করোনা মোকাবিলায় ভিয়েতনামের সাফল্যের নেপথ্যে

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ০২:৪৩, মে ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:৪৮, মে ১৬, ২০২০

৯ কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যার দেশ ভিয়েতনাম। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির সঙ্গে  চীনের দীর্ঘ স্থল সীমান্ত রয়েছে। কিন্তু সেখানে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৩০০-এর কিছু বেশি। মৃতের সংখ্যা শূন্য। সেখানে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের পর প্রায় এক মাস কেটে গেছে। ইতোমধ্যেই সবকিছু খুলতে শুরু করেছে। বিবিসি নিউজের অ্যানা জোন্স লিখেছেন কীভাবে ‘বাড়তি’ পদক্ষেপ নিয়ে ভাইরাস মোকাবিলায় সফল হয়েছে ভিয়েতনাম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য দেশে এখনও সংক্রমণ ও মৃত্যু ব্যাপক মাত্রায় বাড়ছে। কিন্তু ভিয়েতনাম গোড়ার দিকে সংক্রমণের হার যখন কম ছিল, তখনই দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। তবে এর জন্য অনেক শ্রম ব্যয় করতে হয়েছে। মূল্যও দিতে হয়েছে। যে ধরনের কঠোর পদক্ষেপ তারা নিয়েছিল, তার নেতিবাচক দিকও ছিল।

সবচেয়ে বড় কথা হলো বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ভিয়েতনামের এই সাফল্য থেকে অন্য দেশগুলোর শিক্ষা নেওয়ার জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছে। অন্য দেশগুলো সেই সুযোগ মিস করে গেছে। এখন এসব দেশে সংক্রমণ ক্রমশই বাড়ছে এবং তা চূড়ায় পৌঁছনোর পথে রয়েছে।

'চরম কিন্তু প্রয়োজনীয়' পদক্ষেপ

‘যখন এ ধরনের অজানা ও সম্ভাব্য বিপদজনক একটা জীবাণুর বিরুদ্ধে আপনি লড়াইয়ে নেমেছেন, তখন বাড়াবাড়ি প্রতিক্রিয়া অনেক ভালো।’ এমনটাই মনে করেন ভিয়েতনামে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য গবেষণা বিষয়ক অংশীদার সংস্থার ড. টড পোলাক। তিনি কাজ করেন হ্যানয়ে।

এই ভাইরাস স্বল্প পরিসরে ছড়ালেও দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে; এটা আঁচ করতে পেরে ভিয়েতনাম কর্তৃপক্ষ গোড়াতেই ভাইরাস ঠেকাতে ব্যাপক পরিসরে উদ্যোগ নেয়।

জানুয়ারি মাসের শুরুতে, যখন দেশটিতে একজনেরও ভাইরাসটি শনাক্ত হয়নি, তখনই ভিয়েতনাম সরকার ‘চরম পর্যায়ে পদক্ষেপ’ নেওয়া শুরু করে দেয়। রহস্যময় নতুন এই নিউমোনিয়া রোগে তখন উহানে মারা গেছে মাত্র দুই জন। সেই পর্যায়ে তাদের প্রস্তুতির শুরু।

জানুয়ারি মাসের ২৩ তারিখে সেখানে প্রথম রোগী শনাক্ত হয়, যখন উহান থেকে এক ব্যক্তি তার ছেলেকে দেখতে হো চি মিন সিটিতে যান। ভিয়েতনাম তখন থেকেই শুরু করে দেয় তার জরুরি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।

হো চি মিন সিটিতে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক গাই থোয়েটস ভিয়েতনাম সরকারের সংক্রামক ব্যাধি কর্মসূচির সঙ্গেও যুক্ত। তিনি বলেন, ‘ভিয়েতনাম এত দ্রুত পদক্ষেপ নিতে শুরু করে যা তখন মনে হয়েছিল বেশি বাড়াবাড়ি। কিন্তু পরে দেখা গেছে সেটা সুবিবেচনার কাজই ছিল।’

ভিয়েতনাম এমন সব পদক্ষেপ নিতে শুরু করে যা নিতে অন্যান্য দেশের সময় লেগে যাবে কয়েক মাস। তারা ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আনে, চীনের সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় পর্যবেক্ষণ কঠোর করে। কিছুদিনের মধ্যে সীমান্ত পথে চলাচল পুরো বন্ধ করে দেয়। সীমান্ত এবং অন্যান্য নাজুক জায়গাগুলোতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাড়িয়ে দেয়।

জানুয়ারির শেষে চান্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে স্কুলগুলো বন্ধ ছিল। তখনই স্কুলের ছুটি মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং অর্থাৎ সংক্রমিত কারও সংস্পর্শে কারা কারা এসেছে তা খুঁজে বের করতে ব্যাপক জনশক্তি নিয়োগ করা হয়। প্রচুর পরিমাণ অর্থ ব্যবহার করা হয়।

অধ্যাপক থোয়েটস বলেন, ‘ভিয়েতনামকে আগেও বহু রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করতে হয়েছে।’ যেমন ২০০৩ সালে সার্স থেকে শুরু করে ২০১০-এর এভিয়ান ফ্লু, এছাড়াও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া হাম ও ডেঙ্গু।

