ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ যখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তখন খোদ ওয়াশিংটনেই উঠেছে প্রতিবাদের ঝড়। একদল যুদ্ধবিরোধী সাবেক মার্কিন সেনাসদস্য অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতি এখন মার্কিন স্বার্থে নয়, বরং ইসরায়েলের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে। তাদের দাবি, এই অসম যুদ্ধে অকারণে আমেরিকান সেনাদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারি তথ্যমতে ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। তবে বৃহস্পতিবার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক প্যানেল আলোচনায় সাবেক সেনারা দাবি করেন, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কারণ হিসেবে তারা জানান, জার্মানিতে পেন্টাগনের তিনটি সামরিক হাসপাতালই এখন যুদ্ধাহত সেনাদের ভিড়ে ‘পূর্ণ’ হয়ে আছে।
সাবেক মার্কিন বিমানবাহিনীর চিফ মাস্টার সার্জেন্ট ডেনিস ফ্রিটজ প্যানেল আলোচনায় ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ইসরায়েলের হয়ে মধ্যপ্রাচ্য দখলের যে মহাপরিকল্পনা, আমরা বরাবরই তার অংশ ছিলাম। ইরাক দিয়ে শুরু হয়েছিল, আর এখন তা আমাদের নারী-পুরুষ সেনাদের কাঁধে সওয়ার হয়েছে। তারা ভেবেছিল তারা নিজের দেশের জন্য লড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তারা লড়ছে অন্য একটি দেশ, ইসরায়েলের জন্য।
সম্প্রতি পদত্যাগ করা মার্কিন কাউন্টার-টেরোরিজম কর্মকর্তা এবং সাবেক সেনা জো কেন্ট একই সুরে বলেন, ইরান সরাসরি আমেরিকার জন্য কোনও আসন্ন হুমকি নয়। তবে এই যুদ্ধে কেবল ইসরায়েলই লাভবান হচ্ছে, কারণ ইরান মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি সামরিক শক্তির একমাত্র বড় প্রতিপক্ষ হতে পারে।
সাবেক সেনারা দাবি করেন, পেন্টাগনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার গভীরে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমনভাবে গেঁথে আছে যে তা আলাদা করা অসম্ভব। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে তারা ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলার কথা উল্লেখ করেন। ওই হামলায় ১৬৫ জন নিহত হয়েছিল, যাদের অধিকাংশ ছিল শিশু।
সাবেক গ্রিন বেরে অ্যান্থনি আগুইলার বলেন, ওই লক্ষ্যবস্তুর গোয়েন্দা তথ্য আমাদের দিয়েছিল ইসরায়েল। তারা ভালো করেই জানত ওটা স্কুল। ২০১৬ সাল থেকেই ওটা স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
যদিও মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন যে, আমেরিকা বেসামরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না, তবে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর বিশ্লেষণে এই হামলার জন্য মার্কিন দায়বদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক রে ম্যাকগভার্ন (৮৬) ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইসরায়েলের অনুরোধেই ইরানজুড়ে লক্ষ্যবস্তুর তালিকা দীর্ঘ করেছে পেন্টাগন।
অবসরপ্রাপ্ত আর্মি কর্নেল মাইলস বি ক্যাগিন্স থ্রি মনে করেন, ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল এখন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো মার্কিন রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব। তিনি বলেন, আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির মতো শক্তিশালী লবিস্ট গ্রুপগুলো বড় অঙ্কের নির্বাচনি ফান্ড নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে কোনও রাজনীতিবিদই তাদের বিরুদ্ধে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চান না।
যুদ্ধ কৌশল বিশেষজ্ঞ মাইকেল ভ্লাহোসের মতে, মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ে এক ধরণের মোহ তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ইসরায়েলিরা আমেরিকান পুলিশ এবং সোয়াত টিমগুলোকে প্রশিক্ষণ দিতে নিয়ে যায়। এর ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি স্তরে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে তারা ইসরায়েলিদের মতোই দুর্ধর্ষ ও সাহসী হতে চায়।
সাবেক নৌসেনা ইভান ইনগ্রাম বলেন, আমেরিকা সবসময় মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বজায় রাখতে চায় যাতে তাদের অস্ত্রের প্রভাব বজায় থাকে। তিনি ১৯৮৬ সালে তৎকালীন সিনেটর জো বাইডেনের সেই বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করিয়ে দেন— যদি ইসরায়েল না থাকত, তবে এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় আমাদের একটি ইসরায়েল আবিষ্কার করতে হতো।
ফ্রিটজ আরও বলেন, আমাদের সামরিক বাহিনীর নারী ও পুরুষদের এই অবৈধ যুদ্ধে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইনগ্রাম আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের দেশ এত দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধে লিপ্ত যে এটা এখন কারও কাছে কোনও অস্বাভাবিক বিষয়ই মনে হয় না। একবিংশ শতাব্দীর পুরোটা জুড়েই আমরা যুদ্ধ করেছি। এখন আমাদের ভাবতে হবে, সত্যিই কি আমরা এই অন্তহীন যুদ্ধের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে চাই কি না।









