পারস্য উপসাগরে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অতুলনীয় প্রথাগত সামরিক শক্তি, অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতিকে লণ্ডভণ্ড করে দিতে ইরানের ‘গেরিলা’ কায়দায় প্রতিরোধ, সব মিলিয়ে লড়াইটি এখন এক অসম প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী দ্রুততম সময়ে ইরানের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হাজার হাজার বিমান হামলার মাধ্যমে দেশটির নেতৃত্ব এবং সশস্ত্র বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে ইরানের নৌবাহিনীর বড় অংশ এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সক্ষমতা। কিন্তু গত এক শতাব্দীর ইতিহাস বলছে, বিশ্বের বৃহত্তম ও আধুনিক সামরিক বাহিনীগুলোকেও অনেক সময় নতি স্বীকার করতে হয়েছে এমন এক প্রতিপক্ষের কাছে, যারা চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের ভূখণ্ড রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের তুলনায় অনেক কম প্রযুক্তির অস্ত্র দিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তেহরান। এর মাধ্যমে তারা গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়েছে। তেহরানের লক্ষ্য স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্রকে একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘অর্থনৈতিক ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে’ টেনে আনা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করা।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানি বাহিনী অন্তত ১৬টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এর ফলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাজার থেকে ছিটকে পড়ায় দীর্ঘমেয়াদি সংকটের পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। ড্রোন, স্বল্পপাল্লার রকেট এবং সমুদ্র মাইনের বিশাল মজুদ ব্যবহার করে সরু এই প্রণালিতে জাহাজে হামলা চালানো ইরানের জন্য সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নাবিক ও শিপিং লাইনগুলো জীবন বা আর্থিক ঝুঁকির আশঙ্কায় এই পথ এড়িয়ে চলছে।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রণালিটি পুনরায় খুলে দিতে চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে মার্কিন বাহিনী ইরানের প্রধান তেল রফতানি টার্মিনাল খার্গ দ্বীপে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, অন্যান্য দেশগুলোও প্রণালিটি সচল করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে। ট্রাম্প আরও বলেন, মার্কিন নৌবাহিনী খুব শিগগিরই তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া শুরু করবে।
তবে মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত এই প্রণালিতে ড্রোন এবং জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে মার্কিন নাবিকদের জন্য এটি একটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে পারে। ইরান ভ্রাম্যমাণ জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছোট নৌকার সমন্বয়ে গঠিত ‘মস্কিটো ফ্লিট’ ব্যবহার করে অতর্কিত হামলা চালাচ্ছে। পেন্টাগন ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে আরও মেরিন সেনা পাঠাচ্ছে যারা বিমান হামলা এবং বিশেষ অভিযানে সক্ষম।
ইরান কয়েক দশক ধরে আমেরিকান হামলার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল জেমস স্ট্যাভরিডিস বলেন, কেবল এক পক্ষ যুদ্ধ শেষ ঘোষণা করলেই তা শেষ হয়ে যায় না; অপ্রিয় সত্য হলো, শত্রু সবসময়ই ভোট দেওয়ার সুযোগ পায় যে যুদ্ধ কখন শেষ হবে। আমেরিকানরা যুদ্ধের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ আমাদের প্রতি আগ্রহ বজায় রাখতে পারে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ মাইকেল ও’হ্যানলন বলেন, ইরানিদের পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়া থেকে বিরত রাখা তেলের দাম আগের স্তরে রাখার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, ট্রাম্প ও ইসরায়েলের এই ধারণা অত্যধিক আশাবাদী এবং বিভ্রান্তিকর হতে পারে যে, কেবল বিমান হামলা দিয়েই এই শাসনের পতন ঘটানো সম্ভব।
ইরানের প্রভাব মোকাবিলায় ট্রাম্প আন্তর্জাতিক তেল মজুদ ছেড়ে দেওয়া এবং রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছেন। এই পদক্ষেপ পরোক্ষভাবে ভ্লাদিমির পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধে অর্থায়নে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, ইউক্রেন দেখছে তাদের জন্য বরাদ্দ করা মার্কিন গোলাবারুদ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বিস্ফোরিত হচ্ছে। চীনও এই সুযোগে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষের রণকৌশল এবং সমরাস্ত্রের সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাচ্ছে।
লেবাননে ইরানের প্রক্সি হিজবুল্লাহ এই সপ্তাহে ইসরায়েলে প্রায় ২০০টি রকেট নিক্ষেপ করেছে। ইসরায়েল দুই বছর আগে এই সংগঠনটিকে চূর্ণ করার দাবি করলেও তাদের এই হামলা ইরানের টিকে থাকার ক্ষমতারই জানান দিচ্ছে।
নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। জনমত জরিপ বলছে, ভোটাররা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পক্ষপাতী নন। ১৯৮০-র দশকের ট্যাঙ্কার যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে সাবেক মার্কিন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মার্ক কিমিট বলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নও স্বাধীনভাবে ট্যাঙ্কার পাহারা দিয়েছিল। বর্তমান সংকটেও মিত্ররা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ না দিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানের ড্রোনের হুমকি এবং ট্যাঙ্কারগুলোতে হামলার সক্ষমতা ট্রাম্পকে বড় ধরনের ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারে। সরু প্রণালিতে জাহাজ রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক জাহাজ ও মাইন নিরোধক সক্ষমতা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একার নেই, যার জন্য মিত্রদের সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল








