ঢাকার শাহবাগ থেকে দিল্লির শাহীনবাগ: আন্দোলনের সাত মিল

Send
রঞ্জন বসু, দিল্লি
প্রকাশিত : ০৭:৩০, জানুয়ারি ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৫১, জানুয়ারি ২৯, ২০২০

ভারতের রাজধানী দিল্লির এক প্রান্তে শাহীনবাগে গত প্রায় দেড় মাস ধরে চলছে বিতর্কিত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন ও প্রস্তাবিত জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি)-র বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ আন্দোলন। শান্তিপূর্ণ এই জমায়েত মনে করিয়ে দিচ্ছে ঠিক সাত বছর আগে ঢাকার শাহবাগে ছাত্রছাত্রী ও তরুণ সমাজের ঐতিহাসিক আন্দোলনকে।

শাহবাগ আর শাহীনবাগ– আন্দোলনের মিল শুধু জায়গা দুটোর নামেই নয়, প্রতিবাদের চরিত্রেও যেন অনেক সাদৃশ্য আছে এই দুইয়ের মধ্যে। দুটো শহরের মধ্যে ব্যবধান প্রায় দেড় হাজার মাইলের, দুটো আন্দোলনের মধ্যে সময়ের ফারাকও সাত বছরের। তবুও শাহবাগ আর শাহীনবাগ, দুইই নিজ নিজ দেশকে নতুন করে ভাবিয়েছে – এবং ভাবাচ্ছে।

শাহীনবাগের খুব কাছেই দিল্লির ঐতিহ্যবাহী জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস। জামিয়া থেকে রোজ শাহীনবাগের জমায়েতে যোগ দিতে আসেন এমএ দ্বিতীয় বর্ষের ইতিহাসের ছাত্রী রাফিয়া ইউসুফি। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন, ‘ঢাকার শাহবাগ থেকে কিন্তু আমরাও অনেক কিছু শিখেছি। অহিংসা আর সত্যাগ্রহ এই একুশ শতকেও যে কতটা কার্যকরী, শাহবাগ তা আমাদের শিখিয়েছিল। এখন ভারতেও সেটারই সফল প্রয়োগ করে দেখাচ্ছে আমাদের এই শাহীনবাগ!’

আসলে এই দুই আন্দোলনের মধ্যে যে অনেক মিল আছে, তা কিন্তু বোঝা যায় একটু খেয়াল করলেই।

প্রথমত, দুটো আন্দোলনই শুরু হয়েছে কিছুটা আকস্মিকভাবে, কোনও পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লা যখন মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পেয়ে আঙুল তুলে ‘ভিক্টোরি সাইন’ দেখিয়েছিলেন, সেটিই সূচনা করেছিল শাহবাগ। অন্যদিকে দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে গত ১৫ ডিসেম্বর বিকেলে পুলিশ ঢুকে যখন ছাত্রছাত্রীদের ওপর নির্যাতন চালায়, সেটির প্রতিবাদেই সহসা পথে নেমে আসে শাহীনবাগ। সেই প্রতিবাদ আজও চলছে।

দ্বিতীয়ত, দুটো আন্দোলনেই প্রতিবাদের ধরনেও অনেক মিল। শাহবাগ আর শাহীনবাগ, দুটো জায়গাতেই প্রতিবাদকারীরা অবস্থান ও ধরনা চালিয়ে যাচ্ছেন শান্তিপূর্ণভাবে। মঞ্চে এসে নানা মানুষ গান গাইছেন, শের-শায়েরি বা কবিতা পড়ছেন, বক্তৃতা দিচ্ছেন, এমন কী রাজনীতিকরাও কেউ কেউ আসছেন– কিন্তু কোথাওই কোনও রাজনৈতিক দলের ব্যানার নেই। তবে হ্যাঁ, শাহবাগের নাগরিক আন্দোলনে যেমন নেতৃত্ব দিয়েছিল গণজাগরণ মঞ্চ, তেমনি শাহীনবাগেও সংগঠকদের একটি কোঅর্ডিনেশন কমিটি আত্মপ্রকাশ করেছে ঠিকই – কিন্তু তার নেতারা নেপথ্যেই রয়েছেন।   

