য প্রকাশ হয়েছিল। এখনও লাইনগুলো মনে আছে—

‘চুরি করা মহাপাপ
করিয়াছি বারবার
ভুল হলে পাঠশালায়
ছিল নাকো নিস্তার
বৃদ্ধ সে পণ্ডিত
লোক বড় মজবুত
পিটুনির চোটে তার
পালাতো দেশের ভূত’

এরকম করে লম্বা একটা কবিতা লিখেছিলাম। তখনকার পড়া ‘লিচু চোর’ কবিতার প্রভাব এটা। কিন্তু ওই কবিতার ছন্দেও লিখিনি। এখন যখন মনে পড়ে, ভাবি এত নিখুঁত মাত্রাবৃত্ত ছন্দ—তখন এগুলো আমি কিছুই জানতাম না, বুঝতাম না। তবু কী করে এলো! এই যে ছন্দ, তালবোধ, আমার মনে হয় এটা ভেতরে ছিল, ইন-বিল্ট। যে কারণে এমন পদ্য লেখা, যেটার মধ্য থেকে শুরু হলো গান লেখা।

বাংলা ট্রিবিউন: গান লেখার বিষয়টি অবশ্যই জানবো। কিন্তু এসব বিষয়ে পরিবারের সমর্থন বা সহযোগিতার বিষয়টি যদি বলতেন...

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: অসহযোগিতা পাইনি, বাবা, মা কিংবা ভাইয়ের কাছ থেকে। শুধু বাংলায় লেটার মার্কস পেয়ে আর্ট কলেজে আর পড়তে পারিনি। এটুকুই। বলা দরকার, পদ্য আমার বাবা লিখতেন। তার কোনও বই প্রকাশ হয়নি বটে। কিন্তু লিখতেন। তাঁর কবিতার খাতা আমি দেখেছি। এরপর বড় ভাই (ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান) তো লিখতেনই। তার একটা প্রভাব ছিল আমাদের পরিবারে। আমি যখনকার কথা বলছি, তখন ওনার (বড় ভাই) মোটামুটি কবি হিসেবে নাম-ডাক হয়ে গেছে। আমার থেকে উনি সাত বছরের বড়।

প্রসঙ্গের বাইরে, তবু একটা কথা বলে রাখি। আমার বাবার খুব ইচ্ছে ছিল তার একটা মেয়ে হবে। এই এক মেয়ে করতে করতে ৯ ছেলে হলো, কোনও মেয়ে হলো না। আমি বাবা মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। আমার পরে আরও সাত ভাই। কিন্তু চম্পাকে আমরা আর পেলাম না।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউন: প্রসঙ্গের বাইরে হলেও তথ্যটি বেশ। স্কুলে থাকতেই কবিতা, নাটক, ছবি আঁকা শুরু হলো। কিন্তু গানের প্রতি কি তখনও ঝোঁক গড়ে ওঠেনি?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: গানের দিকে একটু পরে ঝুঁকি। এইট নাইনে পড়ি তখন। আমার কিছু বন্ধু গান করতো, স্কুলের অনুষ্ঠানের জন্য শিখতো-গাইতো। তাদের মধ্যে দুজন—হীরা ও লাট্টু। হীরার ভালো নাম শাহ মোহাম্মদ মোরশেদ। ও আমার পেছনে লেগে গেলো! বলতে লাগলো, ‘তুই এত সুন্দর পদ্য লিখিস, গানও লিখ’। কিন্তু গান আমি কী করে লিখবো? গান তো আমি লিখিনি কখনও। হীরা-লাট্টুর চাপাচাপিতে রেডিওতে গান শুনে শুনে বুঝতে চাইলাম, লেখার ধরন কেমন। দেখলাম, গানে একটা মুখ থাকে, অন্তরা থাকে, একটা সঞ্চারি থাকে, আরেকটা আভোগ। মাঝখানে সঞ্চারির চল উঠে গেলো। থাকলো মুখ আর দুই অন্তরা। এগুলোর নাম অনেক পরে বুঝেছি, তবে এই ভাগগুলো আমি বের করলাম গান শুনে শুনে খাতায় লিখে।
 
এরপর কিছু গানের প্যারোডি করলাম। মানে সুর ঠিক রেখে ঠিক পুরনো কথার বদলে একই ছন্দে নতুন কথা লিখলাম। প্যারোডি করার পর দেখলাম, বাহ্ বেশ তো হাতে এসে গেছে! তারপর নকল বাদ দিয়ে, নিজের চিন্তায় একটা গান লিখলাম। হীরা-লাট্টুকে দিলাম। গানটার কথা এখন আর মনে নেই, তবে ওরা পেয়ে খুব খুশি, দুই বন্ধু মিলে সুর করলো। তারা স্কুলের অনুষ্ঠানে সেই গানটি গায়। ভালোই তালি পাই আমরা। তারপর ক্লাস টেনে পড়ার সময় আঁকার জন্য পালিয়ে গেলাম খুলনায়। আমার সব হিজিবিজি হয়ে গেলো।

বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু খুলনা থেকে প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়নুল আবদীনের কথা ধরে দ্রুতই স্কুলে ফিরলেন। বাংলায় লেটার মার্কস পেলেন। কলেজেও জেনারেল লাইনে পড়লেন। কলেজে উঠে কি তবে গানে নিয়মিত হলেন? না কবিতায়।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: তখন কবিতার চর্চাটা ছিল বেশি। পাশাপাশি নাটকের পোকা মাথায়। অন্যরকম নেশা হলো নাটক ঘিরে। ইন্টারমিডিয়েটে নাটকের জন্য আমরা তিনজনের একটা দল ছিলাম। আমি, ডক্টর সৈয়দ আকরম হোসেন ও এহসান চৌধুরী। এহসান চৌধুরী এখন আর জীবিত নেই। আমরা তিনজনে যেমন নাটক লিখতাম আবার আমি ও আকরমও যৌথভাবে লিখতাম। নিজেরাই নির্দেশনা দিতাম, অভিনয় করতাম, স্টেজ তৈরি করতাম। সাপ্তাহিক বন্ধ মানেই আমাদের নাটুকে ব্যস্ততা রাত-দিন। এর মধ্যে জড়িয়েছি সমাজতন্ত্রের রাজনীতির সঙ্গে। রাত জেগে দেয়াল লিখন ছিল আমার কাজ। সাম্যবাদ আর আইয়ুব খান-বিরোধী কার্যক্রম ছিল আমাদের। খেটেছি জেল। নিজের প্রথম সন্তানের মুখ দেখলাম জেলখানায়! এসবে শরীরের ওপর কম অত্যাচার করিনি।
 
এর মধ্যে অনার্স দিলাম। অনার্সের সাবসিডিয়ারি পরীক্ষায় পুরো গ্রুপের মধ্যে আমি একা পাস করলাম! আমি সাবসিডিয়ারি পর্যন্ত যশোর কলেজে পড়লাম, ফাইনালে চলে গেলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষার আগে আমার প্রচণ্ড জ্বর। অনার্স তখন তিন বছর ছিল। সাবসিডিয়ারি দুই বছর আর ফাইনাল ইয়ার এক বছর। জ্বর মানে কী, এমন জ্বর, আমি ড্রপ করবো ডিসাইড করে ফেলেছি। আমার ওখানে লিগ্যাল গার্ডিয়ান ছিলেন ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তিনি জ্বরের কথা শুনে আমার হলে চলে এলেন। বললেন, ‘পরীক্ষা ড্রপ করা যাবে না’।

শিক্ষাজীবন

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান যশোর জিলা স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন (এসএসসি), সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

হেনা ভাই তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। বড় ভাই (ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান) এবং তিনি একসঙ্গে পাস করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। হেনা ভাই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, মনিরুজ্জামান সাহেব ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড। কিন্তু হেনা ভাই ইয়ার লস করার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলো হিসেবে সুযোগ পেলেন না। বড় ভাই সেকেন্ড হয়েও সুযোগ পেলেন। হেনা ভাই অভিমান করে চলে গেলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে জয়েন করলেন। তারাও তার মতো মানুষকে সাদরে গ্রহণ করলেন। যাহোক, উনি সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমাকে ড্রপ করতে দিলেন না। বাধ্য হয়ে পরীক্ষা দিলাম জ্বর নিয়ে। শরীর এত খারাপ ছিল, ফোর্থ সাবজেক্ট পরীক্ষা দিতে পারিনি। তারপর বাকি সবকিছু মিলে আমি কোনও রকম একটা সেকেন্ড ক্লাস পেলাম। সেই ফলাফল পেয়ে মন ভেঙে গেলো। এমনভাবে মন ভেঙে গেলো যে আমি সব স্বপ্ন ছেড়ে রাজশাহী থেকে চলে এলাম ঢাকায়। তারপর বড় ভাই জোর করে বাংলা সাহিত্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিলেন মাস্টার্সে। কিন্তু আমার আর পড়তে ইচ্ছে করে না। একেবারেই মন উঠে গেছে। এটা ১৯৬৭ সালের কথা।

বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু এর মধ্যে গানের সঙ্গে সংযোগ হয়নি!

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: তখনই সংযোগটা হচ্ছিল। ঘটনাটি বলছি। ১৯৬৫ সালে আমার প্রথম গান রেকর্ড হয় ঢাকা রেডিওতে। যশোর থেকে আমি খাতা পাঠিয়েছিলাম। তখন ২৫টি গান পাঠাতে হতো এনলিস্টেড হওয়ার জন্য। অনেকটা পরীক্ষার মতো। কিন্তু খাতা পাঠানোর পরে বড় ভাইকে জানাইনি। সেটা দরকারও মনে করিনি। চাইনি বড় ভাইয়ের পরিচয় দিয়ে সুবিধা নিতে।

যাহোক, ওরা আমার ২৫টি গানই কিনে নিলো, এনলিস্টেড করলো না। না করার কারণে মনটা খুব খারাপ, তখন আমি যশোরে। হঠাৎ ওর মধ্য থেকে একটি গান, ‘এ মাসের গান’ হিসেবে মিউজিক ডিরেক্টর আজাদ রহমান সাহেব তৈরি করেন। গানটি ছিল এরকম—

‘মুগ্ধ আমার এ চোখ
যখন মুগ্ধ আমার এ মন
তখন বাতাস আনলো বয়ে তোমার নিমন্ত্রণ…’

তখন রেডিওর নিয়ম ছিল ‘এ মাসের গান’ নির্বাচিত হলে সেটি মাসজুড়ে প্রচার করা হতো চার জন নামকরা শিল্পীর কণ্ঠে। মানে একই কথা, একই সুরে চার জন চারবার গাইতেন। প্রথম রবিবারে ফেরদৌসি রহমান গাইলেন, দ্বিতীয় রবিবারে সৈয়দ আব্দুল হাদী, তৃতীয় রবিবারে আঞ্জুমান আরা বেগম এবং চতুর্থ রবিবারে মনু দে। এখন হয়তো অনেকেই নামটি ভুলে গেছেন, মনু দে’র খুব সুন্দর কণ্ঠ ছিল। তারপর হারিয়ে গেছেন।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউন: তার মানে হলো আজাদ রহমানের সুরে ‘মুগ্ধ আমার এ চোখ’ দিয়ে গীতিকবি হিসেবে আপনার আনুষ্ঠানিক শুরুটা হলো রেডিওতে।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: ঠিক তা-ই। রেডিওর প্রত্যেকে আমার বড় ভাইকে ভালোভাবে চিনলেও আমি সেই পরিচয় দিয়ে কিন্তু গান পাঠাইনি। কিংবা কাউকে বলিওনি।

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে তালিকাভুক্ত হলেন কবে নাগাদ।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: সেটাই বলছি। প্রথম গানটি মাসজুড়ে রেডিওতে চলছে। এর মধ্যে ঢাকা বেতারের ডিরেক্টরও গানটা শুনলেন। সম্ভবত ওনার ভালো লেগেছে। তিনি অ্যাসিসটেন্ট ডিরেক্টরকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন—  

ডি: এই রফিকউজ্জামান কে?

এডি: আমাদের এখানে গান পাঠিয়েছিল। আমরা ২৫টি গান কিনে নিয়েছি। এনলিস্টেড করে রয়্যালটিতে যাইনি।

ডি: এত সুন্দর গান আপনি রয়্যালটি দেননি কেন?

এডি: না ভাবলাম, আরেকটু পাকা হয়ে আসুক। বন্ধুর ভাই তো!

ডি: বন্ধুর ভাই মানে?

এডি: আমি ওর নাম আর সই দেখেই চিনে ফেলেছি, মনিরুজ্জামান সাহেবের ছোট ভাই রফিকউজ্জামান।

ডি: এত সুন্দর গান লেখে, কার ভাই কী এটা দেখবেন নাকি? যান, এখনই রয়্যালটি পেপার তৈরি করে আনেন। আমি আজকেই সই করে যাবো।

অথচ আমি জানিই না আমাকে নিয়ে ওনাদের মধ্যে এত আলাপ হয়ে গেলো। এগুলো পরে জানতে পেরেছি। এদিকে আমি তো আগেই ২৫টি গানের টাকা পেয়ে গেছি একসঙ্গে। তারপরে আবার রয়্যালটির টাকাও পেলাম।

বাংলা ট্রিবিউন: টেলিভিশনে কবে এনলিস্টেড হলেন?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: টেলিভিশনেও গীতিকার হয়েছি ৬৫ সালে। ৬৪ সালে রেডিওতে যে খাতা পাঠিয়েছিলাম, তার একটি কপি টেলিভিশনেও পাঠালাম। তখন টেলিভিশনে তালিকাভুক্তির সিস্টেম করেনি, মূলত সেই থেকে শুরু হলো। তখন টেলিভিশনে ফাগুনের ওপরে ‘গীতিনকশা’ প্রচার হয়েছে আমার লেখা গান দিয়ে। যেটা সুরকারও আজাদ রহমান সাহেব ছিলেন।

বাংলা ট্রিবিউন: তখন কি আপনি ঢাকায়?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: না। বেতার ও টিভিতে গানের পাণ্ডুলিপি পাঠিয়েছি যশোর থেকে, ডাকযোগে। ৬৭ সালের দিকে রাজশাহী ইউনিভার্সিটি থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এলাম। এখানে এসে টিভিতে অডিশন দিলাম অভিনেতা হিসেবে। কারণ, রক্তে তো মঞ্চ নাটক। অভিনয়শিল্পী হিসেবে পাস করলাম। ব্রিটিশ লেখক আর্থার কোনান ডয়েলের ‘শার্লক হোমস’ অবলম্বনে নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় শুরু করি টিভিতে। তখন অনেকেই মজা করে বলতো, পৃথিবীর ইতিহাসে আমিই একমাত্র শার্লক হোমস, যার গোঁফ আছে!

এই সময়টাতে আমার চারদিক দিয়ে হিজিবিজি, আমি কোনটা করবো!

বাংলা ট্রিবিউন: ঢাকার ব্যস্ত জীবনে ফেরার আগে আবার একটু শৈশবে ফিরতে চাই। কেমন ছিল সেই দিনগুলো?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: আমার আব্বা কেন জানি খুব স্ট্রিক্ট ছিলেন। এলাকার মানুষ সবসময় বলতো, যশোর শহরে সৎ মানুষ যদি কেউ থেকে থাকেন, তিনি হচ্ছেন শাহাদত আলী, আমার বাবা। আমার মায়ের নাম সাজেদা খাতুন। বাবা এতটাই সৎ ও কঠিন ছিলেন— আমাদের বাড়ির সীমানা ঘেঁষে লাগোয়া একটা আম গাছ ছিল। ওই গাছের আম পেকে পেকে রাতে আমাদের অংশে পড়তো। আমার বাবা ভোরবেলা সবার আগে ঘুম থেকে উঠে সেগুলো কুড়িয়ে আম গাছের গোড়ায় ঢেলে দিয়ে আসতেন। এই আম যেন আমরা কুড়িয়ে না খাই কিংবা নিজেদের না মনে করি। প্রতিটি বিষয়ে তিনি এমন ছিলেন। এরকম মানুষ আমরা আর দেখিনি। আমার আব্বা সবার বেলাতেই এমন ছিলেন। আমি অনেক মার খেয়েছি আব্বার হাতে। সেজন্যই হয়তো অন্যায়, অবিচার সহ্য করতে পারি না। এসব কারণে শত্রু ভাবে অনেকে।

বাংলা ট্রিবিউন: এরপরও শৈশবের কিছু দুরন্তপনা তো ছিলই…

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: না থাকলে তো আর মার খেতাম না। মার খেয়েও আবার করতাম। এখনও আমার চোখে ভাসে, ছোটবেলায় স্কুল ছুটি হলে আমি মামাবাড়ি চলে যেতাম। কারণ ওই গ্রামাঞ্চলে বাউল গান, কবি গান, বয়াতি গান, জারি গান, পালা গানের আসর হতো। আমি সারা রাত জেগে সেসব গান শুনতাম। ওটা আমার নেশার মতো ছিল।

এত কিছু আমার মধ্যে কীভাবে এসেছে, হতে পারে সেই কবি গানের আসর থেকে। তখন সারা রাত জেগে আমি আব্দুল হালিম বয়াতির গান শুনেছি। বিজয় সরকার গাইতেন, ‘এই পোষা পাখি উড়ে যাবে একদিন/ সজনী ভাবি নাই মনে’। তিনি গাইতে গাইতে কাঁদতেন। পরে শুনেছি ওনার স্ত্রী বিয়োগ হওয়ার পর এই গানটা লিখেছেন। এটা সত্য মিথ্যা জানি না। কিন্তু উনি গাইতে গিয়ে কেঁদে ফেলতেন, সেটা আমি নিজ চোখে দেখেছি। তখন হালিম বয়াতির গান শুনেছি, মুসলিম বয়াতি, পাগলা কানাইয়ের শিষ্যদের গান শুনেছি।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউন: আপনার মামাবাড়ি কোনদিকে…

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: বাড়িটা হচ্ছে ঝিনাইদহ-মাগুরা বর্ডারে। শৈশবে এই অঞ্চলের হরিশপুরসহ সব এলাকা ঘুরতাম। হরিশপুর গেলে মনে হতো, এখানে লালন ফকিরের জন্ম, যদিও মতান্তর আছে এটা নিয়ে। কিন্তু আমার মনে হতো হরিশপুরে লালন ফকির আছেন। সিরাজ সাঁই সাহেব জন্মেছেন এখানে। এমন কোনও গ্রাম ওই অঞ্চলের নেই, যেখানে আমি যাইনি।

লক্ষ করবেন, আমার দেশের গানে গ্রামীণ বিভিন্ন চিত্র ও চিত্রকল্প অজান্তেই উঠে এসেছে। যেমন-

‘আমার মন পাখিটা যায়রে উড়ে যায়
ধানশালিকের গাঁয়, যায়রে উড়ে যায়
নাটা বনের চোরা কাঁটা ডেকেছে আমায়’

—এই ‘নাটা বন’ বা ‘নাটা ফল’ কী তা হয়তো অনেকেই জানে না বা দেখেননি। নাটা হলো এক ধরনের ফল, এটা খায় না। এটা একদম বন হয়ে যায়। ওটার মধ্যে ঝিনুকের খোলের মতো ফল হয়। একদম কাঁটা দিয়ে ভরা থাকে। গাছেও কাঁটা, ফলেও কাঁটা। ওটা শুকিয়ে গেলে লাঠি দিয়ে পেড়ে আনতাম। বনের ভেতরে ঢোকা সম্ভব হতো না। পেড়ে আনার পরে ওটা খুললে ভেতরে তিনটা বা চারটা বিচি থাকতো। এই বিচি দিয়ে আমরা মার্বেল খেলতাম। মূলত এগুলো জংলি গাছ। সেই নাটা বনের চোরা কাঁটা এসেছে আমার গানে। বেতের বাগান কতজন দেখেছে? আজকের ছেলেমেয়েরা জানে না বেতের বাগান কী।

এগুলো কিন্তু যশোরে আমার বাড়িতে দেখিনি। আমার জন্ম ঝিনাইদহে মামাবাড়িতে। কিন্তু আমার বাবার বাড়ি যশোরে।

কর্মজীবন

১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ বেতার-এ চাকরিতে যোগ দেন মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এখানে চাকরি করেন তিনি। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে লন্ডনের চ্যানেল এস-এ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন এবং ২০০৭ সালে বৈশাখী টেলিভিশনে অনুষ্ঠান প্রধান হিসেবে কাজ করেন তিনি।

যাহোক, রাত জেগে সব গান শোনা, জারি গান, পালা গান, কবিগান—এগুলো খুব মজার হতো। পুঁথি পাঠ ছিলই। তখন রেগুলারই হতো আর কি। এছাড়া আর একটা জিনিস খুব মজার ছিল—তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি। ক্লাস এইটের পরীক্ষা দিয়েই আমরা চলে গেছি নানাবাড়ি। কবি গান হচ্ছে, এক কবি আসেননি। ছেলেমেয়ে যারা ছিল তারা আমাকে ঠেলে তুলে দিলো। আমি পদ্য লিখতে পারলেও গান গাইতে পারি না। তখন ওরা বললো, ‘তোর গাইতে হবে না। তুই শুধু ছন্দে ছন্দে বলে যাবি’। তখন মঞ্চে উঠে কবিয়ালের হাত ধরে বললাম, ‘আমি তো গান গাইতে পারি না। আর আপনাদের এসব ভাবের বিষয়ে উত্তর দেবো, এত সাহসও আমার নেই। আপনাকে আমি সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করবো’। তখন উনি গানে গানে আমাকে কিছু প্রশ্ন করলেন। আমার মতো করে কিছু উত্তর দিলাম। কীভাবে কীভাবে মিল চলে এলো আমি বলতেও পারবো না।

বাংলা ট্রিবিউন: দারুণ অভিজ্ঞতা। তখন কি কবিতা লিখছেন নিয়মিত?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: শুরু করলাম মাত্র। আমার সবকিছুই আসলে কাছাকাছি সময়ে শুরু, উচ্চমাধ্যমিকে। নাটক, পদ্য, অভিনয়, ছবি আঁকা, গান লেখা।

তবে পত্রিকায় কবিতা ছাপা হয়েছে কলেজে ওঠার পর। যশোর কলেজ থেকে আমি নিয়মিত লেখা পাঠাতাম খবরের কাগজে। আমার বয়সী কোনও কবির লেখা সমকালে ছাপা হয়নি। কিন্তু আমার হয়েছে। তখন সমকাল নামে একটা সাহিত্য পত্রিকা ছিল। বেশ নামকরা। সমকাল, নবারুণ, পলি মাটি— এসব পত্রিকায় আমার লেখা রেগুলার ছাপা হতো। ওই সময় একজনকে পেয়েছিলাম, তিনি কবি আজীজুল হক। উনি আমাকে খুব পছন্দ করতেন। আমার কবিতার ক্ষেত্রে উনি এক ধরনের মেন্টর বলা যায়। ওনার তত্ত্বাবধানে যশোর কলেজে আমরা সাহিত্য মজলিস করতাম। যেখানে সপ্তাহে একদিন উনি আসতেন। এসে আমাদের সবার কবিতা শুনতেন। তারপর মন্তব্য করতেন। উনি আমাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন।

বাংলা ট্রিবিউন: এরপর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পার করে ঢাকার জীবনের গল্পটা শুনতে চাই। ঢাকায় গেলেন। বাংলায় এমএ ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখনই সম্ভবত রেডিওতে যোগ দিলেন।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: অনেকটা তা-ই। তবে বিষয়টি অতোটা সরল ছিল না। এমএ পড়তে পড়তে রেডিওর একটা চাকরির বিজ্ঞাপন পেলাম। বড় ভাইকে না জানিয়ে আবেদন করে পাঠিয়ে দিলাম। এটা ছিল প্রোগ্রাম প্রডিউসার পদ। অফিসার র‌্যাংকের শুরুর পদ ছিল এটি। এগুলো সবই যুদ্ধের আগে, ১৯৬৮ সালে। যাহোক, পরে আমাকে ইন্টারভিউতে ডাকলো, গেলাম। ইন্টারভিউ রুমে জিন্নাহ সাহেবের একটা ছবি ছিল। আমাকে বললেন, ‘হোয়াট ইজ দ্য ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন অব দ্য পিকচার?’ বললাম, যা মনে এলো। উত্তরে মনে হলো তারা খুব খুশি হয়েছেন। আমার চাকরিটা হয়ে গেলো।

