কাতারের প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি কেন্দ্রে চলতি সপ্তাহে ইরানের হামলার প্রভাবে কেবল জ্বালানি বাজারই নয়, সংকটে পড়েছে বিশ্বের প্রযুক্তি পণ্যের সরবরাহ চেইন। বেলুন ওড়ানো গ্যাস হিসেবে পরিচিত হলেও উন্নত চিপ নির্মাণ, মহাকাশ গবেষণার রকেট এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের এমআরআই মেশিনে হিলিয়াম অপরিহার্য। কাতার বিশ্বের মোট হিলিয়াম চাহিদায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে। তিন সপ্তাহ আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই দেশটি উৎপাদন স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।
আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কাতারের রাষ্ট্রীয় গ্যাস কোম্পানি জানিয়েছে, এই পরিস্থিতির কারণে তাদের হিলিয়াম রফতানি প্রায় ১৪ শতাংশ কমে যাবে।
প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সময় উপজাত হিসেবে হিলিয়াম পাওয়া যায়। বিশ্বের বৃহত্তম একক প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের মালিক কাতার বিশ্ববাজারের ৩০ শতাংশ হিলিয়াম জোগান দেয়। কাতারের রাস লাফান ফ্যাসিলিটি হলো বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি প্ল্যান্ট, যেখানে এই গ্যাস উৎপাদিত হয়। ২ মার্চ থেকে ড্রোন হামলার কারণে উৎপাদন বন্ধ করে দেয় কাতারগ্যাস। এরপর গত বুধ ও বৃহস্পতিবারের হামলায় স্থাপনাটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যা মেরামত করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
কর্নব্লুথ হিলিয়াম কনসাল্টিং-এর প্রেসিডেন্ট ফিল কর্নব্লুথ বলেন, পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা ছিল ছয় সপ্তাহের মধ্যে উৎপাদন শুরু করা, কিন্তু বর্তমান অবস্থায় তা অসম্ভব মনে হচ্ছে।
সংকট শুরুর পর থেকে হিলিয়ামের স্পট বাজারমূল্য দ্বিগুণ হয়েছে। তবে হিলিয়াম মূলত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে কেনাবেচা হয়। কর্নব্লুথ জানান, উৎপাদন বন্ধ হওয়ার প্রভাব এখনও বাজারে পুরোপুরি পড়েনি। মার্চে কাতার থেকে যে হিলিয়াম এশিয়ায় পৌঁছানোর কথা ছিল, তা আসতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। তাই আসল সংকট অনুভূত হবে আরও কয়েক সপ্তাহ পর।
সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরিতে হিলিয়াম অপরিহার্য, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেলের জন্য ব্যবহৃত হয়। সিলিকন ওয়েফার ঠান্ডা রাখতে হিলিয়ামের কোনও বিকল্প নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার সাংমিয়ুং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জং-হওয়ান লি বলেন, বর্তমান চিপ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ওয়েফার ঠান্ডা করার জন্য হিলিয়ামের কোনও কার্যকর বিকল্প নেই।
এছাড়া চিকিৎসাক্ষেত্রে এমআরআই মেশিনের সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট ঠান্ডা রাখতে এবং স্পেসএক্স বা ব্লু অরিজিনের মতো কোম্পানির রকেট জ্বালানি ট্যাংক পরিষ্কার করতে হিলিয়াম ব্যবহৃত হয়।
হিলিয়াম গ্যাস আকারে রাখা অত্যন্ত কঠিন কারণ এর ক্ষুদ্র অণুগুলো সামান্য ছিদ্র দিয়েও বেরিয়ে যেতে পারে। কাতার সাধারণত একে তরল আকারে বিশেষায়িত কন্টেইনারে করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাঠায়। এই কন্টেইনারগুলো ৩৫ থেকে ৪৮ দিন পর্যন্ত হিলিয়াম ধরে রাখতে পারে। এরপর তাপমাত্রা বাড়লে গ্যাস বেরিয়ে যায়।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ২০০টি এমন কন্টেইনার আটকে আছে, যার প্রতিটির মূল্য ১০ লাখ ডলার। কর্নব্লুথ বলেন, কাতার থেকে এই কন্টেইনারগুলো সরিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন করাই হবে এই সংকটের সবচেয়ে কঠিন অংশ।
এআই বিপ্লবের এই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ শিল্প বড় ঝুঁকির মুখে। ফিচ রেটিং-এর মতে, স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স এবং এসকে হাইনিক্স তাদের হিলিয়াম চাহিদার ৬৫ শতাংশই কাতার থেকে আমদানি করে। দক্ষিণ কোরিয়া সরকার ইতোমধ্যে ১৪টি সেমিকন্ডাক্টর সামগ্রীকে বিশেষ নজরদারিতে রেখেছে, যার মধ্যে হিলিয়াম অন্যতম।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই বড় ধরনের বিপর্যয় হবে না। চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে কিন্তু বড় কোনও প্রভাবের আশঙ্কা করছে না। স্যামসাং বা এসকে হাইনিক্সের কাছে কয়েক মাসের মজুত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফিল কর্নব্লুথ বলেন, যদি হিলিয়ামের ঘাটতি তীব্র হয়, তবে শিল্পখাতে গুরুত্ব অনুযায়ী এটি বরাদ্দ করা হবে। সেক্ষেত্রে চিপ নির্মাণ এবং চিকিৎসা খাত সবার আগে প্রাধান্য পাবে।
সূত্র: এপি