তৃতীয়ত, শাহবাগ আর শাহীনবাগ- দুয়েরই মূল প্রতিবাদ কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদ আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেই। শাহবাগ যেভাবে গর্জে উঠেছিল বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামির ধর্মান্ধতা আর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে – ঠিক সেভাবেই শাহীনবাগও কিন্তু আসলে প্রতিবাদ জানাচ্ছে ভারতকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ বানানোর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেই। ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের আওতা থেকে মুসলিমদের বাইরে রেখে দেশের সংবিধানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে, ঠিক এই বার্তাই দিচ্ছে শাহীনবাগ।  

চতুর্থত, এই দুটো প্রতিবাদ সমাবেশই আয়োজিত হয়েছে শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বা মোড় আটকে রেখে। শাহবাগ ঢাকার একটি সদাব্যস্ত ট্রাফিক মোড়, দিনের পর দিন সেই পথটি আটকে থাকায় বহু মানুষের যাতায়াতে অসুবিধা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তারা বৃহত্তর স্বার্থে সেই অসুবিধা মেনে নিয়েছেন। ঠিক সেভাবেই শাহীনবাগ দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী নয়ডার সংযোগকারী একটি প্রধান রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে বলে বহু মানুষকে আজকাল অনেক ঘুরপথে যেতে হচ্ছে, কিন্তু তবু বেশিরভাগ লোকই হাসিমুখে সেই অসুবিধা সয়ে নিচ্ছেন।  

পঞ্চমত, শাহবাগ আর শাহীনবাগ – দুটোতেই আন্দোলনের ব্যাপ্তি সত্যিই অবাক করার মতো। ঢাকার শাহবাগে আন্দোলন সমাবেশ চলেছিল টানা মাসখানেকের মতো – এবং আজকের যুগেও মানুষ যে সব কাজকর্ম ফেলে দিনের পর দিন আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারে, সেটি শাহবাগ প্রমাণ করে দিয়েছিল। শাহীনবাগের আন্দোলনও আজ ৪৫ নট আউটে ব্যাটিং করছে, অর্থাৎ দিল্লির এই শান্তিপূর্ণ সমাবেশ দেড় মাসে পড়েছে এবং সেখানে উৎসাহে ভাঁটা পড়ার এখনও কোনও লক্ষণই নেই!

ষষ্ঠত, ঢাকা ও দিল্লির দুই আন্দোলনই শাসককে যথেষ্ট বিব্রত করতে পেরেছে, চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে। শাহবাগের আন্দোলনে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রাথমিকভাবে সমর্থন থেকে থাকলেও পরে সেই আন্দোলন ভেঙে দেওয়ার জন্য শাসক দল নানাভাবে চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। আর দিল্লিতেও বিজেপি প্রথম দিকে শাহীনবাগ-কে উপেক্ষা করার নীতি নিয়ে চললেও এখন তারা হেয় করার কোনও চেষ্টাই বাদ দিচ্ছেন না। শহরের এক বিজেপি এমপি (পরভেশ ভার্মা) তো ঘোষণা করেছেন, দিল্লির নির্বাচনে জিতে এলে তারা ‘এক ঘণ্টায় শাহীনবাগের ছুটি করে দেবেন’।

সপ্তমত, এছাড়া কবিতায়-গানে যেভাবে শাহবাগকে বন্দনা করেছিলেন শিল্পী-কবি-গায়করা, ঠিক একই জিনিস দেখা যাচ্ছে শাহীনবাগের ক্ষেত্রেও। আরও অনেকের মতো শাহবাগের জন্য গান বেঁধেছিলেন ‘গানওলা’ কবীর সুমন। পাশাপাশি, এদিকে শাহীনবাগের জন্যও কলম ধরেছেন বিহারের দ্বারভাঙ্গা থেকে আসা অশীতিপর কবি তেহজিব, কিংবা বিখ্যাত উর্দু শায়ের মুনাব্বর রানাও।

ফলে এদেশের নাগরিক আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ও অ্যাক্টিভিস্টরা অনেকেই বিশ্বাস করছেন, সাত বছর আগে ঢাকার শাহবাগের সঙ্গে আজ দিল্লির শাহীনবাগের প্রচুর মিল আছে। বামপন্থী রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এ কথাও বিশ্বাস করেন, ‘দেখবেন শাহবাগ আন্দোলন যেভাবে সফল হয়েছিল, শাহীনবাগও ঠিক তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে।’           

 

/এএ/

লাইভ

টপ
X