বাংলা ট্রিবিউন: এটা রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রের কথা বলছিলেন।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: কেন্দ্র ঢাকা। কিন্তু আমি চাকরিটা পেয়ে পড়ে গেলাম জটিলতায়। আমাকে রাজশাহী কেন্দ্রে পোস্টিং দিয়ে দিলো। কারণ আমার অনার্সের সার্টিফিকেট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের। সে হিসেবে পোস্টিং হয়ে গেলো রাজশাহীতে। তাছাড়া তখনও খুলনা বেতার হয়নি। যেহেতু বাড়ি যশোর আর পড়াশোনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, তাই আমাকে রাজশাহীতে পাঠালো। এরপর বড় ভাইকে এসে জানালাম, এরকম ব্যাপার। মনে মনে খুব রাগ করলেন, কিন্তু এটাও বুঝতে পারছেন আমার যে পড়ায় মন নেই। চাকরি না করে যে দুর্দান্ত রেজাল্ট করবো, সেটা হবে না। এটা উনি বুঝে ফেলেছেন। তখন বললেন, ‘যাও...’। মানে অনুমতি দিলেন। তারপর চাকরি করতে চলে গেলাম। ওখান থেকে এসে এমএ ফাইনাল পরীক্ষা দিলাম ঢাকায়। এবারও কোনোরকমে একটা সেকেন্ড ক্লাস পেলাম। এই আমি লেখাপড়ার শেষে চূড়ান্ত চাকরি জীবনে ঢুকলাম।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু নিয়মিত গান লেখা শুরু করলেন কবে? গীতিকবি রফিকউজ্জামানকে কিন্তু এখনও পাইনি।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: বলছি। রেডিওতে ঢোকার পরে গান লেখার প্রেসার আসতে থাকলো আমার ওপর প্রচণ্ডভাবে। তার একটা কারণও আছে। রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে যখন পড়ি, টুকটাক কবিতা লিখছি; তখন ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল আমাকে একদিন ধরে নিয়ে গেলেন রাজশাহী রেডিওতে। নিয়ে গিয়ে আমাকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন—‘ও মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ভাই। খুব ভালো গান লেখে’। এরপর থেকে চাপ আসতে শুরু করলো। কিন্তু আমি তখন লিখতে পারছিলাম না। ডক্টর আবু হেনা মোস্তফা কামাল আমার প্রশংসা করেছেন, আমার বড় ভাই নামকরা কবি। এখন আমার লেখা যদি খারাপ হয়, তাহলে বলবেন উনি এই লেখাকে ভালো লেখা বলেছেন? এই যে একটা মেন্টাল প্রেসার, আমার মধ্যে প্রচণ্ডভাবে এলো। যার ফলে লিখতেই পারছিলাম না। যা লিখি মনে হয় হচ্ছে না।

তা-ই নয়, স্কুলজীবন থেকে আমি যত গান লিখেছিলাম, সব খাতা পুড়িয়ে ফেলেছিলাম। এটা ১৯৬১ সালে। যেদিন শুনলাম মুকুল দত্তর লেখা ও হেমন্তর কণ্ঠে ‘তুমি এলে অনেক দিনের পরে, যেন বৃষ্টি এলো’ গানটি। এটা শুনে মনে হলো—এটা যদি গান হয়, তাহলে আমি যেসব লিখি এগুলো কী? আমার গানে তুমি, আমি, প্রজাপতি, প্রেম, পাখি—এগুলো কী? এগুলো যেন আমার ওপর আর প্রভাব বিস্তার না করতে পারে, সেজন্য যা লিখেছিলাম সব পুড়ে দিয়েছি। খাতার অনেক গান কিন্তু রেডিওতে হয়ে গেছে। তবু আমি সেই গানের চারটি মোটা খাতা মায়ের কাঠের চুলায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম শুরুর জীবনেই।

বাংলা ট্রিবিউন: বিস্ময়কর! এরপর কি লেখা বন্ধ করে দিলেন?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: বন্ধ করিনি। তারপরে গণসংগীত লেখা শুরু করলাম। তার প্রায় এক বছর পর প্রথম যে আধুনিক গানটা লিখলাম, সেটা হলো-

‘যে সাগর দেখে তৃপ্ত দু’চোখ
মুগ্ধ তোমার মন
বুঝিনি তো তার ঢেউয়ের আড়ালে
ঢাকা কত ক্রন্দন’

প্রথম গান হিসেবে এটাকে আমি স্বীকৃতি দিই। যদিও গানটির রেকর্ড হয় অনেক পরে। এটা খোন্দকার নূরুল আলম সুর করেছেন, খুরশিদ আলম গেয়েছেন। স্বাধীনতার পর এটা ঢাকা রেডিওর জন্য করা হয়েছে।

এরপর চাকরি করি, বিভিন্ন অনুষ্ঠান করি, নাটক দেখি, শিশুদের অনুষ্ঠান দেখি, নারীদের অনুষ্ঠান দেখি। একগাদা অনুষ্ঠান আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। মিউজিক-ড্রামা কখনও একজনকে দেয় না। এক প্রোগ্রাম প্রডিউসারের ঘাড়ে এই এত চাপ কখনও দেয় না। যেহেতু দুটোর এক্সপেরিয়েন্সই আমার আছে, তাই চাপটা নিতে হলো। এরইমধ্যে বেতার নাটক করেছি অনেক। রাজশাহীতে করেছি, ঢাকায় এসে করেছি। মাঝে সিলেট রেডিওতে ছিলাম পুরো যুদ্ধের সময়টায়। তখন আর নাটক কী করবো, একরকম যুদ্ধই করতে হলো।

বাংলা ট্রিবিউন: যুদ্ধকালীন আবহটা একটু শুনতে চাই। যুদ্ধ মানেই তো শুনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গল্প। একই সময়ে সিলেট বেতারে আসলে কেমন কেটেছিল আপনার।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: ভয়ংকর সময় কাটিয়েছি। সেখানে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত মৃত্যু মুঠোয় করে চলতে হয়েছে।
আমি রাজশাহী কেন্দ্র থেকে ৭০-এর শেষে বদলি হয়ে গেলাম সিলেট। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গেলাম ১৯৭১ সালের ১৭ই মার্চ। আর পঁচিশে মার্চ থেকেই তো শুরু আক্রমণ। তখন আমার একটি বাচ্চা কোলে, আরেকটি বাচ্চার বয়স তিন বছর; দুই মেয়ে। সিলেটে নতুন, তখন না কারও ভাষা বুঝি, না জবাব দিতে পারি। সিলেটি ভাষা ঠিকমতো বোঝা এবং তার জবাব দেওয়া খুব কঠিন। আমি আমার ভাষায় কথা বললে ওরা খানিকটা বোঝে আবার বোঝে না। আর ওদের কথা আমি কিছুই বুঝি না।

যাহোক, সিলেটে এসে আমার জীবনে বিশাল ঘটনা ঘটে। ২৬শে মার্চের সকালে আমি রেডিওতে যাওয়ার জন্য রওনা দিয়েছি। পথে এক লোক বলেন, ‘পাখির নাহাল মানুষ মারতেছে। শিগগির বাড়ি যান’। পরে ভেতর দিয়ে ভেতর দিয়ে ঘরে ফিরলাম। রাজশাহীর একটা ছেলে আমাকে এতই ভালোবাসতো যে সে রাজশাহী থেকে সিলেটে চলে এসেছে আমার সঙ্গে। সিলেটে পেলাম এক বাড়িওয়ালার ছেলে। সবাই তো পালিয়ে গেলো জীবন বাঁচাতে। রাজশাহী থেকে যে ছেলেটা এসেছিল—সে, আমি আর ওই বাড়িওয়ালার ছেলে, আমার ওয়াইফ আর বাচ্চা দুজন রয়ে গেলাম।

গান, নাটক, চলচ্চিত্র কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ

১৯৬৫ সাল থেকে বাংলাদেশে বেতারে নিয়মিত গীতিকার হিসেবে কাজ করছেন মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান। তার প্রকাশিত গানের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। ১৯৭৩ সাল থেকে তিনি নিয়মিত ভাবে চলচ্চিত্রের জন্য গান লিখছেন। প্রায় শতাধিক চলচ্চিত্রের জন্য গান লিখেছেন তিনি। ১৯৬১-১৯৮৭ সাল পর্যন্ত মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান মঞ্চ, বেতার ও টেলিভিশনের জন্য শতাধিক নাটক লিখেছেন ও অভিনয় করেছেন।

স্ট্র্যাপিং করা আরম্ভ করলো যখন প্লেন থেকে, তখন টিনের চাল কাগজের মতো ফেটে যাচ্ছিল। পাশেই একটা আন্ডার কনস্ট্রাকশন বিল্ডিং হচ্ছিল, ওটার মধ্যে গিয়ে উঠলাম আমরা। ছাদ পাকা, জানালা দরজা হয়নি। কাঠ দিয়ে চারপাশ বন্ধ করেছি। ওটার মধ্যে গিয়ে আমরা উঠেছি। হঠাৎ একদিন কাঠের ফাঁক দিয়ে রাইফেলের নল ঢুকে গেলো! আমাকে বলছে- ‘বাহার নিকলো’। আমি বললাম, ক্যায় ইয়ে বাচ্চা লেকার? আমার ভাষা শুনে একজন সেনা অফিসার বললো, ‘তুম উর্দু জানতা হো?’ আমার মনে হলো ওরা পাঞ্জাবি সেনা। উর্দু ভালো পারে না। ওদের চেয়ে আমার উর্দু ভালো। সেই ভেবে বলে ফেললাম, ‘উর্দু তো মেরা মাতৃ জবান হ্যায়’!

কাজ হয়েছে এতে। উর্দুতে মোটামুটি কথা চালিয়ে গেলাম। বোঝালাম, আমি পাকিস্তানেরই লোক। পাকিস্তান রেডিওতে চাকরি করি। আমার পরিচয়পত্র দেখলো। সেই যাত্রায় বেঁচে গেলাম। আমাকে না ডেকে সেদিন যদি অন্য তিন জনের যেকোনও একজনকে ওরা জিজ্ঞেস করতো, সেখানেই মারা পড়তাম সবাই। কারণ ওরা উর্দুতে একটা শব্দও বলতে পারতো না। আর আমাদের ঘর সার্চ করলে তো কী হতো জানি না। কারণ আমাদের সঙ্গে যে বাড়িওয়ালার ছেলেটা থাকতো, সে ছিল সিলেট জেলা সদর ছাত্রলীগের জেনারেল সেক্রেটারি। আমাদের ঘরে প্রচুর অস্ত্র রাখা ছিল। যেগুলো ডিসট্রিবিউট করা হতো মাঠ পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু আপনি তো আপাদমস্তক বাংলা গান, কবিতা, সাহিত্যের মানুষ ছিলেন। উর্দু কেমন করে শিখলেন বা বলতে পারলেন!

