হোয়াইট হাউস থেকে শুরু করে ইরানের সাবেক যুবরাজ তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রবক্তারা একে মার্কিনিদের এবং খোদ ইরানিদের কাছে এক ‘মুক্তির ক্রুসেড’ হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানি শাসকগোষ্ঠী এখনো বহাল তবিয়তে আছে, অথচ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লাশের সংখ্যা, ছড়িয়ে পড়ছে পরিবেশগত বিপর্যয় এবং ধ্বংস হচ্ছে বেসামরিক অবকাঠামো।
ইরানের ভেতরে ধ্বংসলীলা চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি এই যুদ্ধ; এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে এবং যুদ্ধ এখন ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। সম্প্রতি বিকল্প ধারার সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্টারসেপ্ট-এর একটি পডকাস্টের আলোচনায় এমন চিত্র উঠে এসেছে।
ইসরায়েলের মূল লক্ষ্যবস্তু এখন লেবানন। দেশটিতে ইসরায়েলি অনুপ্রবেশ এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে বৈরুতের কেন্দ্রে আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহতের সংখ্যা ১০০০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। শুরু হয়েছে স্থল অভিযান এবং ১০ লাখেরও বেশি লেবানিজ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
বৈরুতভিত্তিক সাংবাদিক আফিফ নেসুলি বলেন, ‘লেবাননের মানুষ এখন চরম দুর্ভোগে আছে, তাদের বাঁচানোর মতো কেউ নেই। তারা জানে তারা নিছক দাবার ঘুঁটি, যাদের ভাগ্য ফিলিস্তিনিদের মতোই।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ইসরায়েল দক্ষিণ লিটানি নদী পর্যন্ত এলাকা দখল করে সেখানে বসতি স্থাপন করবে এবং স্থানীয়দের আর কখনোই তাদের ভিটেমাটিতে ফিরতে দেবে না।
দ্য ইন্টারসেপ্ট-এর সিনিয়র এডিটর আলী গারিব বলেন, “এটি স্তম্ভিত হওয়ার মতো বিষয় যে মানুষ এখনও ‘মানবাধিকার হস্তক্ষেপের’ এই ধারণাটি গিলছে। অথচ এটি অর্জিত হচ্ছে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে।”
তিনি উল্লেখ করেন, ইসরায়েলের কৌশল হলো প্রতিপক্ষ দেশগুলোকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’ পরিণত করা। তাদের জন্য রেজা পাহলভির মতো কোনও গণতান্ত্রিক নেতার প্রয়োজন নেই; তাদের শুধু এমন কাউকে দরকার যে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে এতটা ক্ষতিগ্রস্ত করবে যাতে দেশটি খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায় এবং ইসরায়েলের জন্য আর কোনও হুমকি না থাকে।
পিস স্ট্র্যাটেজিস্ট সানাম নারাঘি-আন্দেরলিনি বলেন, গত ২৫ বছর ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য লবিং চলছে। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয় হলেও ইসরায়েল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য ছিল এক ‘সাফল্য’। কারণ ইরাক যদি একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠত, তবে তা ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলকে এবং ইসলামের আদর্শগত প্রশ্নে সৌদি আরবকে চ্যালেঞ্জ জানাত।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানে অন্তত ১ হাজার ৪০০ জন নিহত এবং ১৮ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে হাসপাতাল, ওষুধ কারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বেসামরিক জ্বালানি ডিপো। এর বিপরীতে ইরান ইসরায়েল ও ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
লেবাননের চিত্র আরও ভয়াবহ। বৈরুতের তায়ৌনেহ এলাকা এখন তাবু শহরে পরিণত হয়েছে। সাংবাদিক নেসুলি জানান, প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জন লেবানিজ এখন বাস্তুচ্যুত। সেন্ট্রাল বৈরুতের আবাসিক ভবনগুলো এখন ধ্বংসস্তূপ। বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো স্কুল, স্টেডিয়াম এমনকি খোলা আকাশের নিচে ঘুমাচ্ছে। দেশের অর্থনীতি আগে থেকেই বিধ্বস্ত ছিল, এখন তা টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
সানাম নারাঘি-আন্দেরলিনি ইসরায়েলি সাংবাদিকদের সঙ্গে এক আলাপচারিতার কথা স্মরণ করেন। তারা তাকে বলছিলেন যে, ইরানিরা চায় ইসরায়েল গিয়ে তাদের ‘মুক্ত’ করুক। এর জবাবে সানাম প্রশ্ন ছুড়ে দেন, “আপনারা কি তাদের আত্মা থেকে তাদের দেহকে মুক্ত করতে চান?”
এই যুদ্ধের প্রবক্তারা মানবাধিকারের বুলি আওড়ালেও আদতে তারা ‘কার্পেট বোম্বিং’ এবং বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে একটি প্রাচীন সভ্যতাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে। যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এসে এটি পরিষ্কার যে, এই তথাকথিত ‘মুক্তির যুদ্ধে’ সাধারণ মানুষের মুক্তি মিলছে না, মিলছে কেবল মৃত্যু আর ধ্বংস।