তিনি বলেন, ‘সরকার এবং দেশটির মানুষ সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় অনেক অনেক বেশি অভ্যস্ত। ধনী দেশগুলোর চেয়ে এ ব্যাপারে তারা সম্ভবত অনেক বেশি অভিজ্ঞ। তারা জানে কীভাবে এগুলো মোকাবিলা করতে হয়।’

মার্চ মাসের মাঝামাঝি এসে ভিয়েতনাম দেশটিতে ঢোকা প্রত্যেক মানুষকে এবং দেশের ভেতর পজিটিভ শনাক্ত হওয়া রোগীর সংস্পর্শে আসা প্রত্যেককে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টিন সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়। এর খরচের বেশিরভাগটাই বহন করে সরকার। যদিও কোয়ারেন্টিন সেন্টারে থাকার ব্যবস্থা সেভাবে বিলাসবহুল ছিল না। ভিয়েতনামে বাড়ি এমন একজন নারী অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফিরে যান সে সময়। কারণ তিনি মনে করেছিলেন, ভিয়েতনামে থাকাই বেশি নিরাপদ হবে। বিবিসি-র ভিয়েতনাম বিভাগকে ওই নারী বলেছিলেন যে, প্রথম রাতে তাদের শোবার জন্য শুধু একটা মাদুর দেওয়া হয়েছিল। কোনও বালিশ বা কম্বল ছিল না। একটা বড় ঘর যেখানে খুবই গরম ছিল সেখানে দেওয়া হয়েছিল মাত্র একটা পাখা।

রোগের লক্ষণ নেই কিন্তু জীবাণু বহন করছে তাদের থেকে সুরক্ষা

অধ্যাপক থোয়েটস বলছেন, ব্যাপক পরিসরে মানুষকে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো এই সাফল্যের পেছনে একটা বড় কারণ। কেননা যত মানুষ সংক্রমিত হয়েছিল তথ্য প্রমাণে দেখা গেছে তাদের অর্ধেকের রোগের লক্ষণ ছিল না, কিন্তু তাদের শরীরে ভাইরাস ছিল। অর্থাৎ তারা ছিল যাদের বলা হচ্ছে 'অ্যাসিম্পটোমেটিক' ।

কোয়ারেন্টিনে যাদের নেওয়া হয়েছিল, তাদের সবাইকে পরীক্ষা করা হয়েছিল, তারা অসুস্থ হোক বা না হোক। অধ্যাপক থোয়েটস বলেন, পরীক্ষা করা না হলে ভিয়েতনামে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত রোগীদের শতকরা ৪০ ভাগ জানতোই না যে তাদের শরীরে ভাইরাস রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এখন জীবাণু বহনকারী (অ্যাসিম্পটোমেটিক) রোগীর সংখ্যা যদি এতো বেশি হয়, তাহলে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে করণীয় একটাই, যেটা ভিয়েতনাম করেছে।’

অধ্যাপক থোয়েটস বলেন, ‘এদের ভেতরে যদি আটকে রাখা না হতো, তাহলে এরা বাইরে ঘুরে বেড়াতো এবং অন্যদের সংক্রমিত করতো।’ আর দেশটিতে একজনও মারা না যাবার পেছনে এটাই ব্যাখ্যা।

বাইরে থেকে যারা সে সময় ভিয়েতনামে ফিরছিল তাদের বেশিরভাগই ছিল শিক্ষার্থী, পর্যটক, অথবা ব্যবসার কারণে ভ্রমণকারী। এরা বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং তাদের স্বাস্থ্য সমস্যা সেভাবে ছিল না।

ফলে এদের নিজেদের পক্ষেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার ভাল সক্ষমতা ছিল। আর তাদের পক্ষে বয়স্ক কোন আত্মীয়কে এই ভাইরাসে সংক্রমিত করার সুযোগ ছিল না। ফলে দেশটির স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা অল্প কিছু সংখ্যক গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়াদের চিকিৎসায় মন দিতে পেরেছিল।

ভিয়েতনামে দেশজুড়ে কখনই লকডাউন দেয়া হয়নি। কিন্তু কোথাও গুচ্ছ সংক্রমণের খবর আসলেই কর্তৃপক্ষ তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

ফেব্রুয়ারি মাসে হ্যানয়ের উত্তরে সন লই এলাকায় হাতে গোণা কয়েকজন সংক্রমিত হবার পরই ওই এলাকা ও আশপাশের ১০ হাজারের বেশি মানুষকে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়। একই পদক্ষেপ নেওয়া হয় রাজধানীর কাছে হা লই নামে আরেকটি এলাকায় যেখানে অবরুদ্ধ করে রাখা হয় ১১ হাজার মানুষকে। একটি হাসপাতালকেও রোগী ও কর্মীসহ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।

এই অবরোধ ভেঙে কাউকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত বেরতে দেয়া হয়নি যতক্ষণ না তারা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন যে, সেখানে আর একজনও সংক্রমিত রোগী নেই।

/এমপি/

লাইভ

টপ