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: হতে পারে এটাও শিল্প-সংস্কৃতির একটা শক্তি। যশোর কলেজে থাকতে আমরা সাহিত্য মজলিস করতাম। অবাঙালি ছেলেরা ‘বাজে মে আদম’ নামে আরেকটি মজলিস করতো। ওখানে আমি মাঝে-মধ্যে যেতাম। সেখানে গালিবের গজল নিয়ে ওরা আলোচনা করতো। এগুলো আমি শুনতাম। ওদের সঙ্গে আমার ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। ওদের মধ্যে দুই-একজন কবি-টবিও ছিল। ওগুলো তো একদম খাস উর্দু। গালিবের গজল তো ফার্সি মিশ্রিত কঠিন উর্দু। এগুলো শুনতে শুনতে উর্দুর ওপরে আমার ভালো একটা দখল ছিল। বলা যায়, যুদ্ধের ময়দানেও মির্জা গালিব আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।
 
বাংলা ট্রিবিউন: মুক্তিযুদ্ধের আর কোনও স্মৃতি…

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: অনেক অনেক স্মৃতি। অনেক যুদ্ধ। এভাবে আরও অনেকবার মরতে মরতে বেঁচে গেছি। আমাদের পাশের বাড়িতে একজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিলেন। উনি বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। যাওয়ার সময় আমাকে বাসার চাবিটা দিয়ে গেলেন। বললেন, যদি কোনও অসুবিধা হয় বা প্রয়োজন হয় তবে আমার বাসায় আপনি থাকবেন। তখন চিন্তা করলাম, ওখানে চলে যাই। কারণ আন্ডার কনস্ট্রাকশন বিল্ডিংয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। চলেও গেলাম। আমার ছোট বাচ্চাটার বয়স তখন ৪০/৪৫ দিন। ও তো আর বোঝে না। ওর তো খিদা লাগলে যখন তখন কাঁদে। সেই কান্নার শব্দ পেলেই তো পাকবাহিনী ছুটে আসবে। ওই ভদ্রলোকের বাড়িতে পেলাম নানা ধরনের ঘুমের ওষুধ। ওষুধগুলো গুঁড়া করে দুধের মধ্যে দিয়ে ঝাঁকিয়ে ওকে খাওয়ানো শুরু করলাম নিয়মিত। যেন ঘুমিয়ে থাকে। যেন আমরা পাকবাহিনীর চোখের আড়াল থাকতে পারি। এই ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর কারণে আমার ছোট মেয়েটা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই যুদ্ধটাকে আপনারা কী নাম দেবেন আমি জানি না। ওদিকে খবর পেলাম, আমার বাবার বাড়ি পুরোটাই জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়া হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: মর্মান্তিক সব ঘটনা।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: এমন ঘটনা একটি দুটি নয়। অসংখ্য আছে। সিলেট রেডিও স্টেশনে বসে আমরা গোপনে দেশাত্মবোধক গান বানাতাম। সেগুলো নানান মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাঠানোর চেষ্টা করতাম। এভাবে একদিন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়লো আমাদের সোর্স। তার হাতে সিলেট বেতারের টেপ। অথচ গান হলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য! যদিও পাক সেনারা এর উৎস জানতে পারেনি।

সেখান থেকে নিজেদের আসলে বাঁচানোর পথ ছিল না। তবু নানান যুদ্ধ করে নিজেদের বাঁচিয়েছি। এগুলো অনেক বড় বড় ঘটনা। বলতে গেলে শোনার সময় থাকবে না।

আরেকটা জিনিস যেটা করতো পাক সেনারা, সিলেটের অনেকে লন্ডনে থাকতো। লন্ডন থেকে কেউ এলে তাকে দিয়ে রেডিওতে বলানো হতো, লন্ডনে যারা বাঙালি আছে তারা কেউ বাংলাদেশ চায় না, পাকিস্তান চায়। এরমধ্যে আমার সঙ্গে একটি ছেলে ছিল। নাম শিহাব উদ্দীন। খুব ভালো ছেলে। এখন কোথায় আছে আল্লাহ জানেন। হবিগঞ্জে বাড়ি ছিল ছেলেটার। ওই ছেলেটি সিলেটি ভাষায় খুব ভালো কথা বলতে পারতো। ও আমার সঙ্গে থাকতো। মূলত এরকম লন্ডনিদের যখন আমাদের কাছে জিম্মি করে পাঠানো হতো, তখন তাদের ইন্টারভিউ না প্রচার করে বুঝিয়ে লুকিয়ে ছেড়ে দিতাম। এভাবে ভালোই চলছিল। একবার একজনকে উল্টো বুঝিয়ে পাঠিয়ে দেওয়ার পর সে গিয়ে জানিয়ে দিলো পাকিস্তানি আর্মির কাছে।

পারিবারিক জীবন

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের স্ত্রীর নাম পান্না জামান। এ দম্পতির দুই সন্তান সানজিদা শারমিন জামান স্নিগ্ধা ও সুহানা শারমিন জামান পৃথা।

তারপর ওরা এসে আমাদের দুজনকে ধরে নিয়ে গেলো ক্যাম্পে। এবারও ভাগ্যটা খুবই ভালো ছিল। এরকম ভাগ্য হয় না বোধহয় কারও। ওখানে গিয়ে দেখি এক জামায়াত নেতা, যে আবার বড় ভাইয়ের ছাত্র ছিল। তার সঙ্গে আমার আগে থেকেই পরিচয় ছিল। কবিতা-টবিতা লিখতো। ও তো আমাদের দেখে পাগল হয়ে গেছে। বলছে, ‘কী হয়েছে?’ তখন আমরা বললাম, আমাদের তো এরকম ধরে নিয়ে আসছে। পরের ঘটনা বললাম। পরে ও আমাদের বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। বোঝালো, ‘ইয়া সাচ্চা পাকিস্তানি। ইয়ে নেহি কারেঙ্গি।’ এসব বলে-টলে ছাড়িয়ে দিলো।

এই বাঁচাটা একেবারে অবিশ্বাস্য বাঁচা ছিল।

বাংলা ট্রিবিউন: এভাবেই তাহলে অন্যরকম যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আপনাকে। ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতা, যা এখন আর ভাবা যায় না। দেশ তো স্বাধীন হলো। তারপর…

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এসে আশফাকুর রহমান সাহেব ঢাকা কেন্দ্রের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হলেন। আমি তখন সিলেট কেন্দ্রের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে তার সঙ্গে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল। গান-বাজনাও করতো। ও হঠাৎ একদিন আমাকে ফোন করেছে, ‘তুমি তাড়াতাড়ি ঢাকায় আসো’। জানতে চাইলাম কারণ। ও বললো, ‘বঙ্গবন্ধু দেশে ব্যাক করবেন। তোমাকে সেটার কমেন্ট্রি করতে হবে’।

শুনেই ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি আমি ঢাকায় চলে এলাম। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু এলেন। তেজগাঁও বিমানবন্দরে ছিল একদল, তারপরে ছিলাম আমি এবং টিএইচ সিকদার নামে একজন। আমাদের দুজনের অবস্থান ছিল তেজগাঁওয়ে।

এয়ারপোর্ট থেকে ওরা যত দূর দেখছে, বলছে। তারপর আমরা আবার বলছি। এরপর ফার্মগেটে আরেক দল ছিল। এভাবে স্টেপ বাই স্টেপ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত কমেন্ট্রি সেটআপ ছিল আমাদের। এরপরে ১৯৭২-এর শেষের দিকে আমার ট্রান্সফার হলো ঢাকায়। তারপর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এলাম ৭৩-এর জানুয়ারিতে।

ঢাকা কেন্দ্রে এসে জয়েন করার পর এক কর্মকর্তা আমার জীবনটাকে অতিষ্ঠ করে দিলো। মানে শান্তিমতো কাজ করার পরিবেশ পেলাম না ওনার নোংরা রাজনীতিতে পড়ে। সেটা আরেক ইতিহাস।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউন: রেডিও থেকে আপনি জার্মানি সফরেও গিয়েছিলেন…

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: এটা অনেক পরে। ১৯৮৬ সালে স্কলারশিপ পেয়ে জার্মানি গেলাম। এটা ছিল ট্রেনিং ফর ট্রেনার্স। বেতারের সুবাদে আমি যেতে পেরেছি ডয়েচে ভেলেতে। তখন ওখানে আসাদ চৌধুরী সাহেব ছিলেন, আলফাজ তরফদার ছিলেন। এদের সবার টাইম শেষ হয়ে এসেছে। ছুটি নিয়ে নিয়েছে, একদম কেউ নেই বাংলা বিভাগে। ওখান থেকে আমি তখন বাংলা খবর পড়তাম রেগুলার। একজন জার্মান ভদ্রলোক বাংলা বিভাগের হেড ছিলেন। উনার নামটা ভুলে গেছি। আমি গেছি ট্রেনিং করতে, কিন্তু আমার ট্রেনিং শেষ হওয়ার পরে ওনারা আমাকে ছাড়বে না। তখন বললাম, আমি তো এখানে থাকবো না। আমি বাংলাদেশ মন্ত্রণালয়কে লিখিত দিয়ে এসেছি এখান থেকে গিয়ে আবার জয়েন করবো। তখন তিনি বললেন, ‘এটা তোমাদের গভর্নমেন্টের সঙ্গে আমরা সেটেল করে নেবো’। কিন্তু আমি তাতেও স্থির হলাম না, যথাসময়ে বাংলাদেশ বেতারে ফিরলাম। অথচ তখন থেকে গেলে আমার জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো। মানে আরও উন্নত হতো। আরও সমৃদ্ধ হতে পারতো।

এই কথা দিয়ে কথা রাখার চেষ্টা আমার জীবনে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: যেমন...

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: যেমন একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। কলকাতায় মান্না দে’র সঙ্গে দেখা। সেখানে বেশ ক’টি ছায়াছবির স্ক্রিপ্ট করেছি আমি। গান লিখেছি অনেক ছবির। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এরইমধ্যে পরিচয় হয়ে গেছে। আমি গেলে উনি আমার এখানে চলে আসতেন। সারা দিন আমার সঙ্গে থাকতেন এবং খুব করে গল্প করতেন। একদিন উনি আমাকে নিয়ে গেলেন মান্না দে’র ওখানে। গিয়ে বললেন, ‘আমার ছোট ভাই’। তখন মান্না দে বলেছেন, ‘তুমি পুলকের ছোট ভাই মানে আমারও ছোট ভাই’। আমি বললাম, ‘এটা আমার সৌভাগ্য’। বললেন, ‘তুমি গান লেখো, খুব ভালো। আমাকে একটু শোনাও তো’। তখন রিসেন্ট লিখেছি একটা গান, সেটা ওনাকে শোনালাম। গানটি হলো—

‘তাজমহলের সামনে দাঁড়িয়ে
দেখিনি তো শাজাহান
আমি দেখিনি তো মমতাজ
দেখেছি হাজারো শ্রমশিল্পীর
সাধনার কারুকাজ
ইতিহাস চাটুকার লিখে সত্যকে ঢেকে
ইতিহাসে মিছে কথা
অসত্যতায় পেয়ে যায় অমরতা
এভাবে শিল্পীর শ্রম চুরি করে বাঁচে
কত রাজাধিরাজ’।

তখন মান্না দে বললেন, ‘ছোট ভাই এই গান তুমি আমাকে দাও। আমি সুর করবো, নিজেই গাইবো’। আমি বললাম, দিতে যে পারবো না, আমি তো রেডিওকে দিয়ে এসেছি এটা। এটা ২০০০-এর আগে আগেই। তাই আমি এটা ওনাকে আর দিতে পারিনি। যে দুটো গান লিখে গিয়েছিলাম, সে দুটো গানই আমি ওনাকে শুনিয়েছিলাম। দুটোই চেয়েছিলেন। কিন্তু দিতে পারিনি, প্রথমটি রেডিও, পরেরটি টেলিভিশনে দিয়ে গিয়েছি বলে।

পরের গান হলো—

‘মহাকাল এক অসীম মহাসমুদ্র
এক শতাব্দী সেখানে হয়তো শিশিরের মতো ক্ষুদ্র’

বাংলা ট্রিবিউন: রেডিও থেকে তো চাকরিটা ছেড়ে দেন, অল্প সময়ে। সেটা কি জার্মানি থেকে ফিরে?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: জার্মানি থেকে ফিরেছি ৮৭ সালে। বেতারে কনটিনিউ করছিলাম। কিন্তু খুব চাপ হয়ে যাচ্ছিল। গান আর সিনেমার চিত্রনাট্যের চাপ বাড়ছিল। তাছাড়া এক কর্মকর্তা ছিলেন রেডিওতে, তার অনেক ষড়যন্ত্র আমাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।

১৯৯৩ সালে এসে ডিসাইড করলাম রেডিওর চাকরি ছেড়ে দেবো। আমার চাকরির ২৫ বছর যেদিন পূর্ণ হলো, তার পরের দিন আমি রেজিগনেশন লেটার পাঠিয়ে দিলাম। কেন রিজাইন করতে চাই, সেটা জিজ্ঞাসা করে পাঠালো, জবাব দিলাম। সেখানে আমি কারও অ্যাগেনেস্টে কিছু বলিনি। আমি বললাম, লেখালেখি করি। রেডিওতে আমার সারা দিনের ডিউটি। লেখার খুব অসুবিধা হয়। আমি লিখতে চাই, এ জন্য রেডিও থেকে চলে যেতে চাই।

বাংলা ট্রিবিউন: বেতার জীবন তো দ্রুতই শেষ করলেন। এরইমধ্যে সিনেমা শুরু করেছেন অলরেডি? সিনেমায় শুরুর বিষয়টা যদি একটু বলতেন...

