ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে ইসরায়েলি হামলা এবং এর জবাবে সৌদি আরব ও কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় তেহরানের পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট এবং অন্যদিকে ইরানের এই চোখ রাঙানির লড়াইয়ে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।
বুধবার রিয়াদে যখন আরব ও মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ কূটনীতিকরা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন, ঠিক তখনই সৌদি আরবের রাজধানী লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। একই দিনে কাতারের একটি প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে তেহরান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বুধবারের এই সংঘাত যুদ্ধের এক নতুন মাত্রা উন্মোচন করেছে। কারণ এবারই প্রথম সরাসরি ইরানের জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস ফিল্ড সাউথ পার্স-এর ইরানি অংশে হামলা চালায় ইসরায়েল। এটি কাতার ও ইরান যৌথভাবে পরিচালনা করে। এর ফলে ইরাকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে ইরান। উল্লেখ্য, ইরান তাদের মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের ৭৫ শতাংশই এই ফিল্ড থেকে উৎপাদন করে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হানা একটি ‘বিপজ্জনক উসকানি’, যা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি হুমকি। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, “সাউথ পার্স ফিল্ডে ইসরায়েলি হামলা বর্তমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ।”
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইরানি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই ইসরায়েলি হামলার অনুমোদন দিয়েছেন। তবে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, এর আগে চলতি মাসের শুরুতে তেহরানে ‘অ্যাসিড বৃষ্টি’র কারণ হওয়া ইরানি জ্বালানি ডিপোতে হামলার ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষুব্ধ ছিল। কিন্তু সাউথ পার্সের ওপর রবিবারের এই হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের গবেষক ক্রিস্টিন দিওয়ান প্রশ্ন তুলেছেন, “তেল ও গ্যাস স্থাপনায় এই পাল্টাপাল্টি হামলায় ট্রাম্প প্রশাসন কি সত্যিই প্রস্তুত? তারা কি এর পরিণতি সামলাতে পারবে?”
ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান যখন কাতার ও সৌদি আরবের স্থাপনায় হামলা শুরু করে, তখন উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষোভ তেহরানের দিকে ঘুরে যায়। বিশেষ করে কাতার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। কাতার সরকার দোহায় নিযুক্ত ইরানের দূতাবাসের সামরিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সংঘাত যদি পুরোপুরি জ্বালানি উৎপাদন ধ্বংসের যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পরও বিশ্ব অর্থনীতিতে এর ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী হবে।
কাতারি নিরাপত্তা বিশ্লেষক নাওয়াফ আল-থানি লিখেছেন, “ইরানের আগ্রাসন এখন রাস লাফান পর্যন্ত পৌঁছেছে। যখন এলএনজি স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হয়, তখন এটি আর আঞ্চলিক সংঘাত থাকে না, এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।”
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্স-এ ঘোষণা করেছেন, “চোখের বদলে চোখ, এই সমীকরণ এখন কার্যকর। সংঘাতের নতুন স্তর শুরু হয়ে গেছে।”
ইরান ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে যে তারা সৌদি আরবের সামরেফ শোধনাগার ও জুবাইল পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স, আমিরাতের আল-হসন গ্যাস ফিল্ড এবং কাতারের মেসাইদ পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স ও রাস লাফান শোধনাগারে হামলা চালাবে। বুধবারের হামলায় কাতারের রাস লাফানে ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও যুদ্ধের কারণে এটি আগে থেকেই বন্ধ ছিল, তবে এই ক্ষতির ফলে উৎপাদন পুনরায় শুরু করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এই অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি পড়েছে বিশ্ববাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ২.৬৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১০.২৪ ডলারে পৌঁছেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ওমান থেকে কেনা অপরিশোধিত তেলের দাম এখন প্রতি ব্যারেল প্রায় ১৫০ ডলারে ঠেকেছে। এই তেল হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে রফতানি করা হয়।









