তেহরানের আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন আর মুহুর্মুহু বিমান হামলার মধ্যেই ঘনিয়ে আসছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সর্বশেষ সময়সীমা। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ‘চরম ধ্বংসাত্মক’ হামলার হুমকি মোকাবিলায় এবার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো রক্ষায় তরুণ সমাজকে ‘মানবঢাল’ বা মানববন্ধন গড়ার আহ্বান জানিয়েছে ইরান সরকার। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে ট্রাম্পের দেওয়া আল্টিমেটাম আজ মঙ্গলবার ওয়াশিংটন সময় রাত ৮টায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৬টা) শেষ হচ্ছে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই সময়সীমা ‘চূড়ান্ত’। দাবি মানা না হলে একরাতেই ইরানের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আগামীকাল রাত ১২টার মধ্যে ইরানের প্রতিটি সেতু ধ্বংস হয়ে যাবে এবং সব বিদ্যুৎকেন্দ্র এমনভাবে জ্বলবে ও বিস্ফোরিত হবে যে সেগুলো আর কখনোই ব্যবহার করা যাবে না।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় যুব ও কিশোর বিষয়ক সুপ্রিম কাউন্সিলের সচিব আলিরেজা রহিমি বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্র আমাদের জাতীয় সম্পদ। এগুলো রক্ষায় সব তরুণ, অ্যাথলেট, শিল্পী ও ছাত্র-শিক্ষকদের মানববন্ধন তৈরির আহ্বান জানাচ্ছি।’ অতীতে পারমাণবিককেন্দ্র রক্ষায় ইরানিরা এমনটা করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কারণে তেহরানের প্রধান একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এরই মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক্সে জানিয়েছেন, দেশের হয়ে লড়তে ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নাম লিখিয়েছেন। তিনি নিজেও দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত বলে ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হুমকি দিয়েছে, হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বছরের পর বছর তেল-গ্যাস থেকে বঞ্চিত করা হবে।
আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার আগেই মঙ্গলবার তেহরানের আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে তীব্র বিমান হামলা হয়েছে। আলবোরজ প্রদেশে এক হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন। শাহরিয়ারে ৯ জন এবং পারদিসে ৬ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া পশ্চিমাঞ্চলীয় খোররামাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলা হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী সিরাজের একটি পেট্রোকেমিক্যালকেন্দ্রে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো হামলা চালিয়েছে এবং ইরানিদের ট্রেন ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরান থেকে সৌদি আরব ও ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। সৌদি আরবে সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর দেশটি বাহরাইনের সঙ্গে সংযোগকারী কিং ফাহাদ কজওয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।
ট্রাম্পের এমন ধ্বংসাত্মক হামলার হুমকিকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্বনেতারা। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো বলেন, বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা যুদ্ধের নিয়ম ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছেন। তবে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি নিয়ে তিনি ‘একদমই চিন্তিত নন’।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যুদ্ধের শুরুর তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ছাড়িয়েছে। পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীরা একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য ‘সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়াচ্ছেন’ বলে জানা গেছে। ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্ত দিয়েছে, যার কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র নমনীয় হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
তেহরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন চরম আতঙ্ক। এক যুবক কফি শপে বসে বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে আমরা এখন কাঁচির দুই ব্লেডের মাঝখানে আটকে আছি।’