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: সিনেমার কাজ তারও অনেক আগেই শুরু করেছি। সাইফুল আজম কাশেম এবং আলী হোসেন আমার বড় ভাইয়ের কাছে গেছেন। বললেন, ‘আপনি এত কিছু করছেন, আমাদের জন্য একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট করে দেন’। উনি বলে দিলেন, ‘আমি এসব স্ক্রিপ্ট করতে পারবো না। আমার এক ছোট ভাই আছে। ও নাটক লেখে, ওর কাছে যান। ও করতে পারবে’।

পরে তারা আমার কাছে এলো। আসার পরে আমি টাইম নিলাম। বললাম, আমাকে তিন মাস সময় দিতে হবে। এটা হলো ১৯৭৫ সালের ঘটনা। আমি স্ক্রিপ্ট লিখবো, তার আগে এ সম্পর্কে আমাকে জানতে হবে। মঞ্চ আর রেডিওর সঙ্গে তো সিনেমার পার্থক্য আছে। সেটা জানার জন্য অনেক বই কিনেছি। ফিল্ম ডিরেকশন, রিলেশন বিটুইন রাইটার অ্যান্ড ফিল্ম ডিরেক্টর, এডিটিং এবং ফটোগ্রাফির ওপর প্রচুর বই আনিয়েছি। সব পড়তে শুরু করলাম।

এরমধ্যে ওরা আমাকে এক পৃষ্ঠার একটা গল্প দিলো, একটি কাগজের এপিঠ-ওপিঠ। আমি তো গল্প পড়েই টের পেলাম এটা রবীন্দ্রনাথের ‘নৌকাডুবি’ থেকে চুরি। মানে ‘নৌকাডুবি’র বদলে তারা ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট করিয়েছে!

বুঝেও বললাম, ঠিক আছে আমি করতে পারবো। ওই প্রথম স্ক্রিপ্ট করলাম। ওই সিনেমার নাম ছিল ‘সোহাগ’। ওটাতে আমি কোনও গান লিখিনি। ওটাতে বড় ভাইকে দিয়ে গান লিখিয়েছে ওরা।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউন: তার মানে রেডিও-টিভির বাইরে তখনও সিনেমার জন্য গান লেখেননি!

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: তখনও সিনেমায় গান লেখা শুরু করিনি। তার কারণ হচ্ছে, সিনেমায় তখন গান নষ্ট হচ্ছিল। অশ্লীল কথা, অশ্লীল ভাব চলে আসছিল। আমি ভাই নতুন মানুষ। আমাকে ধরে কী দিয়ে কী লিখিয়ে নেবে, মুখের ওপর রিজেক্ট করতে পারবো না। আমি বিপদে পড়ে যাবো। ওই সময়টাতে গান নষ্ট হওয়া শুরু হয়েছে। সিনেমার গানের যে ক্লাস ছিল, সেখান থেকে নামছিল তখন। এসব ভেবে সিনেমার গানের প্রতি আগ্রহ ছিল না।

তারপর স্ক্রিপ্ট করলাম ‘ঘর সংসার’, সেটাও সুপার-ডুপার হিট। এরপর হঠাৎ সত্য সাহা ধরলেন। এই প্রথম আমি মনের মতো স্ক্রিপ্ট লেখার সুযোগ পেলাম। উনি মিউজিক ডিরেক্টর হলেও ভালো প্রযোজক ছিলেন।

বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু সিনেমার গান লেখা শুরু কীভাবে? আপনার মূলশক্তি যেখানে…

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: এরমধ্যেই নূর হোসেন বলাইয়ের একটা ছবির জন্য সুরকার খোন্দকার নূরুল আলম আমাকে গান লিখতে বললেন। বললাম, আমি তো গান লিখবো না। উনি বললেন, ‘আমি তো আছি এখানে। আমাকে ভরসা পান না?’ তখন বললাম, ঠিক আছে। খোন্দকার ভাই না থাকলে আমি জীবনেও ছবিতে গান লিখতাম না। শুরুটাই হয়তো হতো না। এই ছবিতে আমার গান লেখা শুরু হলো।

ছবিটার নাম ছিল ‘জবাব’। কিন্তু ছবিটি আর রিলিজ হয়নি। আমার একটা গান ছিল সেখানে। গানটা একজন মাতাল খালি বোতল নিয়ে হাঁটছে আর গাইবে—

‘ওই ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ
ওর বুকটাতে কি হয়েছে যক্ষ্মা
হু-হু বাবা, তবে আর পাবে না তো রক্ষা
দেখো আমি লেখাপড়া শিখে তবুও মূখ্য
বুকে নেই সুখ, নেই তার সাথে
নেই কোনও দুঃখ’

এটাই আমার সিনেমার প্রথম গান, গানটিও রিলিজ হয়নি।

এরপর আজাদ রহমানের সুরে ‘চুমকি’ নামের একটি ছবিতে গান লিখেছিলাম। ওই ছবিটিও রিলিজ হয়নি, কিন্তু গানটি রিলিজ হয়েছিল। গানটা হিট হয়েছিল। আজাদ রহমান সাহেবের সুরে শাহানাজ রহমতুল্লাহ গেয়েছিলেন।

গানটি ছিল এমন—

‘তুমি আমায় দিও উপহার
নয় মনিহার, নয় ফুলহার
কণ্ঠে পরাবো না, অঙ্গে জড়াবো না
এই মন ভরাবো আমার
তুমি আমায় দিও উপহার’

বাংলা ট্রিবিউন: বিষয়টি কিন্তু দারুণ। যদি ভুল না করি, রেডিও, টিভি ও সিনেমা—তিন মাধ্যমেই আপনার শুরুটা হয়েছে আজাদ রহমানের সুরে!

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: এটা সত্যি। শুরুটা আজাদ রহমান সাহেবের মাধ্যমেই হলো। তবে খোন্দকার নূরুল আলমের হাত ধরে প্রকৃতপক্ষে আমার সিনেমায় গান লেখা।

বাংলা ট্রিবিউন: একটু আগে সংগীত পরিচালক তথা প্রযোজক সত্য সাহার কথা বলছিলেন। মনের মতো স্ক্রিপ্ট লেখার সুযোগ পেলেন তার মাধ্যমে।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: যেটা বলছিলাম, এরমধ্যে সত্য দা এসে আমাকে বললেন একটা নিউজ পেয়েছি। কিন্তু কোনও পত্রিকায় খুঁজে পাইনি। স্কুপ নিউজ। সেটা হচ্ছে, স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল, লম্বা ছুটি। একটা ছেলে বাথরুমের মধ্যে আটকে গিয়েছিল। ছুটি শেষে যখন স্কুল খুলেছে, তখন দেখা গেলো ছেলেটা ওখানে মরে আছে। এটা ৮০ সালের কথা।

বাংলা ট্রিবিউন: মানে ঐতিহাসিক সিনেমা ‘ছুটির ঘণ্টা’র কথা বলছেন?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: একদম তা-ই। সত্য দা আমার সঙ্গে এতটুকু শেয়ার করলেন। আমরা সব পত্রপত্রিকায় খুঁজলাম, কিন্তু পেলাম না। তারপর এই ঘটনা জানার জন্য আমরা ঘুরলাম। ঘুরতে ঘুরতে প্রথম গেলাম সাভারে। সাভার থেকে শুনলাম এটা এখানে না, ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে। ওখানেও কোনও স্কুলে এটা ঘটেনি। এই শুনতে শুনতে শুনলাম, এটা চট্টগ্রামে। গেলাম সেখানে। চট্টগ্রামে সত্য দার বাড়ি। পৌঁছালাম, কিন্তু সেখানেও পেলাম না এমন কোনও ঘটনা। কেউ একজন বললো, এরকম একটা ঘটনা তো রাঙামাটিতে ঘটেছিল। গেলাম রাঙামাটিতে। সেখানে গিয়ে যে গেস্ট হাউজে ছিলাম, সেটা এখন আর্মির কন্ট্রোলে। সেখানে এখন পাবলিক থাকতে পারে না। তখন ওখানে সাধারণ মানুষ থাকতে পারতো। সেখানে উঠলাম। ওখানেও এমন কিছু হয়নি! কিন্তু ওটার পাশে একটা স্কুল ছিল। সেখানে গিয়ে দেখলাম, সত্য দা’কে বললাম, ইটস বেস্ট প্লেস টু শুট। লোকেশন দেখে আমার গল্প এসে গেছে। পুরো চিত্রনাট্য-সংলাপ তৈরি হলো ওখানে।

ওখানে বসে আমরা স্ক্রিপ্ট করলাম। আজিজুর রহমান সাহেব ডিরেক্টর ছিলেন, উনি যাননি। উনার অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন মতিন রহমান। আমরা তাকে মতি বলে ডাকতাম। মতিন রহমান, আমি আর সত্য দা। আমাদের সঙ্গে সত্য দা’র ফ্যামিলি এবং আমার ফ্যামিলি। গাড়িতে ওরা সারা দিন ঘুরে বেড়ায়। আর আমরা তিন জন সারা দিন ঘরে বসে আবদ্ধ থাকতাম। মনের মতো করে এই প্রথম আমি একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট করলাম।

কিন্তু ঘটনাটি কোথায় ঘটেছে সেটা আর পাইনি। তবে ওই স্কুলেই শুট করেছি আমরা।

বাংলা ট্রিবিউন: মূলত এরপর থেকে আপনি সিনেমার চিত্রনাট্য আর সংলাপ লেখায় ব্যস্ত হয়ে গেলেন। সফলতাও আসছিল প্রচুর। কিন্তু গানের কী অবস্থা তখন?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: তখন সত্যি বলতে স্ক্রিপ্টেই বেশি ব্যস্ত। পাশাপাশি রেডিও-টিভির জন্য গান লিখতে হতো। আর খোন্দকার নূরুল আলম ভাইয়ের ফিল্মগুলোতে বেছে বেছে গান লিখছিলাম। উনার গান হলেই লিখি, না হলে আর লিখিনি। বিষয়টি এমনই ছিল।

এরপর সাহিত্যভিত্তিক ছবি করা শুরু হলো। তখন চাষী নজরুল ইসলাম ও খোন্দকার নূরুল আলম ভাই মিলে অনেক সিনেমার গান করেছি। ‘দেবদাস’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘শুভদা’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’।

সিনেমার গানে আমার মূল জোয়ারটা শুরু হয় আলাউদ্দিন আলীর সঙ্গে কাজ করার পর। সেটা অনেক পরের কথা। তার আগেই ফিল্মের স্ক্রিপ্ট প্রায় শ’খানেক লিখে ফেলেছি।

মটকার গায়ে আঁকা ছবি দেখাচ্ছিলেন মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউন: স্ক্রিপ্ট কমিয়ে গানে সময় বেশি দিয়েছেন কবে নাগাদ?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: ৮০-এর দশক প্রায় পুরোটা আমি স্ক্রিপ্ট করি, গানও লিখি। বলা যায় সমানে সমান। চিত্রনাট্যের মধ্যেই গানসহ লিখতাম।

একটা ঘটনা বলি—আমি তখন বাংলামোটরে থাকি। বাংলামোটরে মেইন রাস্তা থেকে নেমে একটা সরু রাস্তা আছে। রিকশা চলে, কিন্তু গাড়ি ঢুকবে না। হঠাৎ দেখি রাজ্জাক সাহেবের ড্রাইভার বাসায় এসেছে দৌড়াতে দৌড়াতে। আমাকে বলছে, ‘স্যার সর্বনাশ হয়ে গেছে। আপনি শিগগির আসেন। হিরো এসেছে, কিন্তু নামতে পারছে না’।

মানে পুরো এলাকা ভেঙে পড়েছে রাজ্জাক সাহেবকে দেখে। আমি জাস্ট শার্ট-প্যান্ট পরে বেরিয়ে এসেছি। কোনোরকমে লোকজন সরিয়ে, রিকোয়েস্ট করে গাড়িতে উঠে বসলাম। বসার পরে উনি আমাকে ধরলেন। বললেন, ‘‘অভিনয় করে যা আনছি, প্রোডাকশনে এসে সব ডুবে যাচ্ছে। সেই ‘রংবাজ’ ও ‘বেঈমান’-এর পর আর ছবি করে তেমন ব্যবসাসফল হচ্ছে না। রাজলক্ষ্মী প্রডাকশন চালানো মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।’’

আমি বললাম, আপনার ইমিডিয়েট সুবিধা হচ্ছে, সাহিত্যভিত্তিক গল্পগুলোকে কমার্শিয়াল করে ক্যারেক্টারগুলোর নাম হিন্দু থেকে মুসলমান করে ছবি বানাতে পারেন। তখন তিনি বললেন, ‘আপনি লিখেন’। তারপর লেখা আরম্ভ করলাম। বাংলামোটরে তখন জহুরা মার্কেট ছিল। একটা রুম ছিল প্রযোজক মজনু সাহেবের। তার অনেক ছবি করেছি, হিট ছিল সব। মজনু সাহেবের রুমে বসে আমি লিখলাম। দুইবার, তিনবার লিখলাম। তারপর লিখে আমি ফাইনাল করলাম। উনার কাছে নিয়ে গিয়ে শোনালাম। এটার নাম দিলাম ‘সৎভাই’। ১৯৮৫ সালের কথা। ৩ লাখ টাকার ছবি, ৩ কোটি টাকা ব্যবসা করেছিল ওই সময়। ছবিটি করেছি ‘বৈকুণ্ঠের উইল’ থেকে।

এরপর তার জন্য লিখলাম ‘বদনাম’। এটাও সুপার-ডুপার হিট। কিন্তু তার সঙ্গে আমার সফলতা বেশি হলেও কাজ করেছি কম।

বাংলা ট্রিবিউন: চিত্রনাট্য আর সংলাপের গল্প নিশ্চয়ই আরও অনেক আছে। তবে সিনেমার গানের ক্ষেত্রে আপনার শুরুটা খোন্দকার নূরুল আলমকে দিয়ে। তবে সফলতার বিচারে আলাউদ্দিন আলীর সঙ্গেই বেশি। এ দুজন মানুষ সম্পর্কে যদি একটু বলতেন।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: দুজন না, আমাকে বলতে হলে চার জন সম্পর্কে বলতে হবে। একটা হচ্ছে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক হলো হঠাৎ করেই। ও আটটা গান করবে টেলিভিশনে, চারটা আমাকে লিখতে হবে। তখন বুলবুল গান লেখে না।

উল্লেখযোগ্য গান

সেই রেললাইনের ধারে মেঠো পথটার পারে দাঁড়িয়ে
বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম
দুঃখ আমার বাসর রাতের পালঙ্ক
আমার মতো এত সুখী নয়তো কারও জীবন
ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়
আমার মন পাখিটা যায়রে উড়ে যায়
পদ্ম পাতার পানি নয়, দিন যাপনের গ্লানি নয়
মাঠের সবুজ থেকে সূর্যের লাল
কিছু কিছু মানুষের জীবনে ভালোবাসা চাওয়াটাই ভুল
মনটা সবাই দিতে পারে আমি তোমায় প্রাণটা দিতে চাই

ওর অনুরোধে আমি লিখলাম। তারমধ্যে ‘সেই রেললাইনের ধারে মেঠোপথটার পারে দাঁড়িয়ে’ গানটাও ছিল। ওই একটা গানই বেঁচে আছে চার গানের মধ্যে। আশির দশকের গান এটা। তারপর বুলবুলের সঙ্গে আমার এমন সম্পর্ক হলো, সময় পেলেই আমার বাসায় চলে আসতো। এমনকি আমার মেয়েদের জন্মদিন ওর মনে থাকতো। ও মনে করে কেক নিয়ে হাজির হতো।

ওর সঙ্গে আমার হিট গান ‘সৎভাই’ থেকে শুরু। এরপর আরও অনেক গান করেছি আমরা। যেমন ‘পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমারি ছোঁয়াতে খুঁজে পেয়েছি’। এটা ‘সহযাত্রী’ ছবির গান।

বুলবুলের সঙ্গে এভাবে আমার সংযুক্তি ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তো যেটা বলছিলাম, বুলবুলের সঙ্গে বেশ কিছু কাজ আমি করেছি এবং সর্বশেষ ‘না বলো না’ নামে একটি ছবি করেছিলাম। ছবির স্ক্রিপ্ট ও গান আমার লেখা, বুলবুলের সুর। এই ছবিটা হিট হয়নি। কিন্তু কয়েকটা গান হিট হয়েছে। যেমন, ‘তারা চায় জ্বলতে’, ‘গানে গানে চেনা হলো’ প্রভৃতি।

আরেকজনের কথা বলবো, যার সঙ্গে ছবির কোনও গান করিনি। তিনি হচ্ছেন অনুপ ভট্টাচার্য। তিনি আমার আত্মার আত্মীয়। মানে আমি ঠিক আমার গানগুলো যা ভাবতাম, তখন মনে হতো কথাগুলো সুরানুবাদ হয়েছে। এত অ্যাকুরেট সুর হতো।

এরপর খোন্দকার নূরুল আলম ভাই। আমি নিজেই তার ভক্ত ছিলাম। তার সঙ্গে আমি ফিল্মের গানের কাজ প্রথম করি। খোন্দকার ভাই যদি আমাকে সাহস না দিতেন, তাহলে হয়তো আমি জীবনেও ফিল্মের গান লিখতাম না। তারপর তো অনেক ছবি হয়েছে একসঙ্গে।

আলাউদ্দিন আলীর সঙ্গে কাজ করেছি প্রচুর। সে সবসময় আফসোস করতো, ‘রফিকউজ্জামান ভাইয়ের সঙ্গে কেন আমি আট দশ বছর আগে কাজ করা শুরু করিনি। তাহলে কত কী যে অমর সৃষ্টি হতো!’

এই চার জনের কাজ আমি সবচেয়ে বেশি করেছি।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউন: সংগীত পরিচালক-প্রযোজক সত্য সাহার সঙ্গেও আপনি অনেক সমৃদ্ধ গান ও চিত্রনাট্য সৃষ্টি করেছিলেন…

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: সিনেমা তো অনেক পরে। সত্যদার সঙ্গে কাজ রেডিও দিয়ে শুরু। প্রথম যে দুটো গান করেছি, পরে দুটো গানই উনি ছবিতে লাগিয়েছেন। একদিন, তখন আমি হাতিরপুলে থাকি, সত্যদা এসেছেন বাসায়। সঙ্গে সুবীর নন্দী। উনি ভেবেছেন সুবীরকে আমি চিনি না। অথচ সিলেট বেতারের সুবাদে আগে থেকেই চিনি।

যাহোক, সত্যদা এসেই আমার স্ত্রীকে বললো, ‘ভাবি দুপুরে খাবো। আমি আছি, সঙ্গে আরেকজন নতুন মানুষ আছে।’ আমার ওয়াইফ তো সুবীরকে চিনেছে। সে বললো, ‘আপনার কাছে নতুন হলেও সে কিন্তু আমার কাছে নতুন না।’  

খাবার অর্ডার করে সত্যদা আমাকে বললেন, ‘দুটো গান লিখতে হবে এখন।’

বাংলা ট্রিবিউন: এটা কবেকার ঘটনা?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: ৭৫-৭৬-এর মধ্যে। দুটো গানের মধ্যে একটি সাবিনা ইয়াসমিন গাইবেন। আরেকটা এই নতুন ছেলেটার জন্যে। রেডিওর গান। আমি বললাম, ‘এখনই লিখবো কীভাবে! বললেই হয়ে যাবে?’ বললেন, ‘হবে হবে। হয়ে যাবে।’

লিখবো না লিখবো না ভেবেও হঠাৎ চলে এলো, ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম, তবু একটা কিছু হয়েছি যে তাতেই আমি ধন্য হলাম’। এটার এক অন্তরা শেষ হতেই উনি কাগজটা টান দিয়ে নিয়ে নিলেন। বললেন, এবার ওটা লিখেন। এরপরের অন্তরা আপনি পরেও লিখতে পারবেন।

এরমধ্যে খেতে বসে একটা জিনিস মাথায় এলো, আমরা তো সব বস্তু দেখি। চাঁদ, তারা, ফুল। তবে যে জিনিস দেখি না, অদৃশ্য, তাকে বস্তু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা গেলে কেমন হয়? এটা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা লাইন মাথায় এলো। খেয়ে এসেই লিখলাম, ‘দুঃখ আমার, আমার বাসর রাতের পালঙ্ক, নিন্দা আমার প্রেম উপহার, সাতনরি হার কলঙ্ক।’

সত্যদা বলে উঠলেন, ‘এই পেয়ে গেছি, হয়ে গেছে। কী দারুণ হয়েছে’। দাদার উচ্ছ্বাস থামে না। ওটাও উনি এক অন্তরা লিখতেই টান দিয়ে নিয়ে গেলেন।
 
এরপর সত্যদার সঙ্গে বেশ কিছু ছবির কাজ করেছি। খুব বেশি না। ‘ছুটির ঘণ্টা’ তো করেছি। ওনার যত ছবির স্ক্রিপ্ট করেছি, সেগুলোর গানও আমি করেছি। আমাদের সম্পর্কটা হয়ে গিয়েছিল একেবারে পারিবারিক।

উল্লেখযোগ্য গান

আকাশের সব তারা ঝরে যাবে
যদি মরণের পরে কেউ প্রশ্ন করে
আমার বাউল মনের একতারাটা
দোয়েল পাখি গান শুনিয়ে ঘুম ভাঙায়
চির অক্ষয় তুমি বাংলাদেশ
স্বাধীনতা তোমার জন্য যে পারে বইতে
ওই সূর্য বলেছে আমাকে
ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেলেও তবু

একদিন কথায় কথায় বলছি, সত্যদা যশোরের মানুষ আমি, এত বড় কৈ মাছ খেয়েছি, প্লেটের এদিক থেকে ওদিকে মাথা বেরিয়ে যায়। এখন আর চোখেও দেখি না। বললেন, ‘ঠিক আছে আমি খাওয়াবো আপনাকে। ঠিকই একদিন ডেকে বসলেন বাসায়। আমার ফ্যামিলি, খোন্দকার ভাইয়ের ফ্যামিলি, সুবীর নন্দী, রফিকুল আলম, আবিদা সুলতানা, শাম্মী আক্তার, আকরাম, সবাইকে দাওয়াত করেছেন। সোয়ারিঘাট থেকে কৈ মাছ আনিয়েছেন অর্ডার করে। সেই সাইজের কৈ মাছ। এখনও সেই স্বাদ মুখে লেগে আছে।
 
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার এই দীর্ঘ পথচলায় পাঁচ জন লোককে আপনি বিশেষভাবে স্মরণ করলেন। এই পাঁচ জন লোকই কিন্তু নেই। কেমন লাগে ভাবলে?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: এই হাহাকারটা অনুভব করি। আমি এখন একটা গান বা কবিতা লেখার পর কাকে দেখাবো? আজ যদি খোন্দকার ভাই থাকতো অথবা সত্যদা কিংবা আলাউদ্দিন আলী, বুলবুল, অনুপ। অনুপের সুরে আমার লেখা মিতালীর কণ্ঠে অমর হয়ে আছে। ‘শুক পাখিরে পিঞ্জিরা তো খুলে দিলাম আজ, বুঝলাম আমি সুখ সে তো নয় খাঁচায় পোষার কাজ’।

বাংলা ট্রিবিউন: অনুপ ভট্টাচার্য খুব স্লোলি কাজ করতেন। একটা গানের সুর করতে নাকি কয়েক বছর লেগে যেত?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: হ্যাঁ। আমারও হয়েছে এমন। অনুপ কখনও সিনেমার সুর করেনি। আমার খুব ইচ্ছে ছিল ওকে দিয়ে একটা সিনেমা করানোর। কিন্তু হয়নি। পারিনি। পারিনি কারণ, সিনেমা তো ক্রমান্বয়ে নামতে লাগলো।

বাংলা ট্রিবিউন: শেষ কোন সিনেমার স্ক্রিপ্ট করেছেন?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: সম্ভবত আমার শেষ সিনেমার স্ক্রিপ্ট ছিল ‘খোদার পরে মা’। এটা মহা হিট ছবি।

বাংলা ট্রিবিউন: এটার পরে আর কন্টিনিউ করলেন না কেন?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: কন্টিনিউ হলো না, খুব অসুস্থ হয়ে পড়লাম আমি। এটা তো লম্বা সময় বসে করার কাজ। তাই আর করা সম্ভব হয়নি। আস্তে আস্তে দূরত্ব বাড়াতে বাড়াতে, সিনেমার নকল আর অধঃপতন দেখতে দেখতে করা হলো না। ক্রমান্বয়ে সরে এসেছি।
 
বাংলা ট্রিবিউন: গানের ক্ষেত্রে শেষ কোনটা ছিল?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: গানের ক্ষেত্রে শেষ ছিল ফরিদ আহমেদের। ও মারা গেছে। সে আমার এখানে আসতো রেগুলার। সে অনেকটা না বলেই চলে গেলো। হঠাৎ হাসপাতালে গেলো, চার দিনের মাথায় শুনি নেই।

বাংলা ট্রিবিউন: কোন সিনেমার গান ছিল এটা?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: এখন ঠিক মনে নেই। তবে তার সঙ্গে আমার অনেক দেশের গান আছে। এরমধ্যে একটার কথা এমন—

‘পলাশের দিনে পলাশ হয়ে দেশে ফিরেছিল খোকা
দেখেনি জননী কোথাও কখনও এত লাল থোকা থোকা
হাহাকার করে উঠেছিল তাই খোকারে আমার খোকা…’

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউন: আপনার লেখা দেশাত্মবোধক গানের সংখ্যা কত হতে পারে?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: দুশ’ বা আড়াইশ’ হবেই। ঋতুর গান হবে শ’খানেক। বিভিন্ন বিশেষ উৎসবের গান। যেমন স্বাধীনতা দিবস, বৈশাখের গান, একুশে ফেব্রুয়ারি। এমন আরও শ’খানেক।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার বহুমাত্রিক সংগীত জীবনের একটা সমৃদ্ধ অংশ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’। এখনও এই অনুষ্ঠানটির জন্য নিয়মিত লিখছেন। এটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা কেমন করে?
 
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: এটা হঠাৎ করেই। আমি তখন হাতিরপুলে থাকি। চারতলা একটা বাড়ি। চতুর্থতলার ফ্ল্যাটটা নিয়ে আমি থাকি। হঠাৎ একদিন হানিফ সংকেত এসে হাজির। আমি কিন্তু চিনতে পারিনি প্রথমে। বললো, ‘আমি হানিফ সংকেত’। অনেক দিন পরে দেখা হয়েছিল, উনি ছিল টিভি রিলেটেড আর আমি বেতারে। আমি কিন্তু ‘ইত্যাদি’র সঙ্গে শুরু থেকে নেই। আমার আগে অনেকে অনেক গান লিখেছেন। আমার সঙ্গে শুরু হয়েছিল ‘পদ্ম পাতার পানি’ দিয়ে। অ্যান্ড্রু কিশোর গেয়েছিল। 

যাহোক, হানিফ সংকেত এসে আমাকে বললো, ‘রফিক ভাই একটা মেয়ের শ’পাঁচেক ক্যাসেট বেরিয়েছে, কিন্তু কেউ তাকে চিনে না। তাকে নিয়ে একটা গান করবো। আপনি একটু তার গান শোনেন, একটা গান লিখে দেন।’

গান শুনে বললাম, গলা তো ভালো। কিন্তু এসব কী গান করেছে! এরপর লিখলাম, ‘রিটার্ন টিকেট হাতে লইয়া, আইসাছি এই দুনিয়ায়, টাইম হইলে যাইতে হবে, যাওয়া ছাড়া নাই উপায়।’

মজার ব্যাপার হলো, এটা লিখেছিলাম বেইলি রোডের অডিও আর্ট স্টুডিওতে বসে। রেকর্ডিং ওখানে। সুর করেছে আলী আকবর রুপু। গানটা লেখার পরে ওখানে যারা ছিল, তারা আমাকে বলেছে, ‘আপনি তো এ ধরনের গান লিখেন না। এ ধরনের গান কি আপনি লিখতে পারেন ইচ্ছে করলে?’ আমি বললাম, এই যে লিখলাম। ওরা বললো, ‘আবার যদি লিখতে বলি’। বললাম, হ্যাঁ পারবো।

পরে ওখানে বসেই লিখলাম—

‘তুমি থাকো ঢাকা বন্ধু
আমি থাকি জিঞ্জিরায়
কেমনে তোমার প্রেমের পক্ষী
বাঁইধা রাখি পিঞ্জিরায়’

উপস্থিত গীতিকার-সুরকাররা বললো, ‘আরে ভালো গান লিখেছেন তো’। আমি বললাম, এটার অর্থটা কি বুঝেছো? বোঝেনি। তারা বুঝলো, ঢাকা আর জিঞ্জিরা এলাকার গল্প এটা। বললাম, প্রেমিককে দেখা যায় না- কে তিনি? যাকে দেখা যায় না, তিনি চোখের আড়ালে ঢাকা। আর প্রেমিকা, সংসার নামক জিঞ্জিরে আবদ্ধ। অর্থাৎ এই গানে আমি বুঝিয়েছি স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ক।

বাংলা ট্রিবিউন: সুর করা ছাড়া আপনার এখন কী পরিমাণ গান জমা আছে? গান কেউ চাইলে লিখেন, নাকি যখন যেটা মাথায় আসে…

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: গান যখন মনে হয় তখন লিখে রাখি। অনেক লেখা গান আছে- যার সুর হয়নি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাকে বলা হয় দেশের অন্যতম শিক্ষিত গীতিকবি। পাশাপাশি এটাও বলা হয়, আপনি অনেক কঠিন, কট্টর অথবা কড়া সমালোচকও। সেই জায়গা থেকে যদি জানতে চাই, আপনার পছন্দের গীতিকবি কারা আছেন। আপনার সমালোচনা বা আলোচনার জায়গা থেকে।

উল্লেখযোগ্য গান

যেখানে বৃষ্টি কথা বলে
আমি নদীর মতন বয়ে বয়ে
ভালো লাগে না লাগে না এই
শুক পাখিরে, পিঞ্জিরা তোর খুলে দিলাম আজ
দিনে কি রাতে
রিটার্ন টিকিট হাতে লইয়া আইসাছি এ দুনিয়ায়

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: এটা বলা আসলেই খুব কঠিন। আমার আগে যারা এসেছেন তাদের মধ্যে দুজন খুব পছন্দের। আমার ভাই মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান আর ডক্টর আবু হেনা মোস্তফা কামাল। এ দুজনের কথা আমি গর্ব করে স্মরণ করি এবং তাদের জন্য আমার মনে শ্রদ্ধা চিরকাল থাকবে।

আমার পরবর্তীদের মধ্যে, প্রথম যে একঝাঁক ছেলে এসেছিল, প্রত্যেকেই ট্যালেন্টেড। একজনও বেঁচে নেই। একজন আছে শুধু, মুনশী ওয়াদুদ। এছাড়া যারা এসেছিল তাদের মধ্যে একজন ছিল নজরুল ইসলাম বাবু, মাহফুজুর রহমান মাহফুজ, নুরুজ্জামান শেখ। নুরুজ্জামান শেখ অল্প বয়সে মারা গেছে। মাহফুজ আমেরিকায় চলে গেলো। বাবু অল্প বয়সে মারা গেলো। মুনশী এখনও লিখছে। ও শুদ্ধ গীতিকবি। ওর লেখায় ভুল নেই।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের ঘরে সাজানো কিছু পদক বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু এখন পর্যন্ত অনেক সুপারহিট গীতিকার আছেন, ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন অনেক, তাদের আপনি আপনার পছন্দের খাতায় নিলেন না কেন? জনপ্রিয়তা কি মানদণ্ড নয়?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: ব্যাপারটা কী, আমি বলতে গেলে তো নাম বলতে হবে, এটা হচ্ছে প্রবলেম। বাক্য শুদ্ধ না কিন্তু গান হিট। ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছে। আমি আমার প্রিয় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কথাই বলি। ও লিখেছে, ‘আমি লেংটা ছিলাম ভালো ছিলাম, ভালো ছিল শিশুকাল, মায়ের সাদা দুধের মতো, জীবন ছিল নির্ভেজাল’।

এখানে মা থার্ড পার্সন। তারপরই যখন মা’কে সম্বোধন করছে- তখন মা হয়ে গেলো সেকেন্ড পার্সন। একই ব্যক্তি একবার এক পার্সন হয় কেমন করে!

আরেকটা আছে, যেটা খুব হিট গান, কেউ ভুল ধরবে না, ‘এত সুর আর এত গান, যদি কোনোদিন থেমে যায়, সেই দিন তুমিও তো ওগো, জানি ভুলে যাবে যে আমায়।’ ‘তো’ আর ‘যে’ কখনও একবাক্যে ব্যবহার হয় না। হতে পারেও না। এরকম আছে অনেক ভুল। হাজার হাজার ভুল।

আরেকটা গান আছে জাতির পিতাকে নিয়ে। ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই’। ‘মরে নাই’ শব্দটা কেমন শোনায়?

প্রকাশিত গ্রন্থ
হৃদয়ের ধ্বনিগুলো (কবিতা)

আরেকটা গান আছে, ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য অপূর্ব রূপসী রূপেতে অনন্য, আমার দুচোখ ভরা স্বপ্ন ও দেশ তোমারই জন্য’। এটা কাকে বলা হচ্ছে? দেশকে। এখানে সুন্দর, সুবর্ণ ঠিক আছে। তারুণ্য হতে পারে না, দেশ তরুণ হতে পারে কিন্তু তারুণ্য না। লাবণ্য দেশ হতে পারে না। লাবণ্যময় হবে। কেমন! গান তো সুপার ডুপার হিট। কিন্তু এখানে বিশেষ্য ও বিশেষণের গোলমাল আছে। এতজনের এত গান ভুল লেখা হয়েছে, কিন্তু সুপারহিট।

বাংলা ট্রিবিউন: এই জায়গাটাতে উন্নয়ন হচ্ছে না কেন বা উন্নয়নের চিত্রটা কম কেন?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: উন্নয়নের চিত্র কম হচ্ছে এই জন্য যে গানের চিরায়ত ফরমেট থেকে চলে গেছে হিজিবিজিতে। এত বড় একটা মুখ আবার এক লাইনের একটা অন্তরা, আবার একটা মুখ—কী যে একটা অবস্থা।

বাংলা ট্রিবিউন: শিক্ষক বা গুরুজন হিসেবে এই সমস্যার দায় কি আপনি এড়াতে পারবেন?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: ব্যাপারটা হচ্ছে সবখানেই বহু সময় ধস নামে। কিন্তু সেখান থেকে আবার বেরিয়ে আসে।

ফলে সমাজে যখন কালো টাকা সঞ্চিত হয়, তখন তাদের রুচির মাপে সংস্কৃতিকে নামিয়ে আনে। তাকে বিনোদন দিতে হলে তো শিল্পীকে নিচে নামতে হবে। না নেমে উপায় নাই। এরকম অন্ধকার যুগ সবসময় আসে। ভালোর মধ্যে প্রথম চর্যাপদ, তারপরে শ্রীকৃষ্ণের কীর্তন, তারপরে নাই নাই নাই নাই, তারপর এসে বৈষ্ণব পদাবলীতে ঠাঁই পেলো। মাঝখানে সব আবর্জনা কোথায় ভেসে চলে গেছে।
 
বাংলা ট্রিবিউন: এসব দেখতে দেখতে ৮১ বসন্ত পার করলেন। কীভাবে পর্যালোচনা করবেন নিজেকে?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: অনেক কিছু করতে চেয়েছি। সেজন্যে বোধহয় কিছু ঠিকমতো করা হয়নি। আসলে রেডিওতে ঢোকার কারণে শিল্পী সুরকারেরা যত কাছে পেয়েছে, তারা যত বেশি আমার ওপরে ভর করেছে, ওই জন্যে আমার কবিতা থেকে গানে চলে যাওয়া। কখন চলে গেছি আমি নিজেও জানি না। আগে তো কবিতাই লিখতাম। কবিতা থেকে গানের কবিতায় ঢুকে গেছি। এছাড়া খুব ছবি আঁকতে ইচ্ছে করে। মাঝে-মধ্যে আঁকি এখনও।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের আঁকা ছবি বাংলা ট্রিবিউন: এমন আর কী অবহেলিত হয়েছে আপনার জীবনে?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: পেইন্টিং আর কবিতা। আমার কবিতা যখন সমকালে বা পলিমাটিতে ছাপা হতো, তখন আমার বয়সী কোনও কবির লেখা ছাপা হতো না ওইসব বড় পত্রিকায়।

বাংলা ট্রিবিউন: তার মানে কি এই পর্যায়ে এসে মনে হয় আপনার, কবিতাটাকে আরেকটু সময় দিতে পারতাম, ছবিটাকেও?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: হ্যাঁ, কবিতাটা পাশাপাশি লিখে যেতে পারতাম। কিন্তু গান আর চিত্রনাট্যের চাপ এত প্রবলভাবে ঘাড়ে এসে পড়েছে, কখন যে কবিতা থেকে চোখ সরে গেছে নিজেও জানি না। এসব ভাবলে খারাপ লাগে।

বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু গান বা সিনেমাও তো আপনাকে কম দেয়নি। জনপ্রিয়তা, সাহিত্যমান, অর্থ- সবই তো পেলেন।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: দিয়েছে, সেটা অন্য কথা। সম্ভাবনা জাগিয়েও কবিতা থেকে সরে গেছি। কবিতার জন্য খারাপ লাগে। আমার মনে আছে, কবি আজীজুল হক সাহেবের কথা। একদিন আমি ঢাকা থেকে যশোরে গেছি। ওখানে গেলেই উনি দেখা করতে বলেন আমাকে। আমিও ছুটে যেতাম প্রতিবার। কিন্তু একবার তিনি দেখা করতে চাইলেন না আমার সঙ্গে। আমি চমকে গেলাম! তিনি বললেন, ‘এসব গীতিকারের সঙ্গে আমি দেখা করতে চাই না। আমার কবি রফিকউজ্জামান যদি ফিরে আসে, তখন আমি দেখা করবো’।

আমার কবিতা তিনি কতটা পছন্দ করতেন, ভাবুন। এই বিষয়গুলো আমাকে বেশ পোড়ায়।

বাংলা ট্রিবিউন: আর কী আছে এমন খারাপ লাগার মতো?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: খারাপ লাগা আছে, যেটা সময়ের জন্য পারিনি। যেমন কথক নাট্যগোষ্ঠী তৈরি করেছিলাম আমরা। মূলত আমিরুল হক চৌধুরী ছিল এটার সঙ্গে, জহুরুল হক আর ডলি জহুরও ছিল। সৈয়দ আকরাম হোসেন সাহেবও ছিলেন। কিন্তু আমরা এটা চালিয়ে নিতে পারিনি। মূলত আকরাম হোসেন সাহেব ব্যস্ত হয়ে গেলেন ইউনিভার্সিটির দিকে, আর আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম গানের দিকে। যে জন্য নাটকের সঙ্গে থাকা হলো না। অথচ এই নাটক নিয়েই জীবন পার করে দেবো ভেবেছিলাম এক সময়।

বাংলা ট্রিবিউন: অভিনয়ের দিকটাও আপনি কিন্তু মোটামুটি ইগনোর করে গেছেন। মঞ্চ আর বেতারের পর সেটা কনটিনিউ করেননি।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: হ্যাঁ, ঢাকায় থিতু হওয়ার পর অভিনয়টা করা হয়নি। মঞ্চে নয়, টিভিতে ‘শার্লক হোমস’ দিয়ে শুরু করে ‘ঢাকায় থাকি’ সিরিজ পর্যন্ত অভিনয় করলাম। এরপর বেতারেও ‘শার্লক হোমস’ করলাম টানা ১০০ পর্ব। তারপর জার্মানি চলে গেলাম। মজার বিষয় যেটা অনেকেই জানেন না, অনেকটা বাধ্য হয়ে তিনটি সিনেমায় অভিনয়ও করেছি আমি!

‘ঈমান’, ‘মরণের পর’ ও ‘আজকের হাঙ্গামা’। বলা যায়, বাধ্য হয়ে ছোট ছোট তিনটি চরিত্রে অভিনয়টা করতে হয়েছিল।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের আঁকা ছবি বাংলা ট্রিবিউন: আমরা আলাপের শেষের দিকে প্রায়। সামনে আর কী কী কাজ করতে চান বা পরিকল্পনা কেমন?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: প্ল্যান করতে পারবো বলে মনে হয় না। ফলে এখন যা করছি বা যা নিজের মধ্যে আসছে লিখছি। করতে তো অনেক কিছুই ইচ্ছে করে, কিন্তু করা যায় না। যেমন, একসময় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, সেটিও করা হলো না ঠিকঠাক। অথচ আমার সঙ্গে বা পরে রাজনীতি করে এমপি-মন্ত্রীও হয়েছেন। বামপন্থি রাজনীতিতে জড়িত ছিলাম। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে, জেলে ছিলাম। তখন আমার বাচ্চা হয়েছিল। সেই মেয়েকে পরে জেলে নিয়ে গেছে আমাকে দেখানোর জন্য। এও তো জীবনে ঘটেছে। তো এভাবেই আরকি…।

বাংলা ট্রিবিউন: এই প্রজন্মের গীতিকবিদের জন্য বা স্ক্রিপ্ট রাইটারদের জন্য আপনার কোনও পরামর্শ আছে কিনা!

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: আমি একটা কথা বলবো, সত্যি বলুন সত্যি লিখুন। লেখকদের উদ্দেশে আমার যে কথা, সেটা হচ্ছে আপনার উদ্দেশ্য যেন সৎ এবং সত্যি হয়। অসৎ যেন না হয়। ক্ষমতার পেছনে দৌড়াবেন না। কোনও লেখকের ক্ষমতার পেছনে দৌড়ানো উচিত নয়। যদিও আমাদের দেশের অনেকেই ক্ষমতার পেছনে দৌড়াচ্ছেন। ক্ষমতার সুবিধা নিয়েছেন।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তিনবার (১৯৮৪, ১৯৮৬, ২০০৮) জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু পরে কেন জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন প্রকাশ্যে? এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন!

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: ৯৫ সাল। তখন আমার পেনশন কেসটা ঝুলছিল। বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। আমার বন্ধু তরিকুল ইসলাম তথ্যমন্ত্রী ছিল। তারপরও আমার পেনশন হচ্ছিল না। ওই হয়, হয় না। ঘুরতে থাকলাম।

একদিন পেনশনের খোঁজ নিতে গেছি মন্ত্রণালয়ে। যাওয়ার পরে অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি দৌড়ে এসে বললো, ‘আরে রফিক ভাই, আপনার তো দারুণ সুখবর আছে’। আমি বললাম, আমার পেনশনের ফাইল সই হয়েছে? সে বললো, ‘আরে না না, আসেন’। একেবারে টেনে নিয়ে গেছে ভেতরে। দেখালো, ফিল্ম জুরি বোর্ড তিন বছরের পুরস্কার একসঙ্গে দিচ্ছে। গান আর চিত্রনাট্য মিলিয়ে আমি একসঙ্গে সাতটা পুরস্কার পাচ্ছি! জুরি বোর্ড থেকেই এই রায় এসেছে।

তারপর যখন পত্রিকায় চূড়ান্ত তালিকা দেখলাম, কোথাও নেই আমি! একটি পদকও পাইনি।
 
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউন: মানে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে জানলেন পুরস্কার পেয়েছেন সাতটা, কিন্তু গেজেট প্রকাশের পরে দেখলেন একটাও পাননি?

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: হ্যাঁ। তখন আমি বুঝলাম কীভাবে পুরস্কার দেওয়া হয়। একবার তো নায়ক ফারুক জুরি বোর্ড থেকে ফিরে এফডিসিতে আমাকে দেখেই ক্ষেপে গেছেন। সে আমাকে বললো, ‘এই যে শুনেন তো রফিক ভাই, আপনাকে ভাই বলবো না কি বলবো বুঝতে পারছি না। আপনারা কেন এসব কাজ করতে আসেন। গানে পুরস্কার দিতে যাই, বলে না এটা ফিক্সড করা আছে আরেকজনের জন্য। স্ক্রিপ্টে দিতে যাই, বলে না এটা দেওয়া যাবে না। অমুককে দিতে হবে। যেটা বলি সেটাই অন্যকে দিতে হবে, তখন আমি রেগে বের হয়ে চলে এসেছি।’

এসব ঘটনার পরেই আমি ঘোষণা দিয়েছি, জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় কোনও পুরস্কার বা পদক আমি পেলেও গ্রহণ করবো না। কখনোই না। সেটা যে সরকারই হোক, যে কারণেই হোক। এসব অনেক কিছু হয়, অনেক কিছুই ঘটে জীবনে। এগুলো নিয়ে আমার কিন্তু কোনও ক্ষোভ নেই।

পুরস্কার ও সম্মাননা

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১৯৮৪, ১৯৮৬, ২০০৮
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কার, ১৯৮২
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড-দ্য ডেইলি স্টার জীবনের জয়গান উৎসব আজীবন সম্মাননা, ২০১০
চ্যানেল আই পুরস্কার, ২০০৩

শেষবার ২০০৮ সালে যখন পুরস্কার নিয়ে বের হই আমাকে কয়েকজন সাংবাদিক বললেন, ‘রফিক ভাই আপনার অনুভূতি বলেন’। বললাম, ভাই গরিব মানুষ আমি। টাকা পয়সার খুব অভাব। এক লাখ টাকা পেয়েছি, খুব কাজে লাগবে। এটার জন্য ধন্যবাদ। ওরা বললো, ‘আর ট্রফি?’ তখন আমি এগিয়ে দিয়ে বললাম, নিয়ে যান এটা। আমার কোনও দরকার নেই।

বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু একজন যোগ্য শিল্পীকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য পুরস্কারের তো দরকার আছে!

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: আছে। ওই যে বললাম, সবকিছু নির্ভর করে রাজনীতির ওপর। রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক বিষয়টা দেশের সবাই এত বিশৃঙ্খল করে ফেললো!

মুশকিলটা কোথায়- যিনি বা যে প্রতিষ্ঠান পুরস্কার দিচ্ছে তারাও সংস্কৃতি সচেতন নয়। আবার যিনি নিচ্ছেন- তিনিও নিজের কর্মের চেয়ে যেভাবেই হোক পুরস্কারকে করায়ত্ত করতে উদগ্রীব।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাকে আবারও ৮২তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা। দীর্ঘ এই সময়ের জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা।

মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: আপনাকেও ধন্যবাদ। ধৈর্য নিয়ে আমার গল্পগুলো শোনার জন্য। ভালো থাকবেন। মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান

ছবি: মাহমুদ মানজুর

/এমএম/এমওএফ/
টাইমলাইন: গীতিকবির গল্প
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:২১
অনেক কিছুই ইচ্ছে করে, কিন্তু করা যায় না: মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
সম্পর্কিত
খুশি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: ‘আবেদন না করেও পাওয়া যায়!’
স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৪খুশি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান: ‘আবেদন না করেও পাওয়া যায়!’
‘ফিরতে হবে গাজী মাজহারুল আনোয়ারদের কাছেই’
‘ফিরতে হবে গাজী মাজহারুল আনোয়ারদের কাছেই’
মনিরুজ্জামান মনির: জন্মদিনে জানালেন বই প্রকাশের খবর
মনিরুজ্জামান মনির: জন্মদিনে জানালেন বই প্রকাশের খবর
গানের জন্য একমাত্র পুত্রকে হারানো এবং...
গীতিকবির গল্পগানের জন্য একমাত্র পুত্রকে হারানো এবং...
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন: কোন পদে লড়ছেন কে
চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন: কোন পদে লড়ছেন কে
রাজকুমার: ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ এক বিয়োগান্তক ছবি
সিনেমা সমালোচনারাজকুমার: ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ এক বিয়োগান্তক ছবি
হলিউডের ‘ভূত’ আসছে দেশে!
হলিউডের ‘ভূত’ আসছে দেশে!
মাহির সঙ্গে প্রেম গুঞ্জন নিয়ে জয়: আমরা খুব ভালো বন্ধু
মাহির সঙ্গে প্রেম গুঞ্জন নিয়ে জয়: আমরা খুব ভালো বন্ধু
সালমানের বাড়ির সামনে গোলাগুলি, ছুটে এলেন মুখ্যমন্ত্রী
সালমানের বাড়ির সামনে গোলাগুলি, ছুটে এলেন মুখ্যমন্ত্